সোনার বাংলায় গালিভার (পর্ব ২)

দ্বিতীয় পর্ব

ফাইভ-স্টারে গালিভার

রাত্রে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম।টেমস নদীতে বিরাট এক ফ্লোটিলায় চড়ে ভেসে যাচ্ছি আমি।আমার সঙ্গে আরও একশোটা নৌকা।সব মিলিয়ে এক বিশাল শোভাযাত্রা।পিছনের নৌকা থেকে কে একটা বলল, আমারই সম্মানে নাকি এই নৌকা যাত্রার আয়োজন করা হয়েছে।কিন্তু কেন? আমি তো এমনকিছু করিনি যাতে আমার দেশের সরকার আমাকে এই সম্মান জানাবে।আমি অ্যাডভেঞ্চার ভালবাসি বলে বারবার বেরিয়ে পড়েছি ঘর ছেড়ে আর বারবার ওই  বিশাল সমুদ্র ,এক অনন্ত গর্ভের অধিকারিণী নারীর মত গিলে ফেলেছে আমাকে।গল্প অবশ্য ওখানে শেষ নয়,ওটা গল্পের ইন্টারভ্যাল।বিরতির পর ওই সমুদ্রই আবার আমাকে উগরে দিয়েছে,একেবারে অজানা কোনো ভূখণ্ডে।এভাবেই লিলিপুটদের দেশে ভিড়েছিলাম একদিন,এভাবেই গিয়ে পড়লাম ওই বিরাট চেহারা কিন্তু সাধাসিধে মানসিকতার দানবদের মধ্যে।কিন্তু যেখানেই যাই না কেন,ফিরে এসে আমি সেই দেশে পৌঁছোবার রাস্তা বাতলে দিইনি আমার দেশের সৈন্যবাহিনী কিংবা গুপ্তচরদের।বলে দিইনি কোত্থেকে কীভাবে বাঁক নিলে  পা রাখা যাবে অইসব জায়গায়। না বলার কারণ হিসেবে একটাই যুক্তি তুলে ধরেছিলাম আমি। অই দেশগুলোয় এমন কিছুই নেই যার জন্য অজস্র সৈন্য নিয়ে সেখানে অভিযানে যাওয়া যায়। নেই সোনা,নেই হিরে,নেই মশলা,চিনি,তামাক।আছে কেবল বিচিত্র কিছু প্রানী যারা বুঝতেই পারবে না সভ্যতার নিয়মই হল দূরবীন দিয়ে যে জমিই দেখা যাক সেখানেই জাহাজ ভিড়িয়ে অবাধে লুঠতরাজ করা,খুনজখম করে হাজারও লাশ বিছিয়ে দেওয়া,পছন্দসই মেয়ে পেলে তুলে নিয়ে যাওয়া,অপছন্দের মেয়েটিকে ওখানেই যা করার করে দিয়ে ফেলে যাওয়া…ইত্যাদি,ইত্যাদি।

সভ্যতার বাইরের মানুষদের একটু কাছ থেকে দেখবার সুযোগ হয়েছে বলে জানি,সভ্যতার তাদেরকে প্রয়োজন হতেই পারে কিন্তু তাদের সভ্যতাকে কোনো প্রয়োজন নেই।এই অপ্রয়োজনের ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চুপ ছিলাম আর চুপ থাকতে পেরে শান্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার দেশের অনেক হোমড়া-চোমড়ার অশান্তির কারণ হয়েছিল আমার ওই নীরবতা।তারা ভাবছিলেন,না জানি কোন গুপ্তধনের সন্ধান আমি লুকিয়ে রেখেছি আমার মাথায়।  সবকিছু ঘেঁটে দেখার অভ্যেস,ফলের ভিতরের শেষ শাঁসটুকু ছিড়ে-কামড়ে খাবার অভ্যেস তাদের স্বস্তি দিচ্ছিল না,খালি বলছিল,গালিভারের ভিতর থেকে কথা বের করো,আমাদের সাম্রাজ্যকে আর একটু বাড়িয়ে নেবার,আমাদের লোভের আগুনে আরও একটু কাঠ গুঁজে দেবার আয়োজন সম্পূর্ণ করো।সেই আয়োজন যখন শুরুই করা গেল না তখন আমাকে শেষ করে দেবার পরিকল্পনা শুরু হল। টেমসের পাড়ে কিংবা বিগ বেনের ধারেপাশে অথবা রাতের হাইড পার্কে আমার লাশ পড়ে থাকত যদি না আমি বিখ্যাত হয়ে যেতাম। কিন্তু ষড়যন্ত্রীদের কপাল খারাপ,আমার জীবনকাহিনী মানুষের ভাল লেগে গেল। গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-মফসসলে আমি এমনই জনপ্রিয় হয়ে গেলামযে আমার গায়ে সামান্য আঁচ পড়লেও তাই নিয়ে তুলকালাম হল।সেই তুলকালামের চোটে ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বাকিং হ্যাম প্যালেস পর্যন্ত নড়ে গেল।আর গেল বলেই আমির-ওমরাহরা তাদের ভাড়াটে গুণ্ডাদের সতর্ক করে দিলেন। তাই লন্ডন যাওয়ার সময় আর লন্ডন থেকে বাড়ি ফেরার সময় আমি টের পেতাম অনেক কড়া নজর আমার খেয়াল রাখছে,মাঝেমাঝে ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাসও টের পেতাম কিন্তু তার বেশি কিছু নয়।

একদিক থেকে বেশি নয় আবার অন্যদিক থেকে দেখলে কমও নয়। হাতে না মেরে ভাতে মারার মতো,প্রাণে না মেরে সম্মানে মারার চেষ্টা শুরু হল আমাকে।কত কী যে রটিয়ে দেওয়া হল আমার নামে।আমি অনেক টাকা মেরেছি,অনেক মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে এসেছি,সমুদ্রের নুন বাড়িয়ে দিয়েছি,মাটির উর্বরতা কমানোর চক্রান্ত করেছি,এককথায় দেশে থেকে দেশের সর্বনাশ করে চলেছি তাই আমায় সামাজিকভাবে বয়কট করা দেশবাসীর পবিত্র কর্তব্য।আমার তুমুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও এই প্রচার কোথাও কোথাও যে একটু প্রভাব ফেলল না তা নয়।আর সেই প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিল আমার আচরণ।আমি একদম গুটিয়ে নিলাম নিজেকে।আসলে সত্যি সত্যি আমার আর ভাল লাগছিল না।আমি তো একটা কেক নই যে সবাই মিলে আমায় কাটবে আর আমি উপভোগ করব! অতএব যারা আমার ক্ষতি করার জন্য তৎপর তাদের থেকে যেমন দূরে সরে গেলাম,সরে গেলাম তাদের থেকেও যারা আমায় ভালবাসে।আমি অভিযাত্রী,আমি বরাবর তেমন জায়গায় গিয়ে জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছি যেখানে কেউ আমাকে চেনে না;আমি কীভাবে তেমন কোথাও স্বস্তি পাব যেখানে পাঁচজন আমায় দেখে মুখ ভ্যাংচাচ্ছে আর পাঁচশো লোক আমার অটোগ্রাফ নেবে বলে ছুটছে? অসহ্য সেই অবস্থার থেকে রেহাই পাব বলে নিজেকে ডুবোপাহাড়ের মতো লুকিয়ে ফেললাম জনসমুদ্রে।আমার ছায়াটা কেউ কেউ ছুঁতে পারলেও আমার রোদের নাগাল পেতে দিলাম না কাউকেই।কেউ জানতেও পারল না আমার মন আবার কোথায় হারিয়ে যেতে শুরু করেছে,মনে মনে।আর জানতে পারল না বলেই মানুষ আস্তে আস্তে আমার আশা ছেড়ে দিল। সভা-সমিতিগুলো আমায় প্রধান অতিথি হিসেবে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিল,উৎসবের আয়োজকরা আমায় উদ্বোধকের ভূমিকায় কখনোই দেখতে পাবে না জেনে গেল,নিন্দুকেরা আমার প্রবল নিন্দা করতে গিয়ে দেখল নিন্দে-মন্দগুলো হাওয়ায় ভেসে দূরদেশে চলে যাচ্ছে, কেউ জবাব দিচ্ছে না বলে,ব্যাটে লেগে ফেরত আসছে না!আর ফেরত না এলে খেলা জমে? আর না জমলে পড়ে কেই বা চালিয়ে যেতে পারে খেলা? পারে একমাত্র সে যে পেশেন্স খেলতে জানে।আর এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পেশেন্স খেলোয়াড়রাই অ্যাডভেঞ্চারার হয়।যে লোকটা একা একা এভারেস্টের চূড়ায় ওঠে সে জানে তার জন্য ক্যামেরা নিয়ে কোনো ফটোগ্রাফার দাঁড়িয়ে নেই ওখানে।তার বাইট নেবে বলে কোনো চ্যানেলের তরুণী সাংবাদিক চোখে মাসকারা আর ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে অপেক্ষা করছে না।অপেক্ষা করছে কেবল কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া আর তার দোসর তুষার ঝড়। সে একটাই বাইটের কথা জানে,ফ্রস্ট বাইট। সেই কামড়ের সামনে কোনো সাজানো কথা চলে না কারণ সে  এমনভাবে কামড়ে ধরে যেন জীবনকে কামড়ে ধরেছে মৃত্যু। পাহাড়ে বা সমুদ্রে ওই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়াতেই  অ্যাডভেঞ্চারারের আনন্দ। ভুল বললাম,অই লড়াইটাই তার আইডেনটিটি।

আমি কি আমার সেই আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলছি না এই ফাইভ-স্টার হোটেলের মেকি সৌন্দর্যে? যে গালিভার ঢেউয়ে ঢেউয়ে লুটোপুটি খেয়েছে,একটা ছোট্ট ভেলায় চেপে যে মহাসমুদ্রের বুকে বারবার ভাসিয়ে দিয়েছে নিজেকে,যে লোহার শিকলে বাঁধা অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করেও ভেঙে পড়েনি, দিনের পর দিন খাঁচার ভিতরে থেকেও জীবনের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেনি, সেই গালিভার এই ডিলাক্স স্যুট না রয়্যাল স্যুটে কী করছে? সে তো হাঙর,কুমিরদের মধ্যে দিয়ে সাঁতরে নতুন দ্বীপে গিয়ে পৌঁছেছে,জলদস্যুদের সঙ্গে আক্রমণের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে তাকে কারা বেঁধে ফেলতে চাইছে,ওপর থেকে নিচে স্বচ্ছ কাচে মোড়া এই ঘরে? ঘরের ভিতরে প্লাজমা টিভি, ডিভিডি, ল্যাপটপ, প্রিন্টার,ফ্যাক্স মেশিন সব আছে; বেডরুম সংলগ্ন বাথরুমে  স্পা,হটবাথ,এমনকি নদীর তাজা জলে স্নান করার বন্দোবস্ত রয়েছে; আছে, কন্টিনেন্টাল-থাই-চিনা-জাপানি-ইতালিয় বা ভারতীয় খানা খাবার দেদার সুযোগ।কিন্তু আসল জিনিসটাই নেই আর যা নেই তার নাম হল, প্রাণ।সেই প্রাণ যা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও শরীরের ভিতর সুগন্ধ ছড়ায় বলে আমরা পচে যাই না এখানে কোথায় সেই প্রাণ? ওই সোনার জলে রং করা বাথরুমের কলগুলোর মতো পুরোটাই আসলকে নকল দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা।

আমি এই নকলনবিশির সঙ্গে নিজেকে জড়াব কেন?একটু হলেও জড়িয়েছিলাম বলেই কি ওই একশোটা নৌকার একদম সামনেরটায় চাপার  অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম?ঘুম ভাঙার পর এসমস্ত ভাবছি,মনে হল, এই ফাইভ-স্টার আমার জায়গা নয়।আমি রাজার গোলাম হইনি তো কোনো প্রকাশকের গোলাম হতে যাব কোন দুঃখে? ধ্যাত! আজই এই হোটেল ছেড়ে চলে যাব।থাকব,যেদিন যেখানে খুশি। ভাবনাটা শেষ হবার আগেই আমার ঘরের কলিংবেল বেজে উঠল। আশ্চর্য! এত ভোরে কে? বিনায়ক এলে পরে তো নিচ থেকে ফোন করবে আমায়। তাহলে? বেলটা আর একবার বেজে ওঠায় আমি  উঠে গিয়ে দরজাটা খুললাম। জিনসের হাফপ্যান্ট আর হাতকাটা গেঞ্জি পরা একটি কুড়ি- একুশের মেয়ে  আমার চোখে চোখ রেখে দুষ্টু হাসি হেসে বলল, ভিতরে আসতে বলবেন না?

ক্রমশঃ…

গত পর্বের লিং –  https://banglalive.com/bengali-serialised-story-by-binayak-bandyopadhyay/

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.