গল্পভূত

(সমুদ্র, পাহাড় আর সুর্যাতপের দেশ কোরিয়া | স্বভাব কুশলী সে দেশের মানুষ | গায়ের রং মোমের মতো হলুদ | কোরিও ভাষা চিত্রকল্পে ভরা আর প্রাচীন | কোরিও লিপি যার নাম ‘হানজা’, তা আসলে চিনা বা জাপানির মতোই চিত্রসংকেত নির্মিত | জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সুক্ষ্ম শিল্পিত নির্মান কোরিয়দের জাতধর্ম | সরল অথচ লতাতন্তুময়! আর আমরা পড়তে চলেছি, অন্তত দু’হাজার বছরের পুরনো অবিশ্বাস্য একটি কোরিয় লোকগল্প |)

ছিল এক ছোট্ট খোকা, ডং চিন | গল্প শোনার পোকা! রোজ রাতে, খোকা যখন যাবে শুতে, গল্প শোনা চাই একটা অন্তত! গল্প বলে চাচা তাঈ | আর সে যে কত কিসিমের গল্প! কোনোটা খুশির, কোনোটা অল্প ভয়, কোনোটা আবার রাজা-রানী-যুদ্ধজয় | এখানে একটা জরুরী কথা বলা ভীষণ দরকার, তাঈ আঙ্কেল আসলে ডং চিনের বাপের বাজার সরকার | কাজেকর্মে নিত্যসহচর | পুরনো ভৃত্য, বিশ্বস্ত নোকর |

bhut-1এমনিতে ডং চিনের স্বভাব বড়ো মিষ্টি | শুধু একটাই তার বেয়াড়া খেয়াল, গজব অনাছিষ্টি যত বায়না! তাঈ চাচার গল্পগুলো আর কেউ শুনুক এটা সে চায়না!

“বল আর কাউক্কে বলবে না এই গল্পগুলো! তিন সত্যি কর, ওয়াদা কর সাচ্চা!”

“আচ্ছা বাবা আচ্ছা!” বলত তাঈ চাচা, “ইয়াক সোগ হে” – মানে “কথা দিচ্ছি”| এবার ঘুমোও দেখি বাচ্চা |

বাচ্চা হলো বড়ো | কাজেকম্মে – কথাবার্তায় – যুদ্ধ – শিকার – মন মজানোয় দড় | শেষে ডং চিনের অম্মনি আর আব্বাহ একদিন ডং চিনকে মুচকি হেসে বলল – “বাছা! এবার বিয়ে কর!” ডং চিনের আব্বাহ, যিনি একজন হোমরাচোমরা এবং মস্ত আমির, তিন তিনটে পাহাড় পেরিয়ে তবে খুঁজে পেলেন কনে | ডং চিনেরও মনে ধরল ভারি | মেয়ে নয় তো হলুদ, গোলাপ কুঁড়ি | ঠোঁট রাঙা পান বিনে | নয়ন কালো ভোমরা ! ভাব কদমের ভরা রূপ দেখ গে তোমরা! এই পাহাড়ে ওই পাহাড়ে সাজ সাজ রব | তিন তিনটে পাহাড় জোড়া ‘গয়লোনছিগ’, মানে বিবাহ উত্সব! জ্যাঠা-পিসি-মামা-খুড়ো-মাসির ননদ- দিদির বোনাই- পাতানো সই- পাশের বাড়ির জিগরি ইয়ার- পিসতুতো ভাই উত্সাহে সব ফুটছে | তিনশো মজা লুটছে | দেখতে দেখতে এগিয়ে এল তিথি, সাঙ্গ হলো চব্য চোষ্য লেহ্য পেয় আইবুড়ো ভাত খাওয়ার রীতি | বিয়ের আগের রাত …ডং চিনের আব্বাহ আতর জলে ধুইয়ে দিল হবু বরের মাথা, বাঁধল ঘোড়ার ল্যাজের মতো ঝুঁটি, পাহাড়চূড়ার রাজ্যে যেমন প্রথা |

বিয়ের দিন ভোরে, খোকা যাবে বিয়ে করতে চতুর্দোলায় চড়ে | বরযাত্রী ৮১৯ মোটে, চলল সবাই ঝালর ঝোলোর সমেত পায়ে হেঁটে | দুগ্গা দুগ্গা! ওদের বিদেয় করে, তাঈ আঙ্কেল ভাবল ঘরে ফিরে – আর তো মাত্র কয়েক প্রহর পর নতুন বউ আনবে ডং চিন | তবে এখন খোকাবাবুর ঘর ঝেড়েঝুরে গুছিয়ে রাখা উচিত সমীচীন | ডং চিনের ঘরের দরজা বন্ধ এবং তাঈ চাচার হাতে একটা ঝাড়ু অন্যহাতে চাবির গোছা, খুলতে যাবে…হঠাত দাঁড়ায় থমকে! বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে কাদের যেন গলার আওয়াজ! চোখ লাগিয়ে চাবির ফুটোয় ভিরমি খেল তাঈ চাচা, উঠল আমূল চমকে! মাথার ঘিলু ফুটে উঠল বোমকে |

picএকশো না না হাজার না না তার চেয়েও বেশি …ঘর ভর্তি শরীর ছাড়া আত্মা! কেউ সিড়িঙ্গ, কেউ বা পৃথুল, কারোর হাতে বিকট শক্ত পেশী | কিন্তু সবার একটাই মিল, ভুরুর ধনুক বক্র-কুটিল! হাবেভাবে লক্ষণ নয় নরমসরম মোটে | ডাইনে বাঁয়ে সামনে পিছে খাটের তলায় তাকের নিচে একলা এবং জোটে গিজগিজিয়ে জট পাকিয়ে ফুঁসছে! আত্মাগুলো ডং চিনকে দুষছে!

“স্তব্ধ হও!” নেতা গোছের একটা আত্মা উঠল ধমকে চেঁচিয়ে, “ সবাই মিলে একসঙ্গে কথা বললে আসল বিষয়টা যায় পেঁচিয়ে!”

“ঠিক বলেছ” – ফিসফিসিয়ে আরেকজন ছায়াশরীর বলল, “ ব্যাটাচ্ছেলে মহানন্দে করতে গেছে বিয়ে, আমাদের যা করার তা আজই করতে হবে | কেউ কি কিছু ভেবেছ এই নিয়ে?”

“ভাবব কী আর! চাই প্রতিশোধ!” – আরেকটা ভূত বল, “আমি ছিলাম নদীর ধারের খোলা হওয়ার গল্প আর নির্বোধ ডং ছিল সেই আমায় কিনা ধ’রে দিনের পর দিন বন্দী করে রেখেছে বন্ধ ঘরে!”

“কান্ড বটে!” – দেখেশুনে তাঈ আঙ্কেল বিষম খেয়ে মরে, “আরে!ছোট্ট থেকে ডং খোকাকে বলেছি যত গল্প, ভূত হয়ে সব জুটেছে! খোকা বলত আর কাউকে বলতে না! বলিনি | হায়রে কক্ষনো মুখ খুলিনি!”

“ডং চিনকে কৃতকর্মের ভুগতে হবে সাজা, কিন্তু সেটা ঘটবে কেমন করে?” চেঁচিয়ে উঠে ইতিমধ্যে বলল, গলার জোরে আরেকজন ভূতপূর্ব গল্প, যে ছিল এক অহংকারী রাজা এবং তেনার মস্ত সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতার কাহিনি!

“পেয়েছি!” – ফন্দী আঁটে আরেকজন গল্প, যে গল্পের মধ্যে ছিল নামচি গ্রামে একবার কেমন করে বিষ মেশানো কুয়োর জলে প্রাণ হারালো সর্দার আর তার চল্লিশ চোর | সে বলল – “কুয়োর জলে বিষ মিশিয়ে রাখব পথের ধারে | ব্যাটাচ্ছেলে ডং চিন চলতে চলতে ঘেমে নাকাল হয়ে সে জল যদি দৈবাৎ পান করে, পাবে ততক্ষনাত অক্কা!”

bhoot“খাসা বুদ্ধি, কিন্তু ধর ডং চিন যদি সে জল না খায়?” –বলল আরেক ভূতপূর্ব গল্প কামারশালার | যার ভিতরে হাপর টেনে গরম লোহার ত্রিশূলফলা পাকায় কামার | সে বলল – “ডং চিনের কনের বাড়ির পাপোষে আমি বরং এমন করে লুকিয়ে রাখব লোহার পেরেক আগুন গরম, ব্যাটাচ্ছেলে বরের বেশে যেইনা ঢুকবে অমনি চরম শাস্তি পাবে, ফুটবে পায়ে!”

“…কিন্তু ধর, তাতেও যদি অপগন্ড পার পেয়ে যায় বরাত্জরে, বিষকেউটে ছেড়ে দেব ফুলশয্যার খাটে, দেখি এবার ব্যাটাচ্ছেলে কেমন করে আঁটে!” – একথা বলল, বিষাক্ত এক সাপের গল্প |

শুনতে শুনতে মনের মধ্যে মরিয়া সাহস এনে তাঈ চাচা তার হাতের ঝাঁটা বাগিয়ে ধরল কষে | ভাবটা এমন, ‘দেখব তরা কেমন করে পালাস” ! দড়াম দরজা খুলল… ভিতর থেকে ছিটকে এল হওয়া, আর কিছু নেই! এক্কেবারে খালাস! এবার খুড়োর হাড় কনকন ভয়ে | ছুটছে প্রাণপনে তাঈ চাচা | যে করেই হোক, ডং খোকাকে বাঁচাতে হবে প্রাণে | এবং একটা গোটা পাহাড় বুঝি ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে ডং চিনের চতুর্দোলা!

বিয়ের রাতেই মরবে কি ডং চিন? এ ব্যাপারে কৌতূহল হওয়াই সমীচীন! রোসো, চুপটি করে বসো | ২ পর্বে সাঙ্গ হবে গল্পভূতের গল্প | ধৈর্য্য ধরে থাকতে হবে মাত্র কটা দিন | অপেক্ষা তো অল্প!

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.