অলিভের দেশে, সোনালি ইতিহাসের সন্ধানে

1033

টার্কিস এয়ারলাইন্সের বিমান যখন অ্যাথেন্সের মাটি ছুঁল, নিজস্বী চিমটিতেও যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না সত্যিই ঘটছে তো সব কিছু! ইতিহাসের অ্যাথেন্স, ইউরোপকে সভ্যতার আলো দেখানো অ্যাথেন্স | ট্যাক্সি ছুটল যেন এক স্বপ্নসরণী বেয়ে | স্থানীয় মানুষের মজারু ধারণা, এ শহরে যেখানেই খুঁড়বে, উঠে আসবে স্বর্ণ যুগের কিছু না কিছু অবশেষ – এমনই অদ্ভুত সহাবস্থান ইতিহাস আর বর্তমানের |

হোটেলে পৌঁছে মালপত্র রেখেই দে দৌড় | রিসেপশনের ভদ্রলোক হাতে একটা ম্যাপ ধরিয়ে অ্যাক্রোপলিস যাওয়ার উপায় বাতলে দিলেন | ট্যাক্সি চড়বার বিলাসিতায় না গিয়ে, দু মিনিট হেঁটেই পৌঁছে গেলাম মেট্রো স্টেশন মেটাক্সরজিও | মনে মনে একটা ভয় ছিল | সদ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না থাকা নিয়ে গণভোট হয়েছে | তার ফলও বেরোয়নি এখনো | এসব নিয়ে কোনো ঝঞ্ঝাটে না জড়াই | কলকাতার আগুনখেকো বিপ্লবীর দলের ট্রাম, বাস পোড়ানোর মোচ্ছব দেখা ঘরপোড়া গরু তো! পড়ে জানলাম, বিক্ষোভ এখানেও হচ্ছে, তবে সেটা অনেক সংযত এবং স্থান নির্বাচনেও যুক্তিহীন আবেগ নেই |

মাটির নীচে নেমে অবশ্য অবাক করা কিছু নেই | শহর কলকাতার মর্ত্যজীবন যতটাই দুর্বিষহ, পাতাল ঘরটি ভয়ে বা ভক্তিতেই হোক, আশ্চর্যরকমের পরিচ্ছন্ন | কেবল গতি আর সময়ানুবর্তিতায় সামান্য এগিয়ে অ্যাথেন্সের মেট্রো | ৬-৭ টা স্টেশন পেরোতেই চলে এলাম অ্যাক্রোপলিস | সাবওয়ে থেকে ওপরে উঠে বুঝলাম, রাস্তাটি কবল স্টোন দিয়ে বাঁধানো | উল্টোদিকে সারি সারি দোকান –স্যুভেনির শপ, রেস্তোরাঁ, পাব, কফিশপ, আইসক্রিম পার্লার | ফুটপাথে সুদৃশ্য চেয়ার-টেবিল পাতা | রাস্তা ধরে খানিকটা এগোতেই ডান হাতে অ্যাক্রোপলিসের প্রবেশদ্বার আর ঠিক তার উল্টোদিকে অ্যাক্রোপলিস মিউজিয়াম |

আমরা প্রথমে পা বাড়ালাম মিউজিয়ামের দিকেই | অ্যাক্রোপলিস পাহাড়ের পাদদেশে খোঁড়াখুঁড়ি করে পাওয়া গিয়েছিল সপ্তম শতাব্দীতে প্রাক বাইজান্টাইন সভ্যতার কিছু নিদর্শন | সেই প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষকে অক্ষত রেখে, তার উপরেই গড়ে উঠেছে মিউজিয়াম | প্রাচীন সভ্যতা আর আধুনিক স্থাপত্যের এক আশ্চর্য সহাবস্থান | স্বচ্ছ কাচের মেঝের উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতে বেড়াতে তলায় দেখা যায় ১৫০০ বছরের পুরনো ঘরবাড়ি, শস্যভান্ডার, কুয়োর ধ্বংসাবশেষ |মিউজিয়ামের ভিতরে তিনটি তলা | প্রথম তলে স্যুভেনির শপ, দ্বিতীয় তলায় আর্কেইক গ্যালারি | খ্রিঃ পূঃ সপ্তম শতক থেকে খ্রিঃ পূঃ ৪৮০ অব্দ পর্যন্ত অ্যাথেন্সের ভাস্করদের সৃষ্টি নারী (Kore) এবং পুরুষের (Kouros) এর বেশ কিছু মূর্তি প্রদর্শিত আছে এখানে |

অ্যাথেন্সের নামকরণ নিয়ে পৌরাণিক গল্পটি বেশ চমকপ্রদ | মাউন্ট অলিম্পাস ছিল গ্রিসের দেবদেবীদের বসতবাড়ি, ঠিক যেন আমাদের কৈলাস পর্বত | অ্যাথেন্সের পত্তনের পরে দেবরাজ জিউসের ভাই সমুদ্রের দেবতা পসাইডন এবং জিউসের কন্যা অ্যাথেনার মধ্যে এক প্রতিযোগিতা শুরু হলো শহরের পেট্রন হওয়ার জন্য | পসাইডনের ত্রিশূলের আঘাতে মাটি থেকে বেরিয়ে আসে এক দুর্ধর্ষ ঘোড়া | প্রত্যুত্তরে অ্যাথেনার দৈবী শক্তিতে মাটি থেকে উদগত হলো অলিভ গাছের চারা | দেবতাদের নির্বাচনে দেবী অ্যাথেনাই হলেন শহরের রক্ষাকর্ত্রী | পৌরাণিক কল্পকাহিনীর আড়ালেও আসলে লুকিয়ে থাকে মানুষের ব্যবহারিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতা | অলিভ গাছের অনুষঙ্গটিও এসেছে গ্রিক জীবনচর্যার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে | গ্রিসের রুক্ষ মাটিতে অলিভের চাষ হয় প্রচুর পরিমাণে | অর্থনীতির একটা স্তম্ভই বলা চলে অলিভ তেল আর আনুষঙ্গিক দ্রব্যগুলিকে |

মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এসে এগোলাম অ্যাক্রোপলিসের দিকে | অ্যাক্রোপলিস কথাটি এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ অ্যাক্রন (শীর্ষদেশ) এবং পোলিস (শহর) থেকে | আর মানে হলো, পাহাড়ের মাথায় মন্দির বা প্রাসাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দূর্গের মতো ঘেরা নগরী | অ্যাথেন্স শহরটি তিনদিকে ঘেরা পাহাড়ের মধ্যিখানে এক বিস্তীর্ণ সমতলভূমিতে | শহরের প্রাণকেন্দ্রে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু এই অ্যাক্রোপলিস পাহাড়ের শীর্ষদেশে ছড়িয়ে আছে গ্রিক সভ্যতার স্বর্ণযুগের কিছু আশ্চর্য স্থাপত্য |

থিয়েটার অফ ডায়নোসিস (ছবি-লেখক)
থিয়েটার অফ ডায়নোসিস (ছবি-লেখক)

পাহাড়ের পূর্ব দিকের ঢাল বেয়ে খানিকটা উপরে উঠতে চোখে পড়ল মস্ত বড় মঞ্চ | খ্রিঃ পূঃ ষষ্ঠ শতকে তৈরি ১৫০০০ আসন বিশিষ্ট গোলাকার এই মঞ্চটির নাম থিয়েটার অফ ডায়নোসিস | গ্রীষ্মকালে ডায়নোসিস উত্সব উদযাপনের সময় এখানে অভিনীত হতো সফোক্লেস, ইউরিপিডিসের ট্র্যাজিক নাটকগুলি | ভাবতে অবাক লাগে, প্রায় ২৫০০ বছর আগে মানব সভ্যতার আদিলগ্নে, ধর্মচর্চার পাশাপাশি মুক্ত চিন্তার অনুশীলন শুরু করে দিয়েছেন গ্রিসের মানুষ | থিয়েটারটির পাশের রাস্তা ধরে চড়াই ভেঙে ধীরে ধীরে উঠে এলাম অ্যাক্রোপলিসের মূল প্রবেশদ্বারটিতে | ডোরিক ও আয়োনিক স্থাপত্যের থামের উপর তৈরি এই রাজকীয় তোরণটিকে বলা হয় ‘প্রোপাইলিয়া’ |

প্রোপাইলিয়া (ছবি-লেখক)
প্রোপাইলিয়া (ছবি-লেখক)

খ্রিঃ পূঃ ৪৩২ সালে নির্মান শেষ হয় এই অপূর্ব প্রবেশদ্বারটির | পূজার সামগ্রী, উত্সর্গীকৃত পশুদের নিয়ে শোভাযাত্রা করে এই তোরণ দিয়েই অ্যাথেন্সবাসীরা প্রবেশ করতেন অ্যাক্রোপলিস প্রাঙ্গণে |

দরজা দিয়ে প্রবেশ করে বিশাল প্রাঙ্গণের ডানদিকে চোখে পড়ল পার্থেনন, দেবী অ্যাথেনার মূল মন্দির | অস্তগামী সূর্যের মায়াবী আলোর স্পর্শে পার্থেননের মর্মর পাথরের গায়ে তখন সোনালি আভা | খ্রিঃ পূঃ ৪৪৭ সালে অ্যাথেন্সের বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিসের নির্দেশে ভাস্কর ফিদিয়াসের নেতৃত্বে শুরু হয় মন্দির তৈরির কাজ | পূর্বমুখী মন্দিরটির ভিতরে ছিল অ্যাথেনা-পার্থেনস বা ভার্জিন অ্যাথেনার ৪০ ফুট দীর্ঘ এক মূর্তি | দেওয়াল জুড়ে ছিল অসাধারণ সব রিলিফ ভাস্কর্য |

parthenon-greece-travelogue
পার্থেনন (ছবি-লেখক)

গ্রিসের ইতিহাসে সে এক আলোকোজ্জ্বল সময় | শহরের মাটিতে তখন দৃপ্ত পদচারণা করছেন নাট্যকার সফোক্লেস, ঐতিহাসিক হেরোডোটাস, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল | সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প, স্থাপত্য, সব ক্ষেত্রেই অ্যাথেন্স তখন উত্কর্ষের শিখরে |

পার্থেননের ঠিক উল্টোদিকে রয়েছে আয়োনিক স্থাপত্যে তৈরি এক অপূর্ব নান্দনিক মন্দির এরিকথিয়ন | আদতে তিনটি মন্দিরের সমষ্টি এটি | অবশ্য চোখ টানে দক্ষিণ দিকের মন্দিরটি | থামের পরিবর্তে ছটি নারীমূর্তি বা ক্যারিয়াটিডস যেন ধারণ করে রেখেছে মন্দিরের ভার |

এরিকথিয়ন (ছবি-লেখক)
এরিকথিয়ন (ছবি-লেখক)

প্রোপাইলিয়ার ঠিক ডানদিকেই রয়েছে আয়োনিক স্থাপত্যের আর একটি চমত্কার মন্দির, খ্রিঃ পূঃ ৪২১ সালে নির্মিত এই মন্দিরটি ছিল অ্যাথেনা নাইকি’র |

পার্থেনন দর্শন শেষ করে নেমে এলাম সামনের প্রশস্ত রাস্তায় | সূর্য ততক্ষণে ঢলে পড়েছে পশ্চিমে | রাস্তার ধারে বসে একটি ছোট্ট মেয়ে কচি হাতে সুর তুলছে পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ানে | সামনে রাখা ভিক্ষাপাত্র | চলতে চলতে দেখলাম সে একা নয়, আস্ত একটা ছোটখাটো ব্যান্ডের দলও বাজাচ্ছে তাদের সৃষ্টি সুর | মনটা ভারাক্রান্ত হলো | তবে পরিবেশটি  ভারি মায়াবী | পাহাড়ের ওপর পার্থেননের গায়ে একে একে জ্বলে উঠছে আলো | সন্ধ্যার মৃদু বাতাসে নানা সুরের মূর্চ্ছনা | একঝাঁক তরুণ-তরুনী আবার নাচের মহড়ায় মেতেছে রাস্তার পাশে | তাদের ঘিরে ছোটখাটো জটলা | ঐতিহাসিকভাবেই গ্রিকরা আড্ডাবাজ | সন্ধ্যা নামতেই কফি শপের টেবিলগুলো দখল করে আড্ডায় মেতেছে স্থানীয় মানুষ | আমরা গিয়ে বসলাম এমনই এক কফি শপে | কোল্ড কফিতে চুমুক দিতে দিতে কখন অজান্তে অ্যাথেন্সের সান্ধ্য-আড্ডার শরিক হয়ে গেলাম |

পরের দিন আমাদের গন্তব্য গ্রিসের বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিট | এজিয়ান এয়ারলাইন্সের ভোরের উড়ান ধরে ক্রিটের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের বন্দর শহর এরাকলিও  পৌঁছে গেলাম আটটার মধ্যে | সারাদিন বিস্তর ঘোরাঘুরি | ইন্টারনেটেই ক্রিটের এক পর্যটন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ব্যবস্থা করা ছিল | আশা ছিল উন্নত নাসার কোনো দীর্ঘদেহী গ্রিক বীর আমাদের অভ্যর্থনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে | ইতিউতি নজর করে দেখি, একগাল হাসি নিয়ে যে মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন তাঁর উচ্চতা মেরেকেটে সাড়ে পাঁচ | পরনের বারমুডাটি ধরে রেখেছে বাঙালিসুলভ নেয়াপাতি ভুঁড়ি | পুরুর দেশের দুই বাদামি গাত্রবর্ণের নাগরিককে সহজেই আলাদা করে চিনেছেন | পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গোলগাল মিষ্টি চেহারার ভদ্রমহিলার সাথে আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ওর নাম ওয়ালিয়া | আপনাদের গাইড |’ কালবিলম্ব না করে বেরিয়ে পড়লাম | ড্রাইভার ভদ্রলোকের নাম ইয়ানিস | গ্রিক ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিতে দিতে মাখন-মসৃণ রাস্তায় ঝড়ের গতিতে গাড়ি ছোটাচ্ছে সে | রাস্তার দুপাশে লাল, সাদা, গোলাপি করবী ফুলের গাছ |

ওয়ালিয়া ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে ক্রিটের গল্প | গ্রিসের মূল ভূখন্ডের মাইসেনিয়ান সভ্যতার থেকেও পুরনো ছিল ক্রিটের সভ্যতা | পুরাণের গল্পে বর্ণিত ক্রিটের রাজা মিনোসের নামে এর নামকরণ হয় মিনোয়ান সভ্যতা | এর সময়কাল মোটামুটি খ্রিঃ পূঃ ৩০০০ থেকে ১৪৫০ সাল পর্যন্ত | ১৯০০ সালে রবার্ট ইভান্স নামে এক ইংরেজ প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্রিটের কনোসাস অঞ্চলে খননকার্য চালিয়ে এই ব্রোঞ্জ সভ্যতার হদিশ দেন পৃথিবীবাসীকে |

কনোসাস (ছবি-লেখক)
কনোসাস (ছবি-লেখক)

কনোসাসের প্রাসাদটির ধ্বংসাবশেষ দেখে তাক লেগে গেল | চারতলা প্রাসাদটিকে নিয়ে গল্পটিও বেশ রোমাঞ্চকর | প্রাসাদের তলায় নাকি ছিল একটি ল্যাবাইরিন্থ বা গোলকধাঁধা | আর সেখানে অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক বৃষরূপী মিনোটুর নামে এক দৈত্য বাস করত | শেষ পর্যন্ত অ্যাথেন্সের রাজা থিসিয়াস, ক্রিটের রাজা মিনোসের ভগ্নী আরিয়াডনের সাহায্য নিয়ে হত্যা করেন তাকে |

মিনোয়ান সভ্যতার যে দিকটি সমকালীন অন্যান্য সভ্যতা থেকে আলাদা তা হলো এদের যুদ্ধবিমুখতা এবং শান্তিপ্রিয়তা | শিল্পকলা, চারুশিল্প, স্থাপত্য সব কিছুর মধ্যেই ছিল এক মার্জিত সৌন্দর্যবোধের ছাপ | এই সভ্যতায় বৃষের প্রভাব ছিল সর্বত্র | ক্রীড়াপ্রেমী মানুষগুলির অন্যতম প্রিয় একটি খেলা ছিল বৃষের পিঠে চেপে নানা শারীরিক কসরত প্রদর্শন | প্রাসাদের স্থাপত্যে থামের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো | থামগুলি আরো মনে থেকে যায় এর উজ্জ্বল লাল রঙের জন্য |

কনোসাস থেকে বেরিয়ে এসে ওয়ালিয়ার সঙ্গে ঘুরে দেখলাম এরাকলিওর প্রত্নতাত্ত্বিক মিউজিয়ামটি | মূলত কনোসাস অঞ্চল থেকে সংগৃহীত মৃত্পাত্র, শিল্পসামগ্রী, সোনা, ব্রোঞ্জের অলংকারে সাজানো গ্রিসের অন্যতম সেরা মিউজিয়ামটি |

এখানেই ওয়ালিয়া আমাদের বিদায় জানাল | সারথী ইয়ানিসই এবার গাইডের দায়িত্ব নিল | ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো চড়াই-উতরাই, অনুচ্চ টিলা পেরিয়ে গাড়ি ছুটল রুক্ষ প্রান্তরের মধ্য দিয়ে | জনবসতি প্রায় চোখে না পড়ার মতো | মাঝে মাঝে চরাচরে জেগে উঠছে সবুজের বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র, অলিভ আর আঙুরের খেত | কিছুক্ষণ যাওয়ার পর পিচ রাস্তা ছেড়ে একটা কাঁকুড়ে পথ ধরলাম আমরা | দুপাশে অলিভের চাষ | ফুট আষ্টেক উঁচু গাছগুলিতে ঝিরিঝিরি পাতার ঠাসবুনোট | গোটা গ্রিসের অলিভ উত্পাদনের সিংহভাগই এখানকার | ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ার গুণে এটি উত্কৃষ্ট মানের অলিভ আর আঙুরের চাষ হয় এখানে | একটা কাঠের বোর্ড দেখে বুঝলাম আমরা পৌঁছে গেছি গন্তব্যে, লাইরারাক্সি ভিনিয়ার্ড তথা ওয়াইনারি |

একটা বাঁধানো চাতাল পেরিয়ে এসে ঢুকলাম মস্ত বড় একটা ঘরে | এখানেই হবে ওয়াইন চাখার পর্ব | ঘরের একপাশে লম্বা একটি টেবিল পাতা | সেখানে ইতিমধ্যেই সাহেব-মেমদের একটি দল রকমারি ওয়াইন নিয়ে বসে পড়েছে, অন্য পাশে সারি সারি কাঠের ব্যারেল | এতদিন ইংরেজি ছবিতে দেখা ভূগর্ভস্থ সেলারের দৃশ্যগুলিই যেন ছুঁয়ে দেখার পালা |

লাইরারাক্সি ওয়াইনারি (ছবি-লেখক)
লাইরারাক্সি ওয়াইনারি (ছবি-লেখক)

মনে মনে প্রমাদ গুণছি ! গুণমান তো দূরস্থান, অর্ধেক সুরার তো নামই শুনিনি | যথাসম্ভব বোদ্ধা বোদ্ধা ভাব নিয়ে টেবিলে গিয়ে বসলাম | এমন সময় তিনি এলেন, আমাদের ওয়াইন চেনানোর শিক্ষিকা! নাম বললেন ‘আরেতি’, আমি শুনলাম ‘হেলেন অফ ট্রয়’| ওয়াইন-টোয়াইন ছেড়ে দীর্ঘাঙ্গী, এলায়িত কেশের গ্রিক সুন্দরীর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম | হঠাৎ স্ত্রী-র কনুইয়ের খোঁচা খেয়ে উর্ব্বশীলোক থেকে মর্ত্যলোকে প্রত্যাবর্তন | ভদ্রমহিলা দেখলাম জ্ঞানী, অজ্ঞানী দু’দলকেই সমান সম্ভ্রম দেখাচ্ছেন | প্লিতো, ডাফনি, কটসিফ্যালি, জাজাজু, মালভাসিয়া –কত রকমের যে ওয়াইন! যেমন তাদের নামের মাধুর্য, তেমনই স্বাদ-গন্ধ | ভিনিয়ার্ড-এর ডাচ মালকিন এরপর আমাদের নিয়ে গেলেন বাইরে দ্রাক্ষাখেত ঘুরিয়ে দেখাতে | কয়েক হেক্টর জায়গা জুড়ে এস্টেট | আঙুর গাছের গোড়াটা বেশ মজবুত, তবে শাখা-প্রশাখা লতানে, তাই লোহার তারের সমান্তরাল সারি তৈরি করে দেওয়া আছে লতা বাইবার জন্য | থোকায় থোকায় আঙুর ফলে রয়েছে | ফল পাকেনি এখনো; তাই স্বাদ নয়, কেবল তাদের স্পর্শটুকুই নিতে পারলাম | এবার বিদায় নেওয়ার পালা | রিমঝিম মাথা আর ড্রিমড্রিম ভাবনায় মশগুল হয়ে রওয়ানা দিলাম | আঙুরখেতের ছায়ায় গ্রিক সুন্দরীর হাতে সুরাপান –এ কি সত্য, নাকি মায়া!

বেলা প্রায় সাড়ে তিনটে | বেজায় খিদে নিয়ে পৌঁছলাম আরকেন গ্রামে | এখানেই আমাদের অথেনটিক গ্রিক লাঞ্চের ব্যবস্থা | গাছগাছালির ছায়ায় ঢাকা একটা চার-মাথার মোড় | সেখানেই চেয়ার-টেবিল পেতে খাবার পরিবেশন করছে লাগোয়া রেস্তোরাঁগুলি | আমাদের খাবার এল ‘বাকালিকো’ রেস্তোরাঁ থেকে | প্রথমে স্যুপ, তারপর গ্রিক স্যালাদ, আর সবশেষে চিকেন আর পর্ক স্যুভলাকি | এটা অনেকটা ভরপেট খেয়ে একটা গ্রিক বিছানার জন্য প্রাণ টানছিল! তবে গ্রাম ঘুরে দেখার লোভে শয্যাস্বপ্ন ত্যাগ করলাম |

আরকেন–এর রাস্তা(ছবি-লেখক)
আরকেন–এর রাস্তা(ছবি-লেখক)

মধ্যযুগের বৈশিষ্টগুলো সযত্নে লালন করছে ছোট্ট ছবির মতো সুন্দর আরকেন | অনেকটা উত্তর কলকাতার পাড়ার মতো | প্রায় গায়ে গায়ে বাড়ি, অপ্রশস্ত আঁকাবাঁকা গলি | রাস্তাঘাট পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন |রঙিন দরজা, সাদা বা হালকা রঙের দেওয়াল | মাঝে মাঝে রাস্তার এ পার থেকে আঙুরলতা বাইতে বাইতে ওপরে আচ্ছাদন তৈরি করে ওপারে গিয়ে নেমেছে | বাড়ির উঠোনে বসে সাদা চুলের দিদা বসে কুরুশে লেস বুনছেন | আব্দার করতে একগাল হেসে ছবিও তুললেন আমাদের সঙ্গে | নিশ্চিন্ত, নিরুত্তাপ, শান্তিপ্রিয় গ্রিসের একটুকরো ছবি | একরাশ ভালোলাগা নিয়ে গাড়িতে উঠলাম | রওয়ানা হলাম প্লাকিয়াসের পথে | ঘন্টা দুয়েক বাদে হোটেলে পৌঁছে ক্লান্ত শরীরে আজকের মতো ঘরে স্বেচ্ছাবন্দি হলাম |

পরদিন সকালে হোটেল থেকে বেরিয়ে দু-পা এগোতেই সামনে ভূমধ্যসাগর | আবহাওয়ার এক অদ্ভুত বৈপরীত্য | ঝকঝকে নীল আকাশ, কিন্তু তার সাথে অসম্ভব ঝোড়ো একটা হাওয়া | আর সেই হাওয়ায় সুনীল সাগরের জলে ফেনিল সাদা ঊর্মিমালা ভাঙা-গড়ার খেলা | ‘মে-ডি-টে-রি-নি-য়া-ন যেন তানপুরার ঝংকার|’ চারুলতা’র অমল তার বৌঠানকে ভূমধ্যসাগরের নামের ধ্বনিময়তা বুঝিয়েছিল এভাবেই | সাগরের জলতরঙ্গেও আজ সেই ধ্বনিতরঙ্গের ঝংকার |

প্লাকিয়াস বিচ(ছবি-লেখক)
প্লাকিয়াস বিচ(ছবি-লেখক)

ছোট্ট জায়গা প্লাকিয়াস | প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ সোনালি বালির বিচ | রঙবাহারি ছাতা, রোদ পোহানোর চেয়ার | সাদা ত্বক বাদামি করার তাড়নায় নরনারীর সূর্যস্নান | বাচ্চাদের মধ্যে বালির দূর্গ গড়ার প্রতিযোগিতা , হাতে প্লাস্টিকের খেলনা বেলচা আর বালতি | বেলাভূমির উত্তরপ্রান্ত নেচারিস্টদের এলাকা | পোশাকহীন সাহেব-মেমদের অলস দিনযাপন | সেখানে না আছে কোনো অত্যুত্সাহীর ভিড়, না কোনো নীতিপুলিশের ঠ্যাঙাড়েবাহিনী | মুক্তচিন্তার দেশে সবকিছুই সহজ, স্বাভাবিক এবং অনাবিল |

প্লাকিয়াস (ছবি-লেখক)
প্লাকিয়াস (ছবি-লেখক)

বিচের পাশেই সমুদ্র বরাবর পায়ে চলার পথ | হাঁটতে হাঁটতে চললাম গ্রামের জমজমাট এলাকায় | পরপর ছোট ছোট সুপারমার্কেট, রেস্তোরাঁ | পথের ধারের রেস্তোরাঁ এদেশের ভাষায় ট্যাভার্ণা | সেরকমই ছিমছাম ট্যাভার্ণায় ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম | এখানে তথাকথিত দেখার জায়গা বলে কিছু নেই | কেবলই একান্ত আলাপচারিতা সাগরের সাথে, ছোট্ট গ্রামটার সাথে | একটা সুপারমার্কেটে ঢুঁ মারলাম একবার | অলিভের ব্যবহার অনেক জিনিসেই | সাবান, ফেসক্রিম, সবেতেই অলিভের ট্যুইস্ট! খানিকটা দূরে ছোট্ট একটা চার্চ | মধ্যযুগীয় গঠনশৈলীর চার্চগুলোর ছাদগুলি চূড়াবিশিষ্ট নয়, গোলাকার ঘরের মাথায় গম্বুজ | শান্ত সুন্দর চার্চগুলিতে অনেকটা গ্রাম-বাংলার পুরনো দেউলের আদল | ক্রিটের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে এরকম চার্চ |

রাত প্রায় সাড়ে আটটা পর্যন্ত সূর্যালোক থাকে | তাই সূর্যাস্তের পরেই ডিনার করার সময় হয়ে আসে | খুঁজে পেতে টাসোমানোলিস বলে এক ট্যাভার্ণায় ঢুকলাম | ভেতরটা নৌকোর নোঙ্গর, দড়ি, কম্পাস দিয়ে চমত্কার সাজানো | এখানে খেলাম স্যালমন আর অ্যাম্বারজ্যাক মাছের স্যুভলাকি, সঙ্গে সুগন্ধী ভাত | গঙ্গাপারের বাঙালির মাছ-ভাতের কপাল ভূমধ্যসাগর-পারেও এমন সঙ্গ দেবে কে জানত! সামনে সাগরজলে শান্ত এক সন্ধ্যা নামছে | ‘সারাটা বেলা সাগরপারে’, আর স্নিগ্ধ এই সন্ধ্যার ‘মন্দ মধুর’ অলস হাওয়া গায়ে মেখে ভাবছি ‘কোন সাগরের পার হতে আনে কোন সুদূরের ধন |’ মহাকবি হোমারের ‘ইলিয়াড’-এর ক্রিটের মাটিতে বিশ্বকবির গানের বাণী এসে ভাসিয়ে দিল মন | মেলাবেন তিনি মেলাবেন!

আগামীকালই ফেরার পালা | বন্দর-শহর হানিয়া থেকে উড়ে যাব অ্যাথেন্স হয়ে ইস্তানবুল | ক’দিনের এই যাত্রায় গ্রিস এসে ধরা দিল কত না বাহারি রূপে | সময়ের সরণী বেয়ে পিছু হেঁটে কখনো ছুঁলাম ইতিহাস, ফুসফুস ভরে নিলাম দ্বীপভূমির অনুর আর অলিভের বনজ ঘ্রাণ, হৃদয় পরিপূর্ণ করলাম গ্রিক আতিথেয়তার উষ্ণতায় | আজকের গ্রিসকে ঘিরে বাকি ইউরোপের কেবলই তাচ্ছিল্য আর করুণা প্রদর্শন! গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, মুক্ত চিন্তার চর্চা, থিয়েটারের আধুনিক মনন –গ্রিসের কাছে মানবসভ্যতার ঋণ যে অপরিসীম! বৈদিক সভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে আমার আর্দ্র হৃদয়ের সহমর্মিতাটুকুই জানালাম তোমায়, গ্রিস |

প্রয়োজনীয় তথ্য

১)কাতার এয়ারওয়েজের বিমানে কলকাতা থেকে দোহা হয়ে পৌঁছতে পারেন অ্যাথেন্স | অথবা টার্কিস এয়ারলাইন্সের বিমানে দিল্লি হয়ে যাওয়া যায় |

২)অ্যাথেন্সে বাজেট হোটেল পাওয়া যায় সহজেই | ভাড়া মোটামুটি ২৫০০ টাকা থেকে শুরু | যে কোনো নামী হোটেল-বুকিং ওয়েবসাইট থেকে নিশ্চিন্তে অগ্রিম বুকিং করতে পারেন |

৩)অ্যাথেন্স থেকে কৃত দ্বীপে যাতায়াতের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম স্থানীয় এজিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমান |

৪)ক্রিট দ্বীপের বিভিন্ন জায়গায় বাজেট থেকে শুরু করে স্টার হোটেল প্রচুর | সাধ্য অনুযায়ী অনায়াসে অগ্রিম বুকিং করতে পারেন |

৫)গ্রিস ঘোরার সবচেয়ে ভালো এপ্রিল থেকে অক্টোবর |

Advertisements

6 COMMENTS

  1. লেখা-ছবির ঠাস-বুনটে গ্রীসকে আজ নক্সি-কাঁথায় মুড়িয়ে দিলে। খুব স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি! ধন্যবাদ।

  2. দারুন লিখেছো । তোমার বাবা ও অামি একসাথে কলেজে ছিলাম যাদবপুরে ।

  3. মাঝে মাঝে একটু ফুটছিল গ্রীস এর সাম্প্রতিক দুর্দৈব এর খবরগুলো। কিন্তু কি ভীষণ লোভ জাগানি লেখা- ! সবাই হয়তো জানে না, কি চমৎকার ট্র্যাভেল ম্যানেজার তুই। আর আমি জানতাম না, কি সুন্দর ট্র্যাভেল রাইটার তুই! (y)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.