‘গোল্ড’ দেখতে দেখতে দর্শকাসন থেকে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন মহিলা!

এতদিন ধরে এত সিনেমা দেখছি, কিন্তু ঠিক এরকমটা এর আগে আর কখনও হয় নি।

‘গোল্ড’ ছবির শেষ সিকোয়েন্স। এতক্ষণ ধরে এত লড়াই করার পর ফাইনালি অলিম্পিকে সোনা জিততে পেরেছে ম্যানেজার তপন দাশের (অভিনয়ে অক্ষয় কুমার) তৈরি করা ‘টিম ইন্ডিয়া’। বিহ্বল হয়ে মুহূর্তটা দেখছি তখন আমি। হল-এর মধ্যে সিটি, হাততালি, উল্লাসের ঝড় চলছে প্রায়।

এর মধ্যে আলাদা করে কানে এল এক মহিলার চিৎকার। রিনরিনে এক গলা। প্রচণ্ড আনন্দ উল্লাসের মধ্যেও চেঁচিয়ে মহিলা বলে উঠলেন ‘প্লিজ স্ট্যান্ড আপ’।

গলাটা কানের মধ্যে ঢুকল বলে খেয়াল হল, ওহো – এবারে দাঁড়াতে হবে, না? স্ক্রিনে তখন পাশাপাশি তিন দেশের জাতীয় পতাকা, আর দুটো থেকে ভারতের পতাকা অল্প একটু উঁচু। সাল ১৯৪৮। লন্ডন অলিম্পিকে ভারত সোনা জিতেছে না! ইন্সট্রুমেনটালে তাই শুরু হল জাতীয় সংগীতের সুর। সারা ‘হল’ দাঁড়িয়ে পড়েছে তখন। রিভিউ লেখার জন্যে ছবি দেখতে গেছি, আমার তো তখন নৈর্ব্যক্তিক, আবেগশূন্য থাকার কথা, ভাই! কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, নিজের ভেতরে আবেগের তখন বিস্ফোরণ হয়ে চলেছে যেন।

সিনেমা দেখতে গিয়ে এরকম আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ার জন্য স্যরি।

স্ক্রিনে তখন যে ভিস্যুয়াল্‌সগুলো দ্যাখান হচ্ছে, একদিকে সেগুলোতে বুঁদ হয়ে যাচ্ছি, আবার অন্যদিকে একই সঙ্গে মনে হচ্ছে, যে মহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন, তিনি আসলে কে? এই হল-এর কোন স্টাফ? ওঁর ওপর কোন নির্দেশ আছে যে এই সিকোয়েন্স শুরু হলে দাঁড়ানোর কথা সবাইকে চেঁচিয়ে মনে করিয়ে দিতে হবে?

চারপাশে জোর করে জাতীয়তাবাদ গিলিয়ে দেওয়ার যে ধূম লেগেছে, সেই জন্যেই এই কথাটা মনে হয়েছিল আমার।

কিন্তু তারপর এটাও তো মনে হল যে, বহু কালের পুরনো এই সিঙ্গল স্ক্রিন থিয়েটারে কোন মহিলা স্টাফ তো কখনও চোখে পড়ে নি আমার? আচ্ছা, তার মানে কি উনি আমার-আপনার মতোই সাধারণ এক ভিউয়ার? ছবিটায় দৃশ্যের পর দৃশ্য রচনা তাঁকে তাতিয়ে দিয়েছে এতটা, যে এই মোমেন্টে পৌঁছে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ওই চিৎকার না করে আর থাকতে পারেন নি তিনি!

মহিলা চেঁচিয়ে ওঠার ঠিক পরপর – এক এক করে যখন উঠে দাঁড়াচ্ছে সবাই, তখন অন্য ধার থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠও পেলাম। সঙ্গে থাকা কাউকে তিনি বলছেন, ‘চল, আমরাও উঠে দাঁড়াই’। ছবির একদম লাস্ট ফ্রেম হচ্ছে ম্যানেজার তপন দাশের ক্লোজ আপ শট, আর শুধু মাত্র দুটো কথা, ‘বন্দে মাতরম’। আরে, ম্যানেজার বলবেটা কী, তার আগে হল জুড়ে কী সহর্ষ চিৎকার ‘বন্দে মাতরম’ বলে!

সিনেমা দেখতে দেখতেই যেটা মনে হচ্ছিল, এবার সেটা যেন ক্লিয়ার করে বুঝতে পারলাম আরও। এ সিনেমা তো শুধু সিনেমা নয়, এ তো যেন সিরিঞ্জ ভ’রে দেহের ভেতর আবেগ ইনজেক্ট করা। সিনের পর সিন জুড়ে এই যে এতবার হাততালি দিল লোকে, সত্যি কি রিয়্যাল লাইফে দেশকে এরা এত ভালবাসে নাকি? আমার সন্দেহ আছে, স্যর! এখন এই যে এত হাততালি আর এতগুলো সিটি, এসব তো হলো একের পর এক অক্ষয় কুমারের চোখা চোখা ওই ডায়ালগবাজির গুণ!

ঠিক কী রকম সব মোমেন্টগুলোয় হাততালি-ঝড় ফেটে পড়ছিল, ডিটেলে সেটাও লিখছি এখানে, দাঁড়ান।

সোজা ওই সিনটায় চলুন। টিমওয়ার্ক কাকে বলে, খেলার মাঠে হাতে-কলমে বুঝিয়ে দিচ্ছে কোচ। ’৪৮ সালের অলিম্পিক খেলার জন্যে তৈরি হচ্ছে হকি ম্যাচের টিম। গোটা টিমটাকে কোচ অর্ডার দিচ্ছে, মাঠের একধারে রাখা ইটের স্তুপ সরিয়ে অন্য ধারে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। প্রথম দফায় পুরো কাজটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর, ফের সেই ইটগুলোই মাঠের ওদিক থেকে এদিকপানে আগের জায়গায় ফের নিয়ে এসে রাখার অর্ডার!

সব্বাই তো হাঁ! কোনমতে হাঁফিয়ে উঠে কাজ শেষ করতে না করতেই নতুন করে আবার অর্ডার, ফের ইটগুলো এধার থেকে ওধারে নিয়ে রাখো!

ইট সরানোর অর্ডার দিয়ে কী ভাবে যে টিমওয়ার্কের ম্যাজিক শেখান হল, সেটা এখানে ফাঁস করছি না আমি। শুধু এটুকু লিখি, এই সিনে হাততালির তোড়ে কেঁপে গেছে ‘হল’।

কিংবা ওই সিনটা ভাবুন। তপনকে ছাড়া অলিম্পিক খেলতে গিয়ে বিদেশ-বিভূঁইতে গোলমেলে কেস খেয়ে গ্যাছে টিম। সুতরাং টিমকে বাঁচাতে ফ্লাইটে করে তপন দাশ গিয়ে পৌঁছল ব্রিটেন। ফ্লাইটের দরজা থেকে যখন মুখ বের করছে তপন, তখন তো শুধু হাততালি না, আশপাশ থেকে লোকে শুনছি চেঁচিয়ে যাচ্ছে ‘জিও বাঙ্গালি’ বলে! মনে হচ্ছে সিনেমার শেষ ভাগে এই সিনে এসে হিরোর আবার নতুন করে এন্ট্রি হচ্ছে যেন!

আর হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন, খাস বাংলায় বসে এই ‘জিও বাঙ্গালি’ হাঁকটা শুনে থতমত খেয়ে যাচ্ছিলাম খুব। কারণ, আমরা নিজেরা তো নিজেদের এই ভাবে এই উচ্চারণে ‘বাঙ্গালি’ বলি না কখনও ভাই! আমরা তো বলি – ‘বাঙালি’! অবাঙালি হিন্দিভাষী টোনে বলা ‘জিও বাঙ্গালি’ ফ্রেজটা আপনি শুনতে পাবেন এই ছবির বেশ কয়েকটা সিনে। তার মানে কি সিনেমার ওই কথাগুলোর ইমপ্যাক্ট এত গভীর হল যে, সেটা শোনা মাত্র বাংলার এই দর্শককুল নিজেকে আর ‘বাঙালি’ না বলে দ্রুত ‘বাঙ্গালি’ অবধি বলা শুরু করে দিল?

একটা ছবি যে কী দ্রুতবেগে পালটাতে থাকে দর্শকের মনের ভাষা, মুখের ভাষা – মনে হচ্ছিল, তার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশ চলছে যেন!

‘অগর একতা নাহি রহেগা, তো হাম জিত হি নাহি স্যাকতা’ – ছবির এই ডায়ালগ শুনে ফেটে পড়ছিল ‘হল’। একটা ব্যাপার খুব ইন্টারেস্টিং লাগছিল যে, সিনেমাতে একেবারে লারেলাপ্পা মার্কা নাচ-গানের যে সিকোয়েন্স আছে, সেগুলোতে কিন্তু হৈ হৈ করে সিটি বাজাল না কেউ। সিটি কিংবা হাততালি – যা কিছু হল, হল শুধু সেই সব সিনে, ছবিটা যেখানে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেল একজোট হয়ে দেশের জন্যে রুখে দাঁড়ানোর মোমেন্ট।

লোকে যে ঠিক কী দেখতে চাইছে – পাবলিকের ইনস্ট্যান্ট রিয়্যাকশন থেকে সেই রেজাল্ট ফিল্টার হয়ে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসছে যেন!

শুধু দেশের জন্যে আবেগ নয়। শুধু ‘জিও বাঙ্গালি’ চিৎকার নয়। অবাক লাগল দেখে, যে সিনেমা হল-এ এই একই আবেগ উপচে এল পঞ্জাবি এক হকি প্লেয়ারের মাঠে নামার সিনেও!

ঠিক ধরেছেন, সেটা সেই হিম্মত সিংয়ের (সানি কৌশল) সিন। কী যত্ন করে ওর ট্র্যাকটা ছবির মধ্যে সাজানো হয়েছে ভাই! ব্রিটিশ প্রভুকে মুখের মতো জবাব দেওয়ার জন্যে যে ছেলে হকি স্টিক হাতে ব্রিটেন গেল, সিনেমায় দ্যাখান হল যে, ঘটনাচক্রে আর একটু হলে খেলার মাঠে নামাই হত না তার!

তার পেছনে কতটা তার কপাল দোষ, আর কতটা অন্য লোকের ইগোর দোষ, সেই ডিটেল না হয় স্ক্রিনেই দেখবেন আপনি। এখানে শুধু এক লাইন এইটা লিখি যে, ফাইনাল খেলার সেকেন্ড হাফে কুমার রঘুবীর প্রতাপ সিং (অমিত সাধ) যখন নিজের অহং-টহং সরিয়ে রেখে খেলতে ডাকল ওকে, তখন এত জোর উল্লাসের শব্দ ছিটকে বেরল হল-এ, যে রঘুবীর ওই সিনে ডায়ালগ যে কী বলেছে, সেটা শোনাই গেল না জাস্ট!

বুঝতেই পারছেন যে, এ ছবি দ্যাখার অভিজ্ঞতা ঠিক কেমন হয়েছে আমার।

একদম শুরুর থেকেই ছবিটা তো যেন অন্য তারে বাঁধা! ফার্স্ট সিনটাই হল ১৯৩৬ সালের বার্লিন, অলিম্পিক হকির ফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি জার্মানি আর ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার টিম। আর খেলা দেখতে মাঠে হাজির হিটলারবাবু স্বয়ং! আপনি বলুন, কটা হিন্দি ছবির ওপেনিং সিন এমন এপিক টাইপ হয়?

এখানে একটা কথা সোজাসুজি স্বীকার করি যে, এই ছবিতে যা দ্যাখান হল, সেটা নিয়ে এর আগে আমার জানা ছিল না কিচ্ছু। হকিতে ভারত এক সময় যে সোনা জিতেছিল, জানতাম সেটা ঠিকই। কিন্তু এ ছবিটা দ্যাখার আগে কখনও এটা মনে হয় নি যে, নেট ঘেঁটে এটা খোঁজ নিয়ে দেখি, সেই সব সোনা কবে কবে আর কী কী ভাবে আমাদের দেশে এল।

এই সিনেমা দেখে ওঠার পর প্রথম এটা মনে হল যে, একবার গুগল করে দেখি ইতিহাসে ঠিক কী ঘটেছে তখন। হাতড়ে দেখি যে, সেসব ডিটেল নেটের কোথাও লিখে রাখা আছে কিনা। এখন – এরকম একটা খেলার ওপর আর তার ইতিহাসের ওপর আগ্রহটা হাতে-গরম উসকে দিল যে ছবিটা এসে, সেটাকে আলাদা করে থ্যাঙ্কু না জানিয়ে যাবটা কোথায়, বলুন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে ভারতের হকি টিম অলিম্পিকের ফাইনাল ম্যাচে জার্মানিকে যে তাদের দেশেই ৮-১ গোলে হারায় – এই ছবিটা তৈরি না হলে, সারা জীবন এটা হয়তো জানাই হতো না আমার!

সত্যি সত্যি সেই ম্যাচের দিনে হিটলার মাঠে ছিলেন কিনা, সেটা নিয়ে যদিও দেখলাম এখনও ঢের তর্কাতর্কি আছে। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে অনেকে এটা বলছেন যে, ওদিন ওঁর না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

কিন্তু ওটুকু যদি নাটক জমাতে একটু বাড়িয়ে-চাড়িয়ে দ্যাখান হয়েই থাকে, তাতেই বা কী ক্ষতি হয়, বলুন? আরে বাবা, ডকুমেন্টারি ফিল্ম তো এখানে বানাতে বসে নি কেউ। বানানো তো হচ্ছে এখানে হাই ভোল্টেজ ড্রামা। তাহলে একটু মশলা পাঞ্চ করে দিতে অসুবিধেটা কীসের?

একটা ব্যাপার মাথায় রাখুন প্লিজ। ছবিটা রিয়্যালিটির ভিতের ওপর তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আসলে তো এটা একটা কিং সাইজ রূপকথার স্টোরি। ১৯৪৮ সালে অলিম্পিকে হকির ম্যাচে স্বাধীন দেশের প্রথমবার সোনা জেতার গল্প! আর রসিয়ে বলার জন্য সেই গল্পটাকে হরেক রকম মশলা দিয়ে ম্যারিনেট করে নেওয়া।

বার্লিনের সোনা জেতা দিয়ে শুরু। কিন্তু সেটা তো আর স্বাধীন দেশের সোনা নয়। ব্রিটিশ ভারতের সোনা। ম্যানেজার তপন দাশ তাই শপথ নিল, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও ও ফের হকিতে স্বর্ণপদক নেবে। সেই প্রায় অসাধ্য কর্ম কী করে, করে ওঠা গেল, তাই নিয়ে এই ছবি।   

ছবিতে আপনি দেখতে পাবেন, সোনাজয়ী ১৯৪৮ সালের হকি দলের ম্যানেজার সংখ্যা দুই। কোন এক মেহতা এবং এই তপন দাশ। এখন ইতিহাস বই যদি ঘাঁটতে যান, তো দেখতে পাবেন, রিয়্যালিটিতেও ওই দলে দুজন ম্যানেজারই ছিলেন বটে, এবং কাণ্ড দেখুন – সেই দুজনেই বাঙালি! কিন্তু মজা হল যে, তাঁদের কারুর নাম তপন দাশ কিংবা মেহতাসাব নয়।

একজন এ সি চট্টোপাধ্যায়, আরেকজন পঙ্কজ গুপ্ত। কেউ বলছেন তপন দাশের ক্যারেকটার নাকি এঁদের আদলেই করা। আবার কেউ বলছেন ভদ্রলোকের রোলটা নাকি আসলে ওই হকি টিমের ক্যাপ্টেন কিষণ লালের আদল মেপে তৈরি। এখন ছবিটাকে যেহেতু রিয়্যালিটির মিটার দিয়ে মাপার কোন ইচ্ছেই নেই আমার, সুতরাং কার আদলে তপন দাশ তৈরি হয়েছে, সেটা ভেবে সময় নষ্ট করব কেন বলুন?

রিয়্যালিটি দিয়ে মাপতে গেলে তো অনেক কিছুরই কূল পাব না ভাই! মিল পাবেন না প্লেয়ারদের নামে। যা মনে হয়, বেসিকটুকু এক রেখে ঘটনাগুলোও বানিয়ে বানিয়ে লেখা। খেয়াল রাখুন, রিয়্যালিটিতে হকি ফাইনালে ভারতের কাছে গ্রেট ব্রিটেন হেরে গেছিল ৪-০ গোলে। আর এখানে দেখুন, সিনেমায় দ্যাখান হল – ম্যাচ জুড়ে গোল করা আর গোল শোধ দেওয়ার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। ভারত সেখানে জিতছে মাত্র ৪-৩ গোলে!

গোলের হিস্ট্রি না পালটালে জমবে কী করে স্ক্রিনের নাটক, বলুন? দীর্ঘদিন বসিয়ে রাখা হিম্মতকে খেলতে নামানোর চূড়ান্ত ওই ড্রামা-পয়েন্ট তো এই গোলের ছকেই সাজানো হয়েছে দাদা!

শুধু জম্পেশ করে নাটক জমানো নয়, ছবিটা দেখতে দেখতে আপনি টের পাবেন যে, ছবির মধ্যে আরও অনেক পুরনো ছবির লুকনো ছাপ আছে। যেমন তপন দাশকে কাঠি করে সরিয়ে দিয়ে যখন তাঁর হাতে তৈরি টিমকে নিয়ে অলিম্পিক খেলার জন্যে গ্রেট ব্রিটেন পৌঁছে গেল আরেক ম্যানেজার মেহতা, তখন আপনার মনে হতে পারে ‘শালা খাড়ুস’ (২০১৬) ছবিটা থেকে প্লট পয়েন্ট টুকে মারছেন কেউ।

সবাই মিলে খেলতে গেলে যে শুধু নিজে গোল করলেই চলে না, পাশের জনকে সময় এবং সুযোগ বুঝে পাস বাড়াতে হয়, সেটা তো পুরো ‘চক দে ইন্ডিয়া’ (২০০৭) থেকে ছেপে বসিয়ে দেওয়া! আর সবার ওপর তো রয়েইছে ‘লগান’ (২০০১) নামে ছবিটা, ‘গোল্ড’ ছবির নানা দৃশ্যে টুকরো টুকরো করে যেটার রেফারেন্স আসতে থাকবে মনে।

কিন্তু সত্যি বলছি, ‘গোল্ড’ দেখতে এত ভাল লাগছিল যে, এগুলোকে দোষের বলে ধরতে পারছিলাম না আমি।

তবে তাই বলে আমার এই লেখার পুরোটাই প্রশংসা নয় কিন্তু। ছবির কয়েকখানা ব্যাপার দেখে সত্যি কথা বলতে কি, খারাপ লেগেছে খুব। যেমন ধরুন, একটা দৃশ্য তো এমন করে সাজানো হল যে, বৌদ্ধ ধর্মের এক সন্ন্যাসীকে মনে হল কার্যত এক আস্ত জোকার বলে। পাঁচ বছর ধরে মৌনব্রত পালন করার পর হকি টিমের স্টার প্লেয়ারের দ্যাখা পাবেন, শুধু এই কথাটা শোনামাত্র নাকি ওঁর ব্রতের দফা-রফা! সিনটা দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে ভাবছিলাম যে, বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে এই খিল্লিটা না করলে কি ক্ষতি হত কিছু ছবির?

মনে হল, গিয়ে জেনে আসি, বৌদ্ধ বলেই করা গেল এটা, আচ্ছা দাদা, পারতেন এই চটুল খোরাক ইসলাম নিয়ে করতে?

আর হ্যাঁ। স্ক্রিপ্টে নন-স্টপ এন্টারটেনমেন্ট দিচ্ছেন, ব্যাপার হিসেবে এটা তো খুব ভাল। কিন্তু তার জন্যে বৌদ্ধ মঠের অতিথিশালায় মশারি ফেলে গানের তালে স্ত্রীয়ের শরীরে তপন দাশের লিপ্ত হওয়ার সিনও দ্যাখাতে হল!

আর সেই পার্টির দৃশ্যটা? তেড়ে মদ খেয়ে ‘বাঙ্গালি’ তপন দাশ যে ভাবে ধুতিটাকে টেনে তুলে নাচতে শুরু করে দিল, জানি না সেটা কোন হিসেবে রাখা। অলিম্পিকে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, তখন দ্বিতীয় ম্যানেজার মেহতার কারসাজিতে মদ খেয়ে সবার সামনে বেহুঁশ হয়ে বেলেল্লা করতে থাকবে রেসপন্‌সিবল তপন, শুনতে একটু কেমন কেমন লাগছে না যেন, স্যর?

নাকি প্যান ইন্ডিয়া স্টাডি করে এটা দ্যাখা গেছে যে, পাবলিক টানতে হলে এরকম গান লাগে!

অথচ এই ছবিরই অন্য অংশে কী মেপে ব্যালেন্স করে লেখা হয়েছে স্ক্রিপ্ট! পাকিস্তানের ম্যাচের আগে তাঁদের গিয়ে জয়ের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসছে ভারতের ম্যানেজার তপন! আবার ভারতের ফাইনাল ম্যাচে ভারতের হয়ে হাততালি দিয়ে ফাটিয়ে দিচ্ছে পাকিস্তানের ক্যাপ্টেন! আজকের এই যুদ্ধু-যুদ্ধু খেলার দিনে এরকম সব দৃশ্যাবলী সার-রিয়্যাল মনে না হয়ে আর কী হবে, বলুন?

লেখার শেষে স্পষ্ট করে এটাও লিখি যে, ‘গোল্ড’ ছবিটা সবার কিন্তু ভাল লাগে নি আদৌ। পরিচিত এক আধুনিকা দেখলাম ছবি দ্যাখার পর শুরুই করলেন এটা বলে যে, ‘উহ বাপ রে বাপ, কী খারাপ সিনেমা দেখে এলাম একটা আমি’।

ছবিটা কেন খারাপ সেটা নিয়ে ডিটেল কিছু বলেন নি তিনি বটে। তবে দয়া করে শুধু এটা বলেছেন, ‘ওটা কি একটা সিনেমা হয়েছে নাকি?’

তাঁর মুখে এই কথা শুনে সাহস করে আর বলতে পারি নি, যে বেশ কিছু দোষ-ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ছবিটা আমার ভাল লেগে গেছে খুব।

আর একটা ব্যাপার দেখে মজা লাগল বেশ। ‘গোল্ড’ রিলিজ করার দিনকয়েকের মধ্যেই দেখলাম, প্রায় হুড়মুড় করে বাঙালি আইকন নেতাজীকে নিয়ে ফেসবুক পেজে ছবির ঘোষণা হল। তাড়াহুড়ো দেখে মনে হচ্ছিল, টালিগঞ্জ বোধহয় ভয় পেয়ে গেছে, বাঙালি হিরোকে নিয়ে ফিল্ম বানানোর রেস-টায় সে পিছিয়ে পড়ছে বলে!

এটা ১৯৪৮ সাল নয়, আর এখানে ম্যানেজার-কাম-গাইড সেই তপন দাশও নেই। আইকনিক বাঙালি নিয়ে ছবি করে ‘গোল্ড’ তো জিতেই নিয়েছে বলিউড, তাকে ছোঁয়ার সাধ্য কি আর বাংলা ছবির হবে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here