সুব্রত মুখোপাধ্যায়
প্রশাসনিক উচ্চপদে থাকলেও সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান | ২০১২ সালে ‘বীরাসন’-এর জন্য পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার |

যে গঙ্গাসাগরে এখন হেলিকপটার যাচ্ছে সেই স্থানটি আমি একাধিকবার গিয়েছি — কখনও কাজে কখনও বা বিনি কাজে | সে কথা বলার আগে একটু পিছু পানে ফিরে চাইতে ইচ্ছে করছে |

এই জায়গাটি আগে বুনো জঙ্গলে পূর্ণ ছিল | ১৮১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর কলকাতার টাউন হলে তখনকার লাল সাহেবরা মিলে সভা করে ঠিক করলেন যেহেতু এই সাগরদ্বীপের জলবায়ু সুখদ তাই কলকাতার মানুষ সেখানে কিছুদিন বাস করে শরীর সারাতে পারে | এ জন্য খরচ হবে দু-লক্ষ টাকা | এই টাকা যোগাড় করার জন্য একটি কোম্পানি স্থাপিত হবে | তাতে দুইশত লোক থাকবে | সেখানে এদেশীয় ও ইংলন্ডী লোক থাকবে | তারা এক এক জন দু-হাজার করে টাকা দেবে | যাঁরা এই টাকা দেবেন তাঁরা জাহাজে চড়ে গঙ্গাসাগরে গিয়ে সুস্থ হতে পারবেন |

আলোচনা করে সাব্যস্ত হল গঙ্গাসাগর উপদ্বীপে বন কেটে বসত বানালে সেখানে উত্তম তুলা চাষ হতে পারে | সেখানে একটি জাহাজ মেরামতির কারখানা স্থাপন করা যেতে পারে | যে সব জীবজন্তু কলিকাতা থেকে ইংলন্ডে নিয়ে যেতে হয় তাদের আগেভাগে এখানে মজুত করে আস্তে আস্তে বা প্রয়োজন মতো জাহাজে তোলা যেতে পারে | এতে খরচ বাঁচবে | তা বাদে অসুস্থ লোকদের জন্য এখানে একটি হাসপাতালও স্থাপিত হতে পারে |

এই সময় মাপজোক করে দেখা গেল সাগরদ্বীপে এক লক্ষ আশি হাজার বিঘা জমি আছে | এই দ্বীপের উন্নয়নের জন্য যে কমিটি হল তার এক কর্তাব্যক্তি হলেন কলিকাতার শ্রীযুক্ত বাবু রাধাকান্ত দেব বাহাদুর |

Banglalive-8

পাঁচশত শ্রমিক মিলে দ্বীপ পরিষ্কার করল | প্রায় তিন হাজার বিঘা জমি সাফ হল | সেখানে যে বাঘেরা বাস করত তারা বাকি জঙ্গলের অন্তরালে পালাল | এখানে কপিলদেবের মন্দির আগে হতেই ছিল | সেটি দখল করা নিয়ে কলিকাতার মাতব্বরদের সঙ্গে তাদের বিবাদ বাঁধল |

Banglalive-9

এবার আসি ৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৭ সালের খবরে | খবর বলছে প্রতি বছর প্রায় ডিসেম্বর মাসের মাঝ সময় থেকে সেখানে অনেক নৌকা গিয়ে জমতে লাগল | লোককথা অনুযায়ী, প্রায় ১৪০০ বছরের প্রাচীন কপিল মুনির মন্দিরের চত্বরে মেলা বসতে আরম্ভ হয় | ওই মেলায় যারা যেত, সবই জলপথে | সে বছর সাগরযাত্রায় আন্দাজ ষাট হাজার নৌকা, যথা পিনিস, ভাউলিয়া আর ক্ষুদ্র মাড় জাতীয় নৌকা ছিল | অবিভক্ত ভারতবর্ষের লাহোর, দিল্লি, অযোধ্যা, শ্রীরঙ্গপত্তন ও বোম্বাই থেকে বহুতর তীর্থযাত্রী এসেছিলেন | মোট লোকসংখ্যা পাঁচলক্ষের কম নয় | এমনকি ব্রহ্মদেশ থেকেও বহু মানুষ এসেছিলেন | ব্যবসায়ীরা কম পক্ষে ১২ লক্ষ টকার বাণিজ্য করেছিলেন | অজস্র দোকানঘর বাঁধা হয়েছিল | বাংলায় ছাপা বহু বই এই মেলায় বিক্রয় হয়েছিল | খবরে প্রকাশ প্রত্যেক দোকান থেকে যাবতীয় বই বিক্রি হয়ে যায় |

আরও পড়ুন:  প্রত্যেক উড়ানের আগে 'জয় হিন্দ' বলার নির্দেশ পেলেন এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মীরা

পুরনো কথা মানেই বই থেকে টোকা | সেকালের সংবাদপত্র ভরসা করে আমিও তাই করলাম |

আমি প্রথমবার সাগরে যাই ষাটের দশকে এবং বিনি মেলায় | সরকারি কাজে সেই নিঝুম দ্বীপে দুটি রাত একা বাস করেছিলাম একটি আশ্রমে | গরম গরম ভাতে গব্যঘৃত আর পাঁচমেশালি তরকারি সহ অপূর্ব আহার আর বিনি বালিশে বিছানা |

আর একবার সংক্রান্তির ভোর রাতে কুয়াশা মোড়া অবাঙালি তীর্থযাত্রীদের সুরক্ষিত তাঁবুতে আগুন লাগল | এমনই ছিল সেই বিস্তৃত তাঁবুর আঁটোসাঁটো সুরক্ষা, কোলাপসিবল গেট ইত্যাদি আঁটা যে বহু মানুষ ঘুমঘোরে টেরও পেলেন না কী ঘটে যাচ্ছে | যখন টের পেলেন তখন আর বাইরে বেরোবার পথ নেই | সেই জতুগৃহের মধ্যে বহু গব্যঘৃতের টিন আর পাট ইত্যাদি ছিল বলে শোনা যায় | সেই ভয়াবহ দৃশ্য আমরা দূর থেকে দেখেছি | অসহায় দমকল আগুন নেবানোর চেষ্টা করছে | অসহায় মানুষ আগুনে পুড়ে আর ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু দেখছেন | সেদিন অপরাহ্নে পোড়া-আধপোড়া দেহগুলি বালির শয্যায় শোয়ানো ছিল | সে দৃশ্য এখনও আমায় দুঃস্বপ্নে তাড়া করে |

এক রাতে মেলায় একা একা ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ এক যুবতী মেয়ে আমার ডান হাত চেপে ধরল খপাত করে | চেয়ে দেখি বেদেনি মেয়েটি সুন্দরী | খাসা গড়ন আর কাজল পরা চোখে তীব্র টান | পরনে ঘাগরা | হাত বোঝাই কাচের চুড়ির ঝিনিৎকার | তার সঙ্গী বৃদ্ধা মনে হয় মেয়েটির ঠাকুরমা হবেন | মেয়েটি আমার হাত কতক জোর করে চেপে ধরে অন্য হাতে একটি গোলাকার আর রোমশ বস্তু আমায় দেখিয়ে বলল, ইয়ে অসলি মৃগনাভি হ্যায় |

এই বলে আমার হাতের তেলোয় সেটি ঘষে দিল | তীব্র ঝাঁঝালো সুবাস | এবার আমার কনুইয়ে হাত রেখে শুঁকে দেখতে বলল | অবাক হয়ে দেখি আমার হাতের তালু বেয়ে সেই সুগন্ধ আমার কনুই দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে | প্রথমে অবাক ও পরে বুঝতে পারি সে হাতের কায়দায় ওই গন্ধ আমার কনুইয়ে মাখিয়ে দিয়েছে | আমি দ্রুত হাত ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে টের পাই মেয়েটির দেহবলও কম নয় | সে রাতে আমার প্রায় নির্ঘুম বিছানায় আমি সারারাত সেই মৃগনাভির তীব্রতা অনুভব করেছি |

আরও পড়ুন:  ধুতি-কুর্তায় ক্রিকেটার! ধারাভাষ্য সংস্কৃতে!

মেলার একধারে সারি সারি হোগলার ঘরে নানা সাধুদের আশ্রয় | এক জোয়ান সাধু রুটি বানাবেন বলে পাশের খোপের বৃদ্ধ সাধু আটা মেখে দিচ্ছেন | আটা মাখা হলে এবার জোয়ান সাধু রুটি সেঁকতে বসেন কাঠের আগুনে | দুখণ্ড ইট দিয়ে তৈরি উনুনে চাটু চড়ানো | রুটি সেঁকার সময় ছোটো গোলাগুলি দিয়ে বৃদ্ধ সাধুর রুটি হয়, আর নিজের জন্য পেল্লায় গোলার রুটি |

পাশের খোপের আর এক সাধু আমার হৃষ্টপুষ্ট চেহারা দেখে হেসে কন, বয়টো শেঠ, বয়ঠো |
আমি বসি এবং তিনি আমার কপালে ধুনি থেকে ভস্ম তুলে তিলক এঁকে দেন | আমি বলি, ম্যায় শেঠ নহি হুঁ সাধুজী |
এবার তিনি তীক্ষ্ণ চোখে আমার চোখের দিকে তাকান | তারপর গম্ভীর গলায় বলেন, তুম জরুর শেঠ হো | তুম তো মন কা বেপারি হো | সত্যিই কি আমি মনের ‘বেপারি’ হতে পেরেছি ? প্রশ্ন সেই সাধুর দিক থেকে এলেও, তা কাকচরিত্র বিদ্যা বলে মনে হলেও কতকটা কাকতালীয়ভাবেই মিলে গেছে আমার সঙ্গে |

(পুনর্মুদ্রিত)

NO COMMENTS