ভূত, কমেডি, সেক্স আর মুক্তিযুদ্ধের স্বাদু মকটেল

আজ থেকে কুড়ি বছরের একটু বেশি আগে, ঠিক যে বছর ছাপা হলো বাণী বসুর উপন্যাস ‘গান্ধর্বী’, আর সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘কাচের দেওয়াল’, চলে গেলেন সত্যজিৎ রায়, বের হল সুমনের গানের ক্যাসেট ‘তোমাকে চাই’ আর বাবরি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল হৈ-হৈ সগর্বে, সেই ১৯৯২তেই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখলেন তাঁর আশ্চর্য অলৌকিক আখ্যান ‘গয়নার বাক্স’ | শীর্ষেন্দুর শ্রেষ্ঠ রচনাগুলির মধ্যে ‘গয়নার বাক্স’-কে রাখা বেশ মুশকিলের, একথা সম্ভবত্ঃ অতি বড় শীর্ষেন্দু-অনুরাগীও মানবেন | তবে মজা হল, সেই প্রায় ২০ বছর আগেই, কি অদ্ভূত এক দূরদৃষ্টিতে অপর্ণা সেন বুঝতে পেরেছিলেন চলচিত্রের পর্দায় এই কাহিনির ভবিষ্যৎ্-সম্ভাবনা কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে | আর তাই সেই সময়েই গল্পের রাইটস কিনে চিত্রনাট্য লিখে তিনি শুরু করেছিলেন ছবি বানানোর তোড়জোড় | আপনার অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই সত্যি যে অপর্ণা সেনের মতো এক প্রায় আইকনিক সেলিব্রিটি পরিচালকেরও যোগ্য প্রযোজক খুঁজে পেয়ে এই ছবিটা বানাতে শেষ পর্যন্ত বছর কুড়ি সময় লেগে গেল |

এই কুড়ি বছরে পৃথিবী বদলে গেছে আ-মূল | আমাদের জীবনে অনুপ্রবেশ করেছে মাল্টিপ্লেক্স, শপিং মল, ফ্লাই ওভার, ইন্টারনেট, সেলফোন আর স্যাটেলাইট চ্যানেল | কুড়ি বছর আগের সেই লেখা আবার নতুন করে পড়তে গিয়ে দেখলাম, তার মধ্যে এর কোনোটার কোনও চিহ্ন নেই | পড়তে পড়তে টের পাচ্ছিলাম, যদিও রচনায় দুই সময়ের দুটি প্রজন্মকে ধরে গল্প বলেছেন লেখক, এবং তারমধ্যে নবীন প্রজন্মের গল্প বলতে গিয়ে বলতে চেয়েছেন সমসময়ের গল্প, কিন্তু আজ কুড়ি বছর পরে, সেই সমসময়টাকেও কি ভীষণ ডেটেড লাগছে |

ব্যাপারটা পরিছলকও খুব ভাল করে বুঝেছিলেন | বুঝেছিলেন, এই গল্পটাকে সিনেমায় বলতে গেলে ভিন্টেজ সময়ের গল্প হিসেবে বলাই ভাল | আর সেইজন্যে মনে কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না রেখে তিনি গল্পটাকে পিছিয়ে দিলেন আরও অনেক-অনেকগুলো বছর | ১৯৪৯ থেকে শুরু হল গল্পের বুনন | সেইসময়ের এক যৌথপরিবারে প্রায়-নিষ্কর্মা ছেলের (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়) বৌ হয়ে এল গরীব ঘরের সুন্দরী যুবতী (কঙ্কনা সেন শর্মা). পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে সম্পর্কের নকশিকাঁথায় এরপরেই ফুটে উঠতে লাগল চিত্র-বিচিত্র চরিত্রের গমক | বাড়ির বাল্য বিধবা বুড়ি পিসিশশুড়ি (মৌসুমি চট্টোপাধ্যায়), তার যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা গয়নার বাক্স, তাদের বাড়ির এক রহস্যময় পোষা বেড়াল, শ্বশুরমশাই (পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়), শাশুড়ি (মানসী সিনহা), অমেরুদন্ডী ভাসুর (পীযূষ গাঙ্গুলি), কুটনী জা (অপরাজিতা আঢ্য), সবে মিলে মনে হয় যেন হালকা সুরে নিজের ছবি ‘পারমিতার একদিন’-কেই অন্য ব্যঞ্জনায় পুনর্সৃজিত করতে থাকলেন অপর্ণা | নাকি এটা কোনোভাবে ওঁর বহুযুগ আগে ফেলে-আসা এক ব্যক্তিগত যাপনের অংশ? ছবির মধ্যে অন্তত এই জিজ্ঞাসার কোনও উত্তর নেই |

বাড়িতে নতুন বৌ পা রাখার কিছুদিনের মধ্যেই চিরতরে চোখ বুজলেন পিসি শাশুড়িটি (এখানে নাম রাসমণি, বইয়ে নাম রসময়ী) | এরপরেই শুরু আসল চমক | তিনি চোখ বুজলেও, গয়নার বাক্সের মায়া তিনি ত্যাগ করতে পারেন না আদৌ | আর তাই ছায়া-শরীর ধারণ করে তিনি দেখা দিতে থাকেন বাড়ির নতুন সদস্য ছোটবৌ সোমলতাকে ঘন-ঘন | তাঁরই ভৌতিক নির্দেশে ভয়ে ঠক-ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে তাঁর গয়নার বাক্স সরিয়ে নিজের হেফাজতে রেখে দেয় সোমলতা | তারপরেও ক্ষণে-ক্ষণে যেভাবে হাজির হয়ে সেই নতুন বৌয়ের সঙ্গে ভয়-ভীতি-ভালোবাসা আর যৌন-ঈর্ষার এক আশ্চর্য সম্পর্ক রচনা করে পিসিশাশুড়ির ভূত, তা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার মতো বিনোদনী মশলায় ঠাসা |

২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যত’-এর পর থেকে বাংলা সিনেমার ভবিষ্যত সম্ভবত ভূতেদের কাছেই গচ্ছিত রাখা আছে | তাই সিনেমায় একটার পর একটা ভূতের আগমন্ঃ কখনও ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’ (শীর্ষেন্দু), কখনও ‘যেখানে ভূতের ভয়’ (সত্যজিৎ-শরদিন্দু) আবার কখনও ‘ছায়াময়’ (শীর্ষেন্দু) | শুটিং চলছে ‘আশ্চর্য প্রদীপ’-এর (শীর্ষেন্দু) | সাহিত্য-আশ্রিত অলৌকিক গল্পের এই সুপারহিট মহা-মার্কেটে নতুন হটকেক এই ‘গয়নার বাক্স’ও | এবং ‘ভূতের ভবিষ্যত’-এর প্রভাব এই ছবিতে এত গুরুতর যে সেই ছবির শব্দ-উচ্চারণ-প্যাটার্ন এই ছবিতেও প্রায় টুকে দিয়ে ‘ফোটো’কে ‘ফুটো’ বলা হতে থাকে | আর এই উচ্চারণটাই অন্য মাত্রা পেয়ে যায় যৌন-বুভুক্ষু পিসিশাশুড়ির মুখে — তিনি যখন বলে ওঠেন ‘আমার এগার বছর বয়সের ফুটো…’, তখন বুঝতেই পারছেন, তার নির্লজ্জ ইন্টারপ্রিটেশনের জল অনেকদূর অব্দি গড়িয়ে যেতে পারে |

ভূত নিয়ে চূড়ান্ত ফ্যান্টাসি করতে করতে পরিচালক এখানে নিপুণ আঁচড়ে এঁকেছেন সেই পুরনো সময়টাকেও | ছবিতে শীর্ষেন্দুর গল্পের চেয়েও আরও অনেক বশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে যৌথ পরিবারের অন্দরমহলটা | মোটে এগারো-বারো বছর বয়সে স্বামীহারা হলে শরীরের খিদে কি বিপুল উথাল-পাথাল ঘটাতে পারে মানবী-মনোজগতে, তার ছবি আঁকতে গিয়ে পরিচালক নিষ্ঠুর বাস্তবের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন | তাই তিনি সোজা-সাপটা দেখিয়ে দিয়েছেন্ঃ বালিকা সদ্যবিধবাকে ল্যাংটো করে নির্মমভাবে তার মাথা মুড়িয়ে দেয় তারই স্বজনেরা আর তারপরে একটু বয়স বাড়লে সেই শ্বেত-শুভ্রা সুন্দরী বিধবা (শ্রাবন্তী) গভীর রাতে বাড়ির তাগড়াই কালো চাকরকে ডেকে নিজের অনাঘ্রাতা তৃষিত শরীরকে দলিত-মথিত করতে চায় | কিম্বা বাড়ির পুরুষ ব্যবসা-উপলক্ষে বাইরে গেলে নিশিডাকে বাইরের পুরুষের (কৌশিক সেন) কাছে নিজেকে সঁপে দিতে চায় “সতীলক্ষ্মী” বাড়ির বৌটাও | দিন-দুপুরে রাত-নাগরের শাড়ির দোকানে হানা দিয়ে যখন ৩২টা দামি শাড়ি উঠিয়ে নিয়ে যায় বেবুশ্যে কমলা (সুদীপ্তা চক্রবর্তী) কিম্বা এবাড়ির দারোয়ানের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ওবাড়ির বৌ যখন ঠোঁট মুচকে অর্থবহ হাসি হাসে, সে সময় মনে হয় সোচ্চার সেলুলয়েডের মাঝে এভাবে আর কত না-বলা-কথা লুকিয়ে রাখবেন অপর্ণা? মানব-মিলনের বিচিত্র নকশায় একসময় গল্পের নবীন প্রজন্মের পিতৃপরিচয়গুলো যেন গুলিয়ে যেতে থাকে ক্রমে ক্রমে |

কমেডি আর অলৌকিকের জমাট মিশেলের মধ্যে সুতরাং কখনও মিশে যেতে থাকে ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’-এর নিলাজ দেহবাসনা, ‘সতী’-র পাপ ও নষ্টামি, ‘পরমা’-র পরকীয়া, কিম্বা ‘পারমিতা’-র কুশলী প্রতিবাদ | গোল বাঁধে পরিচালক যখন এই গল্পকেই নিয়ে আসেন ১৯৭১ সালে | ততদিনে বেশ ডাগরটি হয়েছে সোমলতার মেয়ে চৈতালী (যদিও শীর্ষেন্দুর গল্পে এই চরিত্রটির নাম বসন) | এইবারে গল্পের মধ্যে জোরদারভাবে ঢুকে পড়ে সেইসময়ের এক রাজনৈতিক ঘটনাঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ | চৈতালী (অভিনয়ে শ্রাবন্তী) শুধু এক মুক্তিযোদ্ধার প্রেমে পড়ে যায়, তাই নয়, তার পাশাপাশি সেই পিসিশাশুড়ির ভূত বাংলাদেশ পর্যন্ত ট্র্যাভেল করে এসে চৈতালীর মোটরবাইকে চড়ে তাকে খানসেনাদের লাইভ বিবরণ পর্যন্ত দিতে থাকেন! এখানেই শেষ নয়, এও দেখা যায় যে চৈতালীর মুক্তিযোদ্ধা-প্রেমিকটি সম্ভবত তার মায়ের এককালীন নিশি-প্রেমিকের সন্তান! চমক আরও আছে | গয়নার বাক্স থেকে একটা হার এধার-ওধার হলেই এতদিন যে পিসিমাকে আমরা মহা-কুপিত হতে দেখেছি, সেই তিনিই এবার নিজের পৈতৃক ভিটে থেকে খানসেনাদের তাড়াতে মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিলে গোটা বাক্সের সবকটা গয়না দিয়ে দিতেও দ্বিধা করেন না! ঠিক ধরেছেন, গল্পের এই অংশের পুরোটাই লিখেছেন অপর্ণা নিজে (তাই ক্রেডিট টাইটেলে তাঁর সপাট ঘোষণা ঃ ‘রিটেন অ্যান্ড ডিরেক্টেড বাই অপর্ণা সেন’), কিন্তু সৃজনের সময় হয়ত এটা বুঝতে পারেননি যে শেষ অব্দি অপর্ণার মুক্তিযুদ্ধ শীর্ষেন্দুর ভৌতিক মজারু আখ্যানে অসম্পৃক্ত হয়েই রয়ে যাবে |

অপর্ণা এর আগে এমন বিনোদনী ছবি আর কখনও বানাননি, এই প্রথম এমন নন-স্টপ বিনোদন সাজাতে গিয়ে কোথাও কোথাও, বিশেষত শেষদিকটায় ভারসাম্য যেন বা টলে গিয়েছে ঈষৎ | ইন্ডাস্ট্রির সেরা অভিনেতারা আর সেরার সেরা কলাকুশলীরা কাজ করেছেন তাঁর ছবিতে (সঙ্গীত , চিত্রগ্রহণঃ সৌমিক হালদার, সম্পদনাঃ রবিরঞ্জন মৈত্র, শিল্প নির্দেশনাঃ তন্ময় চক্রবর্তী), অসামান্য ডিটেলের কাজে ঝকঝকে করছে ছবির প্রতিটা ফ্রেম, তবু ছবি শেষ হবার পর তীব্র অপূর্ণতার এক রেশ রয়ে যায় | মনে হতে থাকে, সবকিছু তো পেলাম, কিন্তু ক্লাইম্যাক্সটা কোথায় হারিয়ে গেল?

এটা অপর্ণার শ্রেষ্ঠ ছবি নয়, এমনকি যে ছবি দেখার পরে তীব্র আরকের নেশায় মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে, এটা তেমন কোনও ছবিও নয় | বরং এটাকে আপনি বলতে পারেন ১৪২ মিনিটের এক স্বাদু উপভোগ্য মকটেল | বিনোদনী ভালো লাগায় মন ডুবিয়ে দিল ঠিকই, কিন্তু মগজে কোনো নেশা ছড়াল না তিন কোটি টাকার ছবি ‘গয়নার বাক্স’ |

শেষ করার আগে আপনার জন্যে দুটি ফ্রি ধাঁধাঃ এই ভীষণ ভীষণ বাঙালি ছবিটার শুরু ও শেষের সমস্ত ক্রেডিট টাইটেল ইংরেজিতে কেন বোঝা গেল না | আর মারা যাওয়ার পরেও শায়িতা পিসিশাশুড়ির শরীরকে যে স্পষ্ট শ্বাস নিতে-ছাড়তে দেখা গেল, সেটা কি নিছক ভৌতিক লীলার কারণেই ঘটল!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here