‘এক যে ছিল রাজা’ : ঢাকা বিক্রমপুরের রাজবাড়ির নামে শেষটা এমন গোঁজামিল!

ছবির যে দিন প্রথম টিজার রিলিজ হল, মনে আছে সে দিনই সেটা দেখতে গিয়ে হাঁ হয়ে গেছিলাম আমি। তার আগেই এটা শুনেছি যে, এটা নাকি ভাওয়াল সন্ন্যাসীর কেস নিয়ে তৈরি, কিন্তু যে বাড়িটা দ্যাখান হচ্ছে টিজারে, সেটাই কি ছবিতে ভাওয়ালের রাজবাড়ি নাকি?

নাগা সন্ন্যাসীর বেশে পিছন ফিরে আছেন যীশু সেনগুপ্ত, আর একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছেন বহু বছর আগে তাঁর ফেলে যাওয়া রাজবাড়ির দিক। টিজারের এই শটটা দেখে হতভম্ব হয়ে মনে হচ্ছিল, যা দেখছি, সেটা ভুল দেখছি না তো?

এর কিছুদিন পর রিলিজ হল ছবির ট্রেলার, আর দেখলাম, যা দেখেছি, যা ভেবেছি, তাতে খুব একটা ভুল হয় নি কিছু। ট্রেলারে স্পষ্ট এটা লিখে দেওয়া হচ্ছে যে, ‘ইনস্পায়ার্ড বাই দ্য ইনক্রেডিবল ভাওয়াল সন্ন্যাসী কেস’। আর তার সঙ্গে বারবার এই বাড়িটার শটই আছে!

এক জায়গায় শুট করে সেটা একটা অন্য জায়গার ভিস্যুয়াল বলে চালিয়ে দেওয়াটা এমনিতে দোষের কিছু নয়। সিনেমা লাইনে এটা খুব চালু একটা রীতি। কিন্তু সেটা করতে গেলে তো মিনিমাম একটা আক্কেল থাকা চাই। কলকাতার ভিক্টোরিয়ায় শুট করে, সেটা শাহজাহানের তাজমহল বলে তো আর চালানো যায় না, দাদা!

ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখতে ঢুকলাম ‘এক যে ছিল রাজা’। দেখলাম ছবি জুড়ে ‘ভাওয়াল’ শব্দটা সংলাপে কোথাও না রাখলেও, ছবির গল্পে জায়গাটাকে দেখান হচ্ছে ‘ঢাকা বিক্রমপুর’ বলে। আর এই যে হলদে রঙের রাজবাড়ি, সেটাকে বলা হচ্ছে সেই বিক্রমপুরের রাজবাড়ি!

এটা কী রকমের গোঁজামিল হল, স্যর?

হলদে রঙের বাড়িটা আসলে কোথাকার বাড়ি, জানেন? এটা মুর্শিদাবাদের কাঠগোলা প্যালেস। যেটাকে কাঠগোলার বাগানবাড়িও বলে। বাড়ির পুরোটা জুড়ে বিশাল মিউজিয়াম, ফি বছর লাখ লাখ লোক সেখানে ঘুরতে যায় দিব্যি! আর হ্যাঁ, বাড়িটার একটা অংশ ভাড়া করে সিনেমা কিংবা সিরিয়ালের শুটিংও হয়ে থাকে। গণ্ডা গণ্ডা সিরিয়ালে এই বাড়িটার এই ‘লুক’টা ঢের আগে থেকে এক্সপোজ্‌ড হয়ে আছে! প্লাস গেল বছর পুজোর সময় অঙ্কুশ আর নুসরাতের ‘বলো দুগগা মাই কি’ বলে যে ছবিটার রিলিজ হল, চেক করে দেখুন, সেটাও কিন্তু এই বাড়িতেই শুট!

সেখানে ছবির হিরো সাম্য (মানে অঙ্কুশ) সেখানে এই বাড়িরই ছেলে।

বারোয়ারি সেই বাড়িটাকেই ইতিহাস নিয়ে তৈরি ছবিতে এরকম ভাবে ঢাকার বিক্রমপুর বলে চালিয়ে দিতে একটুও হাত কাঁপল না, না?

যতবার বাড়িটা দেখছিলাম, ততবার তো শক লাগছিল আমার। যখনই নিজেকে বোঝাতে চাইছিলাম যে, এটা আসলে একশো বছর আগের কোন কুহকে মোড়া সময়, চোখের সামনে এই বাড়িটা দাঁড়িয়ে সেই মেক-বিলিভটা গুঁড়িয়ে জাস্ট ভেঙে দিচ্ছিল যেন!

বাড়ির থেকে এবার সোজা নারীর গল্পে আসুন।

সেই অত বছর আগের ঢাকার এক জমিদারের স্টোরি। তাঁর বৈভব এমন অতুল, যে কথায় কথায় নিজের মহলে বাছাই করা বাইজী নাচের আসর বসান তিনি। এটায় আমার অসুবিধে নেই কিছু। শুধু খটকা কোথায় লাগছে গিয়ে জানেন? হাতের আঙুলে তুড়ি মারলে যাঁর ভবনে একের পর এক মোহিনী সব বেশ্যা এসে জোটে, দূর কলকাতায় এসে সোনাগাছির কানাগলিতে বা ঘুপচি ঘরে তাঁকে ওভাবে ঢুকতে হয় কেন? ক্লিন্ন ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে লে-লে বাবু ছ’আনা বলে যে বেবুশ্যেরা হাঁকে, তাঁদের গুমটি ঘরে এই রাজাবাবুকে মানায় কিনা, ছবি দেখে সেটা বলুন আমায় প্লিজ।

নারী নিয়ে আরেকটা বড় ঘোটালা এখানে না লিখলেই নয়। পরিজনের চাপে মহারাজা মহেন্দ্র কুমার চৌধুরী (অভিনয়ে যীশু সেনগুপ্ত) তখন বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছেন সবে। বৌ হয়ে ঘরে এসেছে শ্রীমতী চন্দ্রাবতী দেবী (রাজনন্দিনী পাল)। এখন বৌ হিসেবে এই মেয়েকে দেখে মুষড়ে পড়ে মহেন্দ্র কুমার জানিয়ে দিচ্ছেন, যে তিনি পূর্ণ বয়সী মহিলাদের পছন্দ করেন, এরকম বাচ্চা মেয়েতে মন বসে না তাঁর।

এই ডায়ালগটা শুনে দম প্রায় আটকে গেল আমার। চন্দ্রাবতী বাচ্চা? যদি এই ডায়ালগটা দিতেই হবে, তাহলে সত্যি বাচ্চা কোন মেয়েকে দিয়ে ওই রোলটা করাতে পারতেন তো স্যর? পূর্ণ যুবতী এক নারীকে দিয়ে ওই ভূমিকায় অ্যাক্টো করিয়ে তারপর তাঁকে ‘বাচ্চা’ বলা কেমন ব্যাভার, বলুন?

রাজনন্দিনীকে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ‘বাচ্চা’ লাগে, সেটা আমায় জানিয়ে যাবেন প্লিজ।

নারী এবং বিয়ের কথা উঠল যখন, ওটা নিয়ে আরেকটা কথাও লিখি। একদিকে এটা এখানে দ্যাখান হচ্ছে যে মহাসমারোহে বিয়ে হচ্ছে মহেন্দ্রের, আর জমিয়ে সেটা উপভোগ করছে সে। এলাহি করে গায়ে হলুদের যে সিনটা শুট করেছেন, দেখতে তো বেশ ভালই হয়েছে সেটা।

এই মহেন্দ্রই তাহলে কোন লজিকে ঘরের মধ্যে বৌকে দেখে আকাশ থেকে পড়বে, আর তারপর অনেক কষ্টে মনে করার স্টাইলে এটা বলবে যে, ‘শুনলাম বটে আমার বিয়ে হয়েছে’।

ক্রেডিটে দেখলাম, স্টোরি, স্ক্রিন প্লে, ডায়ালগ আর ডিরেকশন – সব একটা লোকেরই করা। তো তাঁর কাছে কি এরকম সব ডায়ালগ বা সিকোয়েন্সের ব্যাখ্যা আছে কোন?

ছবিতে কোথাও তো কোন কিছুর কমতি নেই,দাদা! সুন্দরী মেয়ের ব্লাউজ খোলার সিন চাইলে সেটাও আপনি পাবেন, আবার হাতির পিঠে চড়ে বাঘ শিকারের দৃশ্য চাইলে দেখতে পাবেন সেটাও। মুশকিল হবে আপনি যদি সিন দেখে তার লজিক নিয়ে প্রশ্ন শুরু করেন।

যেমন, বাঘ শিকারের সিনটাই যদি ধরেন। দলবল নিয়ে হাতে বন্দুক ধরে বাঘ শিকারে চলেছেন রাজা, এমনিতে সিনটা দেখতে তোফা। কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন, যে হাতির পিঠে রাজার হাওদা লক্ষ্য করে যে বাঘটা ঝাঁপ দিল, এভাবে টার্গেট মিস করে সে পালিয়ে গেল কেন? নাকি হাতির পিঠের ওপর দিয়ে লং জাম্পের প্র্যাকটিস ছাড়া আর কিছু করতে চায় নি সে? না, এসব কথার জবাব কিন্তু এই ছবিতে নেই!

ঘটনার পর ঘটনা দিয়ে পুরো ছবিটা ভর্তি। এমনিতে সিনেমা আর টিভির খাতিরে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর কেস তো এখন সবাই প্রায় কিছু না কিছু জানেন। অবিভক্ত বঙ্গদেশ, ১৯০৯ সাল। ভোগ-বিলাসে মত্ত রাজা শরীর সারাতে ঢাকার ভাওয়াল থেকে সোজা সুদূর দার্জিলিংয়ে গেলেন। সেখানে হঠাৎ করে এক রাতে তাঁর রহস্যময় মৃত্যু। আর তার ১২ বছর পরে হঠাৎ একটা জনশ্রুতি যে, ভাওয়ালে সেই রাজা নাকি ফেরত এসেছেন এক সাধুর বেশ ধরে। এখন সেই সাধু সত্যি সত্যি ভাওয়ালের সেই রাজা, নাকি ঠগ প্রতারক কেউ, সেটা নিয়ে বহুকাল ধরে মামলা চলতে থাকে।

গল্পটা শুনতে যদি সরল লাগে, জেনে রাখুন আদপে সেটা সরল নয়। স্টোরিতে ভাঁজের পরে ভাঁজ, আর খাঁজের পরে খাঁজ। কিন্তু অত লেয়ার এই ছবিতে কই?  

ছবির সেকেন্ড হাফে উকিল অনুপমার মুখে একটা ডায়ালগ পাবেন, ‘বাহ কী নাটক! হলিউড তো পেলে একেবারে লুফে নেবে!’ ভাওয়াল রাজার অরিজিনাল কেস হিস্ট্রি প্রচুর নাটকে সত্যি হয়তো ঠাসা। কিন্তু ছবিটায় সেই নাটকটার যে ছিটেফোঁটাও নেই!

সৃজিতের অন্য ছবির মতো এই ছবিটারও সবচেয়ে বড় দুর্বলতা স্ক্রিপ্ট। একটার পর একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু সেগুলোর ট্রিটমেন্ট এরকম যে, সেগুলোর সঙ্গে আদৌ ইমোশনাল কানেক্ট তৈরি হচ্ছে না কোন।

কোথাও কোথাও যেমন দেখবেন দুম করে একটা সিন কেটে পরের সিন শুরু হয়ে যাচ্ছে। এই নাচঘরে বসে মৌজ করে ফুর্তি করার সিন, তো একেবারে জাম্প কাট দিয়ে পরের সিন জঙ্গলে বাঘ শিকারের! আবার সেখানে বাঘের অ্যাটাকের পরেই জীবন বীমা করার তাগিদে কলকাতায় সোজা পৌঁছে যাওয়ার সিন। দ্যাখার সময় আমার মনে হচ্ছিল, অচেনা কোন ফ্যামিলি অ্যালবামের পাতা আমি উলটে যাচ্ছি যেন। যেখানে একের পর এক মুখের সারি, কিন্তু তাঁদের কী হল না হল, তাতে আমার যায় আসে না কিচ্ছু!

মেজর মেজর সব ইভেন্টগুলো কোন ডায়ালগ ছাড়া জাস্ট মিউজিক দিয়ে মন্তাজের মত করে বেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক। ডিরেক্টর যেন এটা ধরে নিয়েই রেখেছেন যে, পুরো ঘটনার ডিটেল সবার এত নিখুঁত করে জানা, যে অল্প কিছু আভাস দিলেই সবাই সবটা বুঝে যাবে!

বেশ কয়েকটা ইন্টারভিউতে সৃজিত বলেছেন, এই ছবির আসল রসদ তিনি নিয়েছেন পার্থ চ্যাটার্জির ‘আ প্রিন্সলি ইমপোস্টার? দ্য কুমার অফ ভাওয়াল অ্যান্ড দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম’ নামের বইটা থেকে। ৪২৯ পাতার সেই সুবিশাল বই তো পাতায় পাতায় চূড়ান্ত সব মশলা দিয়ে ঠাসা। বইটা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, এতো শুধু মামুলি কোন রিসার্চ ওয়ার্ক নয়, লেখার গুণে বইটা যে এপিক ব্যঞ্জনাময় প্রায়!

সে বই থেকেই যদি স্ক্রিপ্ট লিখে থাকেন তো, সেই গুণাবলী এখানে এই ছবিতে কেন হারিয়ে গেল ভাই?

ছবির সেকেন্ড হাফ জুড়ে কোর্ট রুমে বিতণ্ডা করার সিন। হঠাৎ আসা সন্ন্যাসী যে এস্টেটের আসল রাজা, সেটা প্রমাণ করার জন্যে লড়ছেন ভাস্কর মুখার্জি (অভিনয়ে অঞ্জন দত্ত) নামে এক উকিল। আর তার উলটোদিকে ওই সন্ন্যাসীকে জাল-জালিয়াত প্রমাণ করতে লড়ে যাচ্ছেন আইনজীবী অনুপমা (অভিনয়ে অপর্ণা সেন)।

আজ থেকে ১০০ বছর আগে দাপুটে অমন মহিলা উকিল বাস্তবোচিত কিনা, সেটা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই আমার।

আমার শুধু প্রশ্ন হল, পার্থ চ্যাটার্জির বই পুরোটা আপনি মন দিয়ে পড়েছেন তো সৃজিত? অনুপমাকে দিয়ে সন্ন্যাসীকে ভণ্ড প্রমাণে এতগুলো কথা বলালেন, অথচ একবারও এটা বলালেন না যে, সেই সময়ে কেস হিসেবে আদপেই এটা ইউনিক কিছু নয়! রাজ্যের রাজা মারা যাওয়ার কয়েক বছর পরে কোন এক সাধু এসে নিজেকে রাজা বলে দাবি করছেন, জালিয়াতির এরকম কেস সে সময় একের পর এক বেশ কয়েকটা হয়। যেমন বর্ধমানের জাল প্রতাপচাঁদের কেস, কিংবা মেদিনীপুরের কাঁথির রুদ্র নারায়ণ রায়ের কেস। এই কেসগুলোরও পুরো ডিটেল পার্থবাবুর বইটায় লেখা আছে। আপনার অনুপমা হলিউড নিয়ে টোন-টিটকিরি রচতে পারে, কিন্তু আইডেন্টিটি জাল করার এই ঘটনাগুলোর খবর রাখে না নাকি?   

মামলা থেকে ফোকাস সরিয়ে সৃজিত একবার এটাও দ্যাখান যে, ভাস্কর আর অনুপমার মধ্যে নাকি একসময় লাভ রিলেশন ছিল! কিন্তু অনুপমার কেরিয়ার নিয়ে এগিয়ে চলাটা মানতে পারে নি ভাস্কর – তাই রিলেশন ভেঙে যায়। মনে হচ্ছিল, ডিরেক্টরকে ডেকে বলি, একশো বছর আগের বাংলায় নারীবাদের এমন স্টোরি দেখিয়ে দিয়ে আপনি তো সুবে বাংলার পুরো নারীজাতিকে ধন্য করলেন, দাদা!

এর সঙ্গেই মনে হচ্ছিল, এরকম দুই উকিল দ্যাখানো আসলে কি সেই ‘রাজকাহিনী’র (২০১৫) ছাঁচ? মনে আছে তো সেখানে সেই শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় আর কৌশিক সেনের ক্যারেকটার দুটোর কথা? একসময় গলায় গলায় ফ্রেন্ডশিপ, আর এখন ঘটনাচক্রে দুজন পুরো বিপরীত দুটো দলে! এবার তার সঙ্গে পাঞ্চ করে দিন ‘উমা’ (২০১৮) থেকে ডিরেক্টর ব্রহ্মানন্দ মানে অঞ্জন অভিনীত ক্যারেক্টারের স্টোরি। ব্যাস, দেখুন আপনার হাতে এবার এই ছবির উকিল দুটোর হদ্দমুদ্দ পুরো এসে গেল কিনা!

এখান থেকে কয়েক আনা, ওখান থেকে কয়েক আনা পাঞ্চ করে দিয়ে কী আর স্ক্রিপ্ট লেখা হয়, বলুন!

একেক সময় বোঝা যাচ্ছিল, নতুন কোন আইডিয়া না পেয়ে পুরনো ‘সন্ন্যাসী রাজা’ (১৯৭৫) থেকে সিকোয়েন্স তুলে ছেপে দিচ্ছেন জাস্ট। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা রাজামশাইয়ের গায়ে অকস্মাৎ ঘোড়ার গাড়ির ধাক্কা লাগার সিন, কিংবা সন্ন্যাসী হয়ে ঘোরার সময় দলের প্রধান সন্ন্যাসীর সঙ্গে বলা সংলাপের সিনগুলো মিলিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন এটা।

কোর্ট রুম ড্রামা মানেই তো টানটান টেনশন! কিন্তু ওই টেনশন এখানে কোথাও আশা করবেন না প্লিজ। উলটে দেখবেন একটা সময় কোর্টের তরজাগুলো এত একঘেয়ে লাগতে থাকবে যে মনে হবে, ছেড়ে দে মা, মানে মানে এবার ছবি শেষ কর, বলে!

অদ্ভুত অদ্ভুত সব ধাঁধার জন্ম দেবে ছবিটা, জানেন। একটা শুধু লিখছি এখানে, শুনুন। ছবির ফার্স্ট হাফে দেখতে পাবেন, কলকাতায় বীমা করাতে গিয়ে রাজা মহেন্দ্র কুমার ইংরেজ ডাক্তারের কাছে কাতর ভাবে সারেন্ডার করছেন ‘নো ইংলিশ’ বলে। মানে আর কিছুই নয়, খুব সরল ইংরেজিও বুঝতে পারবেন না তিনি, এটাই হল কথা।

ছবির সেকেন্ড হাফে দেখবেন সেই তিনিই আবার আদালতে বসে জজসাহেবের তুখোড় ইংরেজিতে বলা রায়দান শুনতে শুনতে রিয়্যাক্ট করছেন বেশ! প্লিজ একটু জানাবেন আমায়, হলটা কী করে এটা? নাগা সন্ন্যাসী হয়ে দূর দূর দেশে ঘুরতে ঘুরতে রাজাবাবু স্পোকেন ইংলিশের ক্লাসও করতেন বুঝি?

ছবির গল্পে এটা দ্যাখান হয়েছে রাজাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে রাজার শ্যালক সত্য (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) আর ডাক্তার অশ্বিনী (রুদ্রনীল ঘোষ) – এই দুজনে মিলে। কিন্তু অবাক হবেন দেখে যে, এই খুনের পরে এই দুজনের লাভ কী হল, সেটা নিয়ে ছবিতে আর কোন স্পষ্ট ডিটেল নেই!

তবে ছবির সবটাই ঝুল, সেটা কিন্তু নয়। দুর্দান্ত সব লোকেশনে শুটিং হয়েছে ছবির, আর চোখ ধাঁধানো সব ফ্রেমে সেটাকে যে ভাবে ধরেছে ক্যামেরা, দেখে তারিফ করতে হয়। নাগা সন্ন্যাসীর বেশে প্রায় নগ্ন যীশুকে দেখে কিছুক্ষণের জন্যে মুখের বাক্যি হরে যাওয়াও বিচিত্র নয় কিছু। আর ছবির রূপসী দুই কন্যা – মৃন্ময়ী (জয়া আহসান) আর কাদম্বরীকে (শ্রীনন্দা শঙ্কর) কী সেক্সি আর অ্যাপিলিং যে দেখতে লেগেছে, সেটা নিয়ে কোন কথা হবে না জাস্ট!

সিনেমার সব দৃশ্যেরই নয়ন-মোহন গুণ! এমন কি যাঁকে নিয়ে পুরো ছবিটা, সেই রাজা যখন একটা সিনে হঠাৎ করে নদীর ঘাটে মারা যাচ্ছেন, সেটাও দেখতে এত ভাল যে মনে হচ্ছে – বাহ!

মানেটা এবার স্পষ্ট হল তো, দাদা? ক্যালেন্ডারের সিনিক বিউটি আর সব মোহিনী মেয়ের এক প্যাকেজে দেখতে হলে এবার পুজোয় এই ছবিটা মাস্ট!

9 COMMENTS

  1. Srijit er cinema r script eto durbol tobe dekhte Jan Kano. Dekhben o Abar bodnaam o korben. Tahole apni nije script likhun

  2. পদ্মনাভবাবু
    অভিলাষ রায় কি অন্যায় করলেন ? একজন চিত্র সমালোচকের কাজ করছেন । উনার মত অনুযায়ী ভালো লাগা খারাপ লাগা লিখতেই পারে । আপনি জ্ঞান দেবার কে ? আপনার ক্ষমতা থাকলে উনাকে সরিয়ে নিজে সমালোচনা লিখুন ।

  3. Abhilash babur lekha porte sotyi valo lage. Uni jothesto porasuna kore review lekhen. ebong seta sob cheye valo bojha jae jokhon uni kono novel based cinema’r ba sotyi ghotone obolombone banano cinema’r critic lekhen.

    ei review ta poreo eta bojha jachche je uni “The Princely Imposter” boi ti valo kore pore tobei likhte bosechen.

    Sir apni eivabei likhe jaan….amra apnar chokh diye cinema gulo onyo angike dekhte pai.

    “Manoj der odbhut bari” ebong “Kishor Kumar Junior” er review er opekkhae roilam

  4. Abhilas babur review sotyi sundor. Onar lekha pore bojha jae uni jothesto porasuna korei likhte bosen.

    bisesh kore jokhon kono novel based movie ba sotyo ghotona obolombone toiri movie’r review eta besh bojha jae je uni sei uponyash ba golpota valo kore poren ba sei sotyo ghotona ti somporke jothesto research work kore tobei lekhen.

    ei review tir khetrei jemon bojha jachche uni “The Princely Imposter” namok boiti valo kore nije porechhen likhte bose.

    Abhilash babu apnar aaro review chai.

  5. Dhurr .. i liked uttam kumar old version
    Long back autograph dekhechilam …that was last bangla movie i liked ..
    Uni script content strong kore kichu new actor niye kaaj korte parten ..
    I tried to see his zulfikar .it turned out to be a comedy movie ..wth no script & pathetic acting
    Stil mystry movies are always enjoyble … hope next time he work with tight & bound script with new actors like yrf does .

  6. ভাওয়াল রাজ এস্টেটের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
    পরগণা ভাওয়াল পরিচিতি

    বহুকাল পূর্বে বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীর হতে ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা পার হয়ে সুসং পাহাড় পর্যন- বিস্তীর্ণ ভূভাগের মধ্যে জয়ানশাহি নামে একটি গহীন অরণ্য অঞ্চল ছিল। এর উত্তরাংশকে বলা হতো মধুুপুরের অরণ্য অঞ্চল এবং দক্ষিণাংশকে বলা হতো ভাওয়ালের অরণ্য অঞ্চল। কেহ কেহ মনে করেন উত্তর দক্ষিণে এই অরণ্য অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ছিল পঁয়তাল্লিশ মাইল এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রসে’ ছিল ছয় হতে ষোল মাইল।
    দ্বাদশ শতাব্দির পরবর্তী কালে প্রায় ছয়শ বছর পাঠান ও মুঘলরা এদেশ শাসন করে। তাঁদের আমলে এই আরণ্যকের মাঝখানে গড়ে উঠে এক প্রশাসনিক অঞ্চল– যা ভাওয়াল পরগণা নামে পরিচিত। ভাওয়াল পরগণার উত্তরে আটিয়া ও আলেপসিং পরগণা, দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা, পূর্বে লক্ষ্যানদী ও মহেশ্বরদি পরগণা এবং পশ্চিমে কাশিমপুর ও দুর্গাপুর পরগণা। বর্তমান গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ঢাকা জেলার কতেকাংশে ছিল ভাওয়াল পরগণার অবসস্থান।

    ভাওয়ালের নামকরণ

    অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় ভাওয়াল অঞ্চলের নাম নিয়ে রয়েছে নানা মহলের নানা অভিমত। এসব অভিমতের পেছনে কোন দলিল-দস্তাবেজ, শিলালিপি, প্রাচীন স-ম্ভ, মৃৎলিপি বা গ্রহণযোগ্য কোন প্রামাণক নেই। তবে নামকরণের বিষয়টি প্রচলিত রয়েছে মুখে মুখে, যুগ হতে যুগান-রে। নিচে কয়েকটি অভিমত তুলে ধরা হলো।
    ১. রাজা ভবপাল বা ভদ্রপালের নাম হতে ভাওয়াল
    পাল শাসনামলে এ অঞ্চল পাল রাজ্যভুক্ত ছিল। পাল রাজাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভবপাল বা ভদ্রপাল। এই ভদ্র পালের এক অধঃস-ন পুরুষ শিশুপাল এক সময়ে এ অঞ্চল শাসন করতেন। অনেকে মনে করেন রাজা ভবপাল বা ভদ্রপালের নামানুসারে তার সময়ে এলাকার নাম হয়েছে ভাওয়াল।
    ২. ভগালয় হতে ভাওয়াল
    ভগ+আলয় হতে ভগালয় শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। ভগ অর্থ ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য। এই ছয়টি ভগ বা গুণের যিনি অধিকারী, তিনি ভগবান। আলয় অর্থ নীড়, ঘর, বাড়ি, আশ্রয়স’ল, নিকেতন, ভবন ইত্যাদি। ভগালয় শব্দের অর্থ দাঁড়ায় খ্যাতিমান, যশ্বসী, বিক্রমশালী বা সম্পদশালীর ভবন বা নিকেতন। এই অঞ্চলে সম্পদ বা ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য থাকায় ভগালয় হতে ভাওয়াল শব্দের উৎপত্তি বলে অনেকে ধারণা করে থাকেন।
    ৩. রাজা ভগদত্তের নাম হতে ভাওয়াল
    পৌরাণিক তথা মহা ভারতের যুগে ভগদত্ত নামে এক বিক্রমশালী রাজা ছিলেন। তিনি এ এলাকা শাসন করতেন বিধায় তাঁর নামানুসারে ভাওয়াল শব্দটি এসেছে বলে অনেকে মনে করে থাকেন।
    ৪. আঁতিভোয়াল থেকে ভাওয়াল
    অনেকে মনে করেন প্রথম দিকে এই এলাকাকে আঁতিভোয়াল বা আঁতিভোল নামে ডাকা হতো। তারা প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখ করেন যে, ভাওয়ালের পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে আঁতিভোল নামে একটি প্রাচীন নগরী ছিল। আটিয়া ও ভাওয়াল সন্নিহিত দুটি পরগণার নাম আঁতিভোল হতে এসেছে। তাদের ধারণা আঁতিভোয়াল শব্দ থেকে ভাওয়াল নামের উৎপত্তি হয়েছে।
    ৫. ভাওয়াল গাজীর নাম হতে ভাওয়াল
    দিল্লির সম্রাট আকবরের সময়ে যে বারো জন ভূঁইয়া তৎকালীন বাংলায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন তন্মধ্যে অন্যতম ছিলেন পাঠান বংশোদ্ভুত ভাওয়াল গাজী। অনেকে মনে করেন ভাওয়াল গাজী যে এলাকায় স্বাধীন রাজ্য সস্থাপন করেছিলেন তার নামানুসারে নাম হয়েছিল ভাওয়াল পরগণা। জন শ্রুতি রয়েছে ভাওয়াল গাজীর অধঃস-ন এক জমিদার তাঁর পরগণার ৯ আনা হিস্যা জনৈক ব্রাহ্মণ কর্মচারীকে এবং বাকি ৭ আনা হিস্যা দুই জন কায়স’ কর্মচারীকে দান করেন। এরা দিল্লির মুঘল সম্রাট কর্তৃক জমিদার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। ৭ আনা হিস্যার একজন পূবাইলে তাঁর জমিদারি সস্থাপন করেন বিধায় তাকে বলা হতো পূবাইলের জমিদার। অপর জন কাশিমপুরে জমিদারি সস্থাপন করায় তাঁকে বলা হতো কাশিমপুরের জমিদার। অপরদিকে ৯ আনা হিস্যার ব্রাহ্মণ কর্মচারী তাঁর জমিদারি ভাওয়ালে সস্থাপন করায় ভাওয়ালের জমিদার নামে খ্যাত হন।
    ৬. উপভাষিক শব্দ হতে ভাওয়ালের উৎপত্তি
    ভাওয়াল ও মধুপুর অরণ্যাভ্যন-রে রাজবংশী ও হাজং উপজাতির লোকেরা বাস করে। অনেকের মতে তারা ঘন গজারি জাতীয় গাছে আচ্ছাদিত গহীন লাল মাটির টিলা অঞ্চলকে ভাওয়াল বলে অভিহিত করতো। আবার অনেকের মতে পাঠান ও মুঘলরা তাদের শাসিত ছোট ছোট অঞ্চলকে ওজিয়াল বলতো। এই ওজিয়াল থেকে ভাজিয়াল বা ভাওয়াল শব্দটি এসেছে।
    ভাওয়াল নামকরণের পিছনে এরূপ আরো বহু মত রয়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য মতগুলো ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে ভাওয়াল গাজীর নামানুসারে ভাওয়াল পরগণার নামটি সার্থক বলে মনে হয়।

    ভাওয়াল রাজ বংশ

    সপ্তদশ শতাব্দির শেষার্ধে জমিদার ভাওয়াল গাজীর অধঃস-ন পুরুষ জমিদার দৌলত গাজীর দেওয়ান বা দিউয়ান হিসেবে কাজ করতেন জনৈক বলরাম। শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন বলরামের পুত্র। জনশ্রুতি রয়েছে শ্রীকৃষ্ণ দান সূত্রে ভাওয়াল পরগণার ৯ আনা হিস্যার অধিকার লাভ করেছিলেন। প্রকৃত পক্ষে শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন অত্যন- চতুর ও কৌশলী। তৎকালীন বাংলার প্রধান দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান পরবর্তী কালে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব এর অত্যন- প্রিয় ভাজন হয়ে ওঠেন শ্রীকৃষ্ণ। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে নবাব মুর্শিদকুলি খান বহু মুসলিম জমিদারকে বিতাড়িত করে তদ্‌স’লে হিন্দু জমিদার নিয়োগ করেছিলেন। ভাওয়ালের জমিদারগণ মুর্শিদকুলি খানের এই নীতির ফলে জমিদারি স্বত্ব হারান। এই সুযোগে শ্রীকৃষ্ণ অত্যন- কৌশলে গাজীদের বঞ্চিত করে জমিদারি হস-গত করেন। এভাবে ১৭০৪ সালে শ্রীকৃষ্ণ ওরফে কৃষ্ণ নারায়ণ নিজেকে ভাওয়ালের জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তখন থেকে ১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন- এই বংশ ক্রমাগতভাবে ভাওয়ালের জমিদারি স্বত্ব ভোগ করেন। ভাওয়াল জমিদার পরবর্তীতে ভাওয়াল রাজ পরিবারের সদস্যগণ নিজেদেরকে বিক্রমপুরের বিখ্যাত বজ্রযোগিনী গ্রামের পুশিলাল শোত্রীয় ব্রাহ্মণগোত্র ভুক্ত বলে দাবি করতেন। প্রসংগতঃ বজ্রোযোগিনী গ্রামেই প্রায় হাজার বছর আগে বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত ও বিশ্বপরিব্রাজক অতিশ দীপাঙ্কর জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।
    ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিশ চিরসস্থায়ী বন্দোবস- আইন প্রবর্তন করেন। চিরসস্থায়ী বন্দোবস- আইন প্রবর্তনের পর ভাওয়াল জমিদার অনেক ছোট খাট জমিদারি ও জমি ক্রয় করে একটি বড় জমিদারির মালিক হন। ১৮৫১ সালে পরিবারটি নীলকর জেমস ওয়াইজের জমিদারি ক্রয় করে সম্পূর্ণ ভাওয়াল পরগণার মালিক হয়ে যান। সরকারি রাজস্ব নথিপত্র হতে জানা যায় যে, ভাওয়ালের জমিদার ৪,৪৬,০০০/- টাকা দিয়ে ওয়াইজের জমিদারি ক্রয় করেছিলেন, যা ছিল সে যুগের মূল্যমানের বিচারে একটি বড় ধরণের অংক।
    শ্রীকৃষ্ণ ওরফে কৃষ্ণ নারয়ণের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র জয়দেব নারায়ণ জমিদারি লাভ করেন। জয়দেব নারায়ণের নামানুসারে পীরবাড়ি মৌজার নাম বদলিয়ে রাখা হয় জয়দেবপুর। জয়দেব নারায়ণের মৃত্যুর পর ইন্দ্র নারায়ণ এবং তৎপুত্র কীর্তি নারায়ণ জমিদার হন। কীর্তি নারায়ণের পর তৎপুত্র লোক নারায়ণ এবং তাঁর মৃত্যুর পর তৎপুত্র গোলক নারায়ণ জমিদারি লাভ করেন। গোলক নারায়ণের মৃত্যুর পর তৎপুত্র কালি নারায়ণ জমিদার হন। ব্রিটিস শাসকদের প্রতি আনুগত্য পোষণ ও যোগ্যতার জন্য তিনি খ্যাতি লাভ করেন। ১৮৭৮ সালে ঢাকার নর্থব্রুক হলে তৎকালীন ভারতের বড়লাট লর্ড লিটনকে তিনি এক জাঁকজমক পূর্ণ সংবর্ধনা দেন। বড়লাট কালি নারায়ণের প্রভু ভক্তিতে গদগদ হয়ে তাকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন। তখন তিনি পরিচিতি লাভ করেন ভাওয়ালের রাজা কালি নারায়ণ রায় চৌধুরী হিসেবে। সেই থেকে ভাওয়াল জমিদার পরিবার ভাওয়াল রাজ পরিবারের মর্যাদা লাভ করে।
    রাজা কালি নারায়ণ রায় চৌধুরীর তিন স্ত্রীর মধ্যে ছোট স্ত্রীর নাম ছিল রাণী সত্যভামা দেবী। অপর দুই স্ত্রী ছিলেন রাণী যামিনী দেবী এবং রাণী ব্রক্ষ্মময়ী দেবী। এই দুই রাণী নিঃসন্তান ছিলেন। রাণী সত্যভামা দেবীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী এবং কন্যা কৃপাময়ী দেবী। পিতার মৃত্যুর পর রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ভাওয়ালের রাজা হন। তিনি বিয়ে করেছিলেন বরিশাল জেলার বানারিপাড়ার বিলাসমণি দেবীকে। রাজা রাজেন্দ্র রায় চৌধুরী পিতার ন্যায় যোগ্য ও কৌশলী ছিলেন। তিনি জমিদারির আরো বিস্তৃতি ঘটান। এই সময়ে ভাওয়াল জমিদারি ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বাকেরগঞ্জ জেলায় বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং পূর্ব বঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারিতে পরিণত হয়।
    রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর স্ত্রী রাণী বিলাসমণি দেবীর গর্ভে তিন পুত্র ও তিন কন্যা জন্ম গ্রহণ করেন। প্রথম সন্তান কন্যা ইন্দুময়ী দেবীর বিয়ে হয়েছিল গোবিন্দচন্দ্র মুখোপধ্যায় এম এ বি এল এর সাথে। দ্বিতীয় সন্তান কন্যা জ্যোতির্ময়ী দেবীর বিয়ে হয়েছিল জগদীশ চন্দ্র মুখোপধ্যায়ের সঙ্গে। তৃতীয় সন্তান পুত্র বড়কুমার রণেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী বিয়ে করেছিলেন সরযূবালা দেবীকে। তিন কুমারের মধ্যে রণেন্দ্র নারায়ণ কিছুটা লেখা পড়া শিখেছিলেন। ফলে ব্রিটিস রাজ পুরুষদের সাথে তিনি যোগাযোগ রক্ষা ও আলাপচারিতা করতে পারতেন। চতুর্থ সন্তান পুত্র কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী কোনরূপ নাম সহি করতে পারতেন। তিনি ছিলেন অমিতাচারী। খেলাধুলা আর শিকারের প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিল। তিনি ১৯০২ সালের মে মাসে হুগলীর বিষ্ণুপদ মুখার্জির মধ্যমা কন্যা বিভাবতীকে বিয়ে করেন। রমেন্দ্র নারায়ণ মেজোকুমার নামে পরিচিত ছিলেন। পঞ্চম সন্তান পুত্র কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায়ের সাথে বিয়ে হয়েছিল আনন্দ কুমারী দেবীর। ষষ্ঠ সন্তান কন্যা তড়িন্ময়ী দেবীর বিয়ে হয়েছিল বাবু ব্রজলাল ব্যানার্জী এম এ বি এল এর সাথে।
    রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ১৯০১ সালের ২৬ এপ্রিল মৃত্যু বরণ করেন। হিন্দু আইনানুসারে তাঁর মৃত্যুর পর ভাওয়াল রাজ্য বা এস্টেটের মালিক হন তিন পুত্র। কিন্তু কুমারগণ নাবালক থাকায় তাঁদের মা রাণী বিলাসমণি দেবী ট্রাস্টি হিসেবে এস্টেট পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। আর এ কারণে ভাওয়াল রাজ এস্টেট এক সময়ে রাণী বিলাসমণি এস্টেট নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। ১৯০৭ সালের জানুয়ারি মাসে রাণী বিলাসমণি মৃত্যু বরণ করেন। অতঃপর তিন কুমার সমান হিস্যায় ভাওয়াল এস্টেটের মালিকানা প্রাপ্ত হন। কিন’ ১৯০৯ সালে মেজোকুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর কথিত মৃত্যুর পর এস্টেটের এক তৃতীয় অংশের মালিকানা চলে যায় তাঁর কথিত বিধবা স্ত্রী বিভাবতী দেবীর হাতে। বিভাবতী তাঁর ভ্রাতা সত্যেন্দ্রনাথ এর হাতে এস্টেটের এক তৃতীয়াংশের ভার ছেড়ে দিয়ে কোলকাতায় গিয়ে বিধবা বেশে জীবন যাপন করতে থাকেন। বড় কুমার রণেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি ১৯১২ সালে এবং ছোট কুমার রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি ১৯১৩ সালে উভয়ে নিঃসন্তান অবসস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। অবশ্য ছোট কুমারের স্ত্রী আনন্দ কুমারী দেবী পরবর্তীকালে কুমার রাম নারায়ণ রায় চৌধুরিকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ভাওয়াল রাজ বংশের তিন কুমারের মৃত্যুর পর ১৯১৩ সালে ব্রিটিস সরকার ভাওয়াল রাজ এস্টেট পরিচালনার ভার কোর্ট অব ওয়ার্ডস অ্যাক্ট ১৮৭৯ (ইবহমধষ অপঃ ওঢ ড়ভ ১৮৭৯) এর ৬ ধারার ক্ষমতা বলে গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন বলে ১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথার বিলোপ ঘটলেও আইনগত জটিলতার কারণে ভাওয়াল এস্টেটের কিছু কিছু সম্পত্তি এখনও কোর্ট অব ওয়ার্ডস ভাওয়াল রাজ এস্টেট নামে বাংলাদেশ সরকার ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি সংস্কার বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালনা করছেন। কোর্ট অব ওয়ার্ডস ভাওয়াল রাজ এস্টেট সম্পর্কে বিস-রিত আলোচনার পূর্বে কোর্ট অব ওয়ার্ডস আইন ১৮৭৯ এবং ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

    কোর্ট আব ওয়ার্ডস ভাওয়াল রাজ এস্টেট

    “ভাওয়াল রাজ বংশ” অধ্যায়ে ভাওয়াল রাজ বংশের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হয়েছে। দিল্লির সম্রাট আকবরের সময়ে তৎকালীন বাংলায় যে বারো জন ভূঁইয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, তন্মধ্যে ভাওয়াল গাজী ছিলেন অন্যতম। অনেকে মনে করেন ভাওয়াল গাজী যে এলাকায় স্বাধীন রাজ্য সস্থাপন করেছিলেন, তাঁর নামানুসারে ঐ এলাকার নাম হয়েছিল ভাওয়াল পরগণা। ভাওয়াল গাজীর অধঃস-ন পুর”ষ দৌলত গাজীর দিউয়ান হিসেবে জনৈক বলরাম রায় কাজ করতেন। বলরাম রায়ের বংশধরেরা নিজেদেরকে বিক্রমপুরের বিখ্যাত বজ্রযোগিনী গ্রামের পুশিলাল শোত্রীয় ব্রাহ্মণ গোত্রভুক্ত বলে দাবি করতেন। জনশ্র”তি রয়েছে বলরামের পুত্র শ্রীকৃষ্ণ ওরফে কৃষ্ণ নারায়ণ রায় দানসূত্রে ভাওয়াল পরগণার নয় আনা হিস্যার অধিকার লাভ করে জমিদার শ্রেণীভুক্ত হয়েছিলেন। কিন’ ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে সুবে বাংলার সুবাদার হিসেবে নিযুক্তি পেয়েছিলেন সম্রাটের পৌত্র আজিম-উস্‌শান বা আজিমুদ্দিন। তিনি একাধারে প্রশাসন বিভাগের প্রধান হিসেবে সুবাদার এবং রাজস্ব বিভাগের প্রধান হিসেবে দিউয়ানের দায়িত্ব পালন করতেন। আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির ফলে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন মারাঠা দমনে। যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যয় নির্বাহের জন্য বাংলার রাজস্বের উপর তিনি ছিলেন অনেকাংশে নির্ভরশীল। আজিম-উস-শান ভবিষ্যতে দিল্লির মসনদে আরোহনের কথা ভেবে প্রজাপ্রীড়ন এবং ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থ সম্পদ সঞ্চয়ে উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন। বাংলা থেকে প্রয়োজনীয় রাজস্ব প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য সম্রাট বাংলার দিউয়ান হিসেবে নিয়োগ দেন মুর্শিদ কুলি খানকে। ইতোপূর্বে মুর্শিদকুলি খান বিহার ও উড়িষ্যার দিউয়ান হিসেবে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। তাকে অতিরিক্ত সুবে বাংলার দিউয়ানেরও দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি ঢাকায় এসে আজিম-উস-শানের অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধ করে দিলেন। শাহাজাদা মুর্শিদ কুলি খানকে ভাল চোখে দেখলেন না। তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করলেন। এ পরিকল্পনা তিনি ব্যর্থ করে দিয়ে সম্রাটের অনুমতিক্রমে ঢাকা হতে রাজধানী ভাগিরথীর তীরে মখসুদাবাদে সস্থানান-রিত করলেন। অতঃপর বাংলার বকেয়া রাজস্ব আদায়ে মনোযোগী হলেন। মুর্শিদকুলি খানের নামানুসারে মখসুদাবাদের নাম হয় মুর্শিদাবাদ। তিনি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হিসেবে পরিগণিত হন। নবাব মুর্শিদকুলি খান বাংলায় ”তৃতীয় মুঘল” বন্দোবস- চালু করেন। তিনি সুবা-ই-বাংলাকে ১৩টি চাকলা এবং ১৬৬০ টি পরগণায় বিভক্ত করে শাহসুজার আমলে ধার্যকৃত রাজস্ব ১,৩১,১৫,৯০৭/- টাকার স’লে ১,৪২,৮৮,১৫৬/- টাকা ধার্য করেন। এ সময় রাজস্ব বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১,৭২,২৭৯/- টাকা। মুর্শিদকুলি খান অধিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে নতুন করে ভূমির বন্দোবস- দিয়ে জমিদার শ্রেণীর সৃষ্টি করেন। এ সময় হতে প্রকৃত ভূমি মালিকগণ তাদের মালিকানা স্বত্ব হারাতে থাকে। রাজস্ব বকেয়ার দায়ে পুরাতন জমিদারদের উ”েছদ করে নব্য জমিদারেরা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মুর্শিদ কুলি খানের অন্যতম রাজস্ব নীতি ছিল মুসলিম প্রজা সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় হিন্দু জমিদার নিয়োগ। তাঁর সময়ে অসংখ্য মুসলিম জমিদার বিতাড়িত হন এবং তদস’লে হিন্দু জমিদারগণ জমিদারি লাভ করেন। সম্ভবতঃ শ্রীকৃষ্ণ দানসূত্রে নয় বরং মুর্শিদকুলি খানের উক্তরূপ রাজস্ব নীতির কারণে ১৭০৪ সালে ভাওয়াল জমিদার দৌলত গাজীর জামিদারির বৃহদাংশ লাভ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ ওরফে কৃষ্ণ নারায়ণ রায়-ই হলেন ভাওয়াল জমিদার বংশের আদি প্রতিষ্ঠাতা।
    কৃষ্ণ নারায়ণের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র জয়দেব নারায়ণ ভাওয়ালের জমিদারি লাভ করেন। জয়দেব নারায়ণের নামানুসারে পীরবাড়ি মৌজার নামকরণ হয় জয়দেবপুর। জয়দেব নারায়ণের মৃত্যুর পর তার পুত্র ইন্দ্র নারায়ণ এবং ইন্দ্রনারায়ণের লোকান-রে তৎপুত্র কীর্তি নারায়ণ ভাওয়ালের জমিাদারি প্রাপ্ত হন। কীর্তি নারায়ণের মৃত্যুর পর তৎপুত্র লোকনারায়ণ এবং তার মৃত্যুর পর তৎপুত্র গোলক নারায়ণ জমিদারি লাভ কর্রেছিলেন। গোলক নারায়ণ ইহধাম ত্যাগ করলে তার পুত্র কালি নারায়ণ রায় ভাওয়ালের জামিদার হন।
    ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির আমবাগানের প্রহসনমূলক যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন ঘটে। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে বাংলা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানি বা দিউয়ানি লাভ করে। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে ১৭৭২ সালে পাঁচসনা বা পাঁচ সালা, ১৭৭৭ সালে এক সনা বা বাৎসরিক এবং ১৭৯০ সালে দশ সনা বা দশ সালা বন্দোবসে-র ব্যবসস্থা করে। দশসনা বন্দোবসে-র আগে তালুকদারগণ জমিদারগণের মাধ্যমে খাজনা বা রাজস্ব পরিশোধ করতো। দশ সনা নীতির ফলে তালুকদারগণ সরাসরি কোম্পানির নিকট খাজনা পরিশোধের সুযোগ লাভ করে। ফলে কোম্পানি লাভবান হলেও জমিদারগণ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস’ হয়। জমিদারগণ এই বন্দোবস- প্রক্রিয়া মেনে নিতে পারেনি।
    আলেকজেণ্ডার ডাও তাঁর ’হিষ্টি অব হিন্দুস্তান (১৭৭২)’ এবং হেনরি পান্ডলো তাঁর ”এ্যান এসে অন দি কাল্টিভেশন অব দি ল্যান্ডস ইমপ্র”ভমেন্ট অব দি রেভিনিউস অব বেঙ্গল (১৭৭২)” গ্রনে’ ভূমি রাজস্ব ব্যবসস্থাকে চিরসস্থায়ী বন্দোবস- চালু করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছিলেন। ডাও মনে করেছিলেন, ভূমি রাজস্ব চিরসস্থায়ী বন্দোবস- হলে কৃষির উন্নতি ঘটবে, আর কৃষির উন্নতি ঘটলে বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে। অপর দিকে হেনরি পান্ডলো প্রাকৃতিক সম্পদকে আয়ের প্রধান উৎস বিবেচনা করে ভূমি রাজস্বের জন্য চিরসস্থায়ী বন্দোবস- প্রবর্তনের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। ইংল্যাণ্ডের রাজনৈতিক মহলে চিরসস্থায়ী বন্দোবসে-র স্বপক্ষে অনুকূল মনভাব ও তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল লর্ড কর্ণওয়ালিশের জোর সুপারিশে ইংল্যাণ্ডের প্রধান মন্ত্রী পিট এবং বোর্ড অব কন্ট্রোলের প্রেসিডেন্ট হেনরি ডান্সাস ভারত বিষয়ে অভিজ্ঞ চার্লস গ্রাট এবং জন শোরের সংগে আলোচনা করে ১৭৯২ সালের ২৯ আগস্ট ডিরেক্টর সভায় চিরসস্থায়ী বন্দোবস- প্রদানের জন্য গভর্ণর জেনারেল লর্ড কর্ণওয়ালিশকে নির্দেশ দেন। লর্ড কর্ণওয়ালিশ ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ চিরসস্থায়ী বন্দোবসে-র ঘোষণা দেন। এই বন্দোবসে-র ফলে জমিদার ও স্বাধীন তালুকদারগণ নির্ধারিত রাজস্ব নিয়মিত পরিশোধের বিনিময়ে উত্তরাধিকার সূত্রে জমিদারি ভোগের সুযোগ পেলেন। এই আইনে ভবিষ্যতে খরা বা দুর্যোগের কারণে রাজস্ব মওকুফ রহিত করা হয়। প্রতি বছর ৩০ চৈত্র সূর্যাসে-র পূর্বে নির্ধারিত খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে পুরো জমিদারি অথবা অংশ বিশেষ বিক্রি করে সরকারি পাওনা পরিশোধের ব্যবসস্থা রাখা হয়। জমিদারগণকে পুলিশি ও ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালন হতে বিরত করা হয়। এই আইনে জমিদারগণকে জমিদারি বিক্রয়, বন্ধক, দান বা অন্য কোন ভাবে হস্তান-রের ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
    চিরসস্থায়ী বন্দোবসে-র পরবর্তী সময়ে ভওয়াল জমিদার পরিবার আশে পাশের বহু ছোট-খাট জমিদারি এবং জমি ক্রয় করে একটি বড় জমিদারির মালিক হয়। ১৮৫১ সালে ভাওয়াল পরিবার নীলকর জেমস্‌ ওয়াইজের জমিদারি ক্রয় করেন। ফলে ভাওয়াল পরগণার সম্পূর্ণটাই ভাওয়াল জমিদারির অধীনে আসে। সরকারি রাজস্ব নথিপত্র হতে জানা যায় যে, ভাওয়াল জমিদার ৪,৪৬,০০০/- টাকার বিনিময়ে নীলকর ওয়াইজের জমিদারি ক্রয় করেছিলেন, যা ছিল সেই যুগের মূল্যমান বিচারে একটি বিশাল অংক। ১৮৭৮ সালের এই পরিবারের জমিদার কালি নারায়ণ রায় ঢাকার নর্থ ব্র”ক হলে ভারতের বড়লাটকে এক জমকাল বিশাল সংবর্ধনা প্রদান করেন। বড়লাট লর্ড লিটন এই বিশাল জমকাল সংবর্ধনায় অবিভূত হন। জমিদার কালি নারায়ণ রায়ের প্রভুভক্তিতে হন মুগ্ধ। বড়লাট জামিদার কালি নারায়ণ রায়কে ’রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং বংশ পরম্পরায় রাজা উপাধি ব্যবহারের অনুমতি দেন। সেই থেকে জমিদার কালি নারায়ণ রায় হলেন রাজা কালি নারায়ণ রায় চৌধুরী এবং ভাওয়াল জমিদার পরিবারটি পরিণত হলো ভাওয়াল রাজ পরিবার। কালি নারায়ণ রায় চৌধুরী ছিলেন একজন চৌকস জমিদার। তাঁর বুদ্ধিমত্তা, ইংরেজদের প্রতি আনুগত্য পোষণ, সর্বোপরি প্রজাদের সুযোগ সুবিধার প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জমিদারি প্রসারে এবং পরিচালনায় অত্যন- ফলপ্রসূ হয়েছিল। বাংলদেশের অধিকাংশ জমিদার তাঁর জমিদারি এলাকায় বসবাস করতেন না। বেশির ভাগ জমিদার অনংবহঃু খধহফ খড়ৎফ হিসেবে বাইরে থেকে নায়েব, গোমস্তা, পিয়াদা-পাইক এর মাধ্যমে খাজনা আদায় করতেন। আর জমিদারগণ করতেন কোলকাতা কেন্দ্রিক বিলাসী জীবন যাপন। এক্ষেত্রে ভাওয়াল জমিদার পরিবার ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী।
    ভাওয়াল জমিদার পরিবার জমিদারির একেবারে কেন্দ্রে অবসি’ত জয়দেবপুর গ্রামে বাস করতেন। তাঁদের বাড়িটি রাজ বাড়ি নামে পরিচিত। বর্তমানে উক্ত রাজ বাড়িতে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সস্থাপিত হয়েছে।
    জয়দেবপুরের রাজবাড়িটি ছিল রেল লাইনের পূর্ব পাশে। রাজবাড়ির সামনের দিকের রাস্তাটির নাম ছিল রাজবাড়ি রোড। রাজপরিবারের কোন লোকের মৃত্যু হলে তার মৃতদেহ দাহ করা হত চিলাই নদীর পাশে, নির্দিষ্ট শ্মশানে। চিলাই নদীতে স্নানের জন্য রাজ পরিবারের লোকজন ব্যবহার করতেন একটি নির্দিষ্ট স্নানের ঘাট। এই স্নানের ঘাটটির নাম ছিল ’শিকদার’ ঘাট।
    রাজবাড়িতে প্রবেশ করতে গেলে প্রথমেই পড়ত বড় দালান। এই দালানে অবশ্য রাজপরিবারের কোন লোকজন বসবাস করতেন না। বড় দালানে থাকতেন রাজবাড়ির অতিথিরা। রাজবাড়ির অতিথি হয়ে যারা জঙ্গলে শিকার করতে আসতেন তাঁরা এই বড় দালানে উঠতেন। তাঁদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবসস্থা ছিল এই বড় দালানে। অবশ্য কিছু পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল ১৯০২ সালের পর থেকে।
    এই সময় মিঃ মেয়্যার রাজ এস্টেটের ম্যানেজার নিযুক্ত হয়ে জয়দেবপুর রাজবাড়িতে এসে উঠেছিলেন। তিনি বড় দালানটিকে তাঁর নিজের বাসসস্থান হিসেবে ব্যবহার করতে শুর” করেছিলেন। বড় দালানের পিছনেই ছিল ’নাটমন্দির’। এই নাটমন্দিরের দু পাশেই ছিল ঝুল বারান্দা। এই ঝুল বারান্দা ছিল নাটমন্দির ঘিরে দু-পাশের দালানে। এই দোতালা বাড়ির ঝুল বারান্দা থেকে রাজপরিবারের মহিলারা নাটমন্দিরে অনুষ্ঠিত যাত্রা, থিয়েটার প্রভৃতি অনুষ্ঠানগুলি দেখতেন। গান-বাজনা হলে এখানে বসেই তাঁরা সেই সব শুনতেন। বাড়ির একটি ঘরকে ব্যবহার করা হত ঠাকুরঘর হিসেবে। ঠাকুরঘরটিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল জগদ্ধাত্রীর মূর্তি (বিগ্রহ)। জগদ্ধাত্রী পূজা উপলক্ষে প্রতি বছর নাটমন্দিরে গান-বাজনার আসর বসতো। এছাড়াও প্রতি বছর নাটমন্দিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হতো। একাধিক উৎসব পালন করা হতো জয়দেবপুর রাজবাড়িতে। ভাওয়াল এস্টেটের প্রজারা রাজবাড়ির উৎসবগুলিতে যোগদান করতেন। উত্তর দিকের বাড়ির দোতলার একটি ঘর ছিল রাজবাড়ির সদর বৈঠকখানা।
    এই বাড়ির পিছনের দিকে ছিল রাজবাড়ির অন্দরমহল। অন্দরমহলটিকে বলা হতো পুরানো বাড়ি। পুরানো বাড়ির পশ্চিমদিকের অংশটিকে বলা হতো পশ্চিমাখণ্ড। রাজবাড়ির পিছনের দিকে খোলা অংশে ছিল একটি বাগান। পূর্বদিকে চিলাই নদী। পশ্চিমদিকে ছিল একটি বড় দীঘি। রাজবাড়ির মেয়েরা মাধব বাড়ির পাশ দিয়ে পশ্চিমের দীঘিটিতে যাতায়াত করতেন।
    ’মাধব বাড়িতে’ ছিল ’রাধামাধবের’ মূর্তি। ’রাধা মাধবের’ মূর্তিটি ছিল পাথরের। মাধব বাড়ির পিছনে ছিল রাজবিলাস। রাজা কালি নারায়ণের মৃত্যুর পর রাজপরিবারের লোকজন সাধারণত বাস করতেন রাজাবিলাসে। জয়দেবপুর বাজবাড়িতে ছিল ডাক্তারখানা, খাজাঞ্চিখানা, ফরাসখানা, বাবুর্চিখানা প্রভৃতি। রাজবাড়ির ইউরোপিয়ান অতিথিদের জন্য ছিল একজন অহিন্দু পাচক। এ ছাড়া বাইরের দালানে ছিল ছবিঘর।
    রাজবাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই ছিল পোলো খেলার ময়দান। ১৯২১ সালের ১৫ই মে যখন বিতর্কিত সন্ন্যাসীটি জয়দেবপুরে এসেছিলেন, তখন এই পোলো ময়দানেই একটি বিরাট সভার আয়োজন করা হয়েছিল সন্ন্যাসীর নিজের মুখে তার বক্তব্য শোনার জন্য। তাঁকে দেখার জন্য বহু মানুষের সমাগম হয়েছিল রাজবাড়ির এই পোলো খেলার ময়দানে।
    এছাড়াও রাজবাড়িতে ছিল ’দেওয়ান খানা’। রাজবাড়ির কাছেই ছিল এম-ভি স্কুল। পরে অবশ্য স্কুলটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল ’রাণী বিলাসমণি স্কুল’। স্কুলটির বোর্ডিং হাউসটি ছিল স্কুলবাড়ির দক্ষিণদিকে। রাজবাড়ির সন্নিকটে রেল লাইনের পাশে প্রতি সপ্তাহের সোমবার এবং শুক্রবার হাট বসতো। রাজবাড়ির চত্বরে ছিল ঘোড়াশালা এবং হাতিশালা। পিলখানার পাশাপশি ছিল মাহুতদের থাকার বাসসস্থান।
    মেজোকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ যখন ১৯০৯ সালে দার্জিলিং ভ্রমণে গিয়েছিলেন, সেই সময় রাজবাড়ির হাতিশালে ছিল ১৩টি হাতি। প্রত্যেকটি হাতির ছিল আলাদা আলাদা নাম।
    ঢাকার বুড়িগঙ্গার পাশে নলগোলায় ভাওয়ালরাজের একটি বাড়ি ছিল। কুমারেরা ঢাকায় এলে নলগোলার বাড়িটিতে উঠতেন। রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণের মৃত্যুর পর কুমাররা খুব ঘন ঘন ঢাকার নলগোলার বাড়িতে যাতায়াত করতেন। ভাওয়াল রাজের ’মতিয়া’ নামে একটি লঞ্চ ছিল। বুড়িগঙ্গায় বাঁধা থাকতো লঞ্চটি। ঢাকায় এলে কুমাররা এই ’মতিয়া’ নামক লঞ্চে করে ঘুরে ফিরে বেড়াতেন। এ ছাড়াও ভাওয়ালরাজের ছিল একাধিক নৌকা।
    রাজা কালি নারায়ণ রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার পুত্র রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ভাওয়াল জামিদারির মালিকানা প্রাপ্ত হন। রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী হিন্দু শাস্ত্র্ত্র মতে বিয়ে করেছিলেন বরিশাল জেলার বাণারিপাড়ার চতুর্দশ বর্ষীয়া নাবালিকা বিলাস মণি দেবীকে। রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী পিতার ন্যায় চৌকস এবং করিৎকর্মা ছিলেন। তিনি ভাওয়াল জমিদারির আরো বিস্তৃতি ঘটান। তাঁর সময়ে ভাওয়াল জমিদারি ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বাকেরগঞ্জ জেলায় বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং পূর্ব বাংলার দ্বিতীয় বৃহৎ জমিদারিতে পরিণত হয়। প্রসংগক্রমে উল্লেখ্য যে, এ সময়ে পূর্ব বাংলার সর্ববৃহৎ জমিদারি ঢাকা নবাব এস্টেটটি বিভিন্ন জেলায় বিস্তার লাভ করেছিল এবং জমিদারির প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকা শহরেই অবসি’ত ছিল। প্রধানতঃ আহসান মঞ্জিল হতে ঢাকা নবাব এস্টেট হতে পরিচালিত হতো। কিন’ ঢাকা শহরের অংশ বিশেষ এবং আশে পাশের প্রায় সকল জমির মালিক ছিলেন ভাওয়াল রাজা।
    ১৯১৭ সালের ভূমি জরিপ ও বন্দোবস- রেকর্ডে দেখা যায় যে, ভাওয়াল রাজ পরিবারটি বিভিন্ন সস্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ২২৭৪টি মৌজায় ৪,৫৯,১৬৩.৩০ একর জমির মালিক হয়েছিলেন। ভাওয়াল রাজ এস্টেটের প্রদত্ত হিসেব থেকে দেখা যায় ১৯০৪ সালে ভাওয়াল রাজের জমিদারির ভূমি রাজস্ব বাবদ সরকারকে প্রদান করা হয়েছিল ৮৩,০৫২/- টাকা এবং সকল খরচ-খরচা বাদে নিট আয় হয়েছিল ৪,৬২,০৯৬/- টাকা।
    ভাওয়াল এস্টেটের জমিদারির ব্যবসস্থাপনা ছিল সুদৃঢ় এবং দক্ষতাপূর্ণ। রাজা নিজেই জমিদারি পরিচালনা করতেন। সনাতনীভাবে বেশিরভাগ বড় জমিদার তাঁদের জমিদারি ব্যবসস্থাপনার জন্য নির্ভর করতেন নায়েব, গোমস্তা, পিয়াদা, পাইকের উপর। কিন’ ভাওয়াল রাজ স্বহসে- জমিদারি পরিচালনা করতেন এবং প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে জমিদারি সেরেস্তায় বসতেন। সম্পূর্ণ জমিদারিটি ভাওয়াল রাজ কয়েকটি সার্কেলে বিভক্ত করেছিলেন। প্রতিটি সার্কেল একজন মফস্বল নায়েবের উপর ন্যস- ছিল, যাকে একজন তহশিলদার, মুহুরি, জমাদার, পিওন, ঝাড়-দার এবং কুলি সাহায্য করতো। এ ছাড়াও তার অধীনে থাকতো একদল লাঠিয়াল, যাদেরকে প্রয়োজনে অবাধ্য রায়ত বা প্রজাদের অনুগত করার কাজে ব্যবহার করা হতো। প্রতিটি গ্রামে একজন মণ্ডল থাকতো, যার মাধ্যমে খাজনা আদায় করা হতো। জমির খাজনা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে মাঝেমাঝে প্রত্যেকটি গ্রাম জরিপের ব্যবসস্থা ছিল। বাংলার অন্যান্য জমিদারের মত ভাওয়াল রাজ সাধারণভাবে কোন মধ্যস্বত্বভোগী রায়ত সৃষ্টি করেননি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সি.এস রেকর্ডে দেখা যায় উপরিস্বত্ব ভাওয়াল রাজের এবং নিম্নস্বত্ব সরাসরি রায়তের বা ভূমি মালিকের। ভাওয়াল জমিদারির প্রধান কাচারি ছিল জয়দেবপুরে। এই কাচারিতে রাজার জন্য বিশেষ একটি আসন বা গদি রক্ষিত ছিল। জমিদারির প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তাকে দিউয়ান বলা হতো। যার অধীনে ছিল একজন উপ-দিউয়ান, কয়েজন নায়েব ও গোমস্তা। জমিদারির বিভিন্ন এলাকার জন্য দিউয়ান খানায় আলাদা আলাদা ডেস্ক ছিল এবং প্রতিটি ডেস্কের জন্য বিভিন্ন ধরণের বেশ কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছিল।
    রাজা কালি নারায়ণ রায় চৌধুরীর স্বর্ণময়ী নামে একজন সৎবোন ছিল। কুলিন পাত্র ছাড়া রাজ পরিবারের কোন মেয়েকে বিয়ে দেয়ার রেওয়াজ ছিল না। রায় পরিবারের মেয়েদের বিয়ের পর জামাইদের প্রায় সবাইকে ঘরজামাই হিসেবে রাজবাড়িতে রেখে দেয়া হতো। অবশ্য স্বর্ণময়ী তার বিয়ের কয়েক বছর পরেই স্বামী ও কন্যাদের নিয়ে রাজবাড়ি ছেড়ে আলাদা বাড়িতে উঠেছিলেন। তিনি মারা যান ১৯১৭ সালে। স্বর্ণময়ীর কমলকামিনী ও মোক্ষদা নামে দুটি মেয়ে ছিল। ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার আগেই মোক্ষদা ফণী নামে এক পুত্র ও শৈবালিনী নামে এক কন্যা রেখে মারা যান। ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলায় কমলকামিনী মেজো কুমারের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। অপর দিকে মোক্ষদার পুত্র ফণী ও কন্যা শৈবালিনী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন ১নং বিবাদি অর্থাৎ বিভাবতীর পক্ষে। তারা সাক্ষ্য প্রদানকালে ই”ছাকৃতভাবে অনেক তথ্য গোপন করেছিলেন। রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণের গায়ের রং ছিল হলদে। তাঁর ছিল বিরাট একজোড়া পুর”ষ্ঠ গোঁফ। তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষা বিশেষ লাভ না করলেও ভাল ইংরেজি জানতেন এবং ইংরেজ সাহেবদের সংগে মিশতে পারতেন। ইংরেজদের সাথে কথা বলতেন ইংরেজিতে। কিন’ বাঙালি ব্রাহ্মণদের মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেন। প্রতি বছর জয়দেবপুর রাজবাড়িতে অনুষ্ঠিত হতো দুর্গা পুজা, কালি পূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, বাসন-ী পূজা ইত্যাদি। এছাড়া পালন করা হতো রথযাত্রা উৎসব। রাজবাড়ির পুর”ষদের সাহেব-সুবাদের সাথে মেলা-মেশা থাকলেও মেয়েরা ছিলেন পর্দানশীন। রাজবাড়ির অন্দর মহলে বাইরের পুর”ষদের প্রবেশাধিকার ছিল না।
    সরকারি নথিপত্রে দেখা যায় ১৮৯৭ সালের প্রচণ্ড ভূমিকম্পের ফলে জয়দেবপুর রাজবাড়ির নানা অংশে ফাটল ধরেছিল। সেই কারণে রাজবাড়ি ও রাজবিলাশের নতুন করে সংস্কার করা হয়েছিল। যখন রাজবাড়ির এই সংস্কারের কাজ চলছিল, সেই সময়ে হঠাৎ একদিন রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী অসুস’ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায়। কিন’ শত চিকিৎসা ও চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি আর সুস’ হয়ে উঠেননি। ১৯০১ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকায় নলগোলার বাড়িতে ম
    “ছবি সংযুক্ত করার সুযোগ নাই না হলে আসল রাজবাড়ীর ছবিটা দিয়ে দিতাম ।

  7. রাজকীয় প্রতারক (ভাওয়াল রাজার ইতিহাস অবলম্বনে)
    – পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    সম্পাদনা কিশোরগঞ্জ ডট কম ডেস্ক ফিচার Jul 30, 2012

    ২০ এপ্রিল, ভাওয়ালের রাজপরিবারের মেজকুমার দার্জিলিঙে পৌঁছলেন।
    ৬ মে, মেজকুমার অসুস্থ।
    ৭ মে, মেজকুমারের মৃত্যু।
    ১৮ মে, শ্মশানে সৎকার।

    বারো বছর বাদে ঢাকায় সন্ন্যাসীর আবির্ভাব।

    ঘটনাচক্র: মৃত্যু

    ব্রিটিশ আমলের ঢাকা জেলা। জেলার সবচেয়ে বড় জমিদারি ঢাকার নবাব বাহাদুরের এস্টেট। তার পর ভাওয়াল এস্টেট। ভাওয়ালের জমিদার বাড়ি হল জয়দেবপুরে। যে আমলের কথা বলছি, তখনকার জয়দেবপুরকে গ্রামই বলা যায়। এখন অবশ্য জয়দেবপুর ঢাকার উত্তর দিকের শহরতলির অংশ হয়ে গিয়েছে প্রায়। জয়দেবপুর এখন বাংলাদেশের গাজিপুর জেলার সদর। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে জয়দেবপুর ছিল ভাওয়াল এস্টেটের কেন্দ্রস্থল— রাজবাড়ি, কাছাড়ি, হাইস্কুল, সবই ছিল জয়দেবপুরে। আগেই বলেছি, ভাওয়াল বেশ বড়সড় জমিদারি। বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় সরকারের ট্রেজারিতে খাজনা জমা পড়ত বছরে সাড়ে ছ’লাখ টাকা।

    মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী

    ১৯০৯ সালে, যখন এই কাহিনির সূত্রপাত, তখন এস্টেটের মালিক ভাওয়াল রাজপরিবারে তিন ভাই। বড়কুমারের বয়স সাতাশ, মেজর পঁচিশ আর ছোটর বাইশ। তিন কুমারই তখন বিবাহিত, তিন রানি রাজবাড়িতেই থাকেন। কুমারদের তিন বিবাহিতা বোনও সে সময়ে তাঁদের স্বামী আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে রাজবাড়িতেই ছিলেন।

    মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী

    ১৯০৯ সালের ১৮ এপ্রিল মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ জয়দেবপুর থেকে ট্রেনে দার্জিলিং রওনা হয়ে সেখানে পৌঁছন ২০ এপ্রিল। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পত্নী বিভাবতী, বিভাবতীর দাদা সত্যেন্দ্র আর একুশ জন পরিচারকের একটি দল। পারিবারিক চিকিৎসক আশুতোষ দাশগুপ্ত ছিলেন সেই দলে। দার্জিলিং যাত্রার কারণ ছিল রমেন্দ্রর স্বাস্থ্য। আসলে বছর তিনেক আগে ধরা পড়েছিল যে রমেন্দ্রর সিফিলিস রোগ হয়েছে। অবস্থা খারাপ হতে হতে শেষ পর্যন্ত হাতেপায়ে আলসারের মতো বড় বড় ঘা দেখা দেয়। গ্রীষ্মে পাহাড়ি দেশের ঠাণ্ডায় তিনি কিছুটা ভাল থাকবেন এই মনে করে দার্জিলিং ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ-কারণে তাঁর শ্যালক সত্যেন্দ্র কয়েক মাস আগেই দার্জিলিং এসে তাঁদের থাকার জন্য একটা বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন।

    দলে বিভাবতী ছাড়া আর কোনও মহিলা ছিলেন না। ঘটনাটা কিছুটা আশ্চর্যের। ভাওয়াল রাজপরিবারের মতো রক্ষণশীল বাড়িতে বিভাবতীর মতো প্রায় সদ্য বিবাহিতা বধূ তাঁর স্বামীর সঙ্গে একা বিদেশভ্রমণে যাচ্ছেন, এ প্রায় অভাবনীয়। পরে যখন এই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তখন জানা যায় যে, সত্যেন্দ্র বলেছিলেন, দার্জিলিংয়ের বাড়িটি ছোট, বেশি লোক নিয়ে যাওয়া যাবে না, তাই বিভাবতীর সঙ্গে পরিবারের আর কোনও মহিলা যাননি। দার্জিলিং সফরের প্রথম কয়দিন নির্বিঘ্নেই কাটে। হঠাৎ ৬ মে মেজকুমার অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরদিন জয়দেবপুর রাজবাড়িতে টেলিগ্রাম আসে, তাতে মেজকুমারের দলের এক কর্মচারী লিখছেন যে, মেজকুমারের জ্বর হয়েছে। তার পরদিন সকালে আর একটা টেলিগ্রামে জানা যায় যে, তাঁর অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু, সন্ধের টেলিগ্রামে মারাত্মক খবর এল: ‘কুমার অত্যন্ত অসুস্থ। ঘন ঘন দাস্ত হচ্ছে। কাম শার্প’।

    পরদিন ভোরে ছোটকুমার রবীন্দ্র দার্জিলিংয়ের ট্রেন ধরতে জয়দেবপুর স্টেশনে যাচ্ছেন, এমন সময়ে ডাকপিওন তাঁর গাড়ি থামিয়ে তাঁকে একটা টেলিগ্রাম দিল। তাতে লেখা, মেজকুমার মারা গিয়েছেন। তিন দিন পর দার্জিলিংয়ের যাত্রীরা জয়দেবপুর ফিরে এলেন, তাঁদের সঙ্গে সদ্যবিধবা বিভাবতী।

    ১৮ মে, মৃত্যুর এগারো দিন পর, মেজকুমারের শ্রাদ্ধশান্তি অনুষ্ঠিত হল স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে। তবু তাঁর মৃত্যু আর সৎকার নিয়ে নানা রকম কানাঘুষো শোনা যেতে লাগল। শরিফ খাঁ নামে এক আরদালি মেজকুমারের দলের সঙ্গে দার্জিলিং গিয়েছিলেন। তিনি নাকি অনেককে বলেন যে, মেজকুমার যখন অসুস্থ, তখন তাঁকে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে সরিয়ে আনতে হয়। শরিফ খাঁ বিছানা সরাতে সাহায্য করছিলেন, এমন সময় মেজকুমার হঠাৎ বমি করেন। সে বমি নাকি এমনই বিষাক্ত ছিল যে, কয়েক ফোঁটা শরিফ খাঁর জামায় পড়াতে জামা ফুটো হয়ে যায়। আর একটা গুজবও ছড়াতে শুরু করে যে, মেজকুমারের দেহ সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলেও সৎকার হয়নি।

    ভাওয়াল রাজপরিবারের লোকেরা তখন এসব গুজবকে আদৌ আমল দিয়েছিলেন কি না, বলা শক্ত। মেজকুমারের আকস্মিক মৃত্যুতে জয়দেবপুরবাসী বিস্ময়ে আর শোকে রীতিমত হতবাক হয়ে গিয়েছিল, সেটাই বরং বেশি সত্য। তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয় কোনও রকম জাঁকজমক ছাড়াই, নেহাতই যেন নিয়মরক্ষার জন্য। রাজবাড়ির শ্রাদ্ধ বলতে যে আড়ম্বর বোঝায়, তার কিছুই করা হয়নি।

    পারিবারিক মন্দির

    শ্রাদ্ধের ক’দিন পর থেকেই রানি বিভাবতীর দাদা সত্যেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ভাওয়াল এস্টেটের সম্পত্তিতে তাঁর বোনের অংশ সুরক্ষিত রাখার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। শোনা যায়, বিভাবতীকে একটা মাসোহারা দিয়ে সম্পত্তি থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল। তা শুনে সত্যেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় ছুটলেন উকিলের পরামর্শ নিতে। প্রস্তাবটি অবশ্য বেশি দূর এগোয়নি। পরে শোনা যায়, শালাবাবু সত্যেন্দ্র বড় বেশি এস্টেটের ব্যাপারে নাক গলাচ্ছিলেন, তাই তাঁকে ঠেকাতেই এই প্রস্তাব তোলা হয়। সত্যেন্দ্র ঢাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে তাঁর স্ত্রী আর মাকে কলকাতা থেকে নিয়ে এলেন। জয়দেবপুর রাজবাড়ির লোকেরা নিশ্চয়ই বোনের ব্যাপারে তাঁর ঘন ঘন হস্তক্ষেপ ভাল চোখে দেখছিলেন না। সত্যেন্দ্র এবার বিভাবতীকে রাজবাড়ি ছেড়ে চলে আসার জন্য বোঝাতে লাগলেন। প্রথমে কিছু দিন বিভাবতী রাজি হননি। কিন্তু ক্রমে তিনি মত পাল্টাতে লাগলেন। ১৯০৯ সালের নভেম্বর মাসে তিনি আমমোক্তারনামা লিখে সত্যেন্দ্রকে তাঁর এজেন্ট নিযুক্ত করলেন। সেই সঙ্গে মেজকুমারের নামে যে তিরিশ হাজার টাকার জীবনবিমা এস্টেট থেকে করানো হয়েছিল, সেই টাকাও দাবি করলেন।

    ভাওয়াল রাজবাড়ির ওপর হঠাৎ যেন বিপর্যয়ের কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। ১৯১০ সালে সেপ্টেম্বর মাসে বড়কুমার রণেন্দ্রনারায়ণ মারা গেলেন। ক’ মাস বাদেই ১৯১১-র এপ্রিলে এস্টেটের ম্যানেজার নিডহ্যাম সাহেব কলকাতায় মেজরানি বিভাবতীকে জানালেন যে, তাঁর অংশের সম্পত্তি কোর্ট অব ওয়ার্ডস অধিগ্রহণ করছে। ব্রিটিশ আমলে কোর্ট অব ওয়ার্ডস ছিল একটি সরকারি দফতর যা মালিকহীন জমিদারির তত্ত্বাবধান করত। জমিদারির মালিক নাবালক হলে অথবা জমিদারি পরিচালনায় অক্ষম হলে সেসব এস্টেট কোর্ট অব ওয়ার্ডস-এর আওতায় চলে আসত। ওই বছর মে মাসে সরকার ছোটকুমার রবীন্দ্রনারায়ণকেও জমিদারি পরিচালনায় অনুপযুক্ত ঘোষণা করে তাঁর অংশটুকু কোর্ট অব ওয়ার্ডসকে দিয়ে দিল। এক বছর বাদে বড় রানি সরযূবালার অংশটিও সরকারের আওতায় চলে এলে গোটা জমিদারিটাই কোর্ট অব ওয়ার্ডস-এর অধীন হল। ১৯১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছোটকুমারও অল্প কয়েক দিন রোগভোগের পর মারা গেলেন। হঠাৎ দেখা গেল, ঢাকার এক প্রধান জমিদারবাড়ি ভাওয়াল রাজপরিবারের সদস্য বলতে বাকি রয়েছেন কেবল তিন নিঃসন্তান বিধবা রানি যাঁদের কারও সম্পত্তিই আর তাঁদের দখলে নেই। স্বামীর মৃত্যুর অল্পদিন বাদে ছোটরানি আনন্দকুমারীও জয়দেবপুর রাজবাড়ি ছেড়ে ঢাকা চলে গেলেন। ছ’বছর বাদে তিনি এক দত্তকপুত্র নেন।

    এদিকে রমেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর থেকে বেশ কয়েক বছর ধরে নানা রকম গুজব রটতে থাকে। আগেই শোনা গিয়েছিল যে, তাঁর দেহ নাকি ঠিকমত সৎকার হয়নি। এবার শোনা যেতে লাগল যে, তিনি নাকি জীবিত আছেন এবং সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করছেন। জয়দেবপুর রাজবাড়িতে অনেক সাধুসন্ন্যাসীর আনাগোনা ছিল। মেজকুমারের মারা যাওয়ার গল্প শুনে তেমন এক সন্ন্যাসী নাকি বলেন যে, তিনি এক বাঙালি উঁচুঘরের সন্তানকে একদল সাধুর সঙ্গে ঘুরতে দেখেছেন। সেই সাধুরা নাকি তাঁকে দার্জিলিংয়ে খুঁজে পায়। এসব গুজব শুনে ভাওয়াল রাজবাড়ি থেকে উত্তর ভারতে লোক পাঠানো হল এ ব্যাপারে ভাল করে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। কুমারদের এক বোন জ্যোতির্ময়ীদেবী খুব ধর্মপ্রাণ ছিলেন, মাঝে মাঝেই কাশী যেতেন। তিনি পরে জানান যে, কাশীতে সাধুসন্ন্যাসীদের কাছে খোঁজ নিয়ে তাঁর স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল যে, মেজকুমার বেঁচে আছেন।

    ভাওয়াল রাজার প্রসাদ

    ১৯১৭ সাল নাগাদ গুজবের স্রোত নিশ্চয় বেশ প্রবল হয়ে ওঠে, কারণ কুমারদের বৃদ্ধা ঠাকুরমা রানি সত্যভামা হঠাৎ বর্ধমানের মহারাজার কাছে চিঠি লিখে জানতে চাইলেন যে, তাঁর মেজ নাতির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন কি না। সত্যভামা লিখলেন যে, উত্তর আর পূর্ব-ভারতের নানা জায়গা থেকে ক্রমাগত খবর আসছে যে, ভাওয়ালের মেজ কুমারকে নাকি এক দল সাধুর সঙ্গে ঘুরতে দেখা গিয়েছে। রমেন্দ্রর মৃত্যুর সময় বর্ধমানের মহারাজা দার্জিলিংয়েই ছিলেন। তিনি কি এ বিষয়ে কিছু জানেন? উত্তরে মহারাজা বিজয়চাঁদ জানালেন যে, মেজকুমারের মৃত্যুর কথা তাঁর মনে আছে। দার্জিলিংয়ে থাকার সময় এক দিন তিনি খবর পান যে, ভাওয়ালের মেজকুমার মারা গিয়েছেন। শুনে তিনি সৎকারের কাজে ব্যবহারের জন্য গঙ্গাজল আর তুলসিপাতা লোক মারফত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এর বেশি তাঁর কিছু জানা নেই।

    মেজকুমারকে নিয়ে রটনা কিন্তু চলতেই লাগল। মাঝেমাঝেই শোনা যেত যে, তাঁকে নাকি অমুক জায়গায় দেখা গিয়েছে সাধুসন্তদের দলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বহু কাল পর কলকাতা হাইকোর্টের জজ লজ সাহেব মন্তব্য করেছিলেন যে, এত সব রটনা জল্পনা থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে, ভাওয়ালের লোক মেজকুমারের জীবিত থাকার গল্পটা বিশ্বাস করতে খুবই উদগ্রীব ছিল। কেউ যদি হঠাৎ উদয় হয়ে বলত যে, আমি সেই রমেন্দ্রনারায়ণ, লোকে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে মেনে নিত। কোনও চক্রান্তকারীর মাথায় জাল মেজকুমারকে খাড়া করার মতলব এসে থাকলে, সে এ সব রটনা থেকে অন্তত এটুকু বুঝেছিল যে, খানিকটা চেহারায় সাদৃশ্য আনতে পারলেই তার কার্যসিদ্ধি হতে পারে।

    কে এই সন্ন্যাসী?

    ঢাকা শহরে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর বাকল্যাণ্ড বাঁধ এক কালে অত্যন্ত মনোরম জায়গায় ছিল। সারি সারি গাছ, দু’পাশে বাগান, মাঝেমাঝে বসার জন্য বেঞ্চ। সাহেবসুবোরা মর্নিংওয়াকে আসতেন এখানে। আজ অবশ্য বাকল্যাণ্ড বাঁধ সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাওয়ার পথ, ঢাকার সব চেয়ে ঘিঞ্জি আর নোংরা রাস্তার মধ্যে একটা। দু’পাশে এখন বাজার, কাদা আর আবর্জনার উপর দিয়ে ক্রমাগত সাইকেল রিকশার স্রোত বয়ে চলেছে। নদী দেখা যায় না— রাস্তার ধারে বিরাট পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়েছে, নদীর পাড়ে বেদখলকারীদের বসতি বসে যাবে এই ভয়ে। ঢাকার পুরনো অধিবাসীদের অনেকের কিন্তু বাকল্যাণ্ড বাঁধে বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি মনে আছে।

    ১৯২১ সালের জানুয়ারি মাস নাগাদ বাকল্যাণ্ড বাঁধে এক সাধুর আবির্ভাব হয়। জটাধারী সন্ন্যাসীর সর্বাঙ্গে ছাই মাখা, পরনে কৌপীন। ব্যবসায়ী রূপলাল দাসের অট্টালিকা ঢাকা শহরের এক দ্রষ্টব্যস্থান। আজও হৃত জৌলুসের মলিন স্মৃতি বহন করে সংরক্ষিত ভবন হিসাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে রূপলাল হাউস। সেই রূপবাবুর বাড়ির সামনে আস্তানা গাড়লেন সন্ন্যাসী। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি দিনরাত সেখানে বসে থাকতেন। তাঁর চেহারার জন্যই সন্ন্যাসী অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অনেকদিন পর আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ে একজন যেমন বলেন, ‘‘এমন সুন্দর গৌরবর্ণ, সম্ভ্রান্ত চেহারার জটাধারী সন্ন্যাসী ঢাকায় আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।’’ প্রায়ই সাধুকে ঘিরে ছোটখাটো ভিড় জমে যেত। লোকে তাঁকে নানা প্রশ্ন করত— ‘কোত্থেকে এসেছ? তাবিজটাবিজ দাও নাকি?’ ইত্যাদি। সাধু বিশেষ উত্তর দিতেন না। দিলে উত্তর দিতেন হিন্দিতে। পরে শোনা যায়, সাধু নাকি বলতেন যে, তিনি পঞ্জাবের লোক, ছোটবেলায় ঘরবাড়ি ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়েছেন। বাংলার জল-হাওয়া তাঁর একেবারে পছন্দ হচ্ছে না। ওষুধ চাইলে তিনি মাদুলি তাবিজের বদলে তাঁর গায়ের ছাই এক চিমটে তুলে দিতেন।

    এরই মধ্যে কোনও এক সময়ে গুজব চালু হয়ে যায় যে, ভাওয়ালের মেজকুমার সন্ন্যাসী হয়ে ঢাকায় ফিরে এসেছেন। হঠাৎ দেখা গেল, দূরদূরান্ত থেকে লোক সাধুকে দেখার জন্য বুড়িগঙ্গার ধারে রূপবাবুর বাড়ির সামনে ভিড় করতে শুরু করেছে। বেশির ভাগ সময়ে সন্ন্যাসী লোকের কথায় কোনও সাড়া দিতেন না। বেশি রকম উত্ত্যক্ত করলে তিনি হিন্দিতে বলতেন যে, তিনি সংসারত্যাগী, ঘরবাড়ি আত্মীয়স্বজন কিছু নেই। অনেকেই ‘যত সব বাজে গুজব’ বলে ফিরে চলে যেত। কেউ কেউ আবার বলত ‘লোকটা ঠগ’, যদিও সাধু নিজের পূর্বপরিচয় নিয়ে কোনও রকম দাবি করেননি। তবু সেই শীতকালের মরা রোদে বুড়িগঙ্গার পাড়ে সন্ন্যাসীকে ঘিরে থাকা ভিড়ের ভেতর থেকে গুঞ্জন শোনা যেতে লাগল, ‘হ্যাঁ, এই তো মেজকুমার! ভাওয়ালের মেজকুমার স্বয়ং!’ সাধুর ঢাকায় আসার প্রায় চার মাস বাদে ভাওয়াল রাজপরিবার থেকে প্রথম তাঁকে দেখতে যায় কুমারদের দিদি জ্যোতির্ময়ীর ছেলে বুদ্ধু।

    জয়দেবপুরের পাশের গ্রাম কাশিমপুরের কয়েকজন ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে বুদ্ধু সন্ন্যাসীকে দেখে আসার পরও কিন্তু নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারল না। সন্ন্যাসীর সঙ্গে মেজকুমারের চেহারার মিল আছে ঠিকই। কিন্তু এই সাধুই যে তাঁর মেজমামা, মৃত্যুর দ্বার থেকে জীবন্ত ফিরে এসেছেন, এমন কথা বুদ্ধু জোর গলায় বলতে পারল না। কাশিমপুরের সঙ্গীরা তখন স্থির করলেন যে, সন্ন্যাসীকে একবার সশরীরে জয়দেবপুর নিয়ে আসতে হবে।

    ১৯২১ সালের ৫ এপ্রিল কাশিমপুরের অতুলপ্রসাদ রায়চৌধুরী সন্ন্যাসীকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে এলেন। অতুলবাবু মেজকুমারকে খুব ভাল রকম চিনতেন। ভাওয়াল আর কাশিমপুর, দুই জমিদার বাড়ির মধ্যে বিশেষ ঘনিষ্ঠতাও ছিল। পরে অবশ্য বলা হয় যে, সন্ন্যাসীকে আদৌ ভাওয়ালের মেজকুমার সন্দেহ করে কাশিমপুর নিয়ে যাওয়া হয়নি। নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কারণ, ওই বাড়ির কর্তা সারদাপ্রসাদের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না, তাই সন্ন্যাসীকে দিয়ে পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করানোর চেষ্টা হচ্ছিল। সন্ন্যাসী অবশ্য সরাসরি বলে দেন যে, তিনি যজ্ঞটজ্ঞ কিছু জানেন না। তবু প্রায় দিন সাতেক সন্ন্যাসী কাশিমপুরে এক গাছতলায় আশ্রয় নেন। ১২ এপ্রিল বিকেলে সন্ন্যাসীকে হাতির পিঠে চড়িয়ে জয়দেবপুর নিয়ে আসা হয়।

    সন্ধে ছটা নাগাদ হাতি সোজা এসে থামল রাজবাড়িতে। সন্ন্যাসী হাতির পিঠ থেকে নেমে ধীরে এগিয়ে গেলেন রাজবাড়ির অতিথিশালা মাধববাড়ির দিকে। সেখানে একটা কামিনী গাছের তলায় গিয়ে বসলেন। কুমারদের তিন বোনই ততদিন রাজবাড়ি ছেড়ে জয়দেবপুরে অন্যত্র বাড়ি করে চলে গেছেন। আশি বছরের বৃদ্ধা রানি সত্যভামাও তখন তাঁর এক নাতনির সঙ্গে ছিলেন। সেদিন সন্ধেবেলা সন্ন্যাসীকে চাক্ষুষ দেখতে আসেন রাজবাড়ির কিছু কর্মচারী আর দূরসম্পর্কের আত্মীয়। তাঁদের একজন— সত্যভামার ভাইপো রাধিকা গোস্বামী— পরে বলেছিলেন যে, তিনি বিশেষ করে কৌপীনধারী সাধুর হাত-পায়ের গড়ন লক্ষ করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ইনি মেজকুমার কি না, নিশ্চিত হতে পারেননি।

    পরদিন সকালে ভাওয়াল স্টেটের সেক্রেটারি রায়সাহেব যোগেন্দ্রনাথ বাঁড়ুজ্যে আর তাঁর ছোট ভাই সাগর সন্ন্যাসীকে দেখতে এলেন। এঁরা এসে দেখেন সন্ন্যাসী রাজবিলাস নামে বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় বসে আছেন। সাগরবাবু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সন্ন্যাসীকে দেখতে লাগলেন। ‘আমরা ওঁর মুখোমুখি দাঁড়াতে উনি আমাদের দিকে তাকালেন। আমি ওঁর চোখের মণির রং দেখতে পেলাম। চোখ কটা। আমি ওঁর গড়নপেটন, ওঁর বসার, তাকাবার ভঙ্গি, ওঁর চেহারা, খুব ভাল করে লক্ষ করতে লাগলাম। ওঁকে মেজকুমার বলেই সন্দেহ হল। আমি যোগেনবাবুকে যা ভাবছিলাম তা বললাম। উনি বললেন, ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর। উনি বললেন হইচই কোরো না। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ওঁকে দেখা যাক। কিছুক্ষণ বাদে বুদ্ধু এসে জানাল যে, তাঁর মা সন্ন্যাসীকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যেতে বলেছেন। জিজ্ঞাসা করাতে সন্ন্যাসী বললেন যে, তিনি দুপুরে সেখানে যাবেন।’’

    সেদিন সন্ধেবেলা জ্যোতির্ময়ীদেবী প্রথম সন্ন্যাসীকে দেখলেন তাঁর বাড়িতে। সন্ন্যাসী কিছুক্ষণ আগেই টমটম চড়ে পৌঁছেছেন। জ্যোতির্ময়ী বারান্দায় বেরিয়ে দেখলেন সন্ন্যাসীকে আসন পেতে বসানো হয়েছে। তাঁকে ঘিরে বসে আছে পরিবারের লোকজন। সন্ন্যাসী মাথা নিচু করে আড়চোখে চারপাশ দেখছিলেন। ‘‘তাই দেখে আমার মেজর কথা মনে পড়ল। ও যেমন ভাবে লোকজনের দিকে তাকাত। আমার বেশ সন্দেহ হল। আমি ভাল করে লক্ষ করতে লাগলাম ওঁর চেহারা, মুখের আদল, চোখ, কান, ঠোঁট, গড়ন, হাত পা।’’ জ্যোতির্ময়ী সন্ন্যাসীকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি কতদিন থাকবেন। সন্ন্যাসী জবাব দিলেন যে, পরদিনই তিনি নাঙ্গলবাঁধ যাবেন ব্রহ্মপুত্র স্নানে। জ্যোতির্ময়ী তাঁকে কিছু ফল আর ক্ষীর খেতে দিলেন। সন্ন্যাসী ক্ষীরটুকু খেলেন। তার পর চলে গেলেন। ‘‘আমি ওঁর চলনটা লক্ষ করলাম। ঠিক যেন মেজকুমারের মতো। ঠিক একই রকম লম্বা। তবে ওকে আরও মোটাসোটা লাগল। সামান্য মোটা।’’ সন্ন্যাসী চলে যাওয়ার পর সকলে তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতে লাগল। ঠিক হল, পরদিন তাঁকে নিমন্ত্রণ করে খেতে বলা হবে। তখন দিনের আলোয় তাঁকে ভাল করে পরীক্ষা করে দেখা যাবে।

    পরদিন সকালে সাধুকে রাজবিলাসের বারান্দায় পায়চারি করতে দেখা গেল। এই রাজবিলাস নামে বাড়িটিতেই রাজপরিবারের লোকেরা থাকতেন। সাধু মেজকুমারের ঘরের খড়খড়ি ফাঁক করে ভেতরে উঁকি মেরে দেখলেন। তার পর পাশের স্নানঘরে কল খুলে হাত মুখ ধুলেন। দুপুরে এস্টেটের ঘোড়া গাড়িতে তাঁকে আবার নিয়ে যাওয়া হল জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়ি। এবার তিনি সোজা বৈঠকখানায় ঢুকে চেয়ার পেতে বসলেন। কুমারদের আর এক দিদি স্বর্গতা ইন্দুময়ীর স্বামী গোবিন্দ মুখুজ্যে সামনে চৌকিতে বসলেন আর সত্যভামা ও জ্যোতির্ময়ীদেবী বসলেন চেয়ারে। জ্যোতির্ময়ী পরে বলেছিলেন, ‘‘সন্ন্যাসী আমার ঠাকুরমাকে হিন্দিতে বললেন চৌকিতে উঠে বসতে। ঠাকুরমা উঠে চৌকির একধারে বসলেন। সন্ন্যাসী তাঁকে ধরে আরও আরাম করে বসতে সাহায্য করলেন। তার পর বললেন, ‘বুড়িকা বড়া দুখ হ্যায়।’’ ‘‘এর পর জ্যোতির্ময়ীর মেয়েদের দিকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন তাঁরা কে।

    ইন্দুময়ীর ছেলেদেরও পরিচয় নিলেন। ‘‘আমার বোনঝি কেনিকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়ে কৌন হ্যায়?’ আমি বললাম, আমার দিদির মেয়ে। বলতেই সন্ন্যাসী কেঁদে ফেললেন। গাল বেয়ে চোখের জল গড়াতে লাগল। কেনি তখন বিধবা।’’ ইন্দুময়ীর ছেলে টেবু অ্যালবাম এনে সন্ন্যাসীকে মেজকুমারের ছবি দেখাল। ছবি দেখে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। জ্যোতির্ময়ী সাধুকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তিনি তো সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী, তবে কাঁদছেন কেন? সন্ন্যাসী বললেন, ‘হ্যাম মায়াসে রোতা হ্যায়।’ জ্যোতির্ময়ী জিজ্ঞাসা করলেন ‘কীসের মায়া?’ সন্ন্যাসী কোনও উত্তর দিলেন না। এরপর জ্যোতির্ময়ী মেজকুমারের মৃত্যুর গল্প বলতে শুরু করলেন। বললেন সে দার্জিলিংয়ে মারা গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর মৃতদেহ সৎকার হয়েছিল কি না তা নিয়ে নানা কথা শোনা যায়। জ্যোতির্ময়ীর কথা শেষ হওয়ার আগেই সন্ন্যাসী বলে উঠলেন, ‘‘না, না, তাঁর দেহ পোড়ানো হয়নি। তিনি জীবিত আছেন।’’ জ্যোতির্ময়ী সোজা সন্ন্যাসীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘আপনার মুখ অবিকল আমার ভাইয়ের মতো, যেন কেটে বসানো। আপনিই কি সে?’’ সন্ন্যাসী বললেন, ‘‘ না, আমি আপনার কেউ হই না।’’

    যাই হোক, সন্ন্যাসী সেদিন জ্যোর্তিময়ীর বাড়িতে খেয়ে যেতে রাজি হলেন। ‘‘উনি খাচ্ছিলেন, আমি ওঁকে লক্ষ করছিলাম। দেখলাম প্রতিটি গ্রাস মুখে তোলার সময় ওঁর ডান হাতের তর্জনী কেমন বেরিয়ে থাকে। জিভটাও কেমন একটু বেরিয়ে আসে। ঠিক মেজর মতো। আমি ওঁর মুখের গড়ন, কণ্ঠার ওঠানামা, ভালভাবে লক্ষ করলাম। দেখলাম ওঁর চুল লালচে, চোখ কটা। ওঁর দাঁত দেখলাম অবিকল মেজকুমারের মতো— পরিপাটি সাদা, মুক্তোর মতো। ওঁর হাত আর আঙুলের নখগুলো লক্ষ করলাম, প্রতিটি নখ আলাদা করে দেখার চেষ্টা করলাম। হাতের তেলো দেখলাম। পা, পায়ের পাতা, পায়ের আঙুলগুলো। ছোট্ট থেকে অামরা একসঙ্গে থেকেছি, বড় হয়েছি। ওঁর সারা শরীর— হাত, পা, মুখ, এমনকী চোখের পাতাও, ছাইমাখা। চুল লম্বা, মুখে দাড়ি। মেজো যখন দার্জিলিং যায়, ওর দাড়ি ছিল না। কথা বলছিলেন অস্পষ্ট ভাবে। গলার স্বর একেবারে মেজকুমারের মতো।’’

    জ্যোতির্ময়ীর সন্দেহ এবার তীব্র হতে লাগল যে, এই সন্ন্যাসী তাঁর ভাই। তিনি চাইছিলেন যে, সন্ন্যাসী আর ক’দিন জয়দেবপুরে থাকুন যাতে তাঁর শরীরের দাগগুলো পরীক্ষা করানো যায়। কিন্তু সন্ন্যাসী ঢাকা ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, কিছুতেই থাকতে রাজি হলেন না।

    এর পর প্রায় দিনসাতেক সন্ন্যাসী ঢাকায় ছিলেন না। জ্যোতির্ময়ীর নির্দেশে বুদ্ধু তাঁর খোঁজ করতে গিয়ে দেখা পেল না। শোনা গেল, তিনি চট্টগ্রাম জেলার চন্দ্রনাথ তীর্থদর্শন করতে গেছেন। ১৫ এপ্রিল নাগাদ তিনি আবার বাকল্যাণ্ড বাঁধে তাঁর পুরনো জায়গায় ফিরে এলেন। সেদিন বুদ্ধু সন্ন্যাসীকে ঢাকায় তাঁদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে জ্যোতির্ময়ী তাঁর ছোট বোন তড়িন্ময়ী (ডাক নাম মটর)-কে আসতে বলেছিলেন সন্ন্যাসীকে দেখার জন্য।

    ৩০ এপ্রিল সন্ন্যাসীকে আবার জয়দেব পুরে জ্যোতির্ময়ীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। এবার বহু আত্মীয়স্বজন লোকজন এসে হাজির হল সন্ন্যাসীকে দেখতে। সন্ন্যাসী নদীতে স্নান করতে যাবেন, জ্যোতির্ময়ী তাঁকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন গায়ে ছাই না মাখেন। সন্ন্যাসী শুনলেন না, সেই ছাই মেখেই ফিরলেন। দুদিন এ ভাবে গেল। তৃতীয় দিন কিন্তু সন্ন্যাসী নদী থেকে স্নান সেরে ফিরলেন ছাই না মেখে। জ্যোতির্ময়ী পরে বলেন, ‘‘আমি ওঁর গায়ের রং দেখলাম। ঠিক যেন মেজকুমারের আগেকার গৌরবর্ণ চেহারা, ব্রহ্মচর্যের দরুন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। স্নানের পর ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল যেন অবিকল রমেন্দ্র নিজে। লক্ষ করলাম, ওঁর চোখের পাতা গায়ের রঙের তুলনায় চাপা। ঘোড়াগাড়ির চাকার আঘাতের দাগটাও দেখতে পেলাম। পায়ের পাতা আর গোড়ালির ফাটা ফাটা শুকনো কড়া পড়ে যাওয়া অংশগুলোও দেখলাম। যে সব আত্মীয়ের নাম আগে বলেছি, আমার ঠাকুরমা আর অন্য সকলেই তাঁকে দেখে চিনতে পারলেন, আমারই মতো।’’

    পর দিন ৪ মে ভোরে জ্যোতির্ময়ীর নির্দেশে বুদ্ধু সন্ন্যাসীর শরীরে কী কী দাগ আছে পরীক্ষা করতে চাইল। সন্ন্যাসী রাজি হলেন। জ্যোতির্ময়ী দেখতে চাইছিলেন যে, রমেন্দ্রর শরীরে জন্মদাগ আর অন্যান্য চিহ্নগুলো সন্ন্যাসীর দেহে আছে কি না। ‘‘কারণ বুঝতে পারছিলাম, ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুতর। শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিন্ত হওয়া দরকার, যাতে পরে মনে কোনও প্রশ্ন না ওঠে।’’ সেদিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির বাইরে ভিড় জমতে শুরু করল। জ্যোতির্ময়ী ঠিক করলেন, সন্ন্যাসীকে সরাসরি জেরা করবেন। ‘‘আপনার চেহারা আর শরীরের চিহ্নগুলো অবিকল আমার মেজ ভাইয়ের মতো। নিশ্চয়ই আপনি সে। আপনার পরিচয় কী?’’ ‘‘না, না,’’ সন্ন্যাসী ঘাড় নাড়লেন, ‘‘আমি সে নই। কেন আমায় শুধু শুধু বিরক্ত করছেন?’’ জ্যোতির্ময়ী দৃঢ় ভাবে বললেন, ‘‘আপনাকে বলতেই হবে আপনি কে?’’

    আত্মপরিচয়

    জ্যোতির্ময়ী বুদ্ধুকে বললেন বাইরে গিয়ে সকলকে জানাতে হবে যে, মেজকুমারের শরীরের পুরনো চিহ্নগুলো সব সন্ন্যাসীর শরীরে পাওয়া গেছে। ততক্ষণে বাইরে কয়েক শো লোকের ভিড় জমেছে। বেশির ভাগই জমিদারের প্রজা। সকলেই সন্ন্যাসীর আসল পরিচয় জানতে চায়। জ্যোতির্ময়ী ততক্ষণে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছেন যে, এই সন্ন্যাসীই তাঁর ভাই। তিনি সন্ন্যাসীকে বললেন যে, সকলের সামনে তাঁর আসল পরিচয় না জানালে তিনি জলগ্রহণ করবেন না। ঠিক বারো বছর আগে তারিখ মেলালে প্রায় একই দিনে, তাঁর ভাইয়ের তথাকথিত মৃত্যু হয়েছিল দার্জিলিংয়ে।

    সেদিন দুপুরে সন্ন্যাসী এসে দাঁড়ালেন প্রায় হাজার দুয়েক লোকের সামনে। ভিড়ের ভেতর থেকে প্রশ্ন এল, ‘‘আপনার নাম কী?’’
    সন্ন্যাসী বললেন, ‘‘রমেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী।’’
    ‘‘আপনার পিতার নাম কী?’’
    ‘‘রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী।’’
    ‘‘আপনার মায়ের নাম?’’
    ‘‘রানি বিলাসমণি দেবী।’’
    একজন বলে উঠল, ‘‘আরে, রাজারানির নাম তো সকলেই জানে। আপনার দাই-এর নাম বলুন।’’
    সন্ন্যাসী জবাব দিলেন, ‘‘অলকা।’’

    এই শুনে জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে জয়ধ্বনি দিতে লাগল। ‘‘জয়, মধ্যমকুমারের জয়।’’ মেয়েরা উলুধ্বনি দিতে লাগল। তুমুল হইচইয়ের মধ্যে সন্ন্যাসীর যেন মূর্চ্ছিত হয়ে পড়ার উপক্রম হল। জ্যোতির্ময়ী এবং বাড়ির অন্যান্য মহিলা চিকের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সন্ন্যাসীকে পাখার বাতাস করে মাথায় গোলাপ জল ছিটোতে লাগলেন। কয়েক মিনিট বাদে তাঁকে ছোটবোন মটরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। জনতা তাঁকে ছাড়তে চায় না, পিছু পিছু ধাওয়া করল। অনেক বোঝানোর পর তারা ক্ষান্ত হল।

    পর দিন, ৫ মে ভাওয়াল এস্টেটের ম্যানেজার নিডহ্যাম জয়দেবপুর থেকে ঢাকার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট লিণ্ডসে-কে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে একটা গোপন রিপোর্ট পাঠালেন।

    মাই ডিয়ার লিণ্ডসে,

    এখানে একটা অত্যন্ত অদ্ভুত আর আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে চলেছে যা গোটা জমিদারিতে, এমনকী তার বাইরেও, সোরগোল ফেলে দিয়েছে।

    প্রায় পাঁচ মাস আগে এক গৌরবর্ণ সন্ন্যাসী ঢাকায় এসে নদীর ধারে রূপবাবুর বাড়ির উল্টোদিকে আড্ডা গাড়ে। লোকে বলছে সে নাকি হরিদ্বার থেকে এসেছে। কিছু দিন পর তাঁকে কাশিমপুরের জমিদারবাবু সারদাপ্রসাদ রায়চৌধুরীর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। ক’দিন সেখানে থাকার পর ঢাকা ফেরার পথে অন্যান্য সাধুসন্তের মতো তিনি দু-তিন দিন জয়দেবপুরের মাধববাড়িতে কাটান। ওই সময় তাঁকে শ্রীযুক্তা জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ন্যাসীর সঙ্গে তাঁর মৃত মেজ ভাই (ভাওয়ালের কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়)-এর চেহারার মিল দেখে তিনি কান্নাকাটি শুরু করেন। এবং সাধুও কেঁদে ফেলেন। তাই দেখে বাড়ির লোকজনের মনে সন্দেহ জাগে। মেজকুমারের একটা ফটো দেখার পর সন্ন্যাসী অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তাতে সকলের সন্দেহ আরও জোরদার হয়। বাড়ির সকলে তাঁকে তাঁর আসল পরিচয় জানানোর জন্য চাপ দিতে থাকে, কিন্তু সন্ন্যাসী কোনও জবাব না দিয়ে ঢাকা ফিরে যান। এরপর কিছু দিন সাধুর আর কোনও খোঁজখবর পাওয়া যায়নি।

    এক সপ্তাহ আগের কাশিমপুরের জমিদারবাবু অতুলপ্রসাদ রায়চৌধুরী আবার সাধুকে জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেই যাবৎ সাধু সেখানেই আছেন। রোজ প্রায় শ’খানেক লোক জমছে সাধুকে দর্শন করতে। দেখার পর সকলেই মনে করছে ইনিই মৃত মেজকুমার। জমিদারির বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রজারা দলবেঁধে এসে সাধুকে দেখে গিয়ে খবর ছড়াচ্ছে যে, উনিই মেজকুমার। সাধুর উপস্থিতি গোটা এলাকায় ভয়ানক সোরগোল ফেলেছে।

    গতকাল সন্ধ্যায় কয়েকশো প্রজার প্রশ্ন আর অনুনয়ের চাপে সাধু জানায় যে, তাঁর নাম রমেন্দ্র এন রায়, তাঁর পিতার নাম রাজেন্দ্র এন রায় আর তার দাইয়ের নাম অলকা। এর পর সাধু মুর্চ্ছিত হয়ে পড়ে এবং প্রজারা উলুধ্বনি আর জয়ধ্বনি দিতে থাকে। ওই সময়ে সমবেত জনতার মধ্যে সকলেই নিঃসন্দেহ ছিল যে, এই সন্ন্যাসী মেজকুমার ছাড়া আর কেউ নন। প্রজারা প্রতিজ্ঞা করে যে, এস্টেট তাঁকে মেনে না নিলেও তারা তাঁর পাশে থাকবে। ব্যাপার গুরুতর দেখে ইন্দুময়ী ও জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়ির লোকেরা মোহিনীবাবু ও মিস্টার ব্যানার্জিকে সাধুর স্বীকারোক্তির কথা জানিয়ে দেন। ওঁরা দু’জন তখন জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়ি গিয়ে ঘটনার তদন্ত করেন। কিন্তু সাধু ওদের সঙ্গে দেখা করেননি। আজ সকালে ওঁরা আবার সেখানে যান। সাধু জানিয়েছেন যে, তিনি বিকালে দেখা করবেন। পরিবারের লোকেরা সাধুকে বারে বারে বলেছেন যে, নিজেকে মেজকুমার বলে দাবি করে তিনি বিশাল দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিচ্ছেন। তাঁর আগের জীবনের ইতিহাস পুরোপুরি না জানিয়ে তিনি বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাধুর ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা খুব প্রয়োজন। প্রতি দিন সকাল থেকে সাধুকে দেখার জন্য বহুলোকের ভিড় জমছে। উত্তেজনা এতই প্রবল যে, এখন থেকে ঠিক মতো ব্যবস্থা না নিলে শেষ পর্যন্ত বড় রকমের গোলযোগ দেখা দিতে পারে।

    আপনার আদেশের অপেক্ষায় রইলাম।

    ইতি— এফ.ডব্লিউ. নিডহ্যাম।

    এই চিঠির কপি কলকাতায় মেজরানি বিভাবতী দেবী এবং অন্য দুই রানিকেও তাঁদের অবগতির জন্য পাঠানো হয়। চার দিন বাদে ৯ মে কলকাতার দি ইংলিশ ম্যান পত্রিকায় নিম্নোক্ত চিঠিটি প্রকাশিত হয়।

    স্যার,

    গত শনিবার আপনারা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস দ্বারা প্রেরিত ‘ঢাকায় চাঞ্চল্য’ নামে একটি সংবাদ ছেপেছিলেন। সংবাদের বক্তব্য ছিল যে, এক ব্যক্তি হঠাৎ এসে নিজেকে বারো বৎসর পূর্বে মৃত ভাওয়ালের মেজকুমার বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে।

    দার্জিলিংয়ে তদানীন্তন সিভিল সার্জেন লে: কর্নেল ক্যালভার্ট স্বর্গত কুমারকে তাঁর শেষ অবস্থায় চিকিৎসা করেন। কুমারের ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন দার্জিলিংয়ের ডেপুটি কমিশনার মি. ক্রফোর্ড।

    আমি নিজে স্বর্গীয় কুমারের মৃত্যুশয্যার পাশে উপস্থিত ছিলাম এবং তাঁর বহু আত্মীয়পরিজন ও বন্ধু যাঁরা তখন দার্জিলিংয়ে উপস্থিত ছিলেন কুমারের শেষকৃত্যে যোগদান করেন। মৃত কুমারের বিধবা পত্নী ভাওয়ালের রানি আমার নিজের বোন এবং তিনি এখনও জীবিত আছেন।

    ইতি— এস এন ব্যানার্জি।

    ইতিমধ্যে জয়দেবপুরে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন জ্যোতির্ময়ীদেবীর বাড়ির সামনে উপস্থিত হয়ে সন্ন্যাসীকে দেখার জন্য ভিড় জমাতে লাগল। সাধু তত দিনে সন্ন্যাসীর বেশ ছেড়ে সাধারণ জামাকাপড় পরতে শুরু করেছেন, যদিও তাঁর চুলদাড়ি তখনও আগের মতো লম্বা। প্রতি দিন বাড়ির সামনে চেয়ারে বসে তিনি লোকেদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন, পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতেন আর মাঝে মাঝেই নাকি অশ্রু বিসর্জন করতেন। জয়দেবপুর থানার দৈনিক রেজিস্টারে এ সব রিপোর্ট লেখা হয়েছিল।—

    ১০/৫/২১: দুপুর তিনটে। গত চব্বিশ ঘণ্টা কোনও বৃষ্টি হয়নি। জয়দেবপুর রাজবাড়ির সেই সাধু যিনি নিজেকে মেজকুমার বলছেন, তিনি এখনও এখানেই অবস্থান করছেন। দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য লোক আসছে তাঁকে দেখতে। বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের ধারণা যে ইনিই মেজকুমার।

    ১১/৫/২১: জয়দেবপুরে এক সন্ন্যাসী এসেছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু লোক আসা-যাওয়া করছে তাঁকে দেখার জন্য। পনেরো আনা লোক বলছে যে, উনিই মেজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।

    ১৩/৫/২১: দুপুর আড়াইটে। খবর পাওয়া গেছে যে, আগামী রবিবার এক বিশাল প্রজা সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। যে-সন্ন্যাসী নিজেকে মেজকুমার বলে পরিচয় দিচ্ছেন, তাঁকে সেই সভায় আনুষ্ঠানিক ভাবে মেনে নেওয়া হবে।

    খবর পাকা ছিল পুলিশের কাছে । রবিবার ১৫ মে একটি প্রকাশ্য সমাবেশের ডাক দেওয়া হল জয়দেবপুর রাজবাড়ির সামনের ময়দানে। সেদিন ভোর হতে না হতে জয়দেবপুরে যেন মানুষের ঢল নামল। ঢাকা আর ময়মনসিং জেলার হাজার হাজার লোক সেখানে আসতে শুরু করল। রেল কোম্পানি স্পেশাল ট্রেন চালু করা সত্ত্বেও স্থানাভাবে মানুষ পাদানি আর জানলা ধরে ঝুলতে ঝুলতে এল। দুপুরের মধ্যে লোক জড়ো হয়ে যায় দশ হাজারের বেশি। পরে অনেকে বলে যে, সেদিনের সভায় নাকি পঞ্চাশ হাজার লোক জমায়েত হয়েছিল। ভাওয়ালের এক মান্যগণ্য তালুকদার বারিসবার আদিনাথ চক্রবর্তী বক্তৃতা দিতে উঠে মেজকুমারের মৃত্যুর ঘটনাবলি বর্ণনা করতে শুরু করলেন। বললেন, তাঁর দেহের সৎকার নিয়ে কত রকম সন্দেহ ছিল। তার পর সন্ন্যাসীর আগমন, তাঁর জয়দেবপুর যাওয়া, জ্যোতির্ময়ীদেবী ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন, তাঁর শরীরের চিহ্ন পরীক্ষা এবং শেষে সন্ন্যাসীর নিজমুখে তাঁর পরিচয় স্বীকার করা, সব প্রসঙ্গ বিশদ ভাবে আলোচনা করলেন।

    আদিনাথ জানালেন, বেশির ভাগ লোক যাঁরা সন্ন্যাসীকে দেখেছেন, তাঁদের মনে স্থির বিশ্বাস জন্মেছে যে, তিনি ভাওয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here