গ্রামের মুদির দোকানির ছেলেই পরে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের প্রাণপুরুষ

5459

সাহার ছেলে দোকানে বসবে | এর বেশি আর কী হবে ? আজন্ম এটাই শুনে এসেছিল ছেলেটি | বসেওছিল হাতে দাড়িপাল্লা নিয়ে | টানাটানির সংসারে এ ছাড়া আর গতি ছিল না | কিন্তু মন পড়ে থাকত মুদির দোকানের সের-আনা-ছটাক-পাই হিসেবের বাইরে‚ সুদূর মহাকাশে |

নীল আকাশ তো দূর অস্ত | স্কুলের চৌকাঠই দেখা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছিল মেঘনাদের | নামখানি গালভরা হলে কী হবে ! অভাবী সংসারে বাবা মায়ের পঞ্চম সন্তান | মেঘের আড়াল থেকে বাইরে বের হয়েই যুদ্ধ করতে হতো তাঁকে | অসংখ্য লক্ষ্মণের শক্তিশেলের বিরুদ্ধে |

অবিভক্ত ভারতের ঢাকার অনামী গ্রাম শেওড়াতলি | সেখানেই জন্ম ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর | বাবা জগন্নাথ সাহা মামুলি মুদি দোকানি | মা ভুবনমোহিনী ঘরকন্না নিয়েই ব্যস্ত | পঞ্চম সন্তান মেঘনাদের লেখাপড়া হতোই না যদি না থাকতেন অনন্ত ডাক্তার |

সহৃদয় এই প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছিলেন মেঘনাদ | পরববর্তীকালে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী হয়েও আজীবন ঋণস্বীকার করে গেছেন ডক্টর অনন্ত কুমার দাসের প্রতি | 

মেধাবী মেঘনাদ জলপানি বৃত্তি পেয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে | কিন্তু স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে বহিষ্কৃত হন | তারপর ভর্তি হন কিশোরীলাল জুবিলি স্কুলে | ১৯০৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পূর্ববঙ্গের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম | বাংলা ইংরেজি সংস্কৃত এবং গণিতে সর্বোচ্চ নম্বর | দু বছর পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান | প্রথম হয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বোস | ১৯১৫ সালে দুই সতীর্থই স্নাতকোত্তরে প্রথম | ফলিত গণিতে মেঘনাদ সাহা এবং বিশুদ্ধ গণিতে সত্যেন্দ্রনাথ বোস |

তাঁর ছাত্রাবস্থায় খ্যাতির শীর্ষে ছিলেন জগদীশ চন্দ্র বোস‚ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়-এর মতো বিজ্ঞানসাধকরা | দুজনকেই শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন মেঘনাদ সাহা | তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন মেঘনাদ সাহা‚ সত্যেন্দ্রনাথ বোস-এর মতো পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীরা | 

থার্মাল আয়োনাইজেশন এবং সাহা ইক্যুয়েশন-এর প্রবক্তা বিজ্ঞানসাধক মেঘনাদ সাহা এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন ১৯২৩ থেকে ১৯৩৮ অবধি | পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও ফ্যাকাল্টি ছিলেন ১৯৫৬ সাল অবধি‚ আমৃত্যু | তার আগেই ১৯২৭ সালে মুকুটে যোগ হয়েছে রয়্যাল সোসাইটির সদস্যপদ | 

পরিণত বয়সে আকৃষ্ট হন নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের প্রতি | তার ফসল হল কলকাতায় ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স | যাকে এখন সবাই চেনে সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নামে | পাশাপাশি ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স‚ ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি‚ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন |

একাধিকবার নোবেল পুরস্কার পেতে পেতেও পাননি এই ঢাকাইয়া অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট | অন্তত ছবার তাঁর কাজ মনোনয়নের জন্য পাঠানো হয়েছিল নোবেল কমিটির কাছে | কিন্তু প্রতিবারই নোবেল কমিটির মনে হয়েছে মেঘনাদ সাহার কাজ বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগমাত্র | বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার নয় !

বিদেশ থেকে নোবেল পুরস্কার পাননি | কিন্তু পেয়েছেন দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালবাসা | বালক বয়সে স্বদেশী আন্দোলন‚ যুবা বয়সে অনুশীলন সমিতি | স্বাধীন ভারতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ | দামোদর ভ্যালি প্রকল্প-সহ একাধিক নদী পরিকল্পনার প্রাণপুরুষ তিনি | ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন নিরীশ্বরবাদী | কাজ ও গবেষণাই ছিল তাঁর তপস্যা | বিজ্ঞানপাগল স্বামীর কাজই যেন ছিল স্ত্রী রাধারানির সতীন | বিজ্ঞানসেবা করতে করতেই চলে গেলেন প্রবাদপ্রতিম এই বিজ্ঞানী | ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি‚ হৃদরোগে‚ মাত্র ৬২ বছর বয়সে | 

Advertisements

1 COMMENT

  1. খুব ভালো লাগল!শুধু একটা বিষয় একটু ধোঁয়াশা থেকে গেল। কলকাতা ছেড়ে এলাহাবাদে যেতে হয়েছিল কেন তাঁকে? কারা কারা তাঁকে নোবেল এ মোনোনয়ন করেছিলেন? এটা জানাটাও প্রয়োজন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.