যদুর কপালে মধু ভোট দিয়ে যা

election feature

এত ভঙ্গ বঙ্গ দেশ তবু রঙ্গে ভরা। আর কে না জানে, সব রঙ্গের সেরা রঙ্গ হল ভোটরঙ্গ।

এমনিতে ভোট হওয়ার কথা পাঁচ বছর অন্তর। একবার জিতলে পাঁচ বছর নিশ্চিন্ত। কিন্তু ভোট তো একটা নয়। রাজ্যের ভোট, কেন্দ্রের ভোট, পঞ্চায়েতের আবার ত্রিস্তর ভোট। এর ভেতর আছে পাল্টি খাওয়া, সরকার পড়ে যাওয়া, জেতা লোকের মরে যাওয়ার ফলে উপনির্বাচন, ভোটের দুর্নীতি প্রকাশ্যে এলে রি-পোল। ফলে সারা বছরই একটা ভোট ভোট হাওয়া বাজার গরম করে রাখে।

বাঙালি ফুলশয্যার থেকেও বেশি উত্তেজিত হয় ভোট এলে। আলোচনা, প্রচার, দেওয়াল দখল এবং লিখন, পথসভা, টিভিতে কোন্দল, পাল্টা কোন্দলে বাঙালির রক্তচাপ হুহু করে ওঠে আর নামে।

এই জাতটা সবই জানে, তন্মধ্যে রাজনীতি সে সবচেয়ে বেশি ভাল জানে। তার হাতের কাছেই রয়েছে সুমহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দীর্ঘ ঐতিহ্যমণ্ডিত ইতিহাস। ট্র্যাজেডির নায়ক সুপার হিরো সুভাষ বোস থেকে শুরু করে সিঁড়িভাঙা অঙ্কের গুরুদেব প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি পদটিও এই প্রজাতির দখলে। এই অগাধ জ্ঞান এবং ঐতিহ্য সে কী ভাবে জাহির করবে, কী ভাবে নির্গত হবে তার রাজনৈতিক পাণ্ডিত্য , তার রাস্তা সারা বছর বাঙালি সেই ভাবে খুঁজে পায় না। ক্রিকেট সবাই খেলে না। ফুটবলে সবার আগ্রহ নাইই থাকতে পারে, কিন্তু ভোট এমন উৎসব যা সবাইকে ছোঁবে, তাতাবে এবং মাতাবে। কোন কেন্দ্রে কে প্রার্থী, সেখানে কাকে না দিয়ে কাকে দিলে জিত অনিবার্য, সেটাও চায়ের দোকানের বাঙালি, সংশ্লিষ্ট দলের সম্পাদকমণ্ডলী বা কার্যনির্বাহী সমিতির চেয়ে বেশি জানে।

প্রাক ভোটপর্বে টিকিট পাওয়া না পাওয়ার খেলা চলে সারাবেলা। নমিনেশনের দিন একটা মক্‌ ফাইট হয়। তাতেও প্রবল উত্তেজনা থাকে সমর্থকদের। আবির মাখা মাথার ভিড় দেখে বোঝা দায় ভোট না হোলি।

ইতিমধ্যে প্রশাসনের ঘুম ছোটে। ভোটের আগে কাকে কাকে এলাকা ছাড়া করতে হবে, কাকে এলাকার ভেতর আনতে হবে, কাকে কাকে কাস্টডি করতে হবে, কার কাছে ক’পিস ওয়ান শটার, কে কে নাইট্রেট নিয়ে ঢুকছে রাত দুপুরে , কার কার সিঁড়ির নিচে পেটি পেটি বোমা, বার কর, ধর, পাকড়াও, ধরে ছেড়ে দাও, ছেড়ে আবার ধর, এইসব কাজে পুলিশকে মেতে উঠতেই হয়। আর সিভিল প্রশাসন মেতে ওঠে যজ্ঞিবাড়ির রান্না সামলাতে।

সে এক ধুন্দুমার। অফিসের রাজনৈতিক ট্রেড-ইউনিয়নগুলোর ঘুম যায়। তারা কেবলই অঙ্ক কষে কোন সমিতির কোন লোককে ‘কী-পয়েন্টে’ বসাতেই হবে। ক্ষমতাসীন দলের চাই সব কটা ‘সেল’-এর চাবিকাঠি। ইভিএম থেকে পোস্টাল ব্যালট। প্রিসাইডীং থেকে গ্রুপ ডী, পুলিশ পোস্টিং থেকে বুথের এজেন্ট সব জায়গায় হিসেব কষে পা ফেলতে হয়। নাহলে জেতা নাকি অসম্ভব। ভোট জেতায় ভোটারে — এই তত্ত্ব যে কত অসাড় সেইটা এই আমলাতন্ত্রের ভেতর একবার ঢুকলে টের পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বিরোধী রাজনীতির কর্মচারীদের এই সুযোগে কতটা বাঁশ পেছনে দেওয়া যায় তারও অঙ্ক আছে। দাও ঠেলে অতিস্পর্শকাতর বুথে ওদের। তেল কমে যাবে। দাও ঠেলে ভেহিকেল সেলে। ড্রাইভার খালাসির বাছাই খিস্তি খেয়ে পেট ঢাক হয়ে থাকবে পাঁচ বছর। আর নিজেরা থাকো পোস্টাল ব্যালটে। কোন কোন কর্মচারী আমাদের ভোট দিল না জলের মতো টের পাওয়া যাবে। নিজেরা থাক ইভিএম-এ। কারচুপি মেসিনে হয় কী না হয় সে তো তর্কে বহুদূর। কিন্তু সিল নেই, ব্যালট পেপার একাউন্ট নেই, ভাঙা মেসিন জমা পড়েছে, এইসব তথ্য সময়মতো চেপে যেতে হলে দলের ডেডিকেটেড ক্যাডার লাগে। সেইখানে তো যে সে কর্মচারীকে ডিউটি দেওয়া চলে না। তারপর আছে স্ট্রং রুম। সেখানে স্ট্রং ক্যাডার না দিলে হ্যাপা সামলাবে কে।

কাউন্টিং হল-এ আরও চাপ। সেখানে আরও কমিটেড মেম্বার চাই। বিরোধী এজেন্টকে কী ভাবে ঘাড়ধাক্কা দিতে হবে তাই নিয়ে গোপন ক্লাস হয়। সেই সব তথ্য চেপে রাখবার মতো সাধনা চাই।

বেশির ভাগ মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, যাদের রাজনীতির কাছে কোন টুপাইসের ধান্দা নেই, চাকরিজীবী, শিক্ষক, এঁরা চিরকাল চাঁদা দিয়ে খালাস। সক্রিয় দলদাস না হলে ভাল ডিউটি পাওয়া যায় না এঁরাও জানেন। কিন্তু বুকের আঁচল ফেলে দিয়ে নির্লজ্জ ভাবে তেল দেওয়ার রুচি বা মানসিকতা সবার থাকেও না। এঁরা জানেন তাঁদের বুথে যেতেই হবে। একটাই প্রার্থনা, খেতে পাই আর না পাই, বুথে ইলেকট্রিক কানেকশন যেন থাকে আর থাকে একটা পটিঘর। হায়, এই সামান্য দুটো জিনিস আজ অবধি, এই হাইটেক-স্যাভি আমলেও কেউ পোলিং পার্টির জন্য নিশ্চিত করতে পারল না। তাই ভোটের ডিউটি থেকে নাম কাটানর জন্য আরেক রঙ্গ শুরু হয়। যার যেখানে ‘ক্যাচ’ সর্বশক্তি দিয়ে সে সেইখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নেতার কাছে তো অত সহজে পৌঁছন যায় না। যে যাকে পারে ধরা-করা শুরু করে দেয়। এমনও হয়েছে , পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দার সঙ্গে ধাক্কা লাগলেও কথা হয় না, অথচ যেই শোনা গেল উনি কালেক্টারির মাঝারি মাপের সায়েব ওমনি চিকেন কারি, চাউমিন আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। বার্থ ডে কারও এসে গেল তো ভাল, না এলে বানিয়ে নাও। নেমন্তন্ন করে গলা অবধি খাইয়ে তারপর কাজের কথাটি পাড়ো,

-বলুন তো, সারা বছর ম্যানেজারি করে রাত নটায় ব্র্যাঞ্চ ছাড়ছি রোজ। তার মধ্যে প্রিসাইডিং? আবার দু্দিন ট্রেনিং? একটু দেখুন না। ও হ্যাঁ, মিনহোয়াইল একটা পার্সোনাল লোণের এপ্লিকেশন করে দিন। লাস্ট টু ইয়ার আই টি রিটার্ন, লাস্ট পে স্লিপ আর আধার। সাত দিনে করিয়ে দি। একটু পাটায়া ঘুরে আসুন ফ্যামিলি নিয়ে।

শিক্ষকরা (নেতৃত্বে নেই যারা) চিরকাল নিরীহ হিসেবে খ্যাত। তারা ঝুট ঝামেলাবিহীন জীবন কাটাবেন বলেই এই পেশায় এসেছেন। হেডমাস্টারি পেয়েও রিফিউজ করেছেন কেউ কেউ। শনিবার হাফ ডে-তে ইস্কুল যেতে ছাত্রদের চেয়েও নারাজ। তারা সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন এই বদখদ রঙ্গের পৌরোহিত্য করতে।

কেউ কেউ আকুল হয়ে নাম কাটাতে ছোটেন সদরে, মহকুমায়, ব্লক অফিসে। সেখানে কেরানিবাবুদের পান তামাক দেন। একটা সুতোর মতো পরিচিতি খুঁজে পেলেই অর্ধেক স্বস্তি পান।

গম্ভীর হয়ে কেরানিরা বুদ্ধি দেন। কেউ বলেন, মেডিকেল দিন। কাজও হল। বেশ কয়েক দশক ডাক্তারের ব্যবসা বাড়িয়ে দিল এই টেকনিক। হঠাৎ নির্বাচন কমিশন দেখল মেজরিটি মেডিকেল দিচ্ছে। তখন আদেশ হল, জেলার সরকারি ডাক্তারের সামনে হাজির হতে হবে। উনি বললে তবে রেহাই। নাহলে সব গেল।

কেউ বলল, ছেলের পইতে, মেয়ের বিয়ে, মায়ের শ্রাদ্ধ দেখাও। সেখানেও ছাপান কার্ড জমা দেওয়ার এবং বিডিওকে তদন্ত করবার নির্দেশ এসে গেল। ভরাডুবি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় দেখালেন গত ভোটে, এক আপার ডিভিশন ক্লার্ক। তিনি ভোটের আগের দিন পোলিং মেটিরিয়ালস নেওয়ার সময় রিকশা করে ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারে এলেন হাজিরা দিতে। ডান পায়ের কুঁচকি অবধি বিশাল প্লাস্টার। রিকশাওয়ালার কাঁধ ধরে কোনমতে নামলেন। মাল দেওয়ার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক হতভম্ব হয়ে বললেন, ‘আহা কী করে এমন হল’ ‘বাথরুমে কাল রাতে পড়ে গিয়ে স্যার’ ; ‘না না আপনি যান, বাড়ি চলে যান। আমি রিজার্ভ থেকে পাঠিয়ে দেব কাউকে। সাবধানে যাবেন।’

বাড়ি ফিরে ঝোলা থেকে কাঁচি বার করে কচকচ করে কাটলেন প্লাস্টার। বললেন, ‘গিন্নি চা দাও। সাতশ টাকা পেয়েছিলাম। দেড়শ গেল। তাও তো সাড়ে পাঁচশ নিট লাভ।’

2 COMMENTS

  1. ওফফফ ! কি লেখা বস ! হার্টের সেলাই ছিঁড়ে যাওয়ার জোগাড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here