গলনাঙ্ক

286

এর পেছনে আছে অত্যন্ত পাতি একটা শরীরত্বত্ত | জৈব শরীর দ্বারা ব্যথা, যন্ত্রণা গৃহীত হয়, শরীর আসলে ব্যথা‚ যন্ত্রণা, আঘাতের এক অতি উচ্চমানের রিসেপটর | একটা বাঘ যখন একটা হরিণকে তাড়া করে তখন হরিণটা দুটো কারণে ছোটে, দুটো ভয়ে, একটা হল মৃত্যুভয়, অন্যটা ব্যথা পাওয়ার ভয়! সেটা কি কম ভয়? সব আঘাতই যে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাবে তা তো নয় | আহত হওয়া, জখম হওয়া, ক্ষত, রক্তক্ষরণ, প্রহার — আবার দ্যাখ, আমাদের নিজেদের শরীরও তো আঘাতের ভয় দেখিয়ে, মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে আমাদের শাসন করে, করে না বল? পাহাড় থেকে মাঝে মাঝে শূন্যের মধ্যে কি ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করে না আমাদের্? শরীর অ্যালাউ করে না | আবার হয়তো তুই পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিতেও চাইছিস না, খুব সাবধানে চলাফেরা করছিস যাতে হোঁচট খেয়ে পায়ের নখটাও উপড়ে না আসে তাও হয়তো ওয়ান ফাইন মর্নিং তুই জানতে পারলি তোর শরীর তোর ভেতর অদ্ভুত একটা ফুল ফুটিয়েছে, লাল টকটকে দগদগে জীবাণুমুক্ত একটা ঘা! মরবি কি মরবি না পরের কথা, যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেলি তুই, মুখ থেকে লালা ঝরতে লাগল ব্যথায় | মেরেছে বলে চিত্রকের ওপর রাগ করিস না সাহানা, তোর শরীরটাই আসলে বাইরের সমস্ত অত্যাচারকে হাওয়া দেয়, উৎসাহ জোগায় | এখন আমি খুব বুঝতে পারি জানিস শরীর-সহ স্বাধীন হওয়া যায় না! আর আর্বাণ প্রেম জিনিসটা কি বলত — একসঙ্গে সময় কাটানো, অনেক খাওয়া-দাওয়া করা, প্রচুর সেক্স করা তারপর মারপিট | এটা এরকমই এখন | ভেবে লাভ নেই!

‘খিল্লি করছিস?’

‘না, আমার সত্যি খারাপ লাগছে তূনীরকে মেরেছি বলে!’

‘তুই মেরেছিস আর আমি মার খেয়েছি | দুটো আলাদা ব্যাপার |’

‘চিত্রক ফোন করেনি?’

‘ না! করলেও ধরব না | ওর সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখব না, আমি আর পারছি না চিত্রকের ট্যানট্রামস সহ্য করতে | মুখের দাগ না মেলানো অব্দি এখন বাড়িতে বসে থাকতে হবে আমায় |’

‘কাল আমাদের সঙ্গে চল, মধুজার বয়ফ্রেন্ডের বাড়ির ছাদে দোকে গেট টুগেদার হচ্ছে | ভোরবেলা রিপনরা তুলতে আসবে আমাকে |’

‘নাহ, কোথাও যাব না, বাড়িতে ঘুমোবো পড়ে পড়ে!’

‘তার মানে তুই অপেক্ষা করবি চিত্রক আসার | চিত্রক আসবে, ক্ষমা চাইবে, একটা কান্নাকাটি হবে, তারপর আবার তুই ফিল করবি তুই একটা সম্পর্কে আছিস!’

‘তুই চাস না আমি কোনও সম্পর্কে থাকি গর্বী?’

‘আমি বোধহয় এটা শুধু চাই যে তুই ভালো থাক |’

‘সম্পর্কে না থাকা মানে ভীষণ হাল্কা হয়ে থাকা, এত হাল্কা যেন উড়ে যাচ্ছি, উড়ে যাচ্ছি, ল্যান্ড করতে পারছি না!’

(যদি এটা দোলের আগের রাত না হয়ে যে কোনও একটা দিনের, বেলা একটা দেড়টা হত তাহলে ধরেই নেওয়া যেত যে সে এখন গোলপার্ক থেকে গড়িয়াহাটের দিকে হাঁটছে | ফুটপাত ধরে হাঁটছে | একটা অতিকায় ঢেউইয়ের মতো তার কাঁধের পাশ দিয়ে উঠে গেছে ফ্লাইওভারটা | কিন্তু সে সেটাকে ঢেউ ভাবছে না, তার নিচে ছায়া, ছায়ায় রাখা গাড়ি, বেঞ্চগুলোয় কিছু মানুষ পা ঝুলিয়ে বসে, খবরের কাগজ পড়ছে বা সিগারেট খাচ্ছে, নিরাসক্ত চাহুনি, একটা বড় ভিখিরির দল পাঁউরুটি খাচ্ছে বৃত্তাকারে বসে, কুল আর আমসত্ত্ব বিক্রি করছে কেউ, ডান হাতের ফুটপাতের ফল বিক্রেতারাও ব্যস্ত ও মুখর | এই সময়টায় সজাগ ভিড়ের বদলে অন্যমনস্ক কিছু মানুষ হেঁটে যাচ্ছে তার সঙ্গে বা তার উল্টো মুখে এবং স্কুল্-কলেজের মেয়েদের তুলনায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই নারীর সংখ্যাই এখন অধিক এই চত্বরে | তারা এগোচ্ছে‚ থামছে, দরদাম করছে জিনিসপত্রের, কিনছে বা কিনছে না | এই ফুটপাতে পুরনো বই, ম্যাগাজিনের অনেক ছোট ছোট স্টল | আর একটু এগোলে যে গলিটা পড়ে সেখানেও অনেক বইয়ের স্টল আছে এরকম | স্টলগুলো বই বিক্রিও করে, ভাড়াও দেয় | সে এই স্টলগুলোর উদ্দেশ্যেই হাঁটছে | কোনও বই কিনতে বা ভাড়া নিতে যাচ্ছে না সে, বই পড়ার অভ্যেস নেই তার, কোন ভারী বা হাল্কা বিষয় নিয়েই চর্চার ইচ্ছে নেই, কৌতুহলও নেই | অন্যের চিন্তার ভার নিজের ওপর পড়তে দেয় না সে | সে শুধু ম্যাগাজিন পড়ে, ম্যাগাজিন ভাড়া নেয় | পাঁচ, দশ, পনেরো, কুড়ি বছরের সব পুরোনো ম্যাগাজিন, ইংরিজি কিংবা বাংলা, সেই সব ম্যাগাজিনে এমন সব কথা লেখা থাকে যেগুলো হলুদ হয়ে, অতীত হয়ে ম্যাগাজিনের পাতা থেকেও ঝরে গেছে যেন, এমন সব ছবি থাকে যার সঙ্গে আজকের জগতটার কোথাও কোনও মিল নেই | ছবির মানুষগুলো অনেকে মরেই গেছে বা তাদের আর অনুসন্ধান পাওয়া যায় না! কিংবা কেউ খোঁজেও না তাদের | সে এইসব পুরোনো ম্যাগাজিন উল্টে পাল্টে দেখে তারপর আবার নতুন করে পুরোনো ম্যাগাজিন সংগ্রহ করতে আসে | এখন তার হাতের বিগশপারে ফেরত দেওয়ার মত অনেকগুলো ম্যাগাজিন, তার মধ্যে একটা তিরিশ বছরের পুরোনো ডেবনিয়ার-ও আছে | যেহেতু সে কোন কিছুই তলিয়ে বুঝতে চায় না সেহেতু বাইরের পৃথিবীটার সঙ্গে ম্যাগাজিনের ভেতরের সময়ের পার্থক্যটাও প্রতিভাত হয় না তার চোখে | বস্তুত সে আজকের দিনটার সঙ্গে কালকের দিনটার বদলটাও বিন্দু বিসর্গ টের পায় না |

সে আসলে একজন খুব হালকা মানুষ, হালকা তার চলা ফেরা, হালকা তার কথা বলা, বোঝাপড়াগুলো অলস, অজ্ঞানতিমিরান্ধ, হালকা তার তাকানো, অভিমত ও অভিলাষগুলো, সানুভবতাই নেই তাতে, হালকার হালকা রং পাছন্দ তার, ঠিক পছন্দ কিনাও বলা মুসকিল, তুলে নেয় হাতে বা উঠে আসে নিজেই, কোটা আর শিফন শাড়ি তার বাস, গাড়স্থ জীবনের দায়িত্ব, কর্তব্য, নিপুণতা ও অনুরূপ — বালি বালি যেমন |

যেহেতু এই সময় গড়িয়াহাট সামান্য হালকা, হালকা থাকে, বাস অটোগুলো একটুখানি খালি খালি, হন্তদন্ত মানুষের দুর্ভেদ্য জঙ্গল মনে হয় না জায়গাটাকে সেহেতু এই সময়টাই তার ভীষণ হালকা, নির্ভার, বৈচিত্রহীন, লক্ষ্যহীন বিচরণের পক্ষে অনুকূল | বৈচিত্র্যহীন বা লক্ষ্যহীন কিনা এও অবশ্য জানা নেই তার | সে শুধু ভেতরে ভেতরে আরও মৃদুতার দিকে, আরও লঘিমার দিকে যেতে চায় | মনন দিয়ে নয় — যেন যেতে চায় ইন্দ্রিয়বশ হয়ে | কুকুরের মত গন্ধ পেয়ে চলে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায় এই যাওয়ার অথচ তাতে সারমেয় সুলভ কুশলতাও থাকে না |

গড়িয়াহাটে এখন রৌদ্রের লীলা খেলা চলছে | সূর্য ক্রমাগত ব্যক্ত করে চলেছে নিজেকে যত রকমভাবে পারে যেন এই জেনে যে তার কোনও উত্তরাধিকার নেই! চিন্তাশীল মানুষের যেমন যে কোনও ভাল জিনিস দেখলে নিরাপত্তাহীনতার বোধ জাগে, মনে হয় এ বেশিক্ষণের নয়, ধরে রাখার নয়, ফলে ভোগে অস্বস্তিতে, এই রোদ্দুর প্রায় সেই রকম অস্বস্তিকর | কিন্তু তার হালকা মনে কোনও উচাটন তৈরি করে না এসব | সে পা ফেলতে ফেলতে এগোয় এবং তন্মুহূর্তে স্থির করে পা-টা কোথায় ফেলবে, এইভাবে সে ম্যাগাজিনের স্টলে যেতে যেতেও চলে যায় হিন্দুস্থান পার্কে, ঢুকে পড়ে বড় একটা বাথ-ম্যাট, একটা চান্দেরি শাড়ি, হার্বাল শ্যাম্পু, গ্রিন টি আর অর্গানিক ডাল কিনে ফেলে | এগুলোর কোনওটাই তার কেনার দরকার ছিল না তবু কেনে | তারপর বাড়ির পথ ধরে, সে জানে তিনটে বাজতে না বজতেই কোলাহল বাড়বে গড়িয়াহাটের, ঝিমিয়ে পড়া বাস, অটোগুলো আবার জোরে জোরে ছুটবে, বহু মানুষ, বহু গাড়ি-ঘোড়ায় ভরে উঠবে চারপাশ | এই চাঞ্চল্য দেখা দেওয়ার আগেই সে ঢুকে পড়বে তার সাউথ এন্ড গার্ডেন রোডের ফ্ল্যাটে | রিয়ার পোর্শন ফ্ল্যাট বলে রাস্তার আওয়াজ নেই | ঝুলন্ত বারান্দায় বসলে দেখা যায় গাছ, গাছালি, পড়ন্ত রোদের সঙ্গে মিশে যায় পাখির কিচির-মিচির | সে এই ব্যালকনিতে এখন চা নিয়ে বসবে | খুব হালকা লিকার, অল্প গরম!

তাকে নিয়ে লেখাটা এভাবেই এগোতে থাকবে, সে এত হালকা বলে তাকে নিয়ে সামান্য একখানা বর্ণনাধর্মী লেখাও লিখে ওঠা কঠিন | কিন্তু সে এত হালকা কেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে সেই সব জীবনের দিকে যা তার হালকা জীবনের সঙ্গে কন্ট্রাস্ট! এবং তখনই বোঝা যাবে তার কোথাও কোনও সম্পর্ক নেই বলে এত নির্ভার সে! সম্পর্ক নেই তাই ভয় নেই! ভয় নেই যন্ত্রণা নেই! মিথ্যা নেই, আক্ষেপ, হতাশা, ক্রোধ, অতৃপ্তি লজ্জা, ঘৃণা, অবিশ্বাস, ষড়যন্ত্র কিছু নেই! সম্পর্ক নেই, মানুষের সঙ্গে তার আছে শুধু যোগাযোগ, সে একটা অত্যন্ত ভাসমানতার স্তর, সম্পর্ক যদি হয় মানুষের ছায়া — কখনও সামনে, কখনও পিছনে, কখনও বাঁ বা ডানদিকে তেরচা হয়ে পড়ে, পড়তে গিয়ে ভেঙেচুরে যায়, লম্বা হয়ে যায় বা ছোট, কখনও একটাই মানুষের একাধিক ছায়া তৈরি হয় এমন যেন ছায়াগুলো, একে অন্যের শরীরে আঙুল দিয়ে গর্তও করে দিতে পারে — এরকম কোনও ছায়া তার নেই!

ছায়া নেই? ছায়া পড়ে না? তার মানে তো অস্তিত্বটাই নেই আসলে | তার মানে ‘সে’ নেই আসলে | পুরোটাই ফক্কা!

কিন্তু তার দিক থেকে সে না থাকলে কি হবে, অন্যদের দিক থেকে তো সে আছে | যাদের ছায়া পড়ে, ছায়া তৈরি হয় তাদের কাছে আছে সে — সম্পর্কের ভয় হয়েই আছে!)

সাহানার সঙ্গে যখন তার একটা ঝগড়া লাগবে লাগবে করছে তখনই ফোনটা বেজে উঠল গর্বীর, সে দেখল — রঘুবীর চৌধুরি! আবার কিছু নিয়ে ভয় পেল নাকি রঘুবীরদা? ফোন ধরল সে, ‘বলুন রঘুবীরদা!’ ‘শোন গর্বী, তোমার ঘুম ভাঙালাম, কি হয়েছে বলত? আমার বাড়িতে একটা পুরোনো সাইকেল ছিল, কত পুরোনো তার কোনও হিসেব নেই, আমারই কৈশোরে বাবার কিনে দেওয়া, লড়ঝরে…!’

‘সেই সাইকেলটা বুঝি চুরি হয়ে গেছে রঘুবীরদা?’

‘না, না চুরি হয়নি, সেই সাইকেলটা নিয়ে আমি এখন রাস্তায় নেমেছি, এখন হাঁটছি সাইকেলটা নিয়ে | কিচকিচ শব্দ হচ্ছে কিন্তু চলছে, এবার চড়ে বসব সাইকেলটায় | অনেক অনেক বছর পরে এখন সাইকেল চালাব | ভোর হচ্ছে, একটু একটু করে সূর্য উঠছে, পাখি ডাকছে — রাস্তায় কেউ নেই, ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে মেখে এখন ঘুরে বেড়াব আমি | তুমি দ্যাখো, আমি কিন্তু ঠাণ্ডা হাওয়া, ভোর এসবের এখন আর উলটো মানে করছি না! এসব তোমার জন্য হচ্ছে গর্বী, ভয় জিনিসটা কমে আসছে | আমি টের পাচ্ছি |’

ভোর হচ্ছে? সূর্য উঠছে? এখন তো রাত একটা বাজে! দুপুরবেলাও তো রঘুবীরদাকে ক্যাম্পাসে এক ঝলক দেখেছে গর্বী, বিদেশে যেতে তো মানুষের একটা সময় লাগে | সেই বিদেশ যেখানে কলকাতার থেকে চার ঘণ্টা আগে সূর্যোদয় হয়! সে বলল, ‘আপনি এখন কোথায়?’

‘এই তো, তোমার বাড়ির কাছেই এসে গেছি | হাঁটছি সাইকেল নিয়ে |’

‘আপনি ভোরের আলো দেখতে পাচ্ছেন? সূর্য দেখতে পাচ্ছেন!’

‘একটা পাতলা, ফিনফিনে সালামির মত সূর্য, একটু মাংসল, একটু গোলাপি, — সুন্দর শব্দটা উচ্চারণে এখনও আমার দ্বিধা হচ্ছে, নইলে বলতাম সুন্দর!’

পাতালে গর্বীর আহ্বান

সাড়ে বারোটা নাগাদ স্নান করে ভাত খেয়ে পরিপাটি হয়ে কলেজে বেরোলো — নিজের কাছেই বিস্ময়কর মনে হল গর্বীর | আজ দশদিন হয়ে গেল সাহানা বাড়িতে | ঘুম থেকে উঠে সে দেখল সাহানা বাজার ঘুরে এসেছে এবং ডাইনিং টেবিলে বসে তরকারি কাটছে | দুজনে কফি খেল একসঙ্গে বসে | গল্প হল একটু | এখন সহানার সঙ্গে খুব বুঝে শুনে কথা বলছে গর্বী কারণ সাহানা সত্যিই চিত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে না | এর মধ্যে একদিন বেশি রাতের দিকে বাড়িতে এসেছিল চিত্রক | দুই বন্ধু মিলে তারা তখন হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি পড়ে সোফায় বসে টিভি দেখছে | ঘুমোতে যাওয়ার জন্য তৈরি | চিত্রক আসতে সে চলে গেছিল বেডরুমে | চিত্রক এমন করে তার দিকে তাকাল যেন গর্বীই যত নষ্টের গোড়া | সে বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দিতে যাবে, সাহানা ডাকল তাকে, ‘তুই এখানেই থাক |’

চিত্রক বলল, ‘হ্যাঁ, গর্বী তুমি এখানে থাকো | আমি আবার ওকে হার্ট করতে পারি |’

সাহানার মধ্যে কোনও ভাবান্তর হল না | ঠ্যাং-এর ওপর ঠ্যাং তুলে বসে রইল সোফায় | মুখটা এমন গম্ভীর করে রাখল যে কথাবার্তা এগোতেই পারল না চিত্রক | আধঘন্টা মতো বসে থেকে উঠে চলে গেল | দরজা বন্ধ করে দিয়ে সাহানা বলল, ‘দাগটা মেলাতে অনেক দেরি হচ্ছে কিন্তু বল?’

এখন ক্ষতটা গেলেও নতুন চিকচিকে চামড়া তৈরি হয়েছে কেমন একটা | দেখে মনে হয় ঠোঁটের পাশে কোনও খাবার লেগে আছে | কাল রাতেই সাহানা প্যানস্টিক ঘষছিল দাগটার ওপর | হয়তো আর তিন-চারদিন পরে গভীর মেক আপের নিচে দাগটাকে লুকিয়ে আবার আকাশে উড়তে পারবে ও | সে যখন বেরোচ্ছে তখন সাহানা মেল করছিল অফিসকে — সুস্থ আছে, ভালো আছে, কাজে ফিরে যেতে তৈরি |

রঘুবীরের বাড়ির কাছে পৌঁছে গর্বী দেখল রঘুবীর গেটের পাশে দাঁড়িয়ে | একটা হাল্কা সবুজ শার্টে খুব সুন্দর দেখচ্ছে মানুষটাকে, চুলটা উড়ছে হাওয়ায় | ঈষৎ বাদামী বর্ণের খুব ঘন চুল রঘুবীরের মাথায় | চুলগুলো কপালের ওপর এসে পড়ে থাকে | রঘুবীর কখনও হাত দিয়ে চুলগুলো সরিয়ে দেন না | ফলে মাঝে মাঝেই চুলের পেছন থেকে, চশমার পেছন থেকে রঘুবীরের চোখ চেষ্টা করে খুঁজে নিতে হয় | গেটের সামনে পৌঁছে গর্বী দাঁড়িয়ে পড়ল | বলল, ‘কি হল? মুখটা শুকনো লাগছে কেন রঘুবীরদা?’ রঘুবীর বড় বড় চোখ করে তাকালেন তার দিকে, ‘এই শার্টটা আমি আজ কত বছর পরে পরলাম গর্বী | তিন-চার বছর হবে নিশ্চয়ই | পরে দেখছি পকেটে এই সিমটা রয়েছে |’ পকেট থেকে একটা সিম বের করে দেখালো রঘুবীর তাকে | ‘আমার ভীষণ নার্ভাস লাগছে, কার সিম, কি করে আমার পকেটে এল জানি না | কি করি আমি এখন এটাকে নিয়ে? ছুঁড়ে ফেলে দিই?’

নিজের ঝোলা থেকে চুইংগাম বের করে মুখে পুরল গর্বী | একটা চুইংগাম সে রঘুবীরকেও দিতে গেল, রঘুবীর বললেন, ‘আমি খাই না |’

সে বলল, ‘কেন?’

‘হ্যাঁ?’ রঘুবীরকে খুবই অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে |

‘কেন খান না চুইংগাম্?’

‘তোমাদের বয়সী ছেলেমেয়েদের দেখি সবসময় চুইংগাম খাচ্ছে, অদ্ভুত ভঙ্গিতে চোয়ালটা নাড়াচ্ছে আর মাঝে মাঝে খুব অবজ্ঞার চোখে তাকাচ্ছে চারপাশে | এই চারপাশটাকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা, এই সাহস, স্পর্ধা আছে বলেই তো চুইংগামটা চিবোচ্ছে ওইভাবে | আমার সঙ্গে ব্যাপারটা যায় না | ওটা একটা অ্যাটিটিউড | আমি তো মুখ নিচু করে চলাফেরা করি আর মাঝেমাঝেই পেছন ঘুরে দেখার চেষ্টা করি কেউ অনুসরণ করছে কিনা | বরং তুমি যখন সিগারেট খেয়ে ধোঁয়া ছাড় বা চুইংগাম চিবো-ও আমার মনে হয় তোমার হাতটা ধরি, হাতটা ধরে থাকি |’

কথাটা হেসে উড়িয়ে দিল না গর্বী | বরং তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা দৃশ্য | জীবনানন্দের ট্রামে কাটা পড়ার দৃশ্য | বহুচর্চিত বিষয়টা কল্পনায় দেখে নিল সে এবং ভাবল চুইংগাম চিবোতে চিবোতে হাঁটলে জীবনানন্দ কখনও ট্রামে কাটা পড়তেন না সেই বিকেলে |

সে বলল, ‘সিমটা ফোনে লাগিয়ে দেখলেই তো হয় | হতে পারে ওটা আপনারই কোনও বাতিল করা সিম | পুরনো নাম্বারের, এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না |’

‘আমার তো প্রথম থেকে এই একটাই নাম্বার |’

‘তা হলেও | হতে পারে কখনও সিমটা বদলাতে হয়েছিল আপনাকে | আমারই একবার হয়েছিল এরকম | তূনীরের এক দিদির বাড়ি গেছিলাম বেড়াতে | সেই দিদির বাচ্চাটা আমার ফোন নিয়ে খেলতে খেলতে সিমটা লক করেদিল | সেই লক আর খুলল না | আমাকে আবার নতুন সিম নিতে হল | নাম্বার টাম্বার সব হারিয়ে গেল লোকজনের |’

‘নাহ, আমার এরকম কখনও হয়নি, ট্রাস্ট মি |’

সে হাঁটতে লাগল এবার, ‘তাহলে আপনি সিওর যে সিমটা আপনার নয়?’

একটু চুপ করে থেকে রঘুবীর বললেন, ‘না, নয় |’

‘আপনার কি জানার আগ্রহ আছে সিমটায় কি আছে, সিমটা কি করে?’

‘না নেই |’

‘তাহলে ছুঁড়ে ফেলে দিন | কিন্তু এটা মনে রাখবেন যদি সিমটা ফোনে লাগিয়ে একবার চেক করতেন তাহলে হয়তো এটা আপনার পেকেটে কোথা থেকে এল সেই রহস্যটা কেটে যেত | সেটা আপনার পক্ষে ভাল হত রঘুবীরদা |’

হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়লেন রঘুবীর | সে দেখল মৃদু হাত কাঁপছে রঘুবীরের | গছের ফাঁক দিয়ে রঘুবীরের টিকোলো নাকের ওপর, বলিষ্ঠ চিবুকের ওপর রোদ এসে পড়েছে | শুধু ঠোঁটের কাছটা অন্ধকার, ঠোঁটে একটা বিষন্ন ভাব | তার মনে হল ঠিক কি ভাবে আলোকসম্পাত করলে একজনের মুখের ওপর এই আলো ছায়া তৈরি করা যাবে কোনও ধারণা নেই তার | রঘুবীরের চরিত্রের যাবতীয় অসংলগ্নতা এই মুহূর্তে যেন আলো ও ছায়ায় বিভাজিত হয়ে ধরা পড়ছে তার চোখে | আর গর্বী অবাক হয়ে দেখল যে ওই ছায়ার রং বেগুনি | ‘Shadows are purple!’ বলেছিল না কিউবিস্ট পেন্টাররা? এবং সে স্বয়ংপ্রবৃত্ত হয়ে বলে উঠল, ‘সিমটা আপনি আমাকে দিতে পারেন রঘুবীরদা |’

রঘুবীর মাথা নাড়লেন, সিমটা তাকে দিয়ে দিলেন |

ইউনিভার্সিটি ঢুকে বন্ধুদের দেখতে পেয়ে গর্বী এগিয়ে গেল জটলার দিকে রঘুবীরদাকে ছেড়ে | আসছে ইলেকশন নিয়ে জোর আলোচনা চলছে সেখানে তখন | এস এফ আই যে জিতছে এ বিষয়ে অনেকেই একমত | এরই মধ্যে এক ফাঁকে রিপন তাকে ডেকে নিয়ে গেল ঝিলের দিকে | কি ব্যাপার রিপন নেশা করে নেই? পরিষ্কার করে সেভ করেছে, চুল কেটেছে ছোট ছোট করে? সে বলল, ‘তোর হঠাৎ এই রূপ পরিবর্তন?’

রিপন বলল, ‘ও সব ছাড়! তোকে একটা কথা বলি, দ্যাখ গর্বী, যাদের বুদ্ধি আছে তারা কখনও কোনও মানুষ সম্পর্কে কোনও স্থির ধারণায় আসতে চায় না | ‘এ এরকম’ বা ‘ও ওরকম’ হয় না আসলে | যে কোনও মানুষই যখন তখন রুচি, মানসিকতা, বিশ্বাসের নিরিখে পরিবর্তিত হতে পারে, ম্যাচিওরড একটা লোক ইমম্যাচিওরড হয়ে যেতে পারে, বিকারগ্রস্ত লোক সুস্থ এবং সুস্থ একজন বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে | তোকে দেখে আমার মনে হচ্ছে না তোর মধ্যে সে রকম কোনও চেঞ্জেস এসেছে | এইমাত্র ছাড়া যে তুই আজকাল প্রায়ই রঘুবীরদার সঙ্গে ইউনিভার্সিটি ঢুকছিস, আমি নিজে তিনদিন দেখেছি | কিন্তু রঘুবীরদার পরিবর্তনটা চোখে পড়ার মত! সবাই জানে রঘুবীর চৌধুরী মেয়েদের ব্যাপারে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, মেয়েদের সম্পর্কে লোকটার একটা আলাদা নীতি আছে | যে নিস্পৃহ আচরণ এতদিন দেখে আসছি তার প্রতি আমি অন্তত শ্রদ্ধাবান | গতকাল রাতে তূনীর ঠেকে এসেছিল, তুই তো জানিস সে ঝামেলার পর থেকে তূনীরের সঙ্গে আমার কোনও কথা নেই, ছিল না!’

সে বলে উঠল, ‘দাঁড়া, দাঁড়া — তূনীর তোর কাছে গেল? কি বলতে?’

‘সেটাই বলছি গর্বী! তূনীর বলল, ‘তোর কি ধারণা আছে কোন রিপন — গর্বী এখন কোথায় বসে আড্ডা দিচ্ছে? কার বাড়িতে, কার সঙ্গে?’ তূনীর হাই হয়ে ছিল, কিছু বললেই হাত চালাত আমার ওপর আর তখন ঠেকে কেউ ছিল না! আমি বললাম, ‘গর্বী কোথায়?’

‘রঘুবীর চৌধুরীর বাড়ি!’ বলল ও | সত্যিই কি তুই রঘুবীরদার বাড়িতে ছিলিস কাল রাতে?”

গর্বী বলল, ‘হ্যাঁ, ছিলাম তো! অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছি |’

রিপন তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, ‘তার মানে তূনীর আমার ওপর নজরদারি করে | সেদিন শৌভিক বলছিল তূনীর আজকাল দিন রাত নেশা করে, পড়াশুনো কিছু করে না, যার তার সঙ্গে বাওয়াল করে বেড়ায়!’ বলল সে |

‘তূনীরকে দেখে কাল রাতে খারাপ লাগল আমার গর্বী!’

‘সে তো লাগারই কথা | নিজেকে নষ্ট করছে ও কিভাবে |’

‘ভুল করছে |’

একটা সিগারেট ধরাল সে, দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘আমার কি করার আছে বল?’

‘তোর জন্য এরকম করছে ওর গর্বী | ও তোকে ভালবাসে |’

‘এত সহজ কথাটা তুই বললি রিপন? তুই তো প্রেমে বিশ্বাসই করিস না!’

‘প্রেমে বিশ্বাস করি আমি কিন্তু প্রেমের এই প্রকাশভঙ্গিতে বিশ্বাস নেই আমার!’

‘প্রকাশভঙ্গি বলতে এই একজনকে ভালবেসে ফেলা, তারপর তার সঙ্গে দেখা হওয়া, তার প্রতি অনুরাগ ও আসক্তি, এবং ক্রমশ একটা সেন্স অফ কনকারিং, তার জীবন এবং আমার জীবন জড়িয়ে গিয়ে একটাই জীবন এই অনুভব — এই সীমাবদ্ধতায় তোর বিশ্বাস নেই, তাই তো?’

‘এগুলো একটা প্র্যাকটিস, আমি এর এগেনস্টে |’

‘কিন্তু নারী-পুরুষের প্রেম এর বাইরে যেতে পারে না কখনও রিপন!’

‘সেইজন্য নারীর সঙ্গে প্রেম হবে না আমার, আমি প্রেমে পড়ব এনজেলের |’ রিপন হাসল |

‘তোরা তো ‘কাল্ট অফ বিউটির’ কথা বলিস | তোদের ডিকশনারিতে ‘আগলি’ কথাটা নেই | অথচ ‘কুৎসিত’ না থাকলে সুন্দরের কনসেপ্ট-ও থাকে না | তোরা বিশ্বাস করিস সবই ‘সুন্দর, সবই ‘সদর্থক’ — তাহলে তো যে ‘এনজেল’ নয় সে-ও ‘এনজেল’ | এদিকে পোস্ট মডার্নিজম তো ‘গড’ বা ‘এনজেল’ কারও অস্তিত্বই স্বীকার করে না!’

‘পোস্ট মডার্ন যুগ শেষ গর্বী | আমরা এখন ট্রানসেনডেন্টাল নেচার অফ গড-এর কথা বলছি!’

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.