পর্দানসীন বেগম থেকে বিদ্রোহের নেত্রী হয়েছিলেন অতীতের নগণ্য এক হারেমকন্যা

7171

দরিদ্র পরিবারের এক কন্যা থেকে নর্তকী | সেখান থেকে রানি এবং নেত্রী হয়েছিলেন বেগম হজরত মহল | ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ফৈজাবাদে এক ক্রীতদাসের ঘরে তাঁর জন্ম | অভিজাত গুলাম আলি খানের পরিবারে দাস ছিলেন তাঁর বাবা | জন্মের পরে হজরতের নাম দেওয়া হয়েছিল মুহম্মদি খানুম | অভাবের তাড়নায় বিক্রি হয়ে গিয়েছিলেন মুহম্মদি | নতুন জায়গা হল অওয়ধি নবাবের হারেমে | খাওয়াসিন বা বাঁদী হিসেবে |

কিশোরী মুহম্মদি ছিলেন সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী | নজর পড়ে গিয়েছিলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহর | তিনি তাঁকে নিয়ে নিলেন পরীখানায় | এই পরীখানা বানিয়েছিলেন নবাব নিজেই | হারেম থেকে বাছাই বাঁদীদের নাচগান শেখানো হতো | পারদর্শী হয়ে তাঁরা শিল্পকলা পরিবেশন করতেন রাজসভায় | 

পরীখানায় মুহম্মদির উন্নতি হতে লাগল তরতরিয়ে | কদিনের মধ্যেই হলেন মহক পরী | পরী প্রধানা হয়ে বেশিদিন থাকতে হল না | হয়ে গেলেন নবাবের ‘ মুতাহ ‘ | এই মুতাহ হল চুক্তিভিত্তিক স্ত্রী | তাঁরা বেগম ও বাইজির মাঝামাঝি একটা ত্রিশঙ্কু অবস্থানে ঝুলতেন | মুসলিম অভিজাতদের এরকম অনেক মুতাহ থাকত | তাঁদের মধ্যে যাঁরা পুত্রসন্তানের জন্ম দিতেন‚ তাঁরা বেগম পদে উন্নীত হতেন | প্রাসাদে তাঁদের জন্য তৈরি হতো মহল | পুত্র বিরজিস কাদরার জন্মের পরে মুতাহ মুহাম্মদি হলেন বেগম হজরত মহল | অওয়ধি নবাবের অফিশিয়াল ওয়াইফ |

তাঁর রূপেগুণে মুগ্ধ ছিলেন নবাব | ফলে তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন নবাবের বাকি বেগমরা | মুতাহ থেকে বেগম হওয়া হজরতকে মোটেও মেনে নিতে পারেননি ওয়াজিদ আলি শাহ-র মা মালিকা কিশওয়ার | কিন্তু হজরত তাঁর স্বামীর এতই প্রিয় ছিলেন কেউ কিছু সুবিধে করতে পারেনি |

১৮৫৬ সালে লখনৌ থেকে নির্বাসিত হলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ | রাজপাট হারিয়ে চলে গেলেন কলকাতা | তাঁর মা পাড়ি দিয়েছিলেন ইংল্যান্ড | রানি ভিক্টোরিয়ার কাছে ছেলের সিংহাসন ভিক্ষা করতে | কলকাতায় ওয়াজিদ আলি শাহ স্ত্রী সন্তান পরিজন দাসদাসী-সহ মোট ৫০ জনকে নিয়ে এসেছিলেন | কিন্তু তাঁর বহু স্ত্রী
মুতাহদের কলকাতায় আনা সম্ভব হয়নি | নবাব নিজেও ভেবেছিলেন তাঁর কলকাতাবাস সাময়িক |

লখনৌয়ে রয়ে গিয়েছিলেন বেগম হজরত মহল | লখনৌ মসনদের উত্তরাধিকারী তাঁর পুত্র বিরজিসকে নিয়ে | সেই সময়ে সিপাহি বিদ্রোহ ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে দাবানলের মতো | ১৮৫৭-র ৮ এপ্রিল বিদ্রোহী মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসিতে সেই আন্দোলনের আগুনে ঘি পড়ে |

ধিকিধিকি জ্বলছিল আগুন লখনৌয়ে | নবাব মসনদ হারানোয় সব বাঁধ ভাঙল | যুবরাজ বিরজিস মাত্র বারো বছরের | তাই বেগম হজরত মহল হলেন বিদ্রোহীদের নেত্রী | তিনি প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু মুসলিম শক্তি একত্র করতে | মহিলাদের আহ্বান জনালেন বাহিনীতে যোগ দিতে | হজরত মহলের উদ্যোগে একত্রিত হল সেনাবাহিনীর তিন শাখা | সেনাপ্রধান ছিলেন হিন্দু রাজা জয়লাল সিং | মহিলাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন উদা দেবী | এই দলিত যোদ্ধা বীরক্রমে যুদ্ধ করেছিলেন ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে | 

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাথমিক ভাবে সফল হলেন হজরত মহল | চিফ কমিশনার হেনরি লরেন্স-সমেত লখনৌয়ের সব ইউরোপীয়ানদের রেসিডেন্সিতে বন্দি করে ফেলল বাহিনী | ক্রমাগত হানায় প্রাণ হারালেন লরেন্স | রেসিডেন্সিতেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হল | এর সঙ্গে পুরো লখনৌ নগরী সিজ করে ফেললেন হজরত মহল | ১৮৫৭ সালে মে থেকে নভেম্বর‚ টানা সত মাস অবরুদ্ধ ছিল লখনৌ নগরী |

বার্ষিক এক লক্ষ টাকা খোরপোশের প্রস্তাব ফিরিয়ে ব্রিটিশদের সঙ্গে সন্ধি করলেন না বেগম | কিন্তু তাঁর সব প্রচেষ্টা ধসে গেল যখন নেপালের জং বাহাদুর রানা গোর্খা বাহিনী পাঠালেন ব্রিটিশদের | বেগমের সেনারাও আর ধৈর্য ধরতে পারছিল না |  অনেকেই আবার ব্রিটিশ ফৌজে চলে গেল | অবরোধ ধরে রাখা গেল না | কোনওমতে লখনৌয়ের বাইরে মুসা বাগে পালিয়ে যান বেগম হজরত মহল | এর পরেই কাইজারবাগ প্রাসাদ দখল করে ব্রিটিশরা | 

১৮৫৮-র ১৫ মার্চ নেপাল সীমান্তে পালাতে সক্ষম হলেন বেগম | সেখানে তাঁর সঙ্গী হলেন বিদ্রোহের আর এক ব্যর্থ নেতা‚ নানাসাহেব | তখনও আশাহত নন বেগম হজরত মহল | যে জং বাহাদুর বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন বিদ্রোহে‚ তিনিই নেপালে আশ্রয় দেন বেগম হজরত মহলকে | বেগমের সঙ্গে ছিল ছেলে বিরজিস‚ নিজের অলঙ্কার ও কয়েকজন বিশ্বস্ত পরিচারক ও বাঁদী | 

তাঁকে বহুবার দেশে ফিরতে বলেছিল ব্রিটিশবাহিনী | কিন্তু তাঁদের কোনও প্রতিশ্রুতি কানে তোলেননি বেগম | তিনি বিশ্বাসই করতেন না ব্রিটিশকে | চেয়েছিলেন নিজের শর্তে ফিরতে | তা যখন হয়নি‚ তিনি জন্মভূমিতে ফেরেননি | স্বাধীনভাবে রয়ে গিয়েছিলেন প্রবাসেই | তবে হিন্দুস্তান তাঁকে ছেড়ে চলে যায়নি | কাঠমান্ডুতে বানিয়েছিলেন হিন্দুস্তান মসজিদ | তার পাশেই সমাধিস্থ করা হয় তাঁকে‚ ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে |

বেগম না ফিরলেও তাঁর ছেলে ফিরেছিলেন | ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে এসেছিলেন বিরজিস | বাবা ওয়াজিদ আলির মৃত্যুর পর | ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় এক ভোজসভায় রহস্যমৃত্যু হয় বিরজিস ও তাঁর পুত্র খুরশিদের | তবে রক্ষা পান বিরজিসের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মেহতাব আরা | অন্তর্ঘাত হচ্ছে এরকম সন্দেহ করে তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে গা ঢাকা দেন | বহুবছর পরে প্রকশ্যে আসেন বিরজিস ও মেহতাবের পুত্র মেহর কাদর | তিনিই নিজেকে ওয়াজিদ অলি শাহ-র আইনত উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করেন | মেহর কাদর তথা বেগম হজরত মহলের উত্তরসুরিরা এখনও বসবাস করেন কলকাতায় | সময়ের থেকে বহু ক্রোশ এগিয়ে থাকা বেগম হজরত মহলের বসবাস এখন ইতিহাস বইয়ের ফুটনোট হয়ে |    

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.