গলনাঙ্ক

130

তৃতীয় ছবিটার অভূতপূর্ব সাফল্যের পর ডিপার্টমেন্ট মূলত অভিরূপদার উদ্যোগে যশমাল্য চ্যাটার্জীকে একটা ছোটখাটো সংবর্ধনা দেয় | সংবর্ধনার পর ছিল যশের বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব | তারপর একটা কফি মিট্ | কফি মিটেই যশমাল্যর সঙ্গে প্রাথমিক আলাপটা হয়ে যায় গর্বীর | এরপর ছিল ফার্স্ট ইয়ারের বাছাই কয়েকজনের তৈরি ছবির প্রদর্শনী | সেখানে গর্বীর ছবি ‘ইনকগনিটো’-ও দেখানো হয় | যশমাল্যর বিশেষ রকম ভাল লাগে তার কাজ | সাত মিনিটের ছবিটার মধ্যে কিছুই ছিল না আসলে | একদিন রাত দশটার সময় বাড়ি ফেরার জন্য একটা ট্যাক্সিতে উঠে ট্যাক্সিওলাকে দেখে চমকে ওঠে গর্বী! বৃদ্ধ, আশির কাছাকাছি বয়েস, ন্যুব্জ, স্টিয়ারিং-এর উচ্চতা থেকে এইটুকু উঠে আছে মাথাটা | কঙ্কালসার শরীর কোটরাগত চোখ, কপালে নীল নীল শিরা ফুলে ফুলে উঠছে, হাঁপড়ের মত ওঠা নামা করছে বুক | মাঝে মাঝে কাশির দমকে স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বুক চেপে ধরছে লোকটা | ঘাড় ওঠে না যার সে রাস্তা দেখবে কি? গর্বী বুঝতে পারে আসলে রাস্তাঘাট কিছুই দেখছে না লোকটা — গাড়ি চালাচ্ছে, ব্রেক কষছে, থামছে, দাঁড়াচ্ছে, হর্ন দিচ্ছে! একটু ধাতস্থ হওয়ার পর লোকটা অন্ধও ধরে নিয়ে সে হঠাৎ ব্যাক সিট থেকে ঝুঁকে পড়ে বৃদ্ধের চোখ দুটো চেপে ধরে এবং তাকে চূড়ান্ত অবাক করে দেওয়ার জন্যই তাতেও থেমে যায় না ট্যাক্সিটা, বৃদ্ধের কোন সাড়াও পাওয়া যায় না! একটা প্রাণহীন দেহ যেন স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে বসে আছে মাত্র | এই অবস্থায় তীরবেগে ছুটতে থাকে ট্যাক্সি | চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিতে নিতে গর্বীর মনে হয় তাহলে কি চালক বলে কেউ থাকেই না — আসলে থাকে শুধু চালিকাশক্তি? চালানোর ইচ্ছে! টেনে নিয়ে যাওয়ার স্পিরিট? এই ব্রহ্মাণ্ডটা কি এভাবেই চলছে? এর পরের ঘটনা গর্বীর বিন্দুমাত্র মনে নেই! কোথায় ট্যাক্সিটা থামে, সে কিভাবে বাড়ি পৌঁছোয় — এসব কিছুই মনে নেই তার | সাহানাকে পরেরদিন সকালে ঘটনাটার বিবরণ দিতে সাহানা রেগে ওঠে তার ওপর, ‘ডোপ করেছিলিস নিশ্চই! গাঁজাখোর কোথাকারে’ সে নিজেও ধরে নেয় সেটাই সত্যি, এর বাইরে কিছু হওয়া অসম্ভব | কিন্তু এটাই যে হবে তার ছবির বিষয় এই সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে সে তৎক্ষণাৎ! ট্যাক্সি চালাতে পারে ওই রকম এক অশীতিপর, ক্ষয়াটে বৃদ্ধ খুঁজে পেতে কিছুটা সময় যায় তার্ | যেটা ঘটেছিল বলে তার বিশ্বাস সেটাই ছবি, ক্যামেরা ব্যাকসিটে রেখে শ্যুট করে গর্বী | চালকের মুখটা সামনে থেকে একবারও দেখা যায় না!

সিগারেট খাওয়ার জন্য স্ক্রিনিং চলাকালীন বাইরে বেরিয়ে এসেছিল গর্বী | সুমেধা এসে বলল ‘যশমাল্য চ্যাটার্জ্জি ইজ লুকিং ফর ইউ’ সেদিন যশের সঙ্গেই ইউনিভার্সিটি ছেড়েছিল গর্বী সবার কটাক্ষের মধ্যে দিয়ে | যশমাল্য তাকে বলে, ‘গর্বী, হোয়াই ডোন্ট ইউ বি আ পার্ট অফ মাই ইউনিট?’ কোন একটা প্রডাকশন হাউস জয়েন করার কথা গর্বী তখন ভাবছিলোই | ‘অ্যাকচুয়ালি আই অ্যাম লুকিং ফর সামওয়ান যে আমাকে স্ক্রিপ্ট লিখতে সাহায্য করবে! তুমি সেই কাজটাই করতে পারো আমার সঙ্গে | তোমার তো ইচ্ছে চিত্রনাট্য নিয়েই কাজ করার?’

গর্বীর দিক থেকে আপত্তির কোন কারণ ছিল না | পরেরদিনই যশের এক্সিকিউটিভ প্রডিউসারের ফোন আসে তার কাছে | ‘ফ্রিমেন’ করপোরেশনস্-এর একজন স্যালারিড এমপ্লয়ি হয়ে যায় সে | খুব ধীরে ধীরে যশের ভেবে রাখা গল্পের চিত্রনাট্যে তার হাতের ছাপ পড়তে শুরু করে | রক্তিম, রিপনরা যাই বলুক একটা চাকরি বাকরি তাকে জোটাতেই হত | কোন ‘লোকনাথ’ প্রডাকশন্-এর আন্ডারে টিভি সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লেখার থেকে ‘ফ্রিমেন’ কর্প অনেক ভালো | তার ফিল্ম স্টাডিজের বন্ধুরা যশ সম্পর্কে কি ভাবে তা যশ ভালো করেই জানে অবশ্য | যশ হাসে, ‘সিনেমা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা আর সিনেমা বানানো এক ব্যাপার নয় | ওরা মনে করে ওরা রিবেলিয়ন | ফুটপাতে গাঁজা খেয়ে পড়ে থাকাটাই বিরাট বিপ্লব ওদের কাছে! রক্তিমের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডটা দ্যাখ গর্বী | ওরা চার পুরুষের অ্যাটর্নি | এসব এক্সপেরিমেন্ট ওদের মানায়্ | তোকে কিন্তু অন্য ভাবে এগোতে হবে | শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না! এবং কথাটা ঠিকই বলে যশ! কিন্তু ইদানীং বেশ একটু কনফিউজড গর্বী | সে বুঝতে পারে না তার এগোনোটার মধ্যে খুব বেশি লড়াই আছে কিনা! সেটা বুঝতে পারে না বলেই ‘ফ্রিমেন’ থেকে মাস গেলে অনেক কটা টাকা হাতে পেয়েও সে নিজের টিউশনিগুলো ছড়েনি!

বেলতলায় যখন গর্বী বাস থেকে নামছে তখন তূনীরের ফোন এল, ‘গর্বী, তোকে ডিপার্টমেন্টে খুঁজলাম পেলাম না, তুই কি ক্যাম্পাসের ভেতরে আছিস?’

সে বলল, ‘নাহ, আমি বেরিয়ে এসেছি অনেকক্ষণ!’ তূনীরের গলাটা কেমন যেন শোনাচ্ছে? মুহ্যমান, তার মনে পড়ল আজ সকাল থেকে তূনীরের সঙ্গে একবারও কথা হয়নি তার | তূনীর ফোন করেনি |

‘তুই এখন কোথায়?’

‘আমি পড়াতে যাচ্ছি, কেন তূনীর্?’

‘তোর সঙ্গে একবার দেখা হতে পারে?’

‘তোর তো এই উইকটা পুরোই টিউশন ছিল, বলেছিলিস!’

যারা টিউশন দেয় তাদের সকলেরই এই সময়টা চাপ থাকে, ঘরে ঘরে অ্যানুয়াল পরীক্ষা, স্কুল ফাইনাল |

‘আজ পড়ানো ড্রপ করেছি |’

সে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল সঞ্চারীর বাড়ির দরজায় | ’কেন?’
’মাথাটা খারাপ হয়ে আছে আমার গর্বী, কিছুতে মন দিতে পারছি না! ছটফট করছে ভেতরটা |’
সে চুপ করে রইল |
’গর্বী?’
’বল, শুনছি |’
’কতদিন হয়ে গেল আমরা কিছু করিনি গর্বী! পড়াশুনো কিছু হচ্ছে না আমার | জোর করে চেষ্টা করলে মাথা ধরে যাচ্ছে! আর ডোপ করলে তিন চার ঘন্টা পরে এমন ইরেকশন হচ্ছে যে পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি | ! সব তোর জন্য |’
’তুই তো জানিস তূনীর আমার সমস্যাটা কোথায় |’
’আমি জানি! আমি আর তোকে ওসব কিছু বলব না | আজ একটু আমাকে দে | সাহানা কলকাতায়?’
’না!’
’রতে থাকব আমি তোর কাছে?’
’তূনীর যশের সঙ্গে কাজ আছে আমার | আমি জানি না কত রতে ফিরব | বিদেশ যাওয়ার আগে যশ স্ক্রিপ্টটা শেষ করতে চাইছে | তেমন হলে আমি রতে নাও ফিরতে পারি!’
’যশ! আই হেট দ্যাট ম্যান! আমি জানি তুই যশের সঙ্গে রিলেশনশিপে জড়িয়ে পড়েছিস |’
’তূনীর! চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠল গর্বী | ’আই হ্যাং আপ | ওকে! পরে কথা হবে?’
’ফোন ছাড়িস না প্লিজ!’
’তুই পজেসিভ হয়ে যাচ্ছিস | আই ডোন্ট লাইক ইট!’ তুই যদি এরকম করিস আমার তোকে অ্যাভয়েড করা ছাড়া উপায় নেই তূনীর |’
’ইউ আর কিলড গর্বী!’ হিস হিস করে বলল তূনীর |
’আই গিভ আ ড্যাম!’ ফোন সুইচ অফ করে দিল সে |
সঞ্চারীদের বাড়িটা খুব পুরোনো | প্রায় লড়ঝরে | একতলাটা ভাড়াটেদের দখলে | দোতলায় সঞ্চারী মা আর ঠাকুমার সঙ্গে থাকে | সঞ্চারীর বাবা নেই | গত বছরই মারা গেছেন | খুব একটা ভালো অবস্থায় ফেলে যাননি তিনি পরিবারকে | এখন সঞ্চারীর মা কোথাও একটা ছোটখাট চাকরি করেন | বেশ কষ্ট করেই ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ানোর খরচ খরচা চালাচ্ছেন সঞ্চারীর | কিন্তু বাবা মারা যাওয়ায় ক্লাস এইটের মেয়েটার কনফিডেন্সটা একদমই ভেঙেচুরে গেছে | ভীষণ অমনোযোগী হয়ে উঠেছে সঞ্চারী পড়াশোনোয় | স্কুলে যেতে অনীহা, কারও সঙ্গে মেলামেশায় অনীহা, বাড়ি থেকে বেরোনোয় অনীহা | গত বছর রেজাল্টটা খুবই খারাপ করেছিল আর এ বছর তো পরীক্ষায় বসতেই চাইছিল না | যাও বা বসল ম্যাথসের দিন পরীক্ষা চলাকালীন নার্ভাস-ব্রেক ডাউন হয়ে গেল মেয়ের | এখন মোটামুটি সব পরীক্ষাই হয়ে গেছে — বাকি শুধু ইংলিশ আর বেংগলি সেকেন্ড পেপার | এই সাবজেক্টগুলোই গর্বী দেখে | সত্যি বলতে টাকার জন্য পড়ায় না গর্বী সঞ্চারীকে | মায়াবশতঃও নয় | নানা অসুবিধা সত্ত্বেও সঞ্চারীকে ছেড়ে যেতে পারেনি গর্বী বিরক্তিতে | এইটুকুনি মেয়ে তার এত কিসের ভয়? বাবার মৃত্যুর শোক, সে এক জিনিস আর বাবার মৃত্যুর কারণে বাস্তব জীবনের ইনসিকিউরিটি, ভয় সে আর এক জিনিস | গর্বী সঞ্চারীর মধ্যে এই ভয়টাই দেখে | এবং নিজের সঙ্গে এক ধরনের তুলনা সে করেই ফেলে সঞ্চারীর | বাবা, মা-র মৃত্যুর পরের অবস্থাটা এখনও মনে আছে গর্বীর যদিও তখন সে অনেক অনেক ছোট | অনেক ছোটবেলায় যাদের বাবা, মা মারা গেছে তারা অন্য কারও পিতা, মাতার সংবাদে, বা বাবা, মা নেই শুনলে একটুখানিও চমকায় না | বিশেষত গর্বীর মনে হয় এ আর এমন কি বড় ব্যাপার! এও এক ধরনের স্বাধীনতা বলে টের পায় সে | যদিও কোন এক সময়ে যে বাবা, মা বলে দুজন ছিল — এও এক ধরনের ভার | মাঝে মাঝে নানা ঘুরপথে সেই সত্যিটা সামনে এসে দাঁড়ায় | এই যেমন কয়েকদিন আগে রাসবিহারীর মোড়ে অটো ধরার সময় পেছোন থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ চেঁচিয়ে উঠল ‘ট্যাক্সি, ট্যাক্সি?’ গলাটা ভয়ংকর রকম চেনা মনে হল গর্বীর | অটোটা ছেড়ে দিয়ে সে দাঁড়িয়ে দেখতে চেষ্টা করল লোকটা কে? পরিচিত কিনা! স্বাস্থ্যবান মধ্যবয়মী ভদ্রলোককে একটু-ও চেনা মনে হল না তার | তারপর সমস্ত রাস্তা সে ভেবে বের করার চেষ্টা করল কেন লোকটা চেনা নয় অথচ গলাটা এত চেনা? সাহানার অফ ডে ছিল সেদিন | দুজনে একসঙ্গে ডিনার করল সেদিন, গল্প-টল্প করে শুতে-ও চলে গেল গর্বী | এবং মাঝরাতে সম্পূর্ণ ঘুমন্ত অবস্থায় তার মনে পড়ল কেন ওই গলার আওয়াজটা এত দূর চেনা মনে হচ্ছিল তার! চোখ মেলে তাকিয়ে হেসে উঠেছিল সে রাতে — ঠিক ওরকমই ছিল তার বাবার কণ্ঠস্বর! প্রায় পনেরো বছর অতিক্রান্ত করেও স্মৃতি সেই কণ্ঠস্বরকে ধরে রেখেছে | এত বছর ধরে লক্ষ্য লক্ষ্য কণ্ঠস্বরের মধ্যে থেকে কোনটা সমগোত্রীয় জানিয়ে দিয়েছে তাকে! কিঞ্চিৎ আশ্চর্য হয়েছিল সে |

এই ঘটনার পর এখন হঠাৎ হঠাৎ তার ইচ্ছে করে মায়ের কণ্ঠস্বরটাও খুঁজে বের করতে | বাসে, মেট্রোয়, পথ চলতে চলতে কোনও মহিলা কথা বলে উঠলে সে চোখ বুজে শুনে বোঝার চেষ্টা করে — এরকমটাই ছিল নাকি তার মায়ের গলা? কিন্তু ভিড় থেকে আর অকস্মাৎ ছুটে এসে স্পর্শ করে যায় না তাকে কোনও গলার স্বর ওইভাবে | স্মৃতির সঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় মিলিয়ে দেখতে গিয়ে এখন ব্যাপারটাই তালগোল পাকিয়ে গেছে | সম্ভবত এখন তার মায়ের গলায় কেউ কথা বলে গেলেও পাশে দাঁড়িয়ে গর্বী তা আর চিনে উঠতে, আইডেনটিফাই করতে ব্যর্থ হবে!

বই খাতা খুলে বসে আছে সঞ্চারী | সে ঢুকতে কানের পাশে বারবার চুল গুঁজতে লাগল অস্থিরভাবে, সে বসল চেয়ারে, ‘কেমন হল তোর জিওগ্রাফি?’

সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল মেয়ের |

‘অ্যাই, আবার? সঞ্চারী কনট্রোল ইওর সেল্ফ, নইলে কিন্তু আমি চলে যাব |’

দুহাতে মুখ ঢাকল সঞ্চারী‚ ‘আমি…, আমি পাস মার্ক তুলতে পারব না! টোয়েন্টি ফাইভ নাম্বার আন্-অ্যাটেনডেড আমি কিছু লিখতে পারিনি! কিছু না!’

তার ভীষণ ইচ্ছে করল এই সময় একটা সিগারেট ধরায়, এবং অনুপমা আন্টি চা হাতে ঢুকলেন | সে চোখ ছোট করে তাকাল সঞ্চারীর দিকে | ‘পাশ না করলে কি এসে যাবে বল? আর এক বছর পড়বি ক্লাস এইটে | পাশ না করলে অনুপমা আন্টি কি তোকে ফেলে দেবে? বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে সঞ্চারী?” চায়ে বড় বড় চুমুক দিল সে | সঞ্চারী কেঁদেই যাচ্ছে | খাটের ওপর বসলেন অনুপমা আন্টি | ‘সবাই বলছে ওকে সাইক্রিয়াট্রিস্ট দেখাতে | কি করি আমি বলত?’

‘সাইক্রিয়াটিস্ট তো দেখাতেই হবে তোমাকে আন্টি! কেউ যদি পরিস্থিতিকে ফেস করতে না চায়, হেরে যাওয়ার আগেই হেরে বসে থাকে তাহলে তার তো মানসিক চিকিৎসা হওয়ার দরকারই |’ সে দায়িত্ব নিয়ে বকাঝকা শুরু করল সঞ্চারীকে | একটু পরে উঠে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে এসে বসল সঞ্চারী, রেন অ্যান্ড মার্টিন খুলে প্রশ্ন করতে লাগল সে | এবং তাকে তিতিবিরক্ত করে দিতে ভুল উত্তর দিতেই থাকল মেয়েটা | রাগে, দুঃখে মাথায় হাত দিয়ে বসল গর্বী | অনুপমাও প্যানিক করতে লাগলেন, ‘ও কিছুই পারছে না? কি করে হতে পারে? সত্যিই কি ও এ বছর ক্লাসে উঠতে পারবে না? ও কি পড়াশুনো করবেই না আর? ফেল করলে ওকে তো এই স্কুল রাখবে না? আমি তখন ওকে কোথায় ভর্তি করব? কি করব এই মেয়ে নিয়ে আমি? আমি তো আর পারছি না, আমার শরীর দিচ্ছে না! মাঝে মাঝে আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে! মনে হয় মেট্রোয় ঝাঁপ দিই |’

‘চলো, চলো, তাই চলো মা, আমি আর তুমি মেট্রোয় ঝাঁপ দিই, আমার খুব ইচ্ছে করে শেষ করে দিই নিজেকে | আমি তো পারব না মা, আর ভালো মেয়ে হতে পারব না!’ চোখ মুখ লাল করে কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় আছড়ে পড়ল সঞ্চারী | গর্বী দুজন মানুষকে হা হুতাশে কাঁদতে দেখে সিদ্ধান্ত নিল আর এ বাড়িতে আসবে না সে | এ বাড়ির দেয়ালে, ফার্নিচারে, বালিশে, চাদরে, পর্দায় সর্বত্র বিষাদের চিহ্ন | বড় বেশি বিষাদ! উঠে বেরিয়ে আসার সময় সে অনুপমাকে বলল, ‘আন্টি, যদি পারো ওকে নিয়ে কোথাও ঘুরে এসো কয়েকদিনের জন্য, পরীক্ষার পরে!’ নিচে নেমে ঝোলা থেকে ফোন বের করতে করতে একবার বাড়িটার দিকে তাকাল সে, তার মনে হল সত্যিই আত্মহত্যার গন্ধ মেখে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা, পশ্চিমের ওই ঘরটাতেই তো আত্মহত্যা করেছিলেন সঞ্চারীর বাবা! সম্পূর্ণ অজানা কোনও কারণে!

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.