নেশা করছি বেশ করছি ; ‘আমরা কি আপনার বাবার পয়সায় খাচ্ছি!?’

নেশা করছি বেশ করছি ; ‘আমরা কি আপনার বাবার পয়সায় খাচ্ছি!?’

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সব সয়ে গেছে, সব সয়ে যায়। বাড়ির মেয়েটার বাড়ির বাইরে রাত কাটানো (প্রসঙ্গত, দুপুর কাটানোতে ভর্তুকি ছিল, আছে), বাংলা ভাষায় দু-অক্ষর বা চার অক্ষরের সাবলীল প্রবেশ বা বাড়ির একমাত্র ছেলের মাঝরাতে টলতে টলতে বাড়ি ফেরা। এসব কিছুই আজ খুব স্বাভাবিক, যুক্তিযুক্তও বটে। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা বা ব্যক্তি স্বাধীনতার আইনমাফিক ওঠাপড়ায় এ সব আজ প্রাসঙ্গিক। আগেরগুলো সব ব্যাক-ডেটেড, পুরনো। যেমন, আমাদের স্কুলের কথাই বলতে পারি। মাধ্যমিক দেবো, সবে বিড়ি-সিগারেট খাওয়া শিখেছি। একটা ফিল্টার উইলস ষাট পয়সা, চার্মস চল্লিশ। আদি গঙ্গার নির্জন পাড়। ভিক্স লজেন্স, পিয়ারা পাতা, চুইং-গাম আর একখানা সিগারেট – একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। ধূমপানের মজা নিয়ে, মুখের গন্ধ ঢেকে তবেই বাড়ি ফেরা, কোনভাবে যদি বাবা জ্যাঠারা গন্ধ পায় তাহলেই সব শেষ। পিঠের চামড়া তুলে গায়ের চাদর করবে। জ্যাঠা, কাকাদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম পাড়ার পল্টুদাও যদি জানতে পারে তবে পিঠের একটা হাড়ও আস্ত রাখবে না। এই পল্টুদাদের চোখের রেঞ্জ কিন্তু মারাত্মক। চারদিকের সব খবর এদের ঠোঁটের ডগায়। স্কুল থেকে ফেরার পথে কে ঘোষেদের আম গাছে আম পাড়তে উঠেছে, কে সাবিরদের পিয়ারা গাছের মগডাল থেকে ঘুড়ি পাড়ছিল বা কারা রাস্তা দিয়ে আসতে আসতে হিন্দি গান ‘রাম্বা হো হো’ অথবা ‘দো ঘুট মুঝে পিলা দে’ কোরাসে গাইতে গাইতে ফিরছিল সব পল্টুদা কীভাবে জেনে যায়। আজকের 4G’র থেকেও মারাত্মক দ্রুত এবং শক্তিশালী তার নেটওয়ার্ক। আর আমাদের বাবা জ্যাঠাদের কাছে এই পল্টুদারাই ছিলেন শেষ কথা। তারা মনে করতেন এই পল্টুদারা কখনো ভুল করতে পারেন না। তাই কোনরকম বেচাল হলেই পল্টুদা বা পল্টুদাদের কঠোর শাসন।

এরপর কলেজ। বন্ধুর ফাঁকা বাড়িতে আপেল কুচি, কটকটি, বাদাম আর জল দিয়ে লাল তরল ‘রাম’। তখন আমি বা আমাদের বাড়ির লোকেরা বেড়াতে যাওয়া মানে হাতে চাঁদ পাওয়া। ফাঁকা বাড়িতে সবাই মিলে একসঙ্গে রাত বা দিন কাটানো, মানে, নিজেরা ডিমের ডানলা বানানো, বারে বারে কফি বা চা…শক্তি, সুনীল, দাবা, তাস, ক্যারাম এবং রাম। তারপরে তো হাজার ঝক্কি। মুসুর ডাল চিবনো, জর্দা বা চব্যনবাহার এলাচ দেওয়া পান, চুটকি মশলা (তখনও প্লাস্টিকের প্যাকেটে গুটখা, শেখর আসে নি) এবং ঘন্টা পাঁচেকের অবসর। কোনভাবে যদি কেউ বুঝতে পারে যে পেটে রাম গেছে তাহলে… না, জাস্ট ভাবা যায় না। নিজেরাও বেশ অপরাধবোধে ভুগতাম। বছরে এক বা দুদিনের এই উপরি স্বাধীনতার মজাটাই ছিল আলাদা। সত্যি কথা বলতে কি, বৎসরান্তের ওই দু-ঢোক রাম আমাদের কাছে নেশার থেকেও অনেক বেশি করে স্বাধীনতার স্বাদ দিত। কয়েক ঘন্টার জন্য নিজেদের বেশ লায়েক ভাবতে পারতাম।

এ ছাড়া নেশার ছোঁয়া পাওয়ার আর একটা দিন ছিল বিজয়া দশমী। সেদিন বাড়ির কঠোর সংবিধানে কেমন একটা গা-ছাড়া ভাব থাকত। সিদ্ধি প্রধান এই দিনে বড় ছোট সবাইই কম বেশি সিদ্ধিলাভ করতেন। অ্যামাজন বা ফ্লিপকার্ট’এর বিশেষ ডিসকাউন্টের মতো এই দিনটাতে সবারই বেশ বড়সড় ছাড় মিলত।

আজ এসব অতীত। ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়’এর আপ্তবাক্য মেনেই দিন বদলেছে। আমরা আধুনিক থেকে আধুনিকতর হয়েছি। সেইসব ভয়ঙ্কর অমানবিক দিন আজ আর নেই। লাল জল আজ বাবা, জ্যাঠা বা পাড়ার দাদা কাকাদের লাল চোখের জায়গা নিয়েছে। আজ বেশ নির্বিঘ্নেই পেটে রাম-হুইস্কি-বাংলা নিয়ে বাড়ি ফেরা যায়। বন্ধুর ফাঁকা ফ্ল্যাট বা আদি গঙ্গার পাড় তো দূর অস্ত, যেকোন ধরণের নেশা করার জন্য আজ আর কোন আড়াল লাগে না। পাড়ার মোড়, চায়ের দোকান, এক চিলতে বারান্দা, পার্ক বা ঢালাই রাস্তার বাঁকে প্লাস্টিকের গ্লাস, চানাচুরের প্যাকেট আর বোতলটা নিয়ে বসে পড়লেই হল, কেউ কিচ্ছু বলবে না, কেউ তুলে দেবে না, বরং কেউ হয়ত ভাগ বসালেও বসাতে পারে। বাবা, জ্যাঠারাও আজ আধুনিক। লয় কাটা পায়ে আর জড়ানো জিভে ছেলে বাড়ি ফিরলে যত্ন করে বিছানায় শুইয়ে লাইট নিভিয়ে দিলেই ঝামেলা শেষ। সকাল হলেই আমার বাবু অন্যদের থেকে একেবারে আলাদা, ট্যালেন্টেড – জিনিয়াস। উৎসবের আবহে এই জিনিয়াসরা আরও জিনিয়াস হয়ে ওঠে। দুর্গা, কালী বা বিশ্বকর্মার কথা বাদ দিলাম, সত্যনারায়ণের সিন্নি বা ষষ্ঠী পুজোতেও আজ মদ মাস্ট। আদ্যিকালের ওই রাখঢাক-গুড়গুড় আজ আর নেই। যতসব ন্যাকামি। খাওয়ার জিনিস খাবে, তাতে এত নিয়মকানুনের কি আছে! যেখানে খুশি, যেমনভাবে খুশি খাওয়া যেতে পারে। পাড়ার পল্টুদারাও আজ বেশ সাবধানী। বেশ কয়েকবার শাসন করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন। আঠারো বছরের প্রতিবাদী মুখ, মুখের ওপর বলে দিয়েছে, ‘আমরা কি আপনার বাবার পয়সায় খাচ্ছি’? সেদিনের কাকা, জ্যাঠারাও আজ নেই, যারা তাদের বাড়ির ছেলেটার ব্যাপারে পল্টুদাদের ওপর সম্পুর্ণভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। আজকের বাবা মা’রাও বেশ আধুনিক এবং স্মার্ট। পল্টুদারা শাসন করলে তারাও পল্টুদাদের শাসন করেন… ‘হ্যাঁরে পল্টু, আমার ছেলে তোর কী ক্ষতি করেছে যে ওকে ওরকম করে বকেছিস ? তাছাড়া ওকে শাসন করার জন্য তো ওর বাবা, মা আছে, তোকে এত দায়িত্ব নিতে কে বলেছে’?

অন্যদিকে আজকের পল্টুদারাও তাদের জাত হারিয়ে আজকের ছেলেগুলোর সঙ্গেই এক গ্লাসের পার্টনার হয়ে বসে পড়ছে রাস্তার পাশে, পুকুরপাড়ে বা কুলতলার মোড়ে। তাই এই বদলে যাওয়া স্বাধীন আবহাওয়ায় একটু অন্যভাবে ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন। মনটাকে বড় করুন। উদার অর্থনীতির খোলামেলা জগতে নিজেও দিলখোলা হয়ে যান। আরও আধুনিক হোন, জীবনটাকে ডিজিটালি বিশ্লেষণ করুন। নেশা সমাজেরই অঙ্গ, তাহলে স্বাধীন ভারতের নাগরিক হয়ে ওই ভ্যাদভ্যাদে সেন্টিমেন্ট আঁকড়ে ধরে পাশ কাটিয়ে বা আলগোছে কেন ? সবার সামনে বীরের মতো ঢকঢক করে খাবো ব্যস। মনে রাখতে হবে এখন সবাই হুড়হুড় করে বড় হচ্ছে। সবারই তো একটা ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে, তাই উৎসবের আনন্দে বা উৎসবহীনতার হতাশায় মাতাল হয়ে মেতে থাকা বা মাতিয়ে রাখাটাই তো জীবন, সমাজ, সংসার। চুলোয় যাক পুরনো, জীর্ণ, আচার ব্যবহার । আসুন হাতে হাত রেখে সবাই মিলে ডিজিটালি মাতাল হই !

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

2 Responses

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।