গোপালপুর, সমুদ্রের হাওয়া আর কাঁকড়া ভাজা

928
হোটেলের বারান্দা থেকে আঁকা গোপালপুরের সমুদ্রসৈকত

ইদানিংকালে গোপালপুর যাবার কথা হলেই সবাই নিরুত্সাহ করছে… শেষে বন্ধু চন্দ্রনাথ যখন সপরিবারে ঘুরে এসে উচ্ছ্বসিত হয়ে ছবি-টবি দেখাল ঠিক করে ফেললাম একবার যাওয়াই যাক ওড়িশার গঞ্জাম জেলার উদ্দেশ্যে | সব থেকে বেশি টেনেছিল ‘হোটেল সি সাইড ব্রিজ’ | ওখানে দোতলার দশ নম্বর ঘর থেকে নাকি যেমন খাসা সি ভিউ তেমনই ঝড়ের মতো হাওয়া | হাওড়া থেকে রাত সাড়ে এগারোটার অমরাবতী এক্সপ্রেসে চেপে পরদিন সকালে পৌঁছে গেলাম বেরহামপুরে, এটা ইংরেজদের দেওয়া নাম, আসলে হচ্ছে ব্রম্ভপুর, সব জায়গায় তাই লেখা | গোপালপুর এখান থেকে ১৫ কিমি, অটোতে লাগল চল্লিশ মিনিট | হোটেলটি আমাদের যাকে বলে সার্থকনামা, ১০ নম্বর ঘর তৈরি ছিল, দরজা খুললেই বিরাট বারান্দা, হোটেলের পাঁচিলের গা থেকেই শুরু হয়ে গেছে বালিয়াড়ি, তারপরেই উত্তাল সমুদ্র | তবে আরও ভয়ংকর হলো সারাক্ষণ প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো ঝড়ো হাওয়া | মার্চ মাসের শেষ দিক, দিনের বেলা এখানে ঝলসানো রোদ ফলে এই হাওয়া বেশ মনোরম লাগে…রাতের দিকে তো বেশ ঠান্ডা | বুঝলাম ইংরেজদের জায়গাটা কেন এত পছন্দ হয়েছিল |

জেলেনৌকো

জলপথে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্য নিয়ে বহু আগে থেকেই বিদেশীরা এ অঞ্চলে ঘাঁটি গাড়তে শুরু করে…ইংরেজরা আসে অনেক পরে এবং মূলতঃ ধর্ম প্রচারক হিসেবেই, তারপর জল হাওয়ার টানে কলোনি বানিয়ে ফেলে | সামান্য মাছ চাষিদের গ্রাম হয়ে ওঠে ‘গোপালপুর অন সি’ |আমার অবশ্য সাহেবী বাড়ি খুব একটা চোখে পড়ল না | একদা এখানে ‘হোটেল মারমেড’-এর খুব নাম ছিল…এক আর্মেনিয়ান মহিলা ভারতীয়কে বিয়ে করে এই হোটেল চালু করেন, বাঙালি টুরিস্টরা এসে মনের সুখে সমুদ্রের হাওয়া আর কন্টিনেন্টাল খাবার উদরস্থ করত | মারমেড এখন ঝাঁ চকচকে তিনতলা বাড়ি…সেই ইউরোপিয়ান মেজাজটা কোথায় হারিয়ে গেছে |

লাইটহাউস এক পায়ে দাঁড়িয়ে

আমি বা গিন্নি কেউই জলে নেমে ঝাঁপাঝাঁপি করার মধ্যে নেই তার চেয়ে বরং বালির ওপর ছোট ছোট ছাউনির তলায় বসে দিব্যি ছোলার চাট খেতে খেতে ঢেউ-এর লাফালাফি দেখো | বিকেলের দিকে রোদ পড়লে জলের ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জেলেদের বস্তি ছাড়িয়ে চলে যাওয়া যায় আরও নির্জন জায়গায় | গোপালপুরে গাছপালা বিশেষ নেই, একটু ন্যাড়া ন্যাড়া…লোকের হাঁকডাকও কম | তবে দুপুরের পর থেকে বাস বা অটো চেপে সেজেগুজে ঘুরতে আসে প্রচুর স্থানীয় মানুষ, বালির ওপর সারি সারি লাল প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে ফেলা হয়, একটু দূর থেকে মনে হবে যেন কাঁকড়ার দল |

বিচ রোডের ধারে খাবারের দোকান

ঝিনুকের গয়নার চিরাচরিত দোকানগুলো জাঁকিয়ে বসে, পাড় লাগোয়া বিচ রোডের রেস্তোরাঁগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে | টকটকে লাল রঙের কাঁকড়া, চিংড়ি আর রুই মাছ ঝোলানো, বললেই মুচমুচে করে ভেজে দেবে | লোভে পড়ে এক প্লেট কাঁকড়া অর্ডার দিলাম বটে কিন্তু পাম তেলের এমনই বিটকেল গন্ধ যে শেষ পর্যন্ত মুখে দেওয়া গেল না | হোটেল থেকে দু পা হাঁটলেই প্যাট্রিকের বাড়ি, চন্দ্রনাথ বলে দিয়েছিল, সন্ধেবেলায় একবার ঢু মারলাম | একতলা ছোট বাড়ি, কাঠের গেট দিয়ে ঢুকে সামনের ঘরটায় বসলাম |

লোকটা আধা সাহেব…বাবা ছিলেন পাঞ্জাবি,গত তিরিশ বছর ধরে এই বাড়িতেই আছেন, এখানকার একটা চার্চের সঙ্গে যুক্ত | ৭৫ বছর বয়সেও দেখলুম স্বাস্থ্য বেশ ভাল, “একা মানুষ তো,ব্যায়াম-ট্যায়াম করে শরীর ঠিক রাখতে হয়”…থামস আপের বোতল এগিয়ে দিয়ে বললেন প্যাট্রিক | শুনলাম ওঁর কলকাতা বেশি ভালো লাগে, এখানে নাকি আজকাল সাহেব বিদ্বেষ ক্রমশ বাড়ছে |

বিচের ওপর জগদীশের চাটের দোকান

সমুদ্র, বালিয়াড়ি, জেলেনৌকা এসব আগে যথেষ্ট এঁকেছি কিন্তু গোপালপুরে বাড়তি পেয়ে গেলুম একটা লাইট হাউস, অনেকটা ঘেরা জায়গার মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে | লাল সাদা ডোরায় বেশ খোলতাই চেহারা | এছাড়াও যেটা চোখে পড়ার মতো সেটা হলো বালির ওপর বিশাল একটা জরাজীর্ণ বাড়ি, সামান্য কয়েকটা দেওয়াল আর ছাদ সম্বল করে কোনক্রমে টিকে আছে | শোনা যায় সে আমলের বিদেশী সওদাগরেরা মালপত্র রাখার গুদামঘর হিসেবে এই বাড়ি বানিয়েছিল |

গোপালপুরে দু’দিন থেকে আমরা রওয়ানা দিলাম রম্ভার উদ্দেশ্যে, চিল্কা হ্রদের ধরে বেশ জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পট | অটোতে ঘন্টা দেড়েক লাগল | অনেকেই গোপালপুর থেকে এসে সারাদিন কাটায় | আমরা পান্থনিবাসে ঘর বুক করে নিয়েছিলাম এক রাত থাকব বলে | বাড়িটা ছড়ানো, একতলা দোতলা নিয়ে ঘর অনেক, সামনে বিশাল বাগান পেরিয়ে এলেই জল শুরু…একটা জেটির মতো করা আছে, শেষ মাথায় রেলিং ঘেরা, লোহার বেঞ্চ দেওয়া মাথায় ছাউনি, বসে ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা বিশাল লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় |

রম্ভা থেকে চিল্কা হ্রদ

নৌকো চেপে জলবিহারও হয় কিন্তু শোনা গেলা ভাঁটার টানে আজ জল খুব কম ফলে মাঝিগুলো এক ধারে জটলা করছে | এর মধ্যে বাবু বলে এক ছোকরা দেখলুম বেশ চৌখস, জলের ধারে সব নৌকো লাগানো…বললাম নিয়ে চলো তোমার নৌকোয় ওখানে বসে ছবি আঁকব | স্রেফ হাত পা ছড়িয়ে কাটানোর পক্ষে চমত্কার জায়গা রম্ভা, অবশ্য যদি তেমন গরম সহ্য করার ক্ষমতা থাকে | শুনলাম পান্থনিবাসের সব ঘরেই এ.সি লাগানোর ব্যবস্থা হচ্ছে | গ্লোবাল ওয়ার্মিং ক্রমেই বেড়ে চলেছে কিনা |

বাবুর নৌকোতে বসে আঁকা জেটির মুখ

ফেরাটা রাতের ট্রেনে ফলে স্টেশন যাবার পথে তরতারিণীর মন্দির দর্শন হয়ে গেল | চারটে প্রধান শক্তি পীঠের একটা এই মন্দির পাহাড়ের ওপর, অতিভক্তরা হেঁটেই ওঠে | এছাড়া আছে রোপওয়ে, আমরা ওটা চড়েই চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে গেলাম | পাহাড়ের মাথাতে দেখলাম একেবারে লন্ডভন্ড অবস্থা | চারদিক বাঁশ দিয়ে ঘেরা সারারাত ধরে যাত্রা হয়েছে ফলে ভিড় আর নোংরা, কোথাও আবার পুরোদমে সরানোর কাজ চলছে, কোনরকমে মন্দিরের দরজা অবধি পৌঁছনো গেল | এই পাহাড়ের আশেপাশের অঞ্চলটা মন্দ নয়, জঙ্গল আছে, রিশিকুল্যা নদী আছে, একটা চমত্কার বনবাংলোও ছিল সেটার এখন ভগ্নদশা | কলকাতা থেকে তাই বিশেষ কেউ আর বেড়াতে আসে না | এবার আমাদের ঘরে ফেরার পালা, খালি মনে হচ্ছিল একটা আফশোস রয়ে গেল, গোপালপুর ঘুরে গেলাম অথচ প্রফেসর হিজিবিজবিজের সঙ্গে দেখা হলো না |

Advertisements

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.