‘জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা’

ভারি ব্যাজার মুখ মায়ের। পতিদেব সংসারে চির উদাসীন, যত ল্যাঠা তাই মায়ের। দশ হাতে সামাল দিলেও বচ্ছরকার এই সময়টা যেন পেরে ওঠে না। বাপের বাড়ি যাবার জন্য তৈরি হওয়া কি টুসকি মেরে হয় না কি! সব গোছতাছ করে বুঝিয়ে রাখা, বাক্স-প্যাঁটরা বাঁধা আরও কত কী! ব্যাজার মুখের কারণ হল গিয়ে…  

মা আজ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে গেছিল একটু সাজুগুজু করতে। ছোকরাটা নাপিতের কাজকম্মো করে ইদানিং বেশ নাম করেছে। অনেকদিন ধরেই মা-র কাছে ঝুলোঝুলি, একটিবার যদি তার দোকানে গিয়ে মা পায়ের ধুলো দেয়। কার্তিক একটু খুঁতখুঁত করছিল, ওর গোঁফটা ঠিকঠাক করতে পারবে কি না। বাবা-বাছা বলে মা তাকে রাজি করায়। না-হলে সবাই আলাদা আলাদা জায়গায় গেলে টাইম ম্যানেজমেন্টের যে বারোটা!

গিয়ে তো পৌঁছোলো মায়েরা। কী খাতির কী খাতির। ডাবের শরবত, রাতাবি আর স্পেশ্যাল কাঁচাগোল্লা এসে গেছে। আপ্যায়নের চূড়ান্ত। নাপিত ছেলেটি নিজে দেখভাল করছে। কার্তিকের চুলের কার্লি-ভাবটা আরও কিউট কীভাবে করা যায়, সে নিয়ে রীতিমতো পরীক্ষা চলছে। গণেশের দাবি, তার ইঁদুরটির একটু হৃষ্টপুষ্ট লুক এনে দিতে হবে। সারা মঞ্চে ওকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। সরস্বতী ত্বকের যত্ন নিচ্ছে আর লক্ষ্মী হরেক শেডের লিপস্টিক ট্রাই করছে। সরস্বতী আর লক্ষ্মী এভাবে প্রথমে বাজিয়ে নিচ্ছে, আদৌ এখান থেকে ফাইনাল মেক-ওভার করাবে মামার বাড়ি যাবার আগে, না অন্য কোথাও থেকে।

নাপিত ছোকরার দোকান বেশ টিপটপ। এসি নিঃশব্দে হিমশীতল করে রেখেছে পরিবেশ। মায়ের আপন বাহন সিংহর একটু চোখ লেগে এসেছে। আহা, খুব দৌড়ঝাঁপ যায় ওর। মায়ের মন বলে কথা। মাও না নড়ে চুপ করে বসে আছে, নড়লেই বেচারার ঘুম ভেঙে যাবে যে! ততক্ষণ বাকিদের মিটুক। নাপিতের একজন কাছের বন্ধু এসেছে, ছবিটবি আঁকে। সে একখান ছবি পটাপট এঁকে দোকানের বাইরে যেই না খাড়া করে সাজিয়েছে, ব্যস…

শেষে পিছনের গোপন পথ ধরে নাপিত আর তার বন্ধু ওদের হুজ্জুত থেকে সরিয়ে কৈলাসের বিমানে তুলে দেয়। বাড়ি ফিরে মায়ের মুখ ব্যাজার, মেজাজ সপ্তমে।

যত দোষ তোমার, বুঝেছ?

হুজ্জুতের খবর পেয়েছিল আগেই, বাড়ি ফিরেছে সকলে জেনে ভোলা মহেশ্বর নন্দী-ভৃঙ্গীদের সব জিনিসপত্তর বেটেবুটে তৈয়ার রাখতে বলে সবে ঘরে ঢুকেছে, বোমাটা আছড়ে পড়ল।

কে-কেন, আ-আমি কী করলাম! একটু যেন তুতলে ওঠে মহাদেব।

আকাট, গোঁয়ারগুলোকে সুস্থ, যুক্তিবাদী আর একটু পরমতসহিষ্ণু আর কবে করবে তুমি? সব তো ‘তুমি’ গড়তে গিয়ে বাঁদর হচ্ছে।

সে দায় তো আমরা কবেই সরোকে দিয়েছি। কী রে, বল না মাকে, বাঁচা আমাকে!

দূর আমি জানি না। বলে দিয়েছিলাম, ছাত্রাণাং অধ্যয়নং তপঃ, এখন ওরা জুড়ে নিয়েছে, সঙ্গে নিজের আখেরটাও মাপো। রাজনীতি-সচেতন হতে বলেছিলাম, জড়িয়ে যাচ্ছে গোছানোর রাজনীতিতে। মাথায় মেদ জমছে। তৈরি হচ্ছে হোঁক্কড়ের দল। দাদা তো দেখেই না আর এসব। বুদ্ধি-ঋদ্ধি-সিদ্ধি সব ভুলে গেছে ও।

হলঘরের এক পাশে বসে কিছু লিখছিল গণেশ। তাকে নিয়ে কথা হচ্ছে বুঝে, গলা খাঁকারি দেয়, আবার আমায় কেন টানছিস? ওরা তো আমায় শুধু ব্যবসা বাণিজ্য এসবেই ডাকে। হ্যাঁ, হালে কয়েক বছর অবশ্যি চতুর্থীতেও ধুমধামিয়ে ডাকছে। তবে মাঝে যেভাবে আমায় ব্যবহার করেছিল ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা চিটফান্ডগুলো, আমার ভালো লাগেনি। অপমানিত হয়েছিই বলা ভালো। আজ পুজো করল, কাল উলটে দিয়ে সাধারণ মানুষের রোজগারের সঞ্চয়কে যেভাবে কলা দেখিয়ে গেছে!

সব নক্ষত্রদের কথাবার্তার মধ্যে নিজের নাম শুনে ঘোমটাটা আরেকবার করে টেনে নেয় কলা-বউ। 

লক্ষ্মী মোবাইল সেলফি মোডে রেখে নিজেকে বিভিন্ন প্রেক্ষিতে দেখছিল। কখনো কখনো ক্লিকও করছিল স্টিলশট। ভিডিও রেকর্ডিং করবে ভেবেও করল না। চূড়ান্ত গোপন কথাবার্তা এসব। যদি নেটে গিয়ে ভাইরাল হয়ে যায়। সরস্বতী বয়সে ছোট হলে কি হবে, বরাবরের পাকা। ফাঁক পেলেই মোবাইলটা নিয়ে খুটুসখাটুস করে। এতক্ষণের কথাবার্তায় এবার ওর নিজের ঢোকার সময় এসেছে। তাই স্ক্রিনের ‘ব্যাক’-এ নাগাড়ে আঙুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে সব কিছু থেকে বেরিয়ে স্ক্রিন লক করে বলল, ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ’ যেমন বলেছে ওরা, আবার বলেছে ‘লক্ষ্মী বড় চঞ্চলা’। এমন ডুয়ালিটি যখন আমার চরিত্রে শুরু থেকেই দাগিয়ে দিয়েছে, তখন তার ম্যাও তো সামলাতেই হবে তাদের। তবে যাই বল মা, স্পনসরের এমন ঢল কিন্তু আমারই ইশারায়। এবারে রাজ্যজুড়ে বারোয়ারিগুলোই শুধু ধর যদি, টোটাল বাজেট কত জান তো?

কত শুনি?

শুনে মায়ের আক্কেল গুড়ুম! ভোলেবাবা অন্যকে পার করবে কি! সংখ্যাটা কল্পনা করতে গিয়ে নিজেই বাড়ি থেকে পগার পার। ধ্যাত, লক্ষ্মীটার যত জল মেশানো হিসেব। আচ্ছা, নেশাটা চড়ে যায়নি তো। তা-ই হবে, শোনার ভুল।

থমথমে সিচুয়েশনই তো কার্তিকের এন্ট্রি নেওয়ার জন্য আদর্শ — চুলটার বারোটা বেজে গেল মা। দেখলে তো, আমি আগেই বলেছিলাম। ধর্মের নামে কী যে চলে মর্ত্যের কিছু গাম্বাটদের মধ্যে, আর তোমরা সব জেনেও কেন যে মুখ বুজে থাকো, দেখ খেসারত দিতে হয় এইসব চুলদের।

সত্যিই, কার্লি করতে গিয়ে ইনকমপ্লিট চলে এসে আগে রগড়ে ধুয়েছে বেশ করে। এখন কেমন ম্যাগির মতো লাগছে এক মাথা চুল। গোঁফ তো বিলকুল ট্যারাব্যাঁকা। কুলুঙ্গিতে শাঁখটা রেখে মা ওর দিকে এগিয়ে যায়, ফাঁকা হাতটা রাখে ছোটসোনার পিঠে, রাগ করিস কেন?

রাগ নয় মা, আমায় বাদ দাও। তোমরা ঘুরে এসো। আমি এখানেই বেশ আছি। আর কথা তো হয়ই দাদু-দিদিমাদের সঙ্গে, হামেশাই।

তা আবার হয় নাকি! বিনা-কার্তিক দুর্গাপুজো। সেতো ইয়ার্কির কালীপুজোরও এককাঠি বাড়া হবে!

কার্তিক ঝাঁঝ বাড়ায়, সে তোমরা ভাবো। এমনিতেই আমার ‘হ্যাংলা’ বদনাম আছে। এবার সেই বদনাম ঘুচিয়ে ছাড়ব।

সরস্বতী বলে, সেই ভালো মা, তুমি দিদি আর দাদাকে নিয়েই এবার ঘুরে এসো। আমিও এবার যাব না। আমি আর কাতু এক সেটে পড়ি কিনা। এবার কাতু না গেলে তোমার ডাঁয়ে-বাঁয়ের ব্যালান্স বিগড়ে যাবে, ভেবে দেখ। আমি না গেলে সব সমান সমান। একদিকে দিদি, আরেক দিকে দাদা। যুগান্তকারী ব্যাপার হবে কিন্তু।

বোনে বোনে যত ঝগড়া তত ভাবও। সরস্বতী যাবে না শুনে লক্ষ্মী কায়দা করে ফ্যাকড়া তোলে, স্পনসররা কিন্তু চটে যাবে মা। সকলকে ধরেই তো বাজেট বানানো হয়েছে।

কার্তিক বলে, এক কাজ কর মা। তুমি বিশ্বকর্মাদাকে স্টে-অর্ডার পাঠাও। এবার তো ওর পুজোর ঠিক আট দিন পরই তোমার ষষ্ঠীপুজো। বেশিদিনের ব্যাপার নয়। এর মধ্যে হাতি ফিরে আসুক ঘুড়ি-লাটাই-ছেনি-হাতুড়ি নিয়ে, আর আমি ময়ূরকে পাঠিয়ে দিই তীর-ধনুক দিয়ে। আমার বদলে বিশ্বকর্মাদা প্রক্সি দিলে যারা ধরতে পারবে, তেমন সত্যিকার ধর্মপ্রেমী মানুষ এখন কমতির দিকে। সব তো হাওয়ার পিছনে ছুটছে।  

গণেশ শুঁড় নাড়িয়ে বলে, উপায় নেই রে ভাই। ওর চারটে হাত। কম করে ষষ্ঠী থেকে দশমীই যদি ধরি, দুটো হাত ঠায় পাঁচ দিন লুকিয়ে রাখা যায় না কি? ধরা পড়লেই সব রগচটাদের দল, কী করতে কী করে। এভাবে জানা বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না।

মা কার্তিকের চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলল, কাতুই যাবে। একটু রেগে গেছিল। তা বাপু রাগবারই কথা। এখন ও সব বুঝেছে। ও-ই যাবে।

তারপর লক্ষ্মীর দিকে ফিরে বলে, হ্যাঁরে এত বাজেট, এত খরচ শুনেই আমার শরীর কেমন করছে। সরকারকে বলে কিছু করা যায়? ধর ওরা তো বাজেট বলে দিয়েছে প্রকাশ্যে। এবার সরকার আইনী পথেই সর্বসম্মতিতে বাজেটের উচ্চসীমা দিল বেঁধে, তার ওপরের যা কিছু তা সরকারকে দিয়ে দিতে বলল। আর তা দিয়ে ব্যবস্থা হল পিছিয়ে পড়া মানুষের আরেকটু ভালো থাকা।

মা তুমি এই শেষ রাতে অদ্ভুত সব আইডিয়া দাও বটে। দেখি কতদূর কী করা যায়। তবে ওই শারদ সম্মান কমিটিগুলোর চাকেও ঢিল মারতে হবে এবার তোমায়। গাইড করে দাও, কাজ যা করার কাতু করবে। জোয়ান ছেলে, হাতে তির ধনুক।  

দেবাদিদেব ঠেক থেকে ফিরে জানালেন, তরী প্রস্তুত। তোমরা এবার রেডি হয়ে নাও। আর মিনিট কুড়ি পরেই তো ‘ইয়া চণ্ডী’ কোরাস গলার মিলিয়ে যাওয়া খেই ধরে উত্তর কলকাতার সেই বাবু মানুষটি একটিপ নস্যি নিয়ে হাঁক দেবেন, ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির…।’       

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.