অন্য ভুবনে মৃণাল সেন – প্রতিক্রিয়া তাঁর গুণমুগ্ধদের?

কি নিস্তব্ধ আড়ম্বরহীন ভাবে চলে গেলেন মৃণাল সেন!মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৯৫।এই ‘মাত্র’ শব্দটি প্রয়োগের একটি বিশেষ অর্থ আছে।বার্ধক্য জরা মৃত্যু — চিরন্তন।কিন্তু ইতিহাস তাকেই অমরত্ব প্রদান করে,যে পার্থিব জগতের আপাত অনুভূতিকে তুচ্ছ করে মহাপৃথিবীর উদ্দেশ্যে নিজেকে নিয়োগ করেন।মৃণাল সেন তেমনই ব্যক্তিত্ব।বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম।সময় ১৯২৩ সালের ১৪ মে।

ফরিদপুরেই উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষা সম্পূর্ণ করে মৃণাল পাড়ি দেন কলকাতায়।তারপরেই স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াশোনা।কলেজে পড়ার সময় থেকে বামপন্থী আদর্শে দীক্ষিত হন মৃণাল।আই পি টি এ-র সাংস্কৃতিক শাখায় ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মৃণালের মেন্টাল ম্যানিফেস্টো।মার্কসবাদী চেতনার আলোয় ক্রমাগত তিনি বুঝেছিলেন,সংস্কৃতি কোনও সমাজ বিচ্ছিন্ন বায়বীয় বস্তু নয়।বরং সংস্কৃতি সমাজ বিপ্লবের মেরুদণ্ড।মৃণাল জানতেন — সিনেমা শুধু বিনোদনের বেলাভূমি নয়।ফরাসী পরিচালক জা লুক গোদারের মতোই তার কাছে সিনেমা হল —‘আ ফিল্ম ইজ আ ফিল্ম,ইজ আ ফিল্ম…’।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ১৯৫৫ সাল স্মরণীয়।কারণ ওই বছরই সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পায়।আর ওই বছরই মুক্তি পায় মৃণাল সেনের প্রথম ছবি ‘রাত ভোর’।উত্তম কুমার ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ‘রাত ভোর” শ্রী সেনের প্রথম ছবি হলেও,’রাত ভোর’ ছিল নিছকই সিনেমা তৈরির কর্মশালা।পরবর্তী ছবি নীল আকাশের নীচে(১৯৫৯)।এই ছবি থেকেই মৃণাল খুঁজে পেলেন নিজস্ব গতি।

এ প্রসঙ্গে অভিনেতা  চিরঞ্জিত চক্রবর্তী জানালেন তাঁর নিজস্ব মন্তব্য —‘মৃণাল সেনের প্রায় সব ছবি আমি দেখেছি।আন্তর্জাতিক চিন্তার অধিকারী  ছিলেন মৃণাল সেন।ওনার তৈরি ‘ভুবন সোম’ আমার ফেভারিট ছবি।এ কথা আমি মৃণাল বাবুকে বলেওছি।সেদিনের ঘটনা আজ খুব মনে পড়ছে।মৃণাল বাবু বলেছিলেন,ভুবন সোম ওনারও ফেভারিট ছবি। আরো একটা ঘটনার কথা আজ মনে ভাসছে।তখন আমি খুব ছোট।মেট্রো সিনেমাহলে কলকাতা ৭১ দেখানো হচ্ছে।সেই সময়ও ওনাকে দেখেছি।তৃতীয় বিশ্ব নিয়ে মৃণাল বাবুর ধারণা খুব স্পষ্ট ছিল।আজ উনি নেই।মৃণাল সেনকে তার কাজের মাধ্যমেই আমরা স্মরণ করতে পারি।মৃণাল সেন আমাদের কাছে একটা শিক্ষা।চলচ্চিত্রে পদার্পণের গোড়ার দিকে মৃণাল সেনের ছবির মূল ভিত্তি ছিল কাহিনী।পরবর্তী জীবনে এক্সপিরিমেন্টের মধ্যে দিয়ে ওনার উত্তরণ ঘটে।যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।মৃণাল সেন হলেন আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের ধ্রুবতারা।

১৯৬০ সালে ‘বাইশে শ্রাবণ’-এ মৃণাল যে ছবি আঁকলেন তা রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু দিবসের কার্বন কপি নয়।এক মানুষের জীবন সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। এই ছবি থেকেই মৃণাল আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান।এই ছবির অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল সে দিনের ঘটনা — “উনি আমাকে ডেকেছিলেন।তা আমি গেলাম।উনি যাওয়ার পর আমাকে কিছু প্রশ্ন করেন।তার মধ্যে একটা প্রশ্ন খুব মজার।উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন,তুমি ঘুঁটে দিতে পারো? আমি  ঘুঁটে কখনও দেইনি।ওনার স্ত্রী গীতা দি বললেন,ঘুঁটে দেওয়া কি এমন!গীতা দি বললেন,তোমাকে পরে খবর দেব। আমি ভাবলাম আমি আর বুঝি ডাক পাবো না।মৃণাল বাবুর বাড়িতে একজন নেপালী ছেলে কাজ করত।সেই বলল,বাবু এই মেয়েটিকে নেন।এর মুখটা দেখলে খুব মায়া হয়।একথা মৃণাল বাবু অনেক জায়গায় লিখেছেন।এভাবে আমি বাইশে শ্রাবণে সুযোগ পেলাম।কিন্তু মৃণাল সেন আমার কাছে স্মরণীয় অন্য কারণে।কমিউনিজমে অটুট বিশ্বাসী মৃণাল সেন চিরকালই তাঁর ইডিওলজি থেকে এক পা নড়েন নি।এমন মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।শুধু তাই নয়, নারী স্বাধীনতার যে বীজ তিনি বপণ করেছেন,তা এক কথায় অসাধারণ।” মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কথা শুনে চোখের সামনে ভেসে উঠছিল একদিন প্রতিদিনের কিছু মুহূর্ত।বাড়ির রোজগেরে বড় মেয়ে চিনু,ছোট মেয়ে মিনু এবং তার মা — এই তিনটি নারীর অস্তিত্বের প্রশ্ন,সমাজভীরু মানসিকতা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস বাংলা চলচ্চিত্রে বিরল।ওই ছবির অভিনেত্রী শ্রীলা মজুমদার শোকাতুর মুহূর্তে জানালেন — “আই হ্যাভ লস্ট মাই ফাদার।মৃণাল দা আমার ফ্রেণ্ড ফিলোসফার,গাইড এবং মেন্টর ছিলেন।”

শহুরে সভ্যতা বাদেও গ্রামজীবন নিয়েও মৃণাল সেনের ছবি অন্য বার্তা দিয়েছে ।চলচ্চিত্র গবেষক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় —”তিনি গ্রাম নিয়ে ছবি করলেও  তাঁর ছবিতে নিম্ন মধ্যবিত্তের ক্রোধ ও আবেগ জুড়ে থাকত।তিনি যে বামপন্থী ছিলেন তা তাঁর কাজেই প্রমাণিত।এ কথা উল্লেখযোগ্য ভুবন সোম থেকে শুরু হয়েছিল ভারতীয় নব তরঙ্গের অন্য পর্যায়।এই ছবিতে ক্যামেরা একটা বাস্তবকে তৈরি করে সেই বাস্তবকে ভেঙ্গে দেয়।

এই ভাঙ্গনের চিহ্নগুলো তাঁর ছবিতে এতো বেশি স্পষ্ট হয়ে আছে,যে তিনি এই যুগের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন।এই যুগটি হল বিখ্যাত সত্তর দশক। আজ তিনি নেই।কলকাতা আজ গরিব হয়ে গেল।কোরাসের সময় একটা ঘটনা ঘটেছিল।কোরাস ইন্দিরায় মুক্তি পেয়ে চলছিল না।তখন বৌদি আর মৃণাল দা আমাদের যাদবপুরের কয়েকজন ছাত্রকে দুশো টাকা দিয়ে বলেছিলেন; যতগুলো পারো টিকিট কেটে নাও।তারপর যাকে খুশি দাও।প্রেক্ষাগৃহে অন্তত কিছু লোক আনো।তাহলে আরেক সপ্তাহ ছবি চলবে।মৃণাল সেনের বেঁচে থাকার সংঘর্ষ আমি চোখের সামনে দেখেছি। এটা আজকের চলচ্চিত্রকারেরা অনুমানও করতে পারবেন না”।

আধুনিক চলচ্চিত্রকারেরা আজও মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র কর্মের ভেতর শুনতে পান ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর।পরিচালক গৌতম ঘোষ জানালেন তাঁর প্রতিক্রিয়া —“আমি এখন অনেক দূরে।মৃণাল দার চলে যাওয়াতে আমি বাকরুদ্ধ। এক এক করে সমস্ত স্টলওয়ার্ট চলে যাচ্ছে।মৃণাল দা আমার কাছে অনুপ্রেরণা।তিনি বলতেন;সমঝোতা না করে সিনেমা করো।ভালো কাজ করে যাওয়ার এটাই চালিকা শক্তি”।

মৃণাল সেনের নিজস্ব আপসহীন যাত্রাপথ প্রতিফলিত হত তাঁর ছবিতে।যেখানে নেই কোনও ভনিতা।এ ব্যাপারে উপযুক্ত মন্তব্য করলেন পরিচালক অতনু ঘোষ —‘আমরা দূরদর্শনে ছোটবেলায় মৃণাল সেনের ছবি দেখি।কিন্তু তার আগেই  মৃণাল বাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমি ওনার পাড়াতেই থাকতাম।এখনও  চোখ বুজলেই ওনাকে দেখতে পাই।সেই সাদা পাঞ্জাবী পাজামা পরা চিরপরিচিত চেহারা।হাতে সিগারেট।দেশপ্রিয় পার্কের ট্রাইম লাইনের ধারে সুতৃপ্তি বলে একটা দোকান ছিল।রবিবারের সকালে উনি ওখানে আসতেন।আমরা দূর থেকে ওনাকে দেখতাম।তারপর একদিন প্রতিদিন,পদাতিক,খারিজ,আকালের সন্ধানে আমার মনে খুব রেখাপাত করে।সামাজিক এবং রাজনৈতিক ছবির জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হল মৃণাল বাবুর ছবি।তবে ব্যক্তি মৃণাল সেনের সঙ্গে মিশে আমার মনে হয়েছে উনি যা তাই ওনার চলচ্চিত্রে প্রকাশিত।সেখানে কোনও বিরূপ সত্ত্বার স্বরূপ দেখিনি। উনি প্রতিনিয়ত পরীক্ষা করেছেন। আর মধ্যবিত্তকে  দাঁড় করিয়েছেন আয়নার সামনে।শ্যাম বেনেগালের ভাষায় মৃণাল সেন একজন অ্যানারকিস্ট।”

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.