বারো মাস রোদে পুড়ে জলে ভিজে চাষ করেন বাবা | কিন্তু বাড়ির হেঁশেলে চালের নিশ্চয়তা থাকে না সবসময় | তার আর বড় পাঁচ ভাইবোনের মুখে ডাল ভাত তুলে দিতে হিমসিম মা | তাতে পেটে খিদের আগুন যেমন নেভে না | ঠিক তেমনই জ্বলে থাকে মনের জেদ | রঞ্জিত আর জোমালি দাসের ছোট মেয়ে হিমার | 

Banglalive

অসমের নওগাঁও জেলার ঢিং গামে আর যা-ই কম থাকুক না কেন‚ বৃষ্টির অভাব নেই | বৃষ্টি থামার পরে গ্রামের কাদায় মাখামাখি হয়ে ফুটবল খেলে ওরা | গ্রামের ছেলেরা | আর খেলে হিমা | ওদের সঙ্গেই | মেয়ে বলে কী হয়েছে ! কোথায় লেখা আছে মেয়েরা ফুটবল পেটাতে পারবে না !

বাড়ির লোকের নিষেধ‚ পড়শিদের টিপ্পনি কোনও কিছুই থামাতে পারেনি ঢিং গ্রামের মনসাকে | মেয়ে বলে খাটো করে দেখত মাঠে খেলতে আসা বাকি ছেলেরাও | কিন্তু হিমাকে নিশির মতো টানত সবুজ মাঠ | 

কিছুদিন পর টানের ভরকেন্দ্র পাল্টে গেল | কেন যেন চামড়ার গোল বলটার বদলে হিমাকে পেয়ে বসল দৌড়ের নেশা | একবার আন্তঃজেলা প্রতিযোগিতায় আলাপ হল নিপন দাসের সঙ্গে | নিপন কোচ এবং ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ বিভাগের সঙ্গে যুক্ত | 

তিনি বুঝলেন এই মেয়ের হবে | তবে ঢিং গ্রামে পড়ে থাকলে কিছু হবে না | বললেন রাজধানী গুয়াহাটিতে আসতে | কিন্তু বেঁকে বসলেন বাবা মা | কিছুতেই ছাড়বেন না ছোট মেয়েকে | 

তাঁদের অনেক বুঝিয়ে হিমাকে গ্রাম থেকে বাইরে আনলেন নিপন দাস | বাড়ি থেকে ১৪০ কিমি দূরে গুয়াহাটিতে পা রাখলেন নিম্নবিত্ত কৃষকের ছোট মেয়ে |  স্পোর্টস কমপ্লেক্সের কাছে ভাড়া বাড়িতে থেকে শুরু হল নতুন যুদ্ধ |

গ্রামের মেঠো পথে যে পা দৌড়ত বেআব্রু হয়ে‚ সেই পা এখনও ছুটছে | ছুটতে ছুটতে পৌঁছেছে ফিনল্যান্ডের টাম্পেরে-তে | কদিন আগেই সেই দুটো পা জেনেছে কাকে বলে স্পাইক-সমেত জুতো | নিরাপত্তার ওই আব্রুটুকু এসেছে বটে | কিন্তু খোলা পায়ে দারিদ্র্য আর সংগ্রামের যে কাঁটা বিঁধে আছে‚ তার ক্ষত বড় দগদগে | ওই যন্ত্রণাই তো সম্বল | ওর জোরেই ছুটল আবার পা দুটো | 

পা দুটো জানত‚ সাফল্য না এলে কেউ জানবেও না এই দৌড়ের কথা | আসার সময়ে কেউ সংবর্ধনা দেয়নি | বড় সংবাদপত্রের এক কোণাতেও বের হয়নি খবর | হবেও না‚ যদি না গলায় ওঠে একটাও পদক | আর স্পনসরশিপ তো রয়েই যাবে অন্য ছায়াপথে |

মাঝ-ভর্তি স্টেডিয়ামেই হয়ে গেল অ্যাথলেটিক্সে অনূর্ধ্ব কুড়ি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ | মহিলাদের ৪০০ মিটার বিভাগের একটা দৌড় | ঐতিহাসিক ৫১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড | পাল্টে দিল পরের দিনের ভারতীয় সংবাদপত্রের শিরোনাম | তখনকার নিউজ চ্যানেলের হেডলাইন | সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডিং | ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়াকে সরিয়ে সব জায়গায় উঠে এলেন অখ্যাত অজ্ঞাত এক হিমা দাস |

১৮ বছর বয়সী এই কিশোরী অনেকটা পিছনে থেকে দৌড়চ্ছিলেন | কিন্তু শেষ ৮০ মিটারে তাঁর ছায়া এগিয়ে গেল প্রথমে থাকা তিন প্রতিযোগিণীর ছায়াকে পিছনে ফেলে |

কয়েক লহমা পরে হরিণী যখন ঘুরছেন ট্র্যাক জুড়ে‚ তাঁর দু হাতে উঁচু হয়ে আছে ত্রিবর্ণ | গলায় দুলছে অসমের ঐতিহ্যবাহী গামছা | কিছুক্ষণ পর সেখানে যখন এল স্বর্ণপদক‚ জাতীয় সঙ্গীতের সুরে‚ মেয়ের চোখে জল | 

প্রথম ভারতীয় হিসেবে জুনিয়র বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের ট্র্যাক ইভেন্টে সোনা জিতে ইতিহাস গড়লেন |সীমা পুনিয়া (ব্রোঞ্জ, ডিসকাস), নভোজিৎ কৌর ঢিলন (ব্রোঞ্জ, ডিসকাস), নীরজ চোপড়ার (সোনা, বর্শা নিক্ষেপ)-এর সঙ্গে জুড়ে গেল তাঁর নাম | এমন কৃতিত্বের প্রতিক্রিয়া তো আসবেই | এসেওছে |ভারতীয় অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের পক্ষ থেকে করা ট্যুইট করা হয়েছিল | তখনও হিমা স্বর্ণজয়ী হননি | ৪০০ মিটার দৌড়ের ফাইনালে ওঠার পর তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে এই ট্যুইট করা হয়। তাতেই বলা হয়, ‘সেমি-ফাইনালে ওঠার পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন হিমা দাস। তিনি ভাল ইংরাজি বলতে পারেন না। কিন্তু সেখানেও নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। হিমা দাসের জন্য আমরা গর্বিত। ফাইনালের জন্য শুভেচ্ছা।’এবং এই ট্যুইটে ‘Speaking’-এর বদলে ভুল বানানে লেখা ছিল ‘Speking’! 

এটাই এ দেশে স্বাভাবিক | নইলে আর কর্মকর্তা হবেন কী করে ! তাঁরা ট্যুইট করেন | আর খিদ্দা-রা চেঁচিয়ে যান- ফাইট কোনি‚ ফাইট !” নইলে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীরা নয়‚ নিজেদের পা ধোওয়া জল কোনিদের খাওয়ানোর জন্য মুখিয়ে থাকে গোটা ঘুণধরা সমাজটাই | 

আরও পড়ুন:  বিশেষ পাখি একটি‚ ডিম পেড়েছে চারটি; বন্ধ হতে বসেছে বিখ্যাত মিউজিক ফেস্টিভ্যাল

1 COMMENT