অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

Banglalive

ময়দানকে যদি কলকাতার ফুসফুস বলা যায়, তবে সেই একই যুক্তিতে এ জায়গাটিকেও নিঃসন্দেহেই কলকাতার কিডনি বলে চালানো যেতে পারে। বা হয়তো বলা উচিত, চালানো যেতে পারতোএর কারণ সে আজ আর ভালো নেই। গত তিন বা চারটি দশকে তার কর্মক্ষমতা লক্ষণীয় ভাবেই কমেছে – আর আজ তার শেষ নিঃশ্বাস ফেলাও বোধকরি সময়ের অপেক্ষা কেবল। সেই শোকসংবাদটি শেষ অবধি ঘোষণার আগেই – তাকে নিয়েই দুএক কথা বলবার তাই প্রয়োজন বোধ করলাম।

 ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮-র খবরের কাগজে কলকাতার এক বাঙালী প্রযুক্তিবিদের মৃত্যুসংবাদের খবর সেদিন বোধহয় অনেকেরই নজর এড়িয়ে যেতে পেরেছিল। বিগত কয়েকদিনে, ফেসবুক – হোয়াটস্যাপ ইত্যাদি সামাজিক মাধ্যমগুলির কল্যাণবশত, আবার একদুজনের কাছেও অন্তত তাঁর নামটি বেশ কয়েকবারে ফিরে ফিরে আসতে পেরেছে। ভদ্রলোকের নাম, ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ – পেশায় নিকাশী-এঞ্জিনিয়র পরবর্তীতে পরিবেশকর্মী ও সরকারি পরিবেশ-সমীক্ষক। আর কলকাতার কিডনিকে এতদিন অবধি বাঁচিয়ে রাখবার মূল কৃতিত্বও এনার কাঁধেই দেওয়া যেতে পারে। কলকাতার কিডনির সঙ্গে এবার আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবার সময় হয়েছে।

 

১৯৭৮ সাল বা আনুমানিক সেই সময়ই, ডক্টর ঘোষ কলকাতা শহরের নিকাশী ব্যবস্থার বিষয়ে ভাবতে ভাবতেই, প্রশ্ন তুলেছিলেন যে – অবাক কাণ্ডই বটে, একটিও সে অর্থে নিকাশীকেন্দ্র বা পরিশোধনাগার না থাকা সত্ত্বেও শহরের প্রতিদিনকার ৭৫ কোটি লিটার দূষিত জলের পরিশোধন করে কে? উত্তর পেতে দেরী হয়নি তাঁর। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চল – যাকে আমরা ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস বলে জেনে এসেছি এতটাকাল, সেটিই সেদিন তাঁর সেই অসামান্য প্রশ্নের জবাব জুগিয়েছিলো। ডক্টর ঘোষ আর দেরী করেননি। তিলে তিলে তাঁর গবেষণার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, কি আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গেই এই বিশাল জলা অঞ্চল কলকাতার দূষিত জলকে নিয়মিত পরিশোধন করে চলেছে। পরিশোধন অর্থে তিনি দেখিয়েছিলেন, এই জলাভূমি কলকাতার দূষিত জলকে বুক পেতে নিয়ে, তাকে শোধন করে নিজের ভিতরকার গভীর জগতের বাসিন্দা মাছ ও অন্যান্য কীটপতঙ্গদের খাবারের যোগান দেয়। সংলগ্ন এলাকার চাষযোগ্য জমির উর্বরাশক্তিকে বাড়ায়। আজ অন্যান্য অনেকের গবেষণায় এটিও প্রমাণিত যে, এই জলাজমির কারণেই বহুদিন অবধি শহরের বৃষ্টির জল জমে যাবার সমস্যাও নিয়ন্ত্রিত হতে পেরেছিল। ডক্টর ঘোষ তখন আর কেবল কাগুজে গবেষণাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। জনমত ও জনচেতনা তৈরীর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি শেষ অবধি পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চলের স্বাস্থ্যরক্ষার প্রয়োজনে আদালতেরও দ্বারস্থ হন। আদালত তাঁকে ফেরায়নি। ১৯৯২ সালে তাঁর জনস্বার্থ মামলার কারণেই কলকাতা উচ্চ ন্যায়ালয় পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চলের স্বাস্থ্য-সংরক্ষণের নিমিত্তে বেশ কিছু নির্দেশ জারি করে। ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক জলাভূমি-পর্যবেক্ষক সংস্থা পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চলকে রামসর অঞ্চল বা ‘ওয়েটল্যান্ড অব গ্লোবাল ইম্পর্ট্যান্স’  হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। প্রায় ১২,৫০০ একর বিস্তৃত এই অঞ্চলটিতে সমস্ত রকমের নির্মাণকাজ এবং জমির চরিত্র-বদল নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত হয়। এর ফলে একদিকে যেমন জমি-মাফিয়া এবং অন্যান্য সুবিধাভোগীদের হাতে ডক্টর ঘোষকে নানাভাবেই বিভিন্ন সময়ে হেনস্থা হতে হয়, আবার তার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর কপালে জোটে একাধিক আন্তর্জাতিক পুরষ্কার। রাষ্ট্রপুঞ্জের গ্লোবাল ৫০০ পুরষ্কার এবং লুক হফম্যান পুরষ্কারের মতো বিভিন্ন সম্মানে তিনি সম্মানিত হন। 

কেবল সমস্যার কথা বলেই তিনি থেমে থাকতে চাননি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সেমিনারে জলাভূমি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তিনি চেষ্টা করে গিয়েছেন। আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দূষিত জলকে কাজে লাগিয়ে মাছচাষ বা অন্যান্য কোনও ধরণে ব্যবহার-প্রক্রিয়া যা পরিবেশের ভারসাম্যকে বজায় রাখবে – তেমন সমস্ত বিষয়কে নিয়েও তিনি গবেষণা চালিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের অন্তত ৪টি শহরে তাঁর পরামর্শের ভিত্তিতেই জলাভূমি সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের গঙ্গা বাঁচাও প্রকল্পেও তিনি মতামত জুগিয়েছেন। ২০০৫ সালে, কৃষিবিজ্ঞানী এম এস স্বামীনাথন বলেন, ‘অধ্যাপক অমর্ত্য সেন যেমন ওয়েলফেয়ার ইকনমিকসের তত্ত্ব দিয়েছেন, তেমনিই ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ ওয়েলফেয়ার ইকোলজির ধারণা তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন।’ কলকাতার কিডনিকে চিনিয়ে দেবার জন্য, শহরবাসী তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। 

প্রবন্ধটিকে হয়তো স্মৃতিচারণা বলেও বোধ হতে পারে আপনাদের। তবু জানবেন, এমন একেকটি স্মৃতিচারণারও বোধকরি প্রয়োজন আজ। কলকাতার কিডনির খবর আমরা রাখিনে, কলকাতার ফুসফুসকে নিয়েও আমরা নিশ্চিন্ত বোধ করি – ভাববার সময় কিন্তু পেরিয়ে যাচ্ছে রোজ। জলাভূমি, সবুজ, বাস্তুতন্ত্র – এ সমস্ত শব্দ বা শব্দবন্ধগুলি যদি কেবলই জীবনবিজ্ঞান অথবা পরিবেশ-পরিচয় বইয়ের রঙচঙে পাতার ভিতরটুকুতেই আটকিয়ে থেকে যায় তবে, শহর কিন্তু ভালো থাকবে না, ভালো রাখবেও না আপনাদের। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চলের আয়তন কতখানি কমেছে, কীভাবেই বা তার নিয়মিত-ধ্বংসকরণ চলছে, সেই সমস্ত বিষয়েতেই আমাদের সজাগ হওয়া দরকার। কলকাতায় জল জমছে প্রতি বছর, দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকের গলাতেই পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চলের ক্রমহ্রাসমানতা নিয়েও নানারকম কথা শুনতে পাই। জলাভূমি তার অক্লান্ত এক সংরক্ষককেও হারালো – এই অবস্থায়, ডক্টর ঘোষের শূণ্যস্থান পূরণের নিমিত্তে কি আমাদের সকলেরই এগিয়ে আসাটা উচিত নয়? অন্তত তিলোত্তমার কারণেই? জবাবের অপেক্ষায় রইলাম।

3 COMMENTS

  1. Amra Sadharon Manush Jon Kivabe Sahajjo Korte Pari ? Janle Chesta Korbo. Jodiyo Ami Hooghly r Tobuo Kolkata k Bhalobasi Sekotha Bolai Bahullo. Kolkata r Jonno , Amar Sahorer Jonno Kivabe Sahajjo Korte Pari ? Jante Parle Sotti e Chesta Korbo. Bhalolaglo Lekhari Pore. Subho Ratree

  2. শুদ্ধবোধ-বাবু,

    আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আপনাদের যদি এ সমস্ত লেখাগুলি পড়ে ভালো লাগে, আপনারা মতামত জানান – তবে সেটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে জানবেন। আপনার প্রশ্নের উত্তরে জানাই, একজন লেখক বা সাংবাদিক হিসাবে, আমি কেবল নানা জায়গা থেকে আহরিত তথ্যকে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। একাধিক সংগঠন পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চলকে বাঁচানোর প্রয়োজনে কাজ করছে ঠিকই, তবে সেগুলির কোনটির সঙ্গেই আমার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে এমন দাবি করতে পারি না। ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি ঘোষের সংগঠনের বিষয়ে ইন্টারনেট থেকেই আপনি তথ্য পেতে পারবেন। কিন্তু বোধহয় তার চেয়েও জরুরী হলো আরো অনেক মানুষকে এ বিষয়ে অবহিত করা, দেখবেন অনেকের কাছে হয়তো জলাভূমি সংরক্ষণ ঠিক কোন কারণবশত প্রয়োজন সেটিই সঠিক ভাবে পরিষ্কার নয়। মানুষকে সচেতন করুন, কেবল এই প্রবন্ধটিই নয় – ডক্টর ঘোষের লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধও নেট-দুনিয়ায় সহজেই পাবেন, সেগুলিকেও পড়ুন ও পড়ান। এলাকায় সেমিনার করুন, আলোচনা করুন – মানুষের কানে যেন পৌঁছাতে পারে যে, ‘জল-জমি-আকাশকে বাঁচানোটা বড্ডই দরকারি, সময় বয়ে যায়… সময় বয়ে যাচ্ছে…’

  3. কেউ শোনেনা, তাই আমাদের চিিৎকার করে বলতে হবে, লিখতে হবে, বারবার। বেশ ভালো লাগল পড়ে।