সোনার বাংলায় গালিভার (চতুর্থ পর্ব)

নামের ফাঁদে গালিভার

বুঝতেই পারছিলাম যে আর ঘুম আসবে না তবু কেমন একটা বিহ্বলতা থেকেই চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। হাজারো ছবি ভিড় করে আসছিল মাথায় আর প্রত্যেকটা ছবিই ছিঁড়ে যাচ্ছিল দুম করে। বারবার করে ভেসে উঠছিল ওই মেয়েটার মুখ যার নাম,প্রতিমা । আচ্ছা ও কেন ‘প্যাট’ নাম নিল? সে কি আমার মত সাহেবসুবোরা যাতে সহজে ওর নাম ধরে ডাকতে পারে তাই নাকি ‘প্রতিমা’ নামটার মধ্যে যে ভগবান-ভগবান গন্ধ আছে তাতে এখানকার কাস্টমারদের অসুবিধে হয় বলে? কথাটা ভেবে নিজেরই হাসি পেল। এখনও এত ঈশ্বরবিশ্বাস আছে নাকি?অবশ্য ঠিক জানি না। মানুষে বিশ্বাস যখন কমে যায় তখন ঈশ্বরে বিশ্বাস বাড়ে এ আমি জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি। আর ধর্ম নিয়ে যারা কারবার করে তারা কখনই চাইবে না,মানুষে-মানুষে বিশ্বাস এত বেড়ে যাক যে বিপদে পড়লে মানুষ ধর্ম প্রতিষ্ঠানে না ছুটে, ছুটে যাবে মানুষেরই কাছে। তবুএমন একটা আশা কি আমরা  করি না? আমার সে আশা আজ বড় একটা চোট খেয়েছে। আমি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না কেন একজন খেলোয়াড়কে তার খেলা ছেড়ে শরীর বিক্রির জায়গায় নেমে আসতে হবে? সভ্যতা কি এতটুকু এগোয়নি আজও? তাহলে কীসের শেক্সপিয়র,কেন রবীন্দ্রনাথ? পাশে যাদের দাঁড়ানোর কথা তারা সবাই যদি পাশে শুতে চায়,তাহলে সংস্কৃতির কোনো মাথামুণ্ড থাকে? ভাবতে ভাবতে মাথা এত গরম হয়ে গেল যে উঠে পড়লাম। অকারণ পায়চারি করতে করতে রিসিভারটা তুলে নিয়ে ফোন করলাম,রিসেপশনে। একটি কোমল নারীকন্ঠ বলে উঠল,বলুন স্যার,আপনার জন্য কী করতে পারি?

—কিচ্ছু করতে হবে না কিন্তু রাতবিরেতে আমার ঘরে কাউকে পাঠাবেন না।

মেয়েটির গলা আরও নরম হয়ে গেল,আমার ধাতানি শুনে,আপনার অসুবিধার জন্য দুঃখিত স্যার কিন্তু আমরা তো আগে থেকে পারমিশন না নিয়ে একটা প্রজাপতিকেও আপনার ঘরে ঢুকতে দেব না।

ন্যাকামি দেখে গা জ্বলে গেল আমার। বললাম,প্রজাপতি ঢুকলে তো কোনো প্রবলেম নেই কিন্তু অল্পবয়সী কোনো মেয়ে ঢুকতে চাইলেই প্রবলেম।

মেয়েটা একইভাবে বলল,ভুল বোঝাবুঝির জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত স্যার,কিন্তু আপনার অনুমতি না নিয়ে আপনার ঘরে আমরা কাউকে পাঠাতেই পারি না,এটা একদম ইম্পসিবল।

— একটু আগে ওই অসম্ভবটাই সত্যি হয়েছে আমার সঙ্গে। আর আপনার হয়তো অনর্গল মিথ্যে বলার ট্রেনিং আছে কিন্তু তাতেও সত্যিটা বদলায় না। ঠক করে ফোনটা রেখে দিলাম আমি।

রেখে দেওয়ার মিনিট দশেকের মধ্যেই আমার দরজায় বেল বাজল এবং দরজা খুলে দেখলাম একটি ক্লিন-শেভন ঝকঝকে তরুণ বাইরে দাঁড়িয়ে। ছেলেটা বাও করে জানতে চাইল যে সে ঘরের ভিতরে এসে আমার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারে কি না।

আমি একটু বিরক্তির সঙ্গেই ঘরের ভিতরে আসতে বললাম ওকে।

ছেলেটা ঘরে ঢুকল কিন্তু বসল না। বলল,কোথাও একটা মিস-আন্ডারস্ট্যান্ডিং  হচ্ছে স্যার,আমি খুব সরি।

—আপনার নাম কি?

—আই এম সোয়াপান স্যার। আমি হোটেলের এই ফ্লোরের কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন ইনচার্জ ।

—দেখুন,মিস্টার সোয়াপান,মিস-আন্ডারস্ট্যান্ডিং’এর কিছু নেই। একটি যুবতী ভোররাতে আমায় সেক্স সারভিস দিতে এসেছিল। আর সে তো এই ফাইভ-স্টারের  সিকিউরিটি ভেদ করে উড়ে আসেনি। আপনারাই পাঠিয়েছিলেন তাকে।

—কী বলছেন স্যার?

—ঠিকই বলছি মিস্টার সোয়াপান। আপনাদের হোটেলের রেওয়াজ আছে,আপনারা ভিআইপি অতিথিদের এসকর্ট সারভিস দেন। দিয়ে খুশি রাখতে চান। সেটা আপনাদের ব্যাপার। আমি তাই নিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছি না। কিন্তু ইন ফিউচার,আমাকে যেন এভাবে কেউ ডিস্টার্ব না করে সে ব্যাপারে আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি। আজ যা ঘটল,তা যদি আবার ঘটে তাহলে পরে আমি কিন্তু লিখিত অভিযোগ জানাব এবং তারপর চেক-আউট করে যাব এই হোটেল থেকে।

সোয়াপান এগিয়ে এসে হাতদুটো জড়িয়ে ধরল আমার,এমনটা করার কথা ভাববেন না স্যার। বিপদে পড়ে যাব।

— বিপদে যদি না পড়তে চান তাহলে আমি যাতে বিরক্ত না হই সেটা এনশিওর করুন।

—অফকোর্স স্যার। বিটুইন ইউ এন্ড মি আমি কথা দিচ্ছি যে রাতে কেউ কখনো আর আপনার ঘরে বেল বাজাবে না।

—আপনাদের হোটেলে যে রাতে দরজায় টোকা দেওয়ার রীতি আছে সেটা স্বীকার করছেন তাহলে?

—কী বলব স্যার,বোঝেনই তো! রাতে কোনো মেয়ে ঘরে না গেলে রেগে গিয়ে কমপ্লেন করতে আসে এমন গেস্টের সংখ্যাও তো কম নয়। সোয়াপান ম্লান হাসল।

— সে না হয় বুঝলাম কিন্তু তাই বলে কে চাইছে আর কে চাইছে না সে বিষয়ে একটু সতর্ক তো হতে হয়…

—হব স্যার,এরপর থেকে ভীষণ কেয়ারফুলি কাজ করব। কিন্তু একটা কথা বলুন তো,আপনার কাছে যে মেয়েটা এসেছিল,তার চেহারাটা ঠিক কীরকম?

—কেন বলুন তো? আমি পালটা প্রশ্ন করলাম।

—আপনি বললে পরে আমার একটু সুবিধে হত।

—কিন্তু যে মেয়েটার কথা বলতাম তার তো অসুবিধে হত,তাই না? কীভাবে ভাবলেন যে আমি একটা মেয়ের ক্ষতি করব, আপনার লাভের জন্য?

—আমি কিন্তু মেয়েটার ক্ষতি করার জন্য কথাগুলো বলছিলাম না স্যার। ইন ফ্যাক্ট মেয়েটাকে বাঁচাতে চাই বলেই আপনার সাথে কথা বলে শিওর হয়ে নিতে চাইছিলাম।

—ইয়ার্কি করছেন আমার সাথে?

—না স্যার,সত্যি বলছি। আমি তো বুঝে গেছি,প্রতিমা মানে প্যাট এসেছিল আপনার কাছে।

—কী করে বুঝলেন?

—এখানে যারা এসকর্ট-এর কাজ করে তাদের মধ্যে একমাত্র ওই অতটা ইমোশানাল। নইলে কাস্টমার চাইছে না চাইছে না বোঝার জন্য অন্য কারো একমিনিটও লাগে না। কিন্তু প্রতিমা স্যার,বাঙালি তো,কাজের চেয়ে বেশি কথা বলতে চায়। এই দেখুন,আপনার সঙ্গে যখন কথা বলছি তখনই ও মেসেজ করেছে,স্বপনদা একটা কিচাইন করে ফেলেছি, কোনো ঝামেলায় পড়ব না তো? এরপরও আপনি বলবেন যে আপনার কাছে প্যাট আসেনি?

আমি ওর কথার সরাসরি জবাব না দিয়ে বললাম,মেয়েটি আপনাকে কী নামে ডাকে,বললেন?

—আসলে স্যার আমিও বাঙালি।আমার নাম স্বপন হাজরা।

—তাহলে নিজেকে ‘সোয়াপান’ বলে পরিচয় দিচ্ছিলেন কেন?

—চাকরির স্বার্থে স্যার। আমাদের হোটেলের ম্যানেজমেন্ট নিয়ম করে দিয়েছে যে এই হোটেলে যে বাঙালিরা কাজ করে তাদের নাম পালটে আন্তর্জাতিক হতে হবে… মানে, উজ্জ্বলকে উজোয়াল, তপনকে টোয়াপান, মহুয়াকে মাহি,এইরকম আর কি স্যার। তাই আমার নামটাও…

—স্ট্রেঞ্জ!ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে যারা আসে তাদের ক্ষেত্রেও কি একই নিয়ম চালু?

—না স্যার। চামুন্ডেশ্বরনাথ ভেঙ্কটপ্রসাদ কিম্বা বিটঠলভাই হাজারিওয়ালা আমাদের সঙ্গেই কাজ করে তবে ওদের ওপর নাম বদলানোর কোনো অর্ডার আসে নি।

—কিন্তু এই নামগুলোর থেকে তো, তপন,স্বপন উচ্চারণকরা অনেক সহজ।

–হতে পারে স্যার,কিন্তু ম্যানেজমেন্ট মনে করে শুধু বাঙালিদের নামটাই পাল্টাতে হবে কারণ বাঙালিদের মধ্যে বাঙ্গালিয়ানার লেশমাত্র থাকলে তাদের দিয়ে কাজ করানো যাবে না।

— সমস্ত জাতির মধ্যে একটামাত্র জাতিকে বেছে নিয়ে এরকম করা তাও আবার তার নিজেরই হোমল্যান্ডে, আপনারা প্রতিবাদ করেন না?

—ওই শব্দটা মুখেও আনবেন না স্যার! এখানে সব প্রভিন্সের লোকদের সংগঠন আছে শুধু বাঙ্গালিদের ছাড়া। অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে আমরা নিজেরাও নিজেদের ‘টোয়াপান’, ‘সোয়াপান’ বলে ডাকি। তবু…

—তবু কী?

—মাতৃভাষা,নিজের লোক এই ব্যাপারটা রক্তে থেকে যায় বলুন? তাই প্রতিমাকে আমিই এখানে কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম স্যার।

—এই নোংরা কাজে? ওই সোনার মেডেল জেতা জিমন্যাস্টকে?

—খিদে পেলে খেতে না পাওয়ার চাইতে বড় নোংরামি আর কী আছে স্যার আমায় বলতে পারেন? ওকে তো লোকাল শেয়াল-কুকুররা ছিঁড়ে খেত তার চাইতে ইন্টারন্যাশনাল বাঘ-সিংহরা খাচ্ছে,খারাপ কী স্যার? নালিশ করে ওই বাঙালি মেয়েটার আর এই বাঙালি ছেলেটার সর্বনাশ করবেন না স্যার। স্বপন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আমার পা টা জড়িয়ে ধরতে গেল।

আমি ওকে একটা হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে দিলাম আবার। আর তখনই মনে পড়ল,আরে আজ সকালে তো আর একটা বাঙালি ছেলের আমার কাছে আসার কথা। নাম পাল্টায়নি বলে ওকে আবার হোটেলের গেটে আটকে দেবে না তো?

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.