ক্যানসেল্ড অর্ডারের খাবার দিয়ে পথশিশুদের খাওয়ান দমদমের জোমাটো ডেলিভারি বয়,মানবতার পথিকৃৎ

delivery boy feeds street children

রাস্তায় থাকা কচিকাঁচাদের কাছে ‘রোল কাকু’। পথিকৃৎ সাহা, দমদম ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে খাবার ডেলিভারি করেন তিনি। ক্যানসেল্ড হওয়া খাবার খাওয়ান রাস্তার ছেলেপুলেদের। একটি মহৎ কাজ তা যত ছোটই হোক না কেন, সমাজে আনতে পারে গুরুত্বপূর্ণ বদল। ভারতবর্ষে প্রতি বছর ১৪০০ কোটি টাকার খাবার নষ্ট হয়। যে দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ অর্ধাহারে বা অনাহারে দিন কাটায় সেই দেশে এরকম অপচয় অপরাধেরই সামিল। উদ্বৃত্ত খাবার গরিব মানুষকে না দিয়ে আমরা ফেলে দিই। পথিকৃৎ এই বৈপরীত্যের দেশে এক উদার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

জোমাটোর নিয়ম অনুযায়ী, যদি ডেলিভারি করার জন্য খাবার একবার বেরিয়ে যায় এবং তারপর যদি ক্রেতা অর্ডার বাতিল করেন, তাহলে সেই খাবার ডেলিভারি যিনি করছেন তিনি নিয়ে যেতে পারেন নিজের বাড়িতে অথবা গরিব কাউকে দিয়ে দিতে পারেন। পথিকৃৎ দ্বিতীয়টিই বেছে নিয়েছেন। ‘হাজার হাজার বাচ্চা একবেলাও ভালো করে খেতে পায় না। বেশিরভাগই অপুষ্টিতে ভোগে অথবা ড্রাগ নিয়ে নিজেদের খিদেকে চাপা দেয়। কিন্তু এই দেশের এই সমাজের মানুষ হিসেবে আমাদেরও একটা নৈতিক দায়িত্ব আছে। এরকম যাতে না হয় তার জন্য কি আমরা কিছুই করতে পারি না? আমার পেশা আমাকে সুযোগ দিয়েছে এই না খেতে পাওয়া বাচ্চাগুলোর মুখে মাঝেমাঝে খাবার তুলে দেওয়ার।’

পথিকৃৎ বরাবরই দরিদ্র মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল তবু বছর চারেক আগের একটি ঘটনা পথিকৃৎ-এর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল। ‘দমদম ক্যান্টনমেন্ট রেল স্টেশনে একদিন একটি বাচ্চা ছেলে ভিক্ষে করছিল, আমায় যেতে দেখে আমার কাছে কিছু টাকা চাইল। আমি পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম কিন্তু ছেলেটি বলল কিছু টাকা পয়সা বাড়িতে না নিয়ে গেলে ওর মা নাকি ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। এই ঘটনা থেকে আমি বুঝতে পারি, ভারতবর্ষে গরিবের কী দুর্দশা ! বিশেষ করে বাচ্চাদের’ –পথিকৃৎ-এর আজও মনে পড়ে সেই ঘটনা, জানান তিনি। এই ঘটনার পর থেকেই পথিকৃৎ বেঁচে যাওয়া খাবার বিলি করেন পথশিশুদের। ২৬ বছরের এই তরুণ দমদম অঞ্চলের একটি রেস্টুরেন্টের সঙ্গে রফাও করেছেন যে তাদের দোকানের উদ্বৃত্ত খাবার তিনি এসে নিয়ে যাবেন এবং সেই খাবার বিলিয়ে দেবেন রাস্তার অভুক্ত শিশুদের। জিভে জল আনা বিরিয়ানি থেকে শুরু করে, চাইনিজ, সুস্বাদু রোল, ফ্রায়েড রাইস ত্রিশ জন বাচ্চা মিলে চেটেপুটে খায়। পথিকৃৎ রোজই তাদের জন্য কিছু না নিয়ে আসেন। পথিকৃৎ-এর এই কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর আরও পাঁচজন বন্ধুও যোগ দিয়েছেন তাঁর সঙ্গে। যখনই অর্ডার ক্যানসেল হয়ে যায়, পথিকৃৎ সেই খাবার নিয়ে আসেন গরিব বাচ্চাদের দেওয়ার জন্য। অবসর সময়ে এই বাচ্চাদের পড়ানও তিনি। এদের বাবা মায়েরা কখনোই এদের পড়াশোনা করান না, সাধ্যও নেই তাদের। কেউ কেউ ভিক্ষা করে রেল স্টেশনের রাত কাটায়, কেউ কেউ ড্রাগ নেয়, পয়সার জন্য ছোটখাটো অপরাধও করে বসে কেউ কেউ। এই বাচ্চাদের সাহায্য করার জন্য, তাদের খাবার, সুরক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য পথিকৃৎ ‘হেল্প ফাউন্ডেশন’ নামে এক সংস্থা খুলেছেন। এটি একটি বৈধ এনজিও। কিছু বন্ধুরা সাহায্য করছেন তাঁকে। পথিকৃৎ বাচ্চাদের নিয়ে চালু করেছেন সান্ধ্য পাঠশালা। রোজ পথশিশুদের নিয়ে ক্লাস করান। শুধু এটুকুইতেই থেমে নেই পথিকৃৎ। তাঁর উদ্যোগেই রাস্তায় ভিক্ষে করত এমন ২১জন বাচ্চা সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়েছে পড়াশোনা করার জন্য। পথিকৃৎ কে অভিবাদন ! আমরাও পারি না কি সাধ্যমত এই অপুষ্টিতে ভোগা, অন্ধকারে হারিয়ে যেতে থাকা রাস্তায় ভিক্ষে করা ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য একটু কিছু করতে? অন্তত খাবারটুকু ফেলে না দিয়ে তাদের মুখে তুলে দিতে?

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.