সোনার বাংলায় গালিভার (পর্ব ৫)

বাঙালির টাইমে গালিভার

প্রথমে প্রতিমা তারপর স্বপন। ভোররাত থেকে সকালের মধ্যে রোমাঞ্চকর দুটো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম । আর যতই রোমাঞ্চ থাক মাথার ভিতরে থাকা রুটিন যে তাতে কিছুটা হলেও তালগোল পাকিয়ে গেছে সেটা টের পেলাম স্নানে ঢুকে। কন্টিনেন্টের লোকরা বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের মানুষজন খুব একটা স্নান করতে পছন্দ করে না। ইংল্যান্ডে ব্যাপারটা সেরকম নয় কিন্তু তাই বলে রোজ ভোরে উঠে স্নান সেরে নেবে এমন পাগলও সে দেশে খুব বেশি নেই। আমি আছি আর আমি তো এমন ব্র্যান্ডেড যে আমার পাগলামিকেও লোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখে না। ভাবে এটাও বোধ হয় কোনো নতুন অ্যাডভেঞ্চার। আসলে ব্যাপারটা দুটোর কোনোটাই নয়। অভ্যেস। জীবনের একটা বড় সময় আমি যেসব জায়গায় কাটিয়েছি সেগুলো রীতিমতো গরম,সেখানে ঘন কুয়াশার ভিতর গায়ে ওভারকোট,মাথায় টুপি আর গলায় মাফলার ঝুলিয়ে লোকে কাজে বেরোয় না, কনকনে হাওয়ার বদলে ঝলমলে রোদ খেলে বেড়ায় সেইসব দেশে আর মানুষগুলো ব্রিটিশদের মতো গোমড়ামুখো নয়, হাসি-খুশি,উচ্ছল। আরও একটা বড় তফাত হল,আমার জন্মভূমিতে মানুষ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভালবাসে না। বিখ্যাত একটা কার্টুনের কথা মনে পড়ছে, ‘ সাহেবদের স্বর্গ’ বলে সেখানে একটা ট্রেনের কামরা দেখানো হয়েছিল। কামরার ভিতর অনেক প্যাসেঞ্জার। তাদের কেউ কেউ বই পড়ছে,কেউ বা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে কিন্তু সহযাত্রীর সঙ্গে কথা বলছে না কেউ। অথচ এমনকিছুর কথা তৃতীয় বিশ্বের দেশে ভাবাই যায় না। সেখানে মানুষ মানুষের সঙ্গে অনর্গল কথা বলছে,প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলছে সময়-সময় তবু কথা তো বলছে। কথা বলার মধ্যে দিয়েই হয়তো একজন মানুষ আর একজন মানুষের অস্তিত্ব স্বীকার করে,চুপ করে থেকে তাচ্ছিল্য দেখায় না,আমার স্নান করতে করতে মনে হল। আর একটা কথা মনে হয়ে হাসি পেল,রোজ ভোরে স্নান করার মতো এই মানুষের সঙ্গে কথা বলার অভ্যেসটাও আমি আমার অ্যাডভেঞ্চারের সূত্রে পেয়েছি। কিন্তু প্রতিমা বা স্বপনের কথা শুনতে শুনতে আমি বিশেষ কিছু বলতে পারিনি,থম মেরে গিয়েছিলাম।প্রতিমার ক্ষেত্রে তাও পুনর্বাসন একটা সলিউশন হতে পারে কারণ ওর দারিদ্র দূর করতে পারলে,ওকে কোনো একটা সম্মানজনক কাজ দিতে পারলে ওর আর এভাবে টাকা রোজগার করতে হবে না। কিন্তু স্বপনের সমস্যার কী সমাধান দেব? এটা তো একটা গোটা জাতির সমস্যা। আরও যা আশ্চর্যের তা হল এই ব্যাপারটা নিয়ে তেমন কোনো হেলদোল নেই কারো। আচ্ছা,লন্ডনে ইংরেজদের নিজেদের নাম বিকৃত করে উচ্চারণ করতে হচ্ছে, এমনটা ভাবা যায়? যদিও লন্ডনে এখন প্রচুর এশিয়ান,আফ্রিকান, তবু ব্রিটিশদের সঙ্গে এমন কিছু করার চেষ্টা হলে মুহূর্তে আগুন লেগে যাবে সারা শহরে। তখন ওই ট্রেনের কামরায় চুপ করে থাকা মানুষগুলোই এমন গর্জন করে উঠবে যে ভুলে যাওয়া সাম্রাজ্যবাদের সিংহকে মনে পড়ে যাবে আবার। তাহলে কলকাতায় এই ব্যাপারটা নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে না কেন? যা শুনলাম তাতে তো মনে হল না  নিয়মটা শুধুমাত্র এই হোটেলেই আছে। শহরের বড় বড় সব হোটেল,রিসর্ট,বার,শপিং মল,প্লাজা,এমনকি অনেক অফিসেও এই একই নিয়ম চালু। আর কমবেশি সব বাঙালি এটা মেনে নিয়ে  কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করলেও চার দেওয়ালের ভিতরে গুজুর-গুজুর করছে,বন্ধুর কাছে ফিসফিস করে বলছে কিন্তু গলা তুলে চিৎকার করে বলতে পারছে না,মানছি না,মানব না। স্বপনকেও তো দেখলাম,ভয়েই মরে যাচ্ছে।আচ্ছা,কীসের এত ভয়? তবে যে পড়েছিলাম,ইংরেজের হাত থেকে ভারতকে স্বাধীন করার লড়াইয়ে  বাঙালিরাই সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছে,তা কি মিথ্যে? ক্ষুদিরাম বসু বলে একজনের কথা জেনেছিলাম যিনি কুড়ি না একুশ বছর বয়সে হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন; জেনেছিলাম মাস্টারদা সূর্য সেনের কথা যিনি ব্রিটিশের অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে ব্রিটিশের শিরদাঁড়ায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন; জেনেছিলাম,অসম সাহসিনী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বা মাতঙ্গিনী হাজরার কথা। বিনয়-বাদল-দীনেশের কথাও মনে গেঁথে গিয়েছিল। ভাবা যায় তিনজন তরুণ প্রশাসনিক হেড কোয়ার্টারে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে? জেনে আমারই রক্ত গরম হয়ে ওঠে বাঙালিদের হয় না?

—রক্ত গরম হওয়ার জন্য তো রক্তের সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া দরকার। কিন্তু আমাদের শিরা,ধমনী এই মুহূর্তে ব্লকড। বিনায়ক আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে বলল।

আমি ওকে ফোন করেছিলাম কারণ আমার ভয় লাগছিল যে ও নিজের নাম বললে যদি ওকে ঢুকতে না দেয় ? গেটম্যান হোক বা রিসেপশনের কেউ, বাঙালি নাম বিকৃত করে উচ্চারণ না করলে পরে তো ধন্দে পড়ে যাবে। তখন আমি থাকব আটতলায় আর আমার সঙ্গী থাকবে রাস্তায়। বাংলা ভ্রমণের প্ল্যান শুরুতেই  থমকে যাবে। কিন্তু ফোনে আমার দুশ্চিন্তার কথা শুনে বিনায়ক হাসতে শুরু করল। তার একটু আগেই আমি ওকে ধমক দিয়েছি কারণ ও তখনো বিছানায় শুয়ে আছে। এখনও কেন ঘুমোচ্ছে জিজ্ঞেস করায়,বিনায়ক উত্তর দিল যে ওর ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুম ভাঙার পর কীভাবে কেউ শুয়ে থাকতে পারে আমার মাথায় ঢুকল না। তখন ওই আমায় জানাল যে এটা বাঙালি জাতির একদম নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট্য। তারা ঘুমের পর কিছুক্ষণ অন্তত বিশ্রাম না নিয়ে বিছানা থেকে উঠতে পারে না। আর এই চরিত্রগুণ যে শুধুমাত্র উচ্চ –মধ্য-নিম্নবিত্ত বাঙ্গালির মধ্যে সীমাবদ্ধ তা মোটেই নয়। ফুটপাথে যে বাঙালি শুয়ে থাকে সেও নাকি সূর্য উঠে যাওয়ার পর একটু পাশ ফিরে শোয়।

—এই ফুটপাথে শুয়ে থাকা বাঙালিদের কী পেশা হয় ? আমি জানতে চাইলাম।

—প্রধানত ভিক্ষে। কিন্তু বাঙালি ভিকিরিরা ভোরবেলা ভিক্ষা চেয়ে লোককে বিরক্ত করে না।

— ভিক্ষে করা যার কাজ তার আবার সন্ধ্যা-সকাল কী?

—তারই তো সন্ধ্যা-সকালের বোধ সবচেয়ে বেশি। সে জানে যে বাঙালি বউরা বাঙালি বরদের পকেটে বাজার করার যে টাকা গুঁজে দেয় তা এমনই মাপে মাপ যে ভিকিরিকে দুটাকা দিলে হিসেব মেলানো যাবে না। তাই ভোরবেলা কাউকে এপ্রোচ না করাই শ্রেয়। তার চেয়ে অফিস যাওয়ার সময় কিম্বা সবচেয়ে ভালো হয় যদি অফিস থেকে ফেরার সময় কোনো বাঙালির কাছে ভিক্ষে চাওয়া যায়। তখন ভিক্ষে পাবেই পাবে ।

—আমার তো মাথায় কিছু ঢুকছে না!

—আমি বুঝিয়ে বলছি আপনাকে যদিও এটা একদিনে বোঝার ব্যাপার নয়। তাও বলি, আমাদের এখানে সিস্টেম যেরকম তাতে খুব এক্সেপশনাল কিম্বা ধনী না হলে প্রত্যেক বাঙালিরই সারাদিনের কাজের শেষে মনে হয় যে সে একটা ভিকিরি। ভিকিরি না হলে এত অপমান আর লাঞ্ছনা সহ্য করে সে এই কাজটা করত না। কিন্তু মুশকিল হল বাড়ি ফিরে সে তো নিজেকে ভিকিরি দেখাতে পারবে না।

—দেখালে পরে তার বউ তাকে চেপে ধরবে তাই তো?

— বউ যদি অফিস থেকে ভিকিরি ভাব নিয়ে ফিরে আসে বরও কি ছেড়ে দেবে ভেবেছেন? অতএব পুরুষ বা নারী যেই বাইরে বেরোক তাকে বাড়ি ফেরার সময় এমন একটা রেলা নিয়ে ফিরতে হবে যেন সে আছে বলেই দুনিয়া চলছে। কিন্তু সারাদিন যে ভিকিরির মতো মুখ বুজে সব সহ্য করেছে তার পক্ষে বাড়ি ফেরার সময়টুকুর মধ্যে নিজেকে রাজা বা রানি কল্পনা করে নেওয়াও খুব শক্ত।

—তাহলে উপায়?

—এইখানেই আসল ভিকিরিদের প্রবেশ। তারা জানে ওই সময়ে ভিকিরিকে সামনে পেলে বাঙালি যেচে ভিক্ষে দেবে।একজন,দুজন,তিনজন ভিকিরিকে ভিক্ষে দিতে দিতে আবার নিজেদের কনফিডেন্স ফিরে পাবে,বাড়ি ফিরে চায়ে চুমুক দিয়ে নিজেকে কেউকেটা ভাবতে পারবে। টিভির ভলিউম কমিয়ে নিজের বাণী দেওয়ার সময় খেয়াল পড়বে না,সারাদিন আওয়াজ বেরোয়নি এই গলা দিয়ে।

—ভিকিরিরাই তাহলে বাঙ্গালির এই রূপান্তর ঘটায়?

—উঁহু। সন্ধ্যার ভিকিরিরা। এখানে সন্ধ্যা ব্যাপারটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়ই বাঙালির নতুন করে আত্মপ্রকাশ হয়। বলতে পারেন,ব্লকড শিরা,ধমনীগুলো খুলে যায় তখন।

—তাহলে আমি সকালে তোমার সঙ্গে বেরোচ্ছি কেন? সন্ধ্যাবেলায় যাব যেখানে যাওয়ার।

—তথাস্তু। আমি কি তাহলে সকালে আর যাব না?

–আসবে না কেন? এসো। আমরা একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করব।

কথাটা বলে ফোন ছেড়ে দিয়ে আমি স্নানে গেলাম।আর শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে হাজারও ভাবনা ভাবতে ভাবতে মনে হল,এমনটা হওয়াও কি সম্ভব? বাঙালির টাইম কি পৃথিবীর টাইমের থেকে আলাদা?

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.