তরুণ শ্রমণকে বশ করতে ব্যর্থ হয়ে নিজেও সন্ন্যাস নিয়েছিলেন রূপের আগুন নগরবধূ আম্রপালী

ঘন আমবনে গাছের নিচে এক পরিত্যক্ত কন্যাশিশুকে খুঁজে পেয়েছিল দম্পতি | সন্তানস্নেহে তাকে বড় করতে থাকেন তাঁরা | কিন্তু সেই বালিকা কৈশোরে পা দিতে না দিতেই নিদারুণ সমস্যায় পড়লেন বাবা মা | সমস্যার কারণ মেয়ের আগুনে রূপ | সেই আগুনে ঝাঁপ দিতে চায় সবাই | গ্রামের মহাজন‚ শহরের বণিক‚ জনপদের রাজা‚ নগরের শ্রেষ্ঠী‚ কে নেই তাঁর প্রণয়ীর তালিকায় | সাধারণ মানুষ তো একবার তার দর্শন পেলেই কৃতার্থ হয়ে যায় |

অসামান্য সুন্দরী আম্রপালীকে নিয়ে জর্জরিত হয়ে পড়লেন তাঁর নিতান্ত সাধারণ বিত্তের বাবা মা | আমগাছের নিচে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন বলে এই নামই রাখা হয়েছিল | সংস্কৃতে আম্র মানে আম এবং পল্লব হল পাতা | অর্থাৎ আমগাছের নবীন পাতা |   

আম্রপালী বা অম্বাপালিকে নিয়ে যুদ্ধ বেধে গেল | খ্রিস্টের জন্মের ৫০০-৬০০ বছর আগে | ভারতবর্ষের বৈশালী রাজ্যে | আজকের বিহারের বৈশালী ছিল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের অন্যতম সমৃদ্ধ জনপদ | ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় লিচ্ছবিদের রাজধানী | লিচ্ছবি-সহ মোট আটটি ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় মিলে গড়ে তুলেছিল বজ্জিয়ান গণতন্ত্র |

বিশ্বের প্রাচীন গণতন্ত্রের মধ্যে বিখ্যাত বৈশালী | সেখানে রাজা নির্বাচিত হতো নির্বাচনের মাধ্যমে | ছিল না পরিবারতন্ত্র | যোগ্য হলে তবেই নির্বাচিত হয়ে সিংহাসনে বসার সুযোগ মিলত |

কথিত‚ বৈশালীর এক রাজা মনুদেব হত্যা করেছিলেন আম্রপালীর বাল্যপ্রেমিক পুষ্পকুমারকে | সে রাতেই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল আম্রপালী-পুষ্পকুমারের | এরপর সভা বসে বৈশালী সংসদে | গণতন্ত্র বিধান দেয়‚ আম্রপালী কোনওদিন বিয়ে করতে পারবেন না | কারণ এত রূপ যৌবন নিয়ে তিনি কোনও একমাত্র পুরুষের ভোগ্যা হতে পারেন না |

গণতন্ত্রের সিদ্ধান্ত গৃহীত হল‚ আম্রপালী হবেন বৈশালীর নগরবধূ | অর্থাৎ বহু পুরুষের ভোগ্যা | বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থে তাঁকে জনপদকল্যাণী বলেও উল্লেখ করা হয়েছে | এই জনপদকল্যাণী বা নগরবধূ কিন্তু সামান্য গণিকা বা দেহপসারিণী নন | তিনি হবেন নৃত্যগীতে পারদর্শী‚ অভিজাত আদবকায়দায় রপ্ত এক সুন্দরী | উচ্চবংশের পুরুষই পেতে পারবেন তাঁর সঙ্গসুখ | জনপদকল্যাণী নিজেই নিজের সঙ্গী নির্বাচন করতে পারবেন | কিন্তু বিয়ে কোনওদিনও নয় |

শোনা যায়‚ আম্রপালীর সঙ্গে এক নিশিযাপনের মূল্য ছিল ৫০ স্বর্ণ কার্ষাপণ | তাবড় রাজাদের থেকে কম ছিল না তাঁর অগাধ সম্পদ | জনপদকল্যাণী হওয়ার সুবাদে তিনি ছিলেন বৈশালীর রাজনর্তকী | সুবিশাল উদ্যান‚ মর্মর অট্টালিকা ছিল তাঁর সেবায় নির্মিত |

আম্রপালীর রূপের আগুনে ঝাঁপ দিতে চাইলেন মগধরাজ বিম্বিসার | এদিকে বৈশালী আর মগধ ঘোর শত্রু | শত্রুপক্ষের নগরবধূর কাছে তো আর কামাতুর হয়ে যাওয়া যায় না | সম্রাট বিম্বিসার বৈশালী আক্রমণ করলেন | নিজে আশ্রয় নিলেন আম্রপালীর প্রাসাদে | আম্রপালীর রূপে বিম্বিসার এবং সঙ্গীতজ্ঞ বিম্বিসারের গুণে আম্রপালী ভেসে গেলেন | কিন্তু যখন জানতে পারলেন বিম্বিসার তছনছ করে দিয়েছেন বৈশালী‚ আম্রপালী দৃঢ় কণ্ঠে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবেন বলেন | যদি না তিনি বৈশালীকে মুক্ত করেন |

প্রেয়সীর অনমনীয়তায় বৈশালীকে মুক্ত করেছিলেন মগধরাজ | কিন্তু একে তাঁর দুর্বলতা বলে ধরে নিয়েছিল শত্রুভূমি বৈশালী | দুই রাজ্যের দ্বন্দ্ব আটকাতে পারেনি নৃপতি-নগরবধূর প্রেম | তাঁদের পুত্র ছিল বিমল কোদন্ন | বিম্বিসারের বিবাহ-প্রস্তাব হেলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আম্রপালী | তিনি জানতেন তা হলে দুই শত্রুরাজ্যের যুদ্ধ অনিবার্য |

বিম্বিসারের আর এক পুত্র তথা তাঁর উত্তরাধিকারী ইতিহাসকুখ্যাত অজাতশত্রু আক্রমণ করেছিলেন বৈশালী | তাঁর হাতে বন্দি হন আম্রপালী | বন্দিনী নগরবধূর রূপে মুগ্ধ অজাতশত্রু পুড়িয়ে দিয়েছিলেন গোটা বৈশালী | শুধু আম্রপালীর কারাগার বাদ দিয়ে | নগরবাসীর এই অবস্থা দেখে বিধ্বস্ত হয়েছিলেন বৈশালীর জনপদ কল্যাণী | কিন্তু তবু তিনি মগধ রাজাদের কুক্ষিগত হননি | 

এহেন আম্রপালী এক বর্ষাভেজা দিনে প্রাসাদের অলিন্দ থেকে দেখলেন এক সন্ন্যাসীকে | তাঁর রূপে মুগ্ধ হলেন রাজনর্তকী | ভাবলেন‚ একেই বশ করবেন | দেশ বিদেশের পুরুষসিংহরা তাঁর পায়ের কাছে পড়ে থাকেন | আর এ তো এক তরুণ সন্ন্যাসী | আম্রপালী খবর পেলেন বৈশালীতে এসেছেন বৃদ্ধ তথাগত | সঙ্গে কয়েকশো শ্রমণ | বর্ষার চারমাস এখানেই কাটাবেন তাঁরা | কারণ বর্ষায় তাঁরা পরিব্রাজন করেন না | আশ্রয় নেন কোনও নগরের উদ্যানে‚ নগরবাসীর গৃহে |

এই তরুণ সন্ন্যাসীও এক বৌদ্ধ শ্রমণ | ভিক্ষা ও আশ্রয়প্রার্থী | আম্রপালী নিজে তাঁকে ভিক্ষা দিলেন | বললেন তাঁর প্রাসাদে বর্ষা অতিবাহিত করতে | ভিক্ষু বললেন‚ তথাগতর আদেশ ছাড়া তিনি আশ্রয়গ্রহণ করতে অপারগ |

বৈশালীতে যে শ্রেষ্ঠীর বাড়িতে আতিথ্য নিয়েছিলেন তথাগত বুদ্ধ‚ সেখানে গিয়ে তাঁর কাছে অনুমতি চাইলেন তরুণ শ্রমণ | সবাইকে বিস্মিত করে অনুমতি দিলেন বুদ্ধদেব | এই নিয়ে সঙ্ঘে আলোচনা শুরু হল | এক নগরবধূর বাড়িতে থাকবেন বৌদ্ধ শ্রমণ ?

তাঁদের বুদ্ধ বললেন‚ ওই শ্রমণের চোখে তিনি কোনও কাম দেখেননি | তিনি নিশ্চিত বর্ষা অতিবাহিত হলে শ্রমণ নিষ্কলুষ হয়েই তাঁর কাছে ফিরবেন | এ এক অগ্নিপরীক্ষা | তিনি নিশ্চিত এতে জয়ী হবেন শ্রমণই | কেউ তাঁর কথায় আশ্বস্ত হলেন না |

বর্ষা কাটলে একে একে জড়ো হলেন শ্রমণরা | সবাই আবার যাত্রা শুরু করবেন কোনও না কোনও সঙ্ঘের উদ্দেশে | বৈশালীতে যাঁরা ছিলেন সমবেত হলেন বুদ্ধর কাছে | এলেন সেই তরুণ ভিক্ষু | নগরবধূর প্রাসাদে চার মাস কাটিয়ে | আগের মতোই নিষ্কলুষ | তিনি দাঁড়ালেন তথাগতর সামনে |

তাঁর পিছন পিছন এলেন আম্রপালী | যাঁর গায়ের রং ছিল দুধের মতো সাদা | পাতলা ঠোঁট বেদানার মতো লাল | সমুদ্রগভীর নাভিদেশ, মরালগ্রীবার ভঙ্গিমা দেখার জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতেন রাজপুরুষরা | রূপযৌবনে পরিপূর্ণা সেই আম্রপালীর পরনে কাষায় বস্ত্র | চাঁপাফুলের মতো আঙুল জড়ো করে তিনি প্রণাম করলেন তথাগত বুদ্ধকে | 

জানালেন‚ তিনি তরুণ শ্রমণকে প্রলুব্ধ করতে কোনও চেষ্টা বাকি রাখেননি | কিন্তু এই প্রথম পুরুষকে বশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালী | উল্টে আম্রপালীকেই বশ করেছেন সর্বত্যাগী তরুণ শ্রমণ | আজ‚ সর্বস্ব ত্যাগ করে তথাগত বুদ্ধর চরণে আশ্রয় চান আম্রপালী | বাকি জীবন কাটাতে চান প্রব্যজ্যা নিয়ে | নগরবধূ আম্রপালীর সঙ্ঘে যোগদানের আগে তাঁর উদ্যানে অতিথি হয়ে তাঁর হাতে অন্নগ্রহণ করেছিলেন তথাগত বুদ্ধ | রক্ষণশীল সমালোচকদের মুখের উপর জবাব দিয়ে |

নিজের সব সম্পত্তি‚ প্রাসাদ‚ উদ্যান বৌদ্ধ সঙ্ঘে দান করে দিয়েছিলেন আম্রপালী | মোহমুক্ত হয়ে বাকি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বৌদ্ধ সঙ্ঘারামে | তিনি তথাগতকে বলেন ভিক্ষুণীদেরও সঙ্ঘে নিতে | কিন্তু ভিক্ষুদের মনসংযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় রাজি ছিলেন না বুদ্ধ | তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করেন আম্রপালী | বৌদ্ধ শ্রমণদের মনসংযোগ এতই ঠুনকো যে এক নারীর জন্য তা ভেঙে পড়বে ? এরপর আর রাজি না হয়ে পারেননি বুদ্ধ তথাগত | মাতা গৌতমী‚ স্ত্রী যশোধরাও তাঁকে একই অনুরোধ করেছিলেন | জীবনের অর্ধাংশ বৌদ্ধ সঙ্ঘেই অর্পণ করেছিলেন আম্রপালী | তাঁর পুত্র বিমল কোদন্নও পরবর্তীকালে বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়েছিলেন |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here