সোনার বাংলায় গালিভার (তৃতীয় পর্ব )

প্রতিমা দেখল গালিভার

মেয়েটাকে কাঁদতে দেখে প্রথমটায় আমি একরকম ঘাবড়েই গিয়েছিলাম।কিন্তু তার পরপরই মনে হল ও ন্যাকামি করছে না তো? নইলে এতক্ষণ যে অবলীলায় নিজের শরীরে বিক্রি করার মতো কত কী আছে তাই বোঝাচ্ছিল  সে হঠাত্ করে কাঁদতে শুরু করল কেন? আমি তো কোনো গালাগাল দিইনি ওকে, শুধু জিজ্ঞেস করেছি, খেলোয়াড় ছিল কি না। এতে কাঁদার কি আছে!  ধমকাব মনে করে আমি গলা খাঁকারি দিলাম আর তখনই  একটা আপসোস শুরু হল মনে।আমি গালিভার,আমার জন্মই অ্যাডভেঞ্চারের জন্য। আর জন্ম থেকে যে অ্যাডভেঞ্চারার সে কি জন্ম-প্রেমিকও নয়? তাহলে আমি প্রথম থেকেই মেয়েটার সঙ্গে এমন কাঠ-কাঠ ব্যবহার করছি কেন? ও যেমনই হোক,আমি কি আমার ভিতরের সব কোমলতা,সমস্ত স্বাভাবিক আকর্ষণ বিসর্জন দিয়েছি যে একটা সদ্য যুবতী মেয়ের সঙ্গে মিষ্টি করে কথাও বলতে পারছি না? নিজের ওপরেই নিজের কেমন একটা লজ্জা জন্মাল। সেই লজ্জাটাকে তাড়াবার জন্য আমি মেয়েটার মাটিতে ছুড়ে দেওয়া গেঞ্জিটা হাতে করে কুড়িয়ে নিয়ে ওর সামনে এগিয়ে গেলাম।

এই এগিয়ে যাওয়ার সময় , মেয়েটার ধারালো চেহারার ভাঁজে-ভাঁজে জেগে থাকা বাঁক,খরস্রোতা নদীর মধ্যে জেগে ওঠা অল্প অল্প পলি আমাকে কোনোভাবে দুর্বল করে দিচ্ছিল কি? আমি পেশায় নাবিক ছিলাম আর নাবিকদের বন্দরে বন্দরে ঘর থাকে,ঘরে-ঘরে  বউয়ের মত কেউ না কেউ থাকে,সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে একটা মেয়ে যদি আজকে রাতের আনন্দ পেতে এসেছে আমার সঙ্গে,আমারই বা এত কুন্ঠা কিসের? জোয়ারে যা এসেছে,জোয়ারই তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, মধ্যের ভাটায় যদি জাহাজ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েই থাকে,একটু জোরে যদি বাজনা বেজে ওঠে কোথাও,তাতে ক্ষতি কী? ভিতরে কোথাও এমন মনে হতেই পারত, হয়ত হচ্ছিল,কে বুঝতে পারে, কিন্ত যে মুহূর্তে ওই গেঞ্জিটা নিয়ে মেয়ে্টার অনেকটা কাছে চলে গেলাম,তখনই ওর ক্লিভেজ,ওর অনাবৃত হাত,ওর পেটাই পরোটার মতো পেটের পাশাপাশি আমার চোখ পড়ে গেল ওর মুখে আর কান্নার দমকে ফুলে ওঠা ওই মুখটার সঙ্গে কার যেন ভীষণ মিল পেলাম। সেই মিলটার কথা ভাবতে ভাবতে আমি ওর হাত দিয়ে ঢাকা মুখের অর্ধেক দেখতে থাকলাম আর হঠাত্  গোটা একটা তলোয়ার যেন আমার বুকটা এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে গেল।স্তম্ভিত আমি চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললাম।আমার বন্ধ চোখে আমার ছোট্ট মেয়েটার মুখ ভেসে বেড়াতে থাকল। ভোরবেলা স্কুল যেতে না চেয়ে কান্নার সময় ওর মুখটা যেরকম দেখাত ঠিক তেমনই লাগছে এই মেয়েটার মুখ। ও তো বয়সে অনেকটা বড়ই হবে আমার মেয়ের থেকে। তাহলেও এরকম লাগছে কেন ? সে কি আমি থেকে বহুদূরে আছি বলে? নাকি বাবা হওয়ার নিয়মই এই যে অপ্রত্যাশিত সব মুহূর্তে,অদ্ভুত সব জায়গায়,সন্তানের কথা মনে পড়ে চোখে জল আসবে মানুষের?

–আর কাঁদতে হবে না,এবার চোখে মুখে জল দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। মেয়েটাকে বললাম আমি।

মেয়েটা কান্নাভেজা মুখটা আমার দিকে ফিরিয়ে বলল, আমি সত্যি সত্যি খেলোয়াড়।

–হ্যাঁ, তোমার শরীরের নড়াচড়া দেখেই আমার মনে হচ্ছিল।

—এই এতদিনে আপনি ছাড়া আর আর কেউ কথাটা আমায় বলেনি জানেন তো।

—হয়তো,বুঝতে পারেনি।

—বোঝার চেষ্টাও করেনি। আর কেনই বা করবে? আমার শরীরটা তো পার্ট অফ দা প্যাকেজ।এই ফাইভস্টার,এই এসি,এই নরম বিছানা আর আলোর কাটাকুটি সবকিছুর সঙ্গে আমিও তো আছি। আগেরগুলো যারা পয়সা দিয়ে কিনবে তাদের মধ্যে অনেকে একটা ঝাক্কাস বডিও চাইবে এন্টারটেইনমেন্টের জন্য। আর তাকে সেই পয়সা উশুলিটুকু দেওয়ার জন্য আমি হোটেলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। এটাই তো আমার পরিচয়।

—কিন্তু এই পরিচয় তো কেউ জোর করে চাপিয়ে দেয়নি তোমার ওপর। তুমি তো স্বেচ্ছায় এই পেশায় এসেছ।

—হান্ড্রেড পারসেন্ট ঠিক বলেছেন আপনি। আচ্ছা যে লোকটা মেট্রোর সামনে ঝাঁপ দেয় কিম্বা দশতলা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিছে,সেও তো স্বেচ্ছাতেই কাজগুলো করে তাই না? মেয়েটা আমার চোখে চোখ রাখল।

—তুমি কী বলছ,আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

আমার হাত থেকে একটানে নিজের গেঞ্জিটা নিয়ে তার ভিতরে মাথা গলাতে গলাতে মেয়েটা বলে উঠল,বুঝতে পারবেনও না। আফটার অল,আপনিও তো একজন পুরুষ।

—কিন্তু আমি নারী হলেও তোমার প্রবলেম ঠিক ধরতে পারতাম না বোধহয়। তোমার ওপর কেউ জোর করে ঝাঁপিয়ে পড়ল,তোমায় মলেস্ট করার চেষ্টা করল,রাস্তায় কিম্বা গাড়িতে,সেক্ষেত্রে তুমি নিশ্চয়ই পরিস্থিতির শিকার। এবং শিকার বলেই,সিম্প্যাথি আর সাপোর্ট দুটোরই হকদার। কিন্তু যে মেয়েটা নিজের থেকে বেল বাজিয়ে অচেনা লোকের সঙ্গে সেক্স করতে চাইছে তার দুঃখে কার চোখে জল আসবে?

—কারোর না। তার নিজেরই আসে না এখন তো অন্য কার আসবে বলুন? মেয়েটা ম্লান হাসল।

—তুমি আমার কথায় কিছু মনে কোরো না,আমি হার্ট করতে চাইনি তোমায়…

—আমি জানি। আর যদি হার্ট করেন তবুও আমি কৃতজ্ঞ আপনার কাছে। আপনি বহুদিন পর আমায় মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আমি শুধুই একটা কলগার্ল নই।

—কিন্তু তুমি খেলা ছাড়লে কেন?

—স্বেচ্ছায়,স্বেচ্ছায়। হো হো করে হেসে উঠল মেয়েটা। আর তারপর ওর হাফপ্যান্টের পিছন পকেট থেকে,একটা  ছবি বের করে এগিয়ে দিল আমার দিকে।

PROSTITUTIONআমি ছবিটা হাতে নিয়ে দেখলাম,একটা কোনো খবরের কাগজের রঙিন পাতা কেটে ল্যামিনেট করা হয়েছে। আর সেখানে গলায় পদক ঝোলানো একটা কিশোরী মেয়ে  দৃপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। কাগজটা পুরোনো হয়ে গেছে বলেই হয়তো ছবির বাকি অংশ কিছুটা আবছা। আমি ছবিটা দু,তিনবার উলটে-পালটে দেখে জিজ্ঞেস করলাম,এটা কোথায়,কবে?

মেয়েটা মুচকি হেসে বলল,আগে জিজ্ঞেস করুন,এই ছবিটার মেয়েটা আমিই কি না!

কথাটা শুনে আমি ভালো করে তাকালাম মেয়েটার মুখের দিকে।

—কী দেখছেন? হাজার দেখলেও কোনো মিল পাবেন না। তখন যে  ফুল ছিল এখন সে ফুলের ভিতরে থাকা সাপ। তবে আমি বিষ উগরোই না,বিষ ভিতরে নিই।

—কী এমন হল যে…

মেয়েটা আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল, ছবিটার ভিতরে যে মেয়েটাকে দেখছেন তার একটা বাবা ছিল,বলরাম দাস। রিকশা চালাত। সেই বলরাম দাস ক্যানসার হয়ে মরে গেল। রিকশাওলার তো টিবি হওয়ার কথা কিন্তু মেয়ে ন্যাশনাল গেমসে সোনা জেতার পরই বাবা জাতে উঠে গেল, একদম ক্যানসার বাধিয়ে বসল। আর সেই ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঘটি-বাটি সব এমনকি আমার সোনার মেডেলটা…গলা ধরে গেল মেয়েটার।

—কেউ পাশে দাঁড়ায়নি?

— ন্যাশনাল গেমসের সময় তিনমাস ক্যাম্পে থেকে ভাল-মন্দ খেয়ে আমার চেহারাটা এমন হয়ে গেল যে যারাই পাশে দাঁড়াতে চাইত,দুদিন না যেতেই বুঝতাম,তারা আসলে পাশে শুতে চাইছে। দেখতে দেখতে ঘেন্না ধরে গেল। আর জিমন্যাস্টিকস ছেড়ে দিয়ে দোকানে,নারসিং হোমে যেখানে কাজ করতে গেলাম সেখানেই যখন একই অভিজ্ঞতা হতে থাকল,তখন ভাবলাম,কাজের ভিতর নোংরামি মানব কেন,নোংরামিটাকেই কাজ করে নিই। তাই পাতালের দিকে পা বাড়িয়েই দিলাম। আর অল্প সময়ের মধ্যে উন্নতিও তো করলাম অনেক। ন্যাশনাল থেকে এশিয়াডে যেতে না পারি,রিসর্ট থেকে ফাইভস্টার পর্যন্ত তো এলাম। প্রতিমা থেকে প্যাট তো হলাম!

–কী নাম বললে তোমার?

–প্রতিমা। মেয়ের টানা-টানা চোখ,ঠাকুরের মতো মুখ,সবাই বলেছিল,তাই বাবা ওই নাম রেখেছিল। কিন্তু এখন মুখটা কার মতো,আপনি আবার জিজ্ঞেস করবেন না। যাই,ভোর হয়ে গেল।

—তুমি আমার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট কর আজ। আমি তোমার সমস্ত কথা জানতে চাই।

—মাপ করবেন। এই হোটেলে সকালবেলায় আমাদের এন্ট্রি নেই। আমরা দুপুরের পর থেকে আসতে পারি। কিন্তু আপনার কাছে এসেই বা কী হবে?আপনি তো আমার পাশে শোবেন না?

—যদি তোমার পাশে দাঁড়াতেই চাই?

প্রতিমা তীব্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,এখন আর তার কোনো প্রয়োজন নেই। আর হ্যাঁ,ওই ছবিটা আপনার কাছেই থাক। যে প্রতিমা মরে গেছে তাকে আপনি চিনতে পারলেন বলে আপনাকেই দিয়ে গেলাম। ইচ্ছে হলে রাখবেন,নয়তো…

কথাটা শেষ না করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল প্রতিমা। আমি হতভম্ব হয়ে বিছানায় বসে পড়লাম। আর একদম গুলিয়ে ফেললাম, আমার বাংলা ভ্রমণ কোত্থেকে,কীভাবে শুরু করার কথা!

ক্রমশঃ…

প্রথম পর্বের লিংক –https://banglalive.com/bengali-serialised-story-by-binayak-bandyopadhyay/

দ্বিতীয় পর্বের লিংক –https://banglalive.com/gulliver-travels-to-bengal/

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.