বাঙালীর বিশ্বকাপ এবং কমলাকান্তের পুনরার্বিভাব

Football Fever In Kolkata

[১]

 

প্রভাতী চায়ের আসরে, পুঁটিরাম তার সরঞ্জাম সাজিয়ে দিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু ব্যোমকেশের দেখা নেই। সত্যবতী গজগজ করতে করতে এসে বলে গেলো, “যাও! দেখে এসো গো ঠাকুরপো – তোমার সত্যান্বেষী বন্ধুকে। কাল রাত দেড়টা অবধি ঐ ছাইপাঁশ দেখে এখন ঘুম দেওয়া হচ্ছে। খোকাকে যে স্কুলে দিতে হবে, তার কথা মনে নেই। আর, এই ফুটবল খেলাটাই হয়েছে যত জ্বালা, মরণ” – সত্যবতী ছাদে গেলো ভেজা কাপড় মেলতে। 

খোকাকে স্কুলে দেবার ব্যাপারটা খেয়াল ছিলো না। পুঁটিরামকে হেঁকে বললাম, তাকে তুলে দিতে। এ পরিস্থিতিতে তো আমাকেই যা করবার করতে হবে কি না। ব্যোমকেশের ঘাড়ে চেপেছে বিশ্বকাপ। রহস্যরোমাঞ্চের কোনোকিছুই এখন তার ত্রিসীমানাতেও নেই কোথাওবাঙালীর এখন বিশ্বকাপ দর্শনের মহাযোগ, আমি অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় – কলকাতার কলেজ স্ট্রীট পাড়ার সামান্য লেখক বা প্রকাশক। এ দুর্দিনে আর আমাকেই বা কে বাঁচায় বলুন … জয় হোক বাবা বিশ্বকাপ, সুখে শান্তিতে রেখো বাবা। 

দুপুরের কলকাতায় বাগবাজার ঘাটের পৈঠাগুলোতেই বসেছিলাম। আমি আর ব্যোমকেশ। “নতুন কেস আর সেরকম বুঝি নেই হাতে?” ভয়ে ভয়ে শুধোলুম। -“আর কেস, রাখালবাবুরাও সব খেলা দেখছেন মন-প্রাণ দিয়ে। চোরেরাও ছুটি নিয়েছে সব,” ব্যোমকেশের জবাব। -“আর তুমি, তুমিও যে দিনরাত ঐ ফুটবল নিয়েই মেতে আছো সবসময় – তার বেলা বুঝি কিছু নয়?” আমি ঠেস দিলাম। ব্যোমকেশ সিগারেটের ধোঁয়াটাকে একটা কুণ্ডলী পাকিয়ে গঙ্গার দিকটাতেই ছাড়তে ছাড়তে বললে, “বিনোদন অজিত – বিনোদন, সত্যান্বেষীদেরও যে মাঝে মাঝে ছুটি নেবার দরকার পড়ে। সেটা তাদের বুদ্ধিটাকে শানিয়ে নেবার প্রয়োজনেই। পয়রোকে মনে করো, কেস নেওয়া আর নিজের আরামের ব্যাপারটায় কেমনটা পিটপিটে ছিলেন।” আমি আর কথা বাড়াইনি সেদিন। ব্যোমকেশ এখন বিশ্বকাপ দেখছে রোজ।

 

[২]

 

“ব্রেজিলের কি বিদায় আসন্ন” – “গোষ্ঠীসংঘর্ষে উত্তাল আর্জেন্তিনার সাজঘর, সাম্পাওলি-মেসি দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাঝে পড়ে আহত ফুটবল ঈশ্বর স্বয়ং” – হাতের খবরের কাগজটাকে সশব্দে টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে, ফেলুদা একটা চারমিনার ধরালে। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি এতক্ষণ ফুটবলের খবর পড়ছিলে এত মন দিয়ে?” উত্তর পেলাম না। খানিক পরে নিজেই বললে, “সমাজের ৭০% মানুষের কোনও কাজ না থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে যে বাকি ৩০%এরও বিশ্বকাপ ছাড়াও অন্যান্য বিষয়েতে ইন্টারেস্ট থাকা সম্ভব – সে বিষয়টা কাগজওয়ালারা একেবারেই যে কীভাবে ভুলে মেরে দিতে পারে, সেইটেই আশ্চর্যের।” 

সিধুজ্যাঠার কথাটাই মনে পড়লো আমার। জ্যাঠা বলেছিলেন, “১৯৬৬তে প্রথমবার টেলিভিশনের পর্দাতে বিশ্বকাপ দেখানো শুরু হলে পরে – আজ অন্তত দুশো কোটি মানুষ সারা পৃথিবীতে খেলাগুলোর সরাসরি সম্প্রচার দেখেন। ফাইনাল কি সেমিফাইনালে সংখ্যাটা তিনশো কি সাড়ে তিনশো কোটিতেও গিয়ে দাঁড়ায়। আর এমন একখানা ইভেন্টকে নিয়ে কাগজওয়ালারা হইচই করবে না, তাই কখনও হয়। ফেলুদাকে আর সে কথা বললাম না, একেই চটে আছে – আরও রেগে যাবে তখন 

রহস্যরোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ূর আসবার কথা নয় এখন। আষাঢ় মাস পড়ে গিয়েছে, শারদীয়ার কাগজগুলোতে লেখা জমা দেবার ভারী ব্যস্ততার সময়। শ্রীনাথ রোজকার মত চা দিয়ে গেছে। এমন সময় কলিং বেল। ফেলুদা চায়ের কাপ থেকে মুখ না তুলেই বললো, “লালমোহনবাবু এসেচেন, শ্রীনাথকে আর এক কাপ চা দিতে বলিস।” দরজাটা খুলতেই সেই স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে, ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই জটায়ূর হুকুম, “ভাইটি, চট করে আর এক কাপ চা দিতে বলে দাও তো তোমাদের ঐ জগন্নাথকে, আর হ্যাঁ – বোলো যে রাতের খাওয়াটাও এখানেই সেরে যাবো। আজকে আবার ব্রেজিল – মেক্সিকো, জানেন তো মশাই? আমার টিভিটা আবার কাল রাত থেকেই কেমনটা গড়বড় করছে জানেন, তাই আর কি – না এসে পারলুম না – কেবলে খেলা চলে তো আপনাদের?” ফেলুদাও চারমিনার হাতে হাঁ! আমি শ্রীনাথকে ভেতরে খবরটা দিতে গেলুম।

 

[৩]

 

-“ইডিয়ট। ঐ লো-টা একটা আস্ত ইডিয়ট। যাকে বলে একটা কুরুবক,” টেনিদা চিৎকার করছিলো।

-“যা বলেছো টেনিদা,” আমি যোগ করলাম – “একটাও স্ট্রাইকার নেই, কিছু নেই, স্রেফ টনি ক্রুজ আর বুড়ো টমাস মুলারের ভরসায় উনি বিশ্বকাপ খেলতে এসেছেন। আমাদের বাবলুদা যদি দেখতো একবার …”

– “বাবলুদাটা আবার কেডা,” হাবুল সেন শুধায়।

-“আরে মোহনবাগানের বাবলুদা রে, আমাদের সুব্রত ভটচায,” ক্যাবলা বুঝিয়ে দেয়, “তবে ঐ শেষবেলায় নয়্যারের পাকামোটা নিয়ে তুমি কি বলবে টেনিদা – ওটা তো আর লো-এর দোষ নয়

-“এইডা তুই ঠিক কইছস ক্যাবলা,” হাবুল সেন জুড়ে দেয়, “হালায় আছিলো গোলকিপার, তয় গেলো নাকি পাকামি কইর‍্যা গোল দিতে, নেও – ঠুসে দিলা তো কোরিয়ানগুলান।”

-“উফফ থামবি তোরা এবার, তয় গেলো নাকি পাকামি কইর‍্যা গোল দিতে, এই বাঙালটাকে নিয়ে হয়েছে যত জ্বালা” টেনিদা দুম করে রোয়াকে একটা কিল বসিয়ে দেয়, “আরে অমন পাকামো তো অলিভার কান-টানেরাও দেখিয়েছে এককালে। তখন দলটার মধ্যে একটা জোশ ছিলো, একটা কোঅর্ডিনেশন ছিলো, আর এখন – ইচ্ছে করে হতভাগাদের কানগুলোকে এক চড়ে …”

-“কাজানে পাঠিয়ে দিই” আমি যোগ করলাম।

-“ইয়েস ইয়েস,” আনন্দে টেনিদা থাবড়া মারবার জন্য হাতটা তুলতেই আমি ঠিক সময়ে সরে গিয়েছিলামথাবড়াটা গিয়ে পড়লো হাবুল সেনের পিঠটাতেই। হাবুল চ্যাঁ করে উঠলো। টেনিদা আপন মনে নিজের গালে হাত বুলোতে বুলোতেই হাঁক ছাড়লো, “দু-দশটাকা যা হোক বার কর রে ক্যাবলা, ঐ যে কোয়ালিটির গাড়ি আসছে মোড়ের মাথায় …” ডি লা গ্র্যান্ডি, মেফিস্টোফিলিস!!!

 

[৪]

 

অর্ধনিমীলিত চক্ষে কমলাকান্ত চাহিলেন। বাঙ্গালীগণ বিশ্বকাপ দর্শনে রত। তিনি মৃদুহাস্য করিলেন। নেশাটা জোরদার হইতে বাকি আছে এখনও। তাঁহার চিন্তা নাই। ভবিষ্যতদ্রষ্টা হিসাবে তিনি জানিয়াছেন ২০২৬সালের ট্যুর্নামেন্টে ভারতবর্ষের খেলিবার সম্ভাবনা প্রবল। চিন্তা কেবল একটাই, আর্জেন্তিনা-স্পেন-জার্মানী-ব্রেজিলের বাঙ্গালাভূমিতে স্বদেশপ্রাণ সমর্থকের জোগান মিলিবে তো? কমলাকান্ত নিদ্রা গেলেন। দপ্তর বন্ধ হইলো।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।