নীহারুল ইসলাম
জন্ম- ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭, মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার হরহরি গ্রামে (। শিক্ষা- স্নাতক (কলা বিভাগ), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা- শিক্ষা সম্প্রসারক। সখ- ভ্রমণ। বিনোদন- উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শ্রবণ। এযাবৎ তিন শতাধিক গল্পের রচয়িতা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক “ইলা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ‘ট্যাকের মাঠে মাধবী অপেরা’ গল্পগ্রন্থটির জন্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রবর্তিত “সোমেন চন্দ স্মারক পুরস্কার” প্রাপ্তি (২০১০)। ভারত বাংলাদেশ সাহিত্য সংহতি সম্মান “উত্তর বাংলা পদক” প্রাপ্তি (২০১১)।

আমার মোটরবাইকের সামনে হঠাৎ কোথ্‌ থেকে এক আপদ এসে জুটলচটজলদি ব্রেক কষে দেখি আপদ নয়, মস্ত একটা বিপদ। আধন্যাংটো পাগলি একটাযার পরণে তো একটা শাড়ি আছে, কিন্তু সেই শাড়ির অর্ধেকটা লুটাচ্ছে রাস্তার ধুলায়। অন্য দিকে তার ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত। শুধু বাঁহাতে শক্ত করে ধরে আছে একটা পুঁটলি। ওই পুঁটলিতে কী আছে আমি জানি না। জানার চেষ্টাও করি না তাছাড়া ওসব দেখবার বা জানবার মতো সময় কোথায় আমার? আমাকে আমার ধান্ধায় কখন কোথায় ছুটে বেড়াতে হয় তার ঠিক নেই

Banglalive

আমি তো সেই রকমই ছুটে বেড়াচ্ছিলাম যেই পাহাড়পুর মোড় থেকে শ্রীমন্তপুরের দিকে বাঁক নিতে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি পাগলিকেযে তার ডান হাত আমার দিকে বাড়িয়ে বলছে, পয়সা দে! একটুর জন্য যে সে আমার মোটরবাইকের চাকার তলায় চাপা পড়তে যাচ্ছিল, সেই খেয়াল নেই তার আর তখনই আমি তাকে আরও ভাল করে দেখি দেখি তার অর্ধনগ্ন রূপ। কী জানি কেনখাঁ খাঁ দুপুরটার মতোই আমার মনটাও কেমন বিষন্ন হয়ে ওঠে। আমার আর কিছু ভাল লাগে না। অগত্যা আমি আমার ধান্ধা ছেড়ে সোজা চলে আসি নিজের বাড়িতেই

দুই

তখন ভর দুপুর। সাধারণত এই সময়ে আমি বাড়ি ফিরি না। সকাল ন’টায় বেরিয়ে আমার বাড়ি ফিরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল কিংবা সন্ধ্যে, এমনকি রাত পর্যন্ত হয়ে যায়। তবে এমন ভরদুপুরে কখনই নয়। বোধহয় এই প্রথম। তাই বুঝি বউ খানিকটা অবাক হয়। জিগ্যেস করে, শরীর খারাপ নাকি তোমার?

বললাম, না।

  • তাহলে?

  • এমনিই। এই গরমে আর ছুটে বেড়াতে পারছি না।

  • তাহলে তোমায় খেতে দিই?

আমি জিগ্যেস করলাম, তোমার কি সংসারের কাজ শেষ?

  • না। আমার দেরি আছে। আমি পরে খাব। বরং তুমি খেয়ে নাও

তিন

ক’দিন পর শুরু হবে পবিত্র রমজানের উপবাস তারপরেই আসবে খুশির ইদ। জীবনযুদ্ধে আমি এমনই নাকাল যে, সেকথা আমার খেয়ালে ছিল নাখেতে বসেছি, বউ হঠাৎ বলে উঠল, মনে আছে তোসামনে কিন্তু ইদ আসছে!

[ শাড়ি : ]

আমি চোখ তুলে বউকে দেখিবউ আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে।

কিছু না বলে এরকম মিটিমিটি হাসা আমার একেবারেই সহ্য হয় নাআমি জানি এই হাসির পেছনে নিশ্চয় তার কোনও মতলব আছেজিগ্যেস করি, সামনে ইদ আসছে তো কী মনে রাখতে হবে সেটা খুলে বল।

বউ সেরকমই মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল, আমি জানতাম তোমার থাকবে নাকী জানি হয়ত ইচ্ছে করেই মনে রাখো না! আমি কি তোমার বউ যে মনে রাখবে? আমি তো তোমার দাসী! কে জানে মনের মধ্যে কাকে পুষে রেখেছো?

কিছুদিন আগে হলেও বউয়ের এমন ভ্যানতারাগিরিতে আমি নিশ্চিত ভাতের থালা ছুঁড়ে ফেলে উঠে যেতাম। কিন্তু এখন বুঝতে শিখেছি, জীবনে আমি কাউকেই ঠিকঠাক সম্মান করতে পারিনিনা বাবামাকে, না আত্মীয়স্বজনবন্ধুবান্ধবকে, না বউকে, না প্রেমিকাকে, না আমার কোম্পানির বসকে। হায়রে আমার এই মানব জীবন! তাছাড়া আমার এই ভাত আমাকেই জোগাড় করতে হয়। আর এটা করতে গিয়ে যে কত অপমান, কত অবজ্ঞা, কত যন্ত্রণা হজম করতে হয়, তা আমার মতো একজন সাধারণ সেলস্‌ম্যানের চেয়ে বেশি আর কে জানে!

মনে পড়ে গেল, সামনে ইদ অর্থাৎ এবারের ইদে বউ একটা মুর্শিদাবাদ সিল্ক নেবে। তাও মির্জাপুরের ‘গৌতম মনিয়া’ থেকে। আমার অনুমানবাজেট খুব কম করে পাঁচ হাজারজানি না কোথা থেকে সেই টাকা জোগাড় হবে। তবু কিনে দেব বলেছিলামএবং সেই চেষ্টাতেও আছি। আজকাল রোজ লুকিয়ে লটারির টিকিট কাটছি। যদি ছাপান্ন হাজার লেগে যায়! আমাদের এই ছোট শহরে প্রায় শুনছি ছাপান্ন হাজার এ পেয়েছে! ও পেয়েছে! এই তো গত সপ্তাহে সবজিপট্টীর বলাইও পেয়েছে নাকি! বলাইকে আমি চিনি। তার বউকেও চিনি, একটা ছেঁড়া শাড়ি পড়ে তার পাশে বসে সেও সবজি বিক্রি করে। আমি তো রোজ ওদের কাছে থেকেই সবজি কিনি। আজকেও কিনেছি। বউটাকেও দেখেছি। পরণে সেই একটাই শাড়ি। আঁচল ছেঁড়া। তবু সেই ছেঁড়া আঁচলেই কী সুন্দর ভাবে নিজেকে গুছিয়ে রাখে। তার স্বামী লটারিতে ছাপান্ন হাজার পেয়েছে। কিন্তু কইসে তো স্বামীর কাছে শাড়ি কিনে নেয়নি!

এসব দেখার পর যদি খাবার সময় কানের কাছে বউ শাড়ির জন্য ঘ্যানঘ্যান করে, মেজাজ ঠিক রাখি কী করে?

তবু আমাকে মেজাজ ঠিক রাখতেই হয়মেজাজ ঠিক রেখেই আমি ভাত খাই। না, ভাত নয়বলাই আর বলাইয়ের বউয়ের কাছে কেনা সবজির তরকারি মেখে আমি আমার সব অপমান সব অবজ্ঞা সব যন্ত্রণাগুলিকে গিলে গিলে খাই আমি আমার উদরপূর্তি করি।

চার

খাবার খেয়ে আবার আমার ধান্ধায় বেরিয়ে পড়ার উচিত, কিন্তু বেরোতে ইচ্ছে হয় না। জ্যৈষ্ঠের দুপুর। বাইরে যেমন রোদ তেমনি গরম। জগৎসংসার কেমন খাঁ খাঁ করছে। মনে হচ্ছে এটাও যেন আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এই জগৎসংসার আমাকেই গিলে খাবে বলেই হয়ত এইসবের আয়োজন! আমি সত্যিই খুব ভয় পাই অগত্যা ঘরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি

[ শাড়ি : ]

বিছানায় শুলেই যে ঘুম আসবে তার কী মানে আছে? বরং চোখ বন্ধ করলেই দুঃস্বপ্ন আমাকে তাড়া করতে শুরু করবে বেশ বুঝতে পারছি আমার কোম্পানির মহিলা বস আমাকে এমাসে যে টার্গেট বেঁধে দিয়েছে তা ফুলফিল হবে না। মাসের আজ ছাব্বিশ তারিখ। এর মধ্যে মাত্র পনেরোটা গ্রাহক করতে পেরেছি। হাতে আর মাত্র ক’টা দিন। তাহলে বাকি পনেরোটা কখন হবে? আমার মহিলা বস আমাকে কী বলবে? তার পরণের দামি শাড়িটা আমাকে কী বলবে? সেই ভয়ে আমি চোখ বন্ধ করি না। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। মাথার ওপর ফ্যানটা বনবন করে ঘুরছে। মনে পড়ে যায় এখনও এমাসের বিদ্যুতের বিল দেওয়া হয়নি মানে দিতে পারিনি। আগামী ক’দিনের মধ্যে যদি বিল মেটাতে না পারি, হয়ত আমার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে যাবে। তখন আমার কী হবে? ভাবতে গিয়ে দেখি আমার মাথার ওপর বনবন করে ঘোরা ফ্যানটাও হঠাৎ করে থেমে যায়। তাহলে কি বিদ্যুৎ চলে গেল? নাকি মাস শেষ হওয়ার আগেই বিদ্যুৎ কর্তারা আমার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে গেল? উঠে দেখতে যাব, কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠে না। কখন বউ তার সব কাজ সামটিয়ে ঘরে এসে নিজের পরণের শাড়িটা খুলে আলনায় ছুঁড়ে দিয়ে একেবারে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন এক্ষুণি তার নতুন শাড়ি চায়। মুর্শিদাবাদ সিল্ক! কিন্তু পরক্ষণে আমার মনে হয় এটা বুঝি আমার বউ নয়, এটা বোধহয় বলাইয়ের বউ! ছেঁড়া শাড়ি

পরে যে রোজ আমাকে সবজি মেপে দেয়। নাকি সেই পাগলিটাই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল? এতক্ষণে হয়ত সে বুঝতে পেরেছে যে, আমি তাকে মোটরবাইকে চাপা দিচ্ছিলাম! নাকি দু’টি পয়সাযা সে আমার কাছে চেয়েছিল, দিই নি বলে আমাকে লণ্ডভণ্ড করছে! আমি বাধা দিতে গিয়ে থেমে যাই। হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায় আমার কোম্পানির মহিলা বসকে? মাসের টার্গেট ফুলফিল হয়নি বলে হয়ত তিনিই

পাঁচ

কতক্ষণ কে জানে! একসময় দেখি আমি আর আমার বউ দু’জনেই ঘেমে নেয়ে একে অপরকে আশ্রয় করে বিছানায় শুয়ে আছিহঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া সিলিং ফ্যানটা আবার দিব্যি ঘুরছে। আর তারই বাতাসে আলনায় একটা শাড়ির আঁচল ফরফর করে উড়ছে। কে জানে কার শাড়ি ওটা! পাগলির ধুলায় লুটানো শাড়ি নাকি বলাইয়ের বউয়ের আঁচলছেঁড়া শাড়িটা? নাকি আমার কোম্পানির বসের পরণের সেই শাড়িটা? আমার বস রেগে গেলে তার বদলে যেটা সাপের মতো ফণা তুলে আমাকে দংশাবে বলে ফোঁস ফোঁস করে?

ঠিক বুঝতে পারি না।

তবে আমি নিশ্চিত ওটা আমার বউয়ের শাড়ি নয়। কেননা, বউকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আমার মির্জাপুরে ‘গৌতম মনিয়া’য় যাওয়া হয়নি। যাব কী করে? আজ যে মাসের ছাব্বিশ তারিখ! অথচ এখনও আমি কোম্পানির দেওয়া টার্গেট ফুলফিল করতে পারিনি। রোজ লটারির টিকিট কাটলেও এখনও আমার ভাগ্যে ছাপান্ন হাজার লাগেনি। তবে লাগতে কতক্ষণ? তাছাড়া খুশির ইদ আসতেও ঢের দেরিসবে তো পবিত্র রমজান শুরু হতে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন:  ধর্মঘট

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ