বোতল-ছিপির কারবারি থেকে ধনকুবের ব্যবসায়ী‚ তাঁর বিত্তে সাজল কলকাতা‚ তৈরি হল মেডিক্যাল কলেজ

বড্ড বাড়াবাড়ি শুরু করেছে মিশনারিরা | শিক্ষে দেওয়ার নামে কিনা চাপিয়ে দিচ্ছে বিধর্ম | হেস্তনেস্ত করতে সভায় বসেছিলেন কলকাতার তামাম বাবুরা | নেতৃত্বে স্বয়ং কায়স্থ সমাজ শিরোমণি রাধাকান্ত দেব | মিশনারিদের পাল্লা দিতে শুরু করতে হবে পাল্টা স্কুল | হিঁদুয়ানির আচার-বিচার বাঁচিয়ে | এই নিয়ে অনেক বড় বড় কথা হল |

বৈঠক ও আহারাদির শেষে এ বার আসল পর্ব | শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুরু করতে হলে তো অর্থ চাই | যে-ই অর্থানুকুল্যের প্রসঙ্গ এল‚ বাবুদের মুখে কুলুপ | কেউ আর রা কাড়েন না | দানপত্র এ হাত ও হাত ঘুরে থামল এক হাতে | খসখসিয়ে সে হাত লিখল তিনি অনুদান দিচ্ছেন নগদ এক লক্ষ টাকা | তখনও সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হতে কুড়ি বছর বাকি | সুতরাং সহজেই অনুমেয় ওই অর্থের কী মূল্য ছিল |

এরপর বাবুরা কেউ কয়েকশো‚ কেউ বা কয়েক হাজারের নামমাত্র দানে কর্তব্য সেরেছিলেন | সে বৈঠক শেষ হয়েছিল ডামাডোলে | যে হাত ওই বিশাল অঙ্কের টাকা দান করেছিল তাঁর শিক্ষা শুরু হয়েছিল কলকাতার এক পাঠশালায় | তারপর মার্টিন বোলস ইংলিশ স্কুল | শেষে বাবু নিত্যানন্দ সেনের হাই স্কুল | 

মতিলাল স্কুলপাঠ শেষ করতে পেরেছিলেন এই অনেক | মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হারিয়েছিলেন বাবাকে | যে কলকাতায় তাঁর জন্ম ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে‚ সেখানেই ফোর্ট উইলিয়মে ছেলে একটা চাকরিতে ঢুকে যাক | চেয়েছিলেন মতিলালের মা | 

কিন্তু বণিক-শোণিতের ডাক উপেক্ষা করতে পারলেন না মতিলাল | বাবা চৈতন্যচরণ শীল ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী | মতিলালও শুরু করলেন ব্যবসা | পসার জমার আগেই বিয়ে হয়ে গেল মাত্র ১৭ বছর বয়সে | মোহনচরণ দাসের মেয়ে নাগরী দাসীর সঙ্গে | তাঁর জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছিল বিবাহ | শ্বশুরমশাইকে পেলেন অভিভাবক স্বরূপ | তাঁর সঙ্গে উত্তর ও পশ্চিম ভারতে তীর্থে গিয়ে চোখ খুলে গেল মতিলালের | 

ইতিমধ্যে ফোর্ট উইলিয়মে মাঝারি কাজ জুটিয়ে ফেললেন | মনে রাখলেন শ্বশুরের পরামর্শ | শুধু চাকরি নয় | সেখানে ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করলেন | নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস জোগান দিতে থাকলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে | সখ্যতা বাড়িয়ে হয়ে গেলেন শুল্ক দফতরের পরিদর্শক |

মতিলালের প্রথম কারবার ছিল বোতল আর ছিপির | যোগান দিতেন হাডসন সাহেবকে | তিনি ছিলেন বিয়ার রফতানিকারী | ব্রিটিশদের নীল ব্যবসায় অন্যতম সহযোগী ছিলেন মতিলাল | কাপড় কাচার নীলের সঙ্গে তাঁর জহুরি চোখ চিনে নিত উচ্চ গুণমানের রেশম‚ চিনি আর নুন | এতটাই তাঁর দক্ষতা‚ ব্রিটিশরা তাঁকে বানিয়ান পদেই নিয়োগ করে নিল | 

মতিলাল চাকরি ছেড়ে রশি কষে ব্যবসা শুরু করলেন সাহেবদের সঙ্গে | শোনা যায় তাঁর ৩০ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছিল | কিন্তু তিনি দমেননি | পুরোদমে নীল‚ চিনি‚ রেশম‚ চাল‚ নুন রফতানি করতেন ইংল্যান্ডে | আমদানি করতেন সুতীর কাপড় আর লোহা | এতটাই বাড়ল ব্যবসা‚ আস্ত কার্গো জাহাজ কিনে ফেললেন তিনি | বাষ্পচালিত সেই জাহাজে তাঁর কারবারের মালপত্র পারাপার হতো |

সেইসঙ্গে শেয়ার কেনাবেচা‚ নগদ-সুদ-মূলধন বেসাতি‚ সব মিলিয়ে এমন অবস্থা হল যে একটা সময়ে কোম্পানির কাগজ বাজারে কোন দরে বিকোবে তার শেষ কথা ছিলেন মতিলাল শীল | সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে থেকে নগদ-কারবার যে করতেন তাতে তা মোটেও সমকালীন সুদখোরদের বাণিজ্য ছিল না | বরং মতিলাল যেভাবে টাকা ধার দিতেন‚ তা ছিল আজকের ব্যাঙ্কিং ও বীমা ব্যবস্থার পূর্বসুরী | ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠায় যে কজন বঙ্গসন্তান উদ্যোগী হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে মতিলাল অন্যতম | ওরিয়েন্টাল বীমা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতেও তিনি ছিলেন প্রধান অনুঘটক |

বিত্তে তিনি ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং রুস্তমজি কাউয়াসজির সমকক্ষ | তাঁকে বলা হতো রথসচাইল্ড অফ ক্যালকাটা  | তবে একথাও মনে রাখতে হবে তাঁর মতো সৎ ও বিনয়ী ব্যবসায়ী ছিলেন বিরল | কোনওদিনও অসৎ পথে বা কাউকে ঠকিয়ে এক পয়সাও উপার্জন করেননি | এই দরাজ শংসাপত্র দিয়েছিলেন স্বয়ং শিবনাথ শাস্ত্রী | 

এক হাতে উপার্জন করেছেন‚ অন্য হাতে ব্যয় করেছেন সমাজকল্যাণে | হিসেবহীন পৃষ্ঠপোষকতায় সাজিয়েছিলেন কলকাতাকে | ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে বেলঘরিয়ায় তৈরি করেছিলেন ভিক্ষাজীবীদের জন্য আশ্রম | দৈনিক পাত পড়ত অন্তত পাঁচশো জনের | এখনও আছে সেই আশ্রম | যেমন আছে গঙ্গাপাড়ে বাবু মতিলাল শীল ঘাট | 

অবশ্য এত আতসকাচ দিয়ে খুঁজতে হবে না | কলকাতায় জাজ্বল্যমান মেডিক্যাল কলেজ দেখলেই মনে পড়বে তাঁর নাম | যে জমির উপর কলেজ ও হাসপাতাল দাঁড়িয়ে পুরোটাই ছিল বাবু মতিলাল শীলের | মহৎ উদ্দেশে দান করেছিলেন ব্রিটিশ সরকারকে | পরিবর্তে তাঁর নামে যে ওয়ার্ড করেছিল সরকার তাতে নেটিভ লোকজন চিকিৎসা পরিষেবা পেত | এক নেটিভের দান বাকি নেটিভদের কল্যাণে‚ কতকটা সেরকম | এরপরেও আরও এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি | সেখানে ফিমেল ওয়ার্ড শুরুর জন্য |

১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে পথ চলা শুরু করল বাবু মতিলাল শীল ফ্রি কলেজ | পরে এর সঙ্গে যোগ হয় স্কুলও | মিশনারী-বিমুখ হিন্দু ছাত্ররা যাতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে‚ তাই এই উদ্যোগ | তবে শিক্ষাদান ও পাঠ্যক্রম ছিল আধুনিক | প্রথমে ফাদার ফ্রান্সিস জেভিয়ারের ( আজকের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ )প্রতিষ্ঠান দেখত এর পঠন-পাঠন | কিন্তু নির্দেশ ছিল ধর্মের দিক দিয়ে ছাত্রদের প্রভাবিত করা যাবে না | যদিও পরে অভিযোগ ওঠে‚ জেসুইট পাদ্রীরা সে নিয়ম মানছেন না | তাই পরে মতিলাল শীল পরিচালনার দায়িত্ব দেন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জিকে | কলেজের ব্যয় তখনকার দিনে বার্ষিক ১২ হাজার টাকা আসত মতিলাল শীলের ট্রাস্ট থেকে | পড়ুয়া পিছু নেওয়া হতো বার্ষিক এক টাকা সাম্মানিক ব্যয় | এছাড়াও বহু চ্যারিটেবল উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মতিলাল | আর্থিক সাহায্য করেছিলেন হিন্দু কলেজ-সহ অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে |

তৎকালীন বঙ্গীয় বাবুসমাজ ছিল দু ভাগে বিভক্ত | একদল উদারপন্থী‚ রামমোহন রায়ের অনুগামী | অন্যদল রক্ষণশীল | তাঁদের নেতা রাধাকান্ত দেব | দ্বিতীয় দল ছিল অনেক বেশি ভারী | মতিলাল শীলও ছিলেন আদ্যোপান্ত গোঁড়া | তবে একটি বিষয়ে তিনি পুরোমাত্রায় রামমোহনের অনুগামী ছিলেন | তা হল‚ নারীকল্যাণ | সর্বতো ভাবে সাহায্য করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়কে‚ তাঁর সতীদাহ প্রথা রদ আন্দোলনে | সোচ্চার হয়েছিলেন বাল্যবিবাহ রোধে এবং বিধবা বিবাহ প্রচলনে | প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন‚ যে বাঙালি তরুণ বিধবা বিবাহ করবেন তাঁকে তিনি নগদ ১ হাজার টাকা যৌতুক দেবেন | মনে রাখবেন‚ মতিলাল যে সময় প্রয়াত হন‚ সেই ১৮৫৪-র ২০ মে-এর আরও দু বছর পরে পাশ হয় বিধবা বিবাহ আইন | তাঁর এই দূরদর্শিতা কি আমাদের মনে একবারের জন্যেও আসে‚ যখন আমাদের পা পড়ে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে মতি শীল স্ট্রিটে ? 

1 COMMENT

  1. খুব ভালো লাগলো ও সমৃদ্ধ হলাম এই তথ্য আহরণ করে। ধন্যবাদ।

    তবে, সব বাবু বা জমিদার দের ব্যাপারেই বললেন, দেখলাম বাবু রায় রাজচন্দ্র দাস ও রানী রাসমণির ব্যাপারে তো কোনোদিন কিছু বলেননি!!

    বাবু রাজচন্দ্র দাসের গৌরব ও ইতিহাস এই মতিলাল শীল দের থেকেও অনেক বেশি। আর রানী মায়ের ইতিহাস তো জানাই আছে।

    একদম তাদের নিয়ে তথ্য দিলে ভালো লাগতো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here