শরীর ও ভুখ

ভ্রুর ইশারায় থমকে গেল সোমেন। গাড়িটা পার্ক সার্কাসের মোড়ে এসে সিগন্যালে আসতেই বাঁ ফুটে চোখ ফেরাতেই দৃষ্টি আটকে গেল ছেলেটির দিকে। হ্যান্ডসামই বলা চলে ছেলেটিকে। ফর্সা রঙ। তার ওপর ম্যাচো ফিজিক! সানগ্লাসটা মাথার ওপর তোলা কায়দা করে। চোখ পড়তেই চোখে ইশারা করলো। নিমেষে চোখ সরিয়ে নিয়েছে সোমেন। মনের মধ্যে কৌতূহল। ভুল দেখল কি সে? ভাবল, এতটা ভুল? সেকেন্ডের মধ্যে ঘুরে তাকালো সে। ছেলেটি যেন জানত সে ফিরে তাকাবে। মুহূর্তে নজরবন্দী! এইবার হাসল ছেলেটি, চোখে ইশারা।

স্বতঃস্ফূর্তভাবে গালাগাল বেরিয়ে এল সোমেনের মুখ থেকে, শালা। তোর বাপকে গিয়ে ডাক!

সিগন্যাল খুলে যেতেই গাড়ি ছুটিয়ে দিল সে। মাথার মধ্যে ঘুণ পোকার দংশন যেন। ক্রামাগত দংশনের শব্দ! তাহলে চারদিকে যা শোনা যাচ্ছে, সেগুলো সত্যি?

অফিসে গিয়েই অমিতকে ফোন করল সোমেন। অমিতের এইসব ব্যাপারে খুব আগ্রহ জানে বন্ধু মহল। খবরাখবর রাখে সে। বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র অমিতই বেপাড়ায় ঘুরে এসে সরেজমিনে সংবাদ পরিবেশন করেছিল। বন্ধুদের মধ্যে রীতিমতো হইচই তখন!

অমিতকে ফোন করে জিজ্ঞেস করতেই সে যা জানাল তাতে চোখ মাথায় ওঠার জোগার।

বলল, তুই আজ দেখলি? তোর আর শালা কিছু হবে না। মলগুলোতে একবার যাস। সকাল থেকে দুপুর আবার সন্ধ্যে রাতে দেখতে পাবি। ওদের চিনবি কী করে?

মোটামুটই জিম করা চেহারা, বডিসডি বানানো। একলা দাঁড়িয়ে থাকে। হাবভাব দেখলেই বুঝবি। ওরা বাই সেক্সুয়াল। বড়লোকের মধ্যবয়সী ফ্রাস্টেটেড মহিলারাই ওদের টার্গেট। তারপর পারভার্ট পুরুষগুলো তো আছেই। তোকে ডাকছিল নাকি? হা হা হা।

হ্যাঁ, ওরা এইভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে শহরের অলিতে গলিতে। ব্যস্ত রাজপথ থেকে নির্জন পথে। ওরা আগেও ছিল। এখন প্রকট হয়েছে। মূল্যবোধের বাজার যেখানে নামছে আর গ্লোবালাইজেশনের দাপট বাড়ছে, সেখানে ওরা সংখ্যায় বাড়ছে ক্রমশ।

যৌনতা একটা সামান্য চাহিদা মাত্র ওদের কাছে।

কিছুদিন আগে এক যুবক ফেসবুকে আলাপ করলেন। মেসেজ দিয়ে নিজের সম্পর্কে জানালেন – আপনার সাম্প্রতিক উপন্যাসটি পড়েছি আমি। অসাধারাণ।তাই খোঁজ করে করে আপনাকে ফেসবুকে আবিস্কার করলাম।

উপন্যাস সাহিত্য নিয়ে কথা হতে হতে কয়েকদিনের মধ্যেই সে জানাল, আমার প্রফেসন কী জানো? তুমি লেখক বলেই বলতে পারি।

একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি? তুমি তো একটা অ্যাকাউন্টস ফার্মে জব করো।

সত্রাজিৎ বলল, করতাম। ওই ফার্মের মালকিনের নির্দেশ, তার বড় বড় মহিলা ক্লায়েন্টকে অ্যাটেন্ড করতে হবে। মনোরঞ্জন করতে হবে। বুঝলেন, অগত্যা শুরু হলো। চাকরির কন্ডিশন ছিল এক বছরের। তার আগে ছাড়া যাবে না। তারপর নিজেরই নেশায় পেয়ে গেল। একদিন বলব সব গল্প। সব মহিলাই কিন্তু ফিজিক্যাল রিলেশন করে না। আশ্চর্য সব ক্যারেকটার। হাতে অনেক পয়সা কিন্তু এদের প্রত্যেকের। খুব যত্ন আত্তি করে। খাওয়ায় প্রচুর। গিফট দেয়। কেউ আবার সেকচুয়ালি এতটা স্টার্ভড যে আমাকে আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে কয়েক বার।

বললাম, একদিন আপনার খুব খারাপ লাগবে কিন্তু। বলল, লাগবে না। আমি তো কারোকে ঠকাচ্ছি না। যার যেখানে প্রবলেম, আমি সেখানে হাত বোলাচ্ছি, বুঝলেন? অবশ্যই পয়সার বিনিময়ে। আমার পয়সার দরকার আর তাদের ফিজিক্যাল মেন্টাল স্যাটিস্ফেকশনের। এক জায়গায় এসে মিলে গেল।

বললাম, বিয়ে করবে না? গার্লফ্রেন্ড নেই?

সত্রাজিতের কথায় চমকে গেলাম। বলল, না। করবো না। সোসাইটির যা চেহারা আমি রোজ রোজ দেখছি, তারপর আর প্রেম আসে না, জানেন? ওই যে বললেন না, মূল্যবোধ, বিবেক টিবেকের কথা? ওসব মরে গেছে। সমাজের অবস্থা আরও খারাপ হবে আগামী দিনে, দেখবেন! প্রেম বিয়ে, ফ্যামিলি, ভালোবাসা সব মিথ্যে। সব মিথ্যে।

সত্রাজিতের কথা মতো একদিন আলাপ করতে গেলাম দক্ষিণ কলকাতার এক অভিজাত মলে। সত্রাজিতের চিনতে অসুবিধে হয় নি। পৌঁছে দেখলাম, ওর সাথে আর কয়েক জন ছেলে ওর সঙ্গে বসে আছে কফি শপে। না বলতেও বুঝেছি ওদের পরিচয়।

সত্রাজিৎ আলাপ করিয়ে দিল চারজনের সাথে। প্রথমেই লক্ষ্য করলাম, চার যুবকেরই বেশভূষা মোটামুটি একই রকমের। কালার্ড চুল, নিখুঁত করে কামানো গোঁফ দাড়ি। রীতিমতো ব্যায়াম চর্চিত দেহ সৌষ্ঠব। পরনে ডেনিম জিন্স আর টি-শার্ট। আমার স্ক্যানার চোখকে ফাঁকি দিতে পারল না এদের মুখের অভিব্যক্তি। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় মনের ভেতরের চিন্তার প্রকাশ সমগ্র মুখমন্ডল জুড়ে আছে।

প্রীতম, সানি, স্যান্ডি আর রনি। এই চার যুবকের বয়সের অনুপাত পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে।

সত্রাজিৎই বলল, আপনি ওদের কাছ থেকে জানতে পারেন। জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আমরা একই সার্কিটের, যদিও আমাদের কোনও ঠেক নেই তেমন করে।

বললাম, চারজনের কাছেই সেম প্রশ্ন করবো। উত্তর দিতে ইচ্ছে হলে দেবেন। না হলে অ্যাভয়েড করতে পারেন। অথবা আপনারা নিজেরাও নিজেদের মতো বলতে পারেন।

হাসিখুশি চারজনেই বলল, আপনি যা জানতে চান, জিজ্ঞেস করুন। অসুবিধা নেই।

সানি বলল, মাঠে নেমেছি খেলতে দিদি, লোকলজ্জার ভয় পাই না।

অন্যরাও সহমত দেখলাম।

জিজ্ঞেস করলাম, কেন এলেন এই পেশায়?

প্রীতমের উত্তর এতটুকু না ভেবে, চাকরি পাচ্ছিলাম না। অনেকদিন ধরে পাস আউট করে বসে আছি। এক বন্ধু এই পেশাতে আগেই এসেছে। ওর লিংক ধরেই।

রনির উত্তর, আমি এখনও পড়ছি। মাস্টার্স করছি। মফস্বলের ছেলে। মেসে থাকি এখানে। যে মেসে থাকি, সে পাড়ারই এক বউদির সাথে প্রথমে একটা অ্যাফেয়ার হয়। তারপর কিছুদিন যাবার পর ব্যাপারটা আমার আর ভালো লাগে না। সরে আসি। তখন বউদি পয়সার লোভ দেখায়। বাবার অত পয়সা নেই। কলকাতায় টিউশন করে চালাই। ব্যাপারটা খুব একটা খারাপ লাগলো না। হাজব্যান্ড তাকে সময় দেয় না। ফিজিকাল রিলেশন নেই। খুব কান্নাকাটি করতো। অথচ পয়সার অভাব নেই। খারাপও লাগছিল। পয়সা আমারও দরকার। সেই থেকে নেশার মতো হয়ে গেল, বুঝলেন দিদি! ওই বউদির এক বান্ধবীও আমাকে যোগাযোগ করলো। হাঃ হাঃ। এখন তো ওদের — পার্টি গ্রুপের ছ-সাতজন আমার ক্লায়েন্ট।

প্রত্যেকের আর্থিক অবস্থাই কি খুব ভাল? মানে উচ্চবিত্ত?

বলতে পারেন। আমাকে ভাল পে করে। ওই যে সামান্য একটু সময় খরচ করেই এত টাকা উপার্জন, এটা তো আর অন্য কোনও প্রফেশনে পাবেন না।

– মূল্যবোধে আটকায় না?

– না। কীসের মূল্যবোধ? এই মূল্যবৃদ্ধির যুগে মূল্যবোধ! ধুসস্‌! কী যে বলেন? মূল্যবোধ কী দেখা যায়?

স্যান্ডি এতক্ষণে মুখ খুলল। একটা প্রশ্ন এইবার আমি করবো ম্যাডাম?

– হ্যাঁ বলুন।

– পেট বড় না মূল্যবোধ? পেটের জ্বালা বড় না মূল্যবোধের জ্বালা?

বললাম, চাকরি পেলেও কি এই প্রফেশনে থাকবেন, না ছেড়ে দেবেন?

প্রীতম বলল, দেখুন চাকরি পাবার চান্স খুব কম। আর যে চাকরি পাব, তাতে যে স্যালারি পাব, সেটা এখন আর পছন্দ হবে না।

বাকি তিন যুবক একসাথে মাথা নাড়ল, বলল, এগ্রি।

সানি বলল, ম্যাম! বলে রাখছি একদিন এই প্রফেশনে তাবড় তাবড় পুরুষ জয়েন করবে। কত ছেলে এই কাজ করছে, আপনার জানা নেই। একটু পরে জিত আসবে, জিত সাক্সেনা। ওর পয়সার অভাব নেই। বাপের বড় বিজনেস। কিন্তু নেশার মতো এই প্রফেশনে পড়ে আছে। বড় বড় বিজনেসম্যানের ওয়াইফরা ওর ক্লায়েন্ট। ওয়ান নাইট টেন থাউজ্যান্ড নেয়। বলুন, চাকরি করে এই টাকা বাপের জন্মে পাব? আপনি কী এটাকে খারাপ ভাববেন? কোনদিক থেকে খারাপ বলুন ম্যাম?

প্রীতম বলল, গুড কোয়েশ্চেন। শুনুন, আমরা কারোর ফ্যামিলি ভাঙছি না। হাজব্যান্ড ওয়াইফের মধ্যে লাফড়া লাগাচ্ছি না। একজন ফ্রাস্টেটেড মহিলার ডিজায়ার যদি ফুলফিল করতে পারি, আর তার বিনিময়ে সে যদি লিকুইড ক্যাশ দেয় তাহলে প্রবলেমটা কী? তার শরীরের ক্ষিধে আমাদের দুটো পারপাসই সার্ভ হচ্ছে। এদের হাজব্যান্ড গুলো শালা বোকা —’ জিভ কাটল প্রীতম। বলল, সরি ফর মাই – ল্যাঙ্গোয়েজ। দেখুন এদের হাজব্যান্ডরা সবই জানে। আমার একটা কেসই বলছি। ভদ্রমহিলাকে ওর হাজব্যান্ডই জোর করে পাঠায়। হাজব্যান্ড কিছু করতে পারতো না, তাই বউকে বলে যে আমি পয়াসা দিচ্ছি তুমি বাইরে গিয়ে মিটিয়ে এসো। অথচ মেয়েটি অসম্ভব ভালো। একটা বিয়ে বাড়িতে আমার সঙ্গে আলাপ। তারপর কথা বার্তা হতো। ক্রমশ প্রেম। এবং মীরা ওর সব কথা বলে আমাকে। জানেন, মীরা সুইসাইড করেছে? আমি খুব জড়িয়ে যাচ্ছিলাম দেখে সরে আসি। তাহলে বলুন, কাকে দোষ দেবেন?

রনি বলল, ম্যাডাম গিগোলেরা কিন্তু আগেও ছিল। সারা পৃথিবীতেই ছিল। তখন খুব রয়েল ফ্যামিলিতে থাকত। আজ মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে। আর ঘর কি বলব বলুন? ঘরগুলো দেখতেই ঘরের মতো। ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে ঘরের খোকলা হয়ে যাওয়া গল্পগুলো জানতে পারছি। কিস্যু নেই ম্যাডাম। কিস্যু নেই। আমরা তো বেসিক্যালি অনেকেই বাইসেক্সুয়াল। শুধু মহিলা নয়, ছেলেদেরও এন্টারটেইন করি। প্রচুর প্রচুর পুরুষ আমাদের ক্লায়েন্ট। আমারই দুজন মেল ক্লায়েন্ট আছে পার্মানেন্ট। — আর ফ্লাইং তো আছেই। আপনি কার মূল্যবোধের কথা বলছেন বলুন? হুঁ? আমরা তো পয়সার জন্য করছি। বড়লোকের ফ্রাস্ট পার্ভাটেডগুলোর হাতে পয়সা আছে, দে স্পেন্ড দেয়ার মানি ফর দেয়ার প্লেজ্যার আর আমরা সহজে কামাবার রাস্তা পেয়েছি।

সত্রাজিৎ বলল, ইজি মানি দিদি। সেক্স নিয়ে ট্যাবু রাখার দিনকাল শেষ। এই যে আপনারা ভোগবাদটাদ বলেন, এটাই সেটা।

প্রশ্ন আর উত্তরের আবর্তের মধ্যে পাক খাচ্ছি। এদের প্রশ্নের উত্তর আমারও জানা নেই।

কাবেরী রায়চৌধুরী
কাবেরী রায়চোধুরী এই সময়ের অন্যতম কবি ও সাহিত্যিক যিনি দু'হাতে গল্প কবিতা ও উপন্যাস লিখছেন। প্রকাশিত উপন্যাসের ( ছোটদের ও বড়দের) সংখ্যা ২৬। গল্প সংকলন ৪ টি। প্রথম শ্রেনীর সব প্রকাশনা সংস্থা থেকে তার বই গুলো প্রকাশিত।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here