পর্দানসীন বেগম থেকে বিদ্রোহের নেত্রী হয়েছিলেন অতীতের নগণ্য এক হারেমকন্যা

পর্দানসীন বেগম থেকে বিদ্রোহের নেত্রী হয়েছিলেন অতীতের নগণ্য এক হারেমকন্যা

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

দরিদ্র পরিবারের এক কন্যা থেকে নর্তকী | সেখান থেকে রানি এবং নেত্রী হয়েছিলেন বেগম হজরত মহল | ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ফৈজাবাদে এক ক্রীতদাসের ঘরে তাঁর জন্ম | অভিজাত গুলাম আলি খানের পরিবারে দাস ছিলেন তাঁর বাবা | জন্মের পরে হজরতের নাম দেওয়া হয়েছিল মুহম্মদি খানুম | অভাবের তাড়নায় বিক্রি হয়ে গিয়েছিলেন মুহম্মদি | নতুন জায়গা হল অওয়ধি নবাবের হারেমে | খাওয়াসিন বা বাঁদী হিসেবে |

কিশোরী মুহম্মদি ছিলেন সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী | নজর পড়ে গিয়েছিলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহর | তিনি তাঁকে নিয়ে নিলেন পরীখানায় | এই পরীখানা বানিয়েছিলেন নবাব নিজেই | হারেম থেকে বাছাই বাঁদীদের নাচগান শেখানো হতো | পারদর্শী হয়ে তাঁরা শিল্পকলা পরিবেশন করতেন রাজসভায় | 

পরীখানায় মুহম্মদির উন্নতি হতে লাগল তরতরিয়ে | কদিনের মধ্যেই হলেন মহক পরী | পরী প্রধানা হয়ে বেশিদিন থাকতে হল না | হয়ে গেলেন নবাবের ‘ মুতাহ ‘ | এই মুতাহ হল চুক্তিভিত্তিক স্ত্রী | তাঁরা বেগম ও বাইজির মাঝামাঝি একটা ত্রিশঙ্কু অবস্থানে ঝুলতেন | মুসলিম অভিজাতদের এরকম অনেক মুতাহ থাকত | তাঁদের মধ্যে যাঁরা পুত্রসন্তানের জন্ম দিতেন‚ তাঁরা বেগম পদে উন্নীত হতেন | প্রাসাদে তাঁদের জন্য তৈরি হতো মহল | পুত্র বিরজিস কাদরার জন্মের পরে মুতাহ মুহাম্মদি হলেন বেগম হজরত মহল | অওয়ধি নবাবের অফিশিয়াল ওয়াইফ |

তাঁর রূপেগুণে মুগ্ধ ছিলেন নবাব | ফলে তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন নবাবের বাকি বেগমরা | মুতাহ থেকে বেগম হওয়া হজরতকে মোটেও মেনে নিতে পারেননি ওয়াজিদ আলি শাহ-র মা মালিকা কিশওয়ার | কিন্তু হজরত তাঁর স্বামীর এতই প্রিয় ছিলেন কেউ কিছু সুবিধে করতে পারেনি |

১৮৫৬ সালে লখনৌ থেকে নির্বাসিত হলেন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ | রাজপাট হারিয়ে চলে গেলেন কলকাতা | তাঁর মা পাড়ি দিয়েছিলেন ইংল্যান্ড | রানি ভিক্টোরিয়ার কাছে ছেলের সিংহাসন ভিক্ষা করতে | কলকাতায় ওয়াজিদ আলি শাহ স্ত্রী সন্তান পরিজন দাসদাসী-সহ মোট ৫০ জনকে নিয়ে এসেছিলেন | কিন্তু তাঁর বহু স্ত্রী
মুতাহদের কলকাতায় আনা সম্ভব হয়নি | নবাব নিজেও ভেবেছিলেন তাঁর কলকাতাবাস সাময়িক |

লখনৌয়ে রয়ে গিয়েছিলেন বেগম হজরত মহল | লখনৌ মসনদের উত্তরাধিকারী তাঁর পুত্র বিরজিসকে নিয়ে | সেই সময়ে সিপাহি বিদ্রোহ ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে দাবানলের মতো | ১৮৫৭-র ৮ এপ্রিল বিদ্রোহী মঙ্গল পাণ্ডের ফাঁসিতে সেই আন্দোলনের আগুনে ঘি পড়ে |

ধিকিধিকি জ্বলছিল আগুন লখনৌয়ে | নবাব মসনদ হারানোয় সব বাঁধ ভাঙল | যুবরাজ বিরজিস মাত্র বারো বছরের | তাই বেগম হজরত মহল হলেন বিদ্রোহীদের নেত্রী | তিনি প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু মুসলিম শক্তি একত্র করতে | মহিলাদের আহ্বান জনালেন বাহিনীতে যোগ দিতে | হজরত মহলের উদ্যোগে একত্রিত হল সেনাবাহিনীর তিন শাখা | সেনাপ্রধান ছিলেন হিন্দু রাজা জয়লাল সিং | মহিলাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন উদা দেবী | এই দলিত যোদ্ধা বীরক্রমে যুদ্ধ করেছিলেন ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে | 

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাথমিক ভাবে সফল হলেন হজরত মহল | চিফ কমিশনার হেনরি লরেন্স-সমেত লখনৌয়ের সব ইউরোপীয়ানদের রেসিডেন্সিতে বন্দি করে ফেলল বাহিনী | ক্রমাগত হানায় প্রাণ হারালেন লরেন্স | রেসিডেন্সিতেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হল | এর সঙ্গে পুরো লখনৌ নগরী সিজ করে ফেললেন হজরত মহল | ১৮৫৭ সালে মে থেকে নভেম্বর‚ টানা সত মাস অবরুদ্ধ ছিল লখনৌ নগরী |

বার্ষিক এক লক্ষ টাকা খোরপোশের প্রস্তাব ফিরিয়ে ব্রিটিশদের সঙ্গে সন্ধি করলেন না বেগম | কিন্তু তাঁর সব প্রচেষ্টা ধসে গেল যখন নেপালের জং বাহাদুর রানা গোর্খা বাহিনী পাঠালেন ব্রিটিশদের | বেগমের সেনারাও আর ধৈর্য ধরতে পারছিল না |  অনেকেই আবার ব্রিটিশ ফৌজে চলে গেল | অবরোধ ধরে রাখা গেল না | কোনওমতে লখনৌয়ের বাইরে মুসা বাগে পালিয়ে যান বেগম হজরত মহল | এর পরেই কাইজারবাগ প্রাসাদ দখল করে ব্রিটিশরা | 

১৮৫৮-র ১৫ মার্চ নেপাল সীমান্তে পালাতে সক্ষম হলেন বেগম | সেখানে তাঁর সঙ্গী হলেন বিদ্রোহের আর এক ব্যর্থ নেতা‚ নানাসাহেব | তখনও আশাহত নন বেগম হজরত মহল | যে জং বাহাদুর বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন বিদ্রোহে‚ তিনিই নেপালে আশ্রয় দেন বেগম হজরত মহলকে | বেগমের সঙ্গে ছিল ছেলে বিরজিস‚ নিজের অলঙ্কার ও কয়েকজন বিশ্বস্ত পরিচারক ও বাঁদী | 

তাঁকে বহুবার দেশে ফিরতে বলেছিল ব্রিটিশবাহিনী | কিন্তু তাঁদের কোনও প্রতিশ্রুতি কানে তোলেননি বেগম | তিনি বিশ্বাসই করতেন না ব্রিটিশকে | চেয়েছিলেন নিজের শর্তে ফিরতে | তা যখন হয়নি‚ তিনি জন্মভূমিতে ফেরেননি | স্বাধীনভাবে রয়ে গিয়েছিলেন প্রবাসেই | তবে হিন্দুস্তান তাঁকে ছেড়ে চলে যায়নি | কাঠমান্ডুতে বানিয়েছিলেন হিন্দুস্তান মসজিদ | তার পাশেই সমাধিস্থ করা হয় তাঁকে‚ ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে |

বেগম না ফিরলেও তাঁর ছেলে ফিরেছিলেন | ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে এসেছিলেন বিরজিস | বাবা ওয়াজিদ আলির মৃত্যুর পর | ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় এক ভোজসভায় রহস্যমৃত্যু হয় বিরজিস ও তাঁর পুত্র খুরশিদের | তবে রক্ষা পান বিরজিসের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী মেহতাব আরা | অন্তর্ঘাত হচ্ছে এরকম সন্দেহ করে তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে গা ঢাকা দেন | বহুবছর পরে প্রকশ্যে আসেন বিরজিস ও মেহতাবের পুত্র মেহর কাদর | তিনিই নিজেকে ওয়াজিদ অলি শাহ-র আইনত উত্তরাধিকারী হিসেবে দাবি করেন | মেহর কাদর তথা বেগম হজরত মহলের উত্তরসুরিরা এখনও বসবাস করেন কলকাতায় | সময়ের থেকে বহু ক্রোশ এগিয়ে থাকা বেগম হজরত মহলের বসবাস এখন ইতিহাস বইয়ের ফুটনোট হয়ে |    

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

pandit ravishankar

বিশ্বজন মোহিছে

রবিশঙ্কর আজীবন ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের প্রতি থেকেছেন শ্রদ্ধাশীল। আর বারে বারে পাশ্চাত্যের উপযোগী করে তাকে পরিবেশন করেছেন। আবার জাপানি সঙ্গীতের সঙ্গে তাকে মিলিয়েও, দুই দেশের বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যবহার করে নিরীক্ষা করেছেন। সারাক্ষণ, সব শুচিবায়ু ভেঙে, তিনি মেলানোর, মেশানোর, চেষ্টার, কৌতূহলের রাজ্যের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন। এই প্রাণশক্তি আর প্রতিভার মিশ্রণেই, তিনি বিদেশের কাছে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের মুখ। আর ভারতের কাছে, পাশ্চাত্যের জৌলুসযুক্ত তারকা।

Pradip autism centre sports

বোধ