আরে! ‘হ্যাপি পিল’-এর গল্প তো প্রায় তপন সিংহের সেই সিনেমাটার মতো!

বছর দেড়েক আগে মোদী যখন সবে দেশ জুড়ে পাঁচশো আর হাজার টাকার নোট বাতিল করল, সে সময় ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটা বাংলা সিনেমার ক্লিপিংস খুব ঘুরতো, মনে আছে?

সিনটা এরকম যে, কোন একটা দোকান নাকি আড়তঘরে বসে ঝড়ের বেগে নোট গুণে চলেছেন অনুপকুমার আর হরিধন মুখুজ্জে। আর সামনের দিকে বসে গোটা কাজটার তদারকি করছেন কালী ব্যানার্জি।

দেখলেই বোঝা যাচ্ছে যে সাদা পথে ওসব টাকার কোন হিসেব-নিকেশ নেই। বহু পুরনো একটা বাংলা ছবির ক্লিপিংস, কিন্তু ছবির নামটা যে কী, সেটার উল্লেখ থাকতে দেখি নি সেখানে কোথাও।

ডিমনিটাইজেশনের সময় এই ক্লিপিংটা হু-হু করে শেয়ার হওয়ার কারণ, বহুকাল আগের এই বাংলা ছবির সিনে যে একেবারে আন্ডারলাইন করে শুনিয়ে দেওয়া হচ্ছিল নোট বাতিলের কথা! মনে হচ্ছিল, আরেব্বাস, এতো মান্ধাতার আমলের সিনেমা নয়, একেবারে হাল আমলের কথা!

কালী ব্যানার্জিকে প্রায় ধমক দিয়ে ওখানে বলতে শোনা যাচ্ছিল যে, দশ আর পাঁচ টাকার নোটের বান্ডিলের সঙ্গে একশো টাকার নোটের বান্ডিল মেশান চলবে না, কারণ ‘গরমেন্ট কোন নোট কখন বাতিল করে কিছু ঠিক আছে?’

এর ধুয়ো ধরে হরিধন বলছিলেন, ‘গরমেন্ট যদি ধরুন একশো টাকার নোট বাতিল করে দ্যায়। আমাদের প্রাইভেট ডিটেকটিভ ঘোষাল সাহেব অন্তত পক্ষে ধরুন ছ’ঘণ্টা আগে জানাবে। সেই ছ’ঘণ্টার মধ্যে ধরুন বস্তা বস্তা একশো টাকার নোট ভাঙাতে হবে। তখন যদি ধরুন, পাঁচ-দশ টাকার নোটের মধ্যে একশো টাকার নোট খুঁজতেই ধরুন ঘণ্টা কাবার হয়ে যায়, তাহলে ধরুন ভাঙাবেন কখন?’

ডিমনিটাইজেশনের কালে যাঁরা এই সিনটা দেখে চরম পুলক পেয়েছিলেন, কিন্তু ছবির নাম কী, সেটা বুঝতে পারছিলেন না, তাঁদের জানাই, ছবির নাম হল ‘এক যে ছিল দেশ’ (১৯৭৭)। ছবির মূল কাহিনী লিখেছিলেন শংকর। ছবির চিত্রনাট্য, সংলাপ, গীত রচনা, সঙ্গীত ও সংলাপ ছিল তপন সিংহের।

‘হ্যাপি পিল’ দেখতে দেখতে হঠাৎ এই ছবিটার কথা মনে পড়ে গেল কেন, সেটা এক-এক করে লিখছি। তার আগে এটুকু লিখি যে, এখানে যেমন নোট বাতিলের বিষয়টাকে ছুঁয়ে যাওয়া হয়েছে, প্রায় কাকতালীয় ভাবে ‘হ্যাপি পিল’ ছবিটাতেও এসেছে সেই ডিমনিটাইজেশনের গল্প!

সেটা ছবির শেষ দিক। সিনটা হল এরকম যে, ‘হ্যাপি পিল’-এর ব্যবসা করে যা টাকা পকেটে এসেছে, তার মধ্যে থেকে নিজের ভাগটা ব্যাগে পুরে শহর থেকে পালিয়ে যাচ্ছে সিদ্ধার্থ চৌধুরী (অভিনয়ে ঋত্বিক চক্রবর্তী)। এমন সময় ফোনে সে কারুর থেকে শুনতে পাবে মোদীর নোট বাতিলের খবর। ট্যাক্সি থামিয়ে রাস্তার ধারের একটা টিভির দোকানে গিয়ে এরপর সে শুনবে নোট বাতিল নিয়ে মোদীর সেই ফেমাস ভাষণখানা।

এরপরের সিনটাই চরম শকিং। সিনেমায় দ্যাখান হচ্ছে যে, ভাষণের ওই একটা টুকরো শুনেই নিজের চিমসে হাতব্যাগ খুলে, লাভের যেটুকু ক্যাশ সঙ্গে ছিল, একটা ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে সেটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছে সিদ্ধার্থ!

দেখতে গিয়ে একেবারে হাঁ হয়ে যাচ্ছি আমি, মৈনাক। আপনার সিনেমায় এসব কী দ্যাখাচ্ছেন আপনি? ওই এক রত্তি ব্যাগের মধ্যে কত হার্ড ক্যাশ এঁটেছে যে, রাস্তার টিভিতে মোদীর ভাষণ শোনামাত্র পুরো ক্যাশ একেবারে হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে হল? ওই সামান্য কটা টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া বা অন্য কোনভাবে এক্সচেঞ্জ করে নেওয়ার মিনিমাম কোন চেষ্টাই করলো না সিদ্ধার্থ?

সিনটা লেখার সময় এগুলো আপনার মাথায় আসে নি মৈনাক?

ছবির কোথাও এটা না বলা থাকলেও, একেকবার বেশ মনে হচ্ছিল, তপন সিংহের ‘এক যে ছিল দেশ’ থেকে ‘ইন্সপিরেশন’ নিয়েই ছবিটা বানিয়েছেন আপনি। শুধু আফশোষ এইটে যে ওই ছবিতে তো ডায়ালগে এটাও স্পষ্ট শুনিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ছয় ঘণ্টার মধ্যে বাতিল নোট ভাঙিয়ে নেওয়ার গল্প। কিন্তু আপনার ছবির হিরোকে সেই সুযোগটাও আপনি দিলেন না কেন?

ছবিতে সিদ্ধার্থের বিজনেস পার্টনার হল পচাদা (অভিনয়ে মীর)। সে আবার সিদ্ধার্থের থেকেও আরেক কাঠি সরেস। মোদীর নোট বাতিলের খবর পেতে না পেতে সে গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে নোট পোড়াতে থাকে! মুশকিল হল, এঁদের সকলেরই কাঁচা টাকার সঞ্চয় বলে যেটা দ্যাখান হচ্ছে, সেটা হচ্ছে, একটা ঝোলা ব্যাগের মধ্যে রাখা অল্প কিছু টাকা। মাথায় মিনিমাম কোন বুদ্ধি থাকলে যে টাকাটা ভাঙিয়ে নেওয়া এমন কিছু হাতি-ঘোড়া কাজ না। কিন্তু সেই ন্যায্য লজিকে দেখছি এঁরা ঢুকতে চান না কেউ!

প্লটের একটা বড় গণ্ডগোল হল এটা। আর একটা বড় গণ্ডগোল এইটে যে, ছবিতে এটা স্পষ্ট করে কোথাও বলা হল না যে, হঠাৎ করে হ্যাপি পিলের ব্যবসা বন্ধের জন্যে কেন উঠে পড়ে লাগলো পুলিশ।

‘হ্যাপি পিল’ নামে বড়িগুলো তো কার্যত বিক্রি হচ্ছিল হজমিগুলি বিক্রি করার স্টাইলে। কোথাও কোন রকম বিজ্ঞাপন নেই, মার্কেটিং নেই, শুধু মুখে মুখে যেটুকু প্রচার হয় সেই টুকুনি ছাড়া। কেউ এটার এগেনস্টে গিয়ে থানায় কোন নালিশ করে নি যে, এই ‘হ্যাপি পিল’ খেয়ে তাঁদের সর্বনাশ হয়ে গেছে বলে। উলটে সবাই তো এর সুখ্যাতিটাই করছিল।

সামাজিক যে সিস্টেম জাপানি তেলের মতো একটা জিনিষকেও মাথায় তুলে নাচে, সেই সিস্টেমের পুলিশ কেন হঠাৎ করে হাত ধুয়ে হ্যাপিওলার পেছনে পড়ে গেল, আর হ্যাপিওলার খোঁজ নিতে দলে দলে পুলিশ বাহিনী কেন গলিতে গলিতে দৌড়ে বেড়াতে লাগল, গল্পে সেই লজিক কোথাও অ্যাড করলেন না কেন, মৈনাক?

শুধু হ্যাপি পিলের ডাব্বায় কোথাও এম. আর. পি. লেখা নেই, এই অপরাধে বুঝি?

এবার গল্পের কিছুটা ছোট করে বলে দিই, আসুন। শখ ছিল বোধহয় ডাক্তার হওয়ার, কিন্তু কপাল ফেরে এমবিবিএস ডিগ্রি পাওয়ার সুযোগ ঘটে নি সিদ্ধার্থের। গরীব ছেলে। ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকা মা (কাবেরী মুখার্জি) আর কালো বোন রিনিকে (পার্নো মিত্র) নিয়ে ছোট সংসার ওর।

সিনেমায় এটা দ্যাখান হল যে, নিজের সব আনহ্যাপিনেস কাটিয়ে উঠতে নিজের পড়াশুনোর সব বইপত্র কলেজ স্ট্রিটে বেচে দিয়ে যে টাকাটা পেল, সেই টাকায় রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্যে উপকরণ কিনে আনল ও। এরপর খুব দ্রুত অদ্ভুত একটা হলুদ রঙের বড়ি বানিয়ে ফেলল, যেটা খেলে নাকি মন সুখে ভরপুর হয়ে যাবে।

প্রাণের সঙ্গী পচাদার পরামর্শে সেটার নাম রাখা হল ‘হ্যাপি পিল’, আর সেটা নিয়ে চুপিসাড়ে একটা বিজনেসও শুরু করে দিল ওরা।

কাট টু আসুন ‘এক যে ছিল দেশ’-এ। সেখানেও আপনি দেখতে পাবেন ঘরের মধ্যে ছোট করে সায়েন্স ল্যাব খুলে বসার গল্প। এখানে হিরো যেমন ব্যর্থ এমবিবিএস, ওখানে হিরো তেমন এক ব্যর্থ কেমিস্ট। ‘ব্যর্থ’ শব্দটা লিখলাম, কারণ ওই সিনেমায় দ্যাখান হয়েছিল, বহু চেষ্টা করেও টাকে চুল গজানোর ওষুধ আবিষ্কার করতে পারছে না লোকটি। এমন ওষুধ তৈরি করছে, যেটা ইউজ করতে গেলে উলটে লোকের মাথায় যেটুকু চুল ছিল, তাও সাফ হয়ে যাচ্ছে উঠে।

এই টাকের ওষুধ বানাতে গিয়ে  বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে সে তৈরি করে বসে এমন আশ্চর্য এক তরল, যেটা কোনভাবে শরীরে ঢুকলে সবাই বাধ্য হবে কিছুক্ষণ ধরে কনফেশনে সব উগড়ে দেওয়ার জন্য।

একে একে এই ওষুধের শিকার হয় বাড়ির চাকর নবকুমার, সাধু ভাণ্ডারের মালিক ব্ল্যাক মার্কেটিয়ার ঘনশ্যাম দত্ত, ঘাঘু ব্যবসাদার চোরামিয়া, কোটিপতি মস্তান-রাজনীতিবিদ চাণক্য দস্তিদার, আর তারপর একে একে আরও অনেকে। ওষুধের প্রভাবে সমাজের ক্ষুদ্র-তুচ্ছ মানুষ থেকে তালেবর কেষ্ট-বিষ্টু সবাই যদি কিছুক্ষণের জন্যে হলেও সত্যি কথা বলতে থাকে, তাহলে গোটা সিস্টেম কী রকম নড়বড় করে উঠতে পারে, তার এক অমোঘ আখ্যান ছিল ছবিটা।

কাট টু আসুন মৈনাকের ছবিতে। এখানে দেখতে পাবেন, ওষুধের প্রভাবে অ-সুখ ভর্তি এই সময়ে লোকজনের সুখী হয়ে ওঠার গল্প।

দুটো গল্পের বেসিক প্যাটার্ন দেখবেন একেবারে এক। দুটো ক্ষেত্রেই আবিষ্কার হওয়া নতুন ওষুধটাকে রুখে দিতে তেড়েফুঁড়ে উঠছে সিস্টেম। ‘এক যে ছিল দেশ’-এ এই ওষুধটাকে কব্জা করার উদ্যোগ নিয়েছিল দুষ্টু লোকেরা। আর ‘হ্যাপি পিল’-এ তো আগেই লিখেছি যে, বলার মত তেমন কোন কারণ ছাড়াই হাত ধুয়ে হ্যাপিওলাদের পেছনে পড়ে গেল পুলিশ প্রশাসন পুরো!

‘এক যে ছিল দেশ’ ছবিতে কেমিস্টের সংসারে লোকের সংখ্যা তিন। কেমিস্ট নিজে, তাঁর বয়স্ক দিদি, আর সেই দিদির তরুণী কন্যা। সঙ্গে বাড়ির চাকর নবকুমার। আসুন ‘হ্যাপি পিল’-এ। এখানেও দেখবেন গবেষক-কাম-ব্যর্থ এমবিবিএস-এর বাড়ির জনসংখ্যা তিন! গবেষক নিজে, সঙ্গে তাঁর অসুখী মা আর বোন। সম্পর্কের বিন্যাস ‘এক যে ছিল দেশ’ থেকে আলাদা হলেও দেখতে পাবেন, ক্যারেক্টারের এজ গ্রুপ বলুন, বেসিক লুক বলুন, সব একেবারে খাপে খাপ ম্যাচ করে যাচ্ছে দুটো ছবির।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল ক্যারেক্টারের নাম। একচল্লিশ বছর আগের ছবি ‘এক যে ছিল দেশ’-এর হিরোর নাম রাখা হয়েছিল অবনী। তখন এক মাঝবয়সী যুবকের এরকম নাম হয়তো অবাক হওয়ার মতো তেমন কিছু নয়। কিন্তু তাই বলে ২০১৬ সালের গল্প দ্যাখাতে বসেও মৈনাক আপনি মাঝবয়সী একটা লোকের নাম রাখবেন অবনী? সত্যি কি এই নামটা আজকের দিনে সেভাবে পাওয়া যায়?

অবাক হবেন না প্লিজ। ছবিতে এই অবনী (অভিনয়ে চন্দন সেন) লোকটাকে আপনি আসতে দেখবেন ইন্টারভ্যালের একটু আগে। সে কোথা থেকে এসে জুটল গল্পে, সেটার খুব কিছু ক্লু অবশ্য দেওয়া নেই কোথাও। শুধু এটা দ্যাখান হয়েছে যে, কোন কারণে এ হ্যাপি পিলের ফেরিওয়ালা ‘গাঁজা’ ওরফে গগনদীপের (দেবপ্রসাদ হালদার) ওপর অবনী হাড়ে-মজ্জায় চটা।

গুণ্ডা-বদমাশ ঘেঁটে বেড়ায় যে লোক, তার নাম হঠাৎ করে অবনী হল কেন, কে জানে! কথায় কথায় সে বাংলা কবিতার লাইন আউড়ে বেড়ায় কেন, কে জানে! আর কবিতা ব’লে কবিতা! গুণ্ডা অবনীর মুখে শক্তির ‘অবনী বাড়ি আছ’ থেকে শুরু করে সুনীলের ‘কেউ কথা রাখে নি’ কিংবা সুভাষ মুখুজ্জের ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’ – কোনটাকে তো বাদ রাখেন নি মৈনাক!

এখন কথা হচ্ছে, বারোয়ারি ভাবে যে সব কবির কবিতা ইউজ করা হল ডায়ালগে, সেটা করতে গেলে তো আগে অনুমতি নিতে হয়, নাকি? নিয়েছিলেন সেটা কেউ? যদি অতটাও না করতে পারেন, তাহলে তো ক্রেডিটে মিনিমাম ঋণস্বীকারটুকুর দরকার ছিল ভাই!

কিন্তু কোথাও তো চোখে পড়ল না তেমন কিছু!

আচ্ছা, বাংলা কবিতা মানে কি রাস্তায় পড়ে থাকা বেওয়ারিশ মাল যে ইচ্ছে মতো তুলে নিয়ে স্ক্রিপ্টে বসিয়ে সিনেমা বানিয়ে ফেলবেন বেশ? কবিদের উদ্দেশ্যে মিনিমাম সৌজন্য দ্যাখানোরও দায় থাকবে না কোন!

আসুন ‘এক যে ছিল দেশ’-এ। দেখবেন সিস্টেম বনাম অবনীর এই ফাইটে খুব ইম্পরট্যান্ট একটা রোল প্লে করছে অবনীর বন্ধু রিপোর্টার বুলু। মোক্ষম একটা বিপদের মুখে বলতে গেলে ও-ই হয়ে উঠছে ত্রাতা।

সেখান থেকে এবার আসুন ‘হ্যাপি পিল’-এ। দেখবেন এখানেও কাট পেস্ট সেই রিপোর্টার ক্যারেকটার জুড়ে দেওয়া আছে গল্পে। শুধু তপন সিংহের ছবিতে এটা ছিল মেল, এখানে এসে সেটা হয়ে গেছে ফিমেল – ফারাক বলতে এটুকু।

মেয়েটির নাম ইন্দ্রাণী (অভিনয়ে সোহিনী সরকার), কাজ করে ‘দেশ টাইমস’ নামে একটা কাগজে।

তা’ আমায় এখানে একটা কথা বলুন আপনি মৈনাক। খবরের কাগজে রিপোর্ট লেখার জন্যে হ্যান্ডি ক্যাম হাতে ওকে রাস্তার লোকের ইন্টার্ভিউ শুট করে বেড়াতে হয় কেন, দাদা? নেহাত যদি ভিডিও তুলতে হয়, তার জন্যে কি মোবাইল ফোন যথেষ্ট নয় নাকি?

এই রাস্তার লোকের ভিডিও শুট করে বেড়াতে বেড়াতে যে ভাবে ইন্দ্রাণীর সঙ্গে হ্যাপি পিলের আবিষ্কর্তা সিদ্ধার্থ চৌধুরীর দ্যাখা হয়ে গেল, সেটা তো যাকে বলে একেবারে কো-ইনসিডেন্সের চরম। একটা গল্পের মধ্যে এরকম কাকতালীয় সব ব্যাপার-স্যাপার ঘটতে থাকলে স্পষ্ট বুঝতে পারা যায়, কী রকম নড়বড়ে ভাবে লেখা হয়েছে সিনেমাটার স্ক্রিপ্ট।

মাস-টাসের হিসেবও তো একেক জায়গায় পুরো গুলিয়ে ফেলেছেন দেখলাম। খেয়াল করে দেখুন, ছবির গল্পটা যখন শুরু করছেন, স্ক্রিনে লিখে দিচ্ছেন ‘অক্টোবর ২০১৬’ বলে। আর এর সঙ্গে দ্যাখান হচ্ছে যে হাতকড়া পরিয়ে সিদ্ধার্থ আর পচাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

এরপর তো আপনি ফ্ল্যাশ ব্যাকে পিছিয়ে গিয়ে বলতে থাকছেন গল্পটা। স্ক্রিনে দ্যাখান হচ্ছে ‘আগস্ট ২০১৬’ লেখা। এরপর চলতে চলতে গল্প যখন ফের সিদ্ধার্থ আর পচার অ্যারেস্ট হওয়ার দিনে এসে পৌঁছবে, তখন কিন্তু দর্শক এটা টের পেতে বাধ্য যে এই তারিখটা আর যাই হোক, কিছুতেই ‘অক্টোবর ২০১৬’ নয়!

কারণটা কী, সেটা বুঝতে পারছেন তো? খুব পরিষ্কার করে আপনি তো আগেই দেখিয়ে দিয়েছেন যে ওদের গ্রেফতার হওয়ার রাতটা হল ভারতে সেই ডিমনিটাইজেশন ঘোষণা করার রাত। মোদীর ভাষণ-টাসন সব দেখিয়ে এখন কোন আক্কেলে সময়টাকে অক্টোবর বলে ক্লেম করছেন, বলুন? তারিখটা তো আসলে হল ৮ নভেম্বর, ২০১৬, না?

খুব আক্ষেপ লাগে এটা দেখে যে এই রিভিউ লেখার জন্যে যেটুকু হোম ওয়ার্ক করি আমি, একটা গোটা সিনেমা তৈরি করতে গিয়ে তার সিকিভাগ হোম ওয়ার্ক করার সময়ও পান না বোধ হয় আপনারা।

আগস্ট থেকে নভেম্বরের শুরু – সাকুল্যে সাড়ে তিন মাসের গল্প দ্যাখালেন স্ক্রিনে। অথচ এরপরেই শুনতে পেলাম এক টিভি অ্যাংকরকে দিয়ে সিদ্ধার্থের একটা টিভি ইন্টার্ভিউ নেওয়াতে গিয়ে এটা বলাচ্ছেন যে, ‘মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তাঁর নাম সকলের মুখে মুখে’। এখন গোটা গল্পটা যেখানে সাড়ে তিন মাসের গল্প, সেখানে হুট করে ছয় মাসের হিসেবটা এল কী করে, মৈনাক? আর অ্যাংকর যদি এখানে ভুল বলেই থাকে তো সামনে বসে থাকা সিদ্ধার্থ ওকে কারেক্ট করে দিল না কেন, জানতে ইচ্ছে তো করে সেটাও।

ছবির একদম শেষে পচাদাকে দিয়ে এটা বলান হল যে, ‘মানুষ প্রথম কবে হ্যাপি হয়েছিল, জানিস? যেদিন জ্ঞানবৃক্ষের আপেলটাতে প্রথম কামড় বসিয়েছিল, সেদিন’। আমায় ক্ষমা করবেন মৈনাক, আমি কিন্তু একেবারে উলটো কথাই শুনেছি। যেদিন প্রথম ওই জ্ঞানবৃক্ষের ফলে কামড়, সেদিনই স্বর্গ থেকে পতন, সেদিন থেকেই মানুষের আনহ্যাপি হওয়া শুরু। আর সেটাকেই আপনি হ্যাপি হওয়ার শুরু বলে দাগিয়ে দিলেন, দাদা?

তবে এরকম হাজারো ভুলে ভরা ছবিতেও জায়গায় জায়গায় এরকম অনেক সিন রয়েছে, যেগুলো দেখতে মজা লাগছিল বেশ। যেমন ধরুন মিডিয়া অফিসে বসকে তেল মেরে মেরে নিজের জায়গা ক্লিয়ার করার যে মোমেন্টগুলো ছবিতে দেখিয়েছেন আপনি, সেগুলো যাকে বলে একেবারে একঘর সিন যেন!

বা রিনির হবু বর সঞ্জীবকে (অভিনয়ে সৌম্যজিৎ মজুমদার) নিয়ে যে সিনগুলো লেখা হয়েছে, সেগুলোরও জবাব হবে না কোন। যেমন ধরুন রেস্তোরাঁয় বসে ছেলেটির নাক খুঁটে যাওয়ার সিন, কিংবা রিনির বাড়িতে গিয়ে মনের মতো পণের কথা শুনে আহ্লাদে ডগমগ হয়ে ওঠার সিন। এগুলো দেখতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, ছবিটা যত অগোছাল ভাবেই তৈরি হোক না কেন, যে লোক এটা বানিয়েছে, তাঁর জীবনে আর কিছু না হোক, ‘উইট’ বলে ব্যাপার রয়েছে একটা।

এছাড়া এটাও মানতে হবে যে, ছবির আবহটাও জোরদার হয়েছে খুব। মনে হচ্ছিল, ওটা আছে বলেই ছবির গতি এত মসৃণ আর এত দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছি সিনের পরে সিনে।

রিলিজের পরের দিন, মানে শনিবার সিনেমা হল-এ ছবিটা দেখতে গিয়ে অভিনব অভিজ্ঞতা হল এক। সিনেমা দেখতে ক’জন এসেছিল, সেটা নিয়ে আলাদা করে কিছু লিখতে চাই না আমি। শুধু এটুকু লিখি যে, ছবি শুরুর আগে হঠাৎ দেখলাম এক ভদ্রলোক ক্ষেপে গিয়েছেন খুব। ফোনে কাউকে একটা বলতে লাগলেন যে, ‘আরে, একদম ভুল টাইমে রিলিজ হল বইটা। তার ওপর তেমন কোন পাবলিসিটি নেই! মৈনাকের সিনেমা দেখতে এই কটা লোক এসেছে, ভাবতে পারছি না আমি। সোমবার থেকে তো এই বই তুলে দিয়ে অন্য বই লাগাতে হবে দেখছি’। এখানে বলে রাখি যে, এই ভদ্রলোকের পরিচয় কী, কোথা থেকে এসেছেন তিনি, সে সব কিন্তু কিছুই জানি না আমি। শুধু এত চিৎকার করছিলেন যে, কথাগুলো ওঁর একটু দূরে বসেও শুনতে পাচ্ছিলাম বেশ।

এরপর লেখাটা লিখতে গিয়ে প্রযোজনা সংস্থার ফেসবুক পেজ খুলে দেখি যে সেখানে আরেক রগড়। এই সিনেমার শো হাউসফুল যে হয়েই চলেছে, সেটা প্রমাণ করার জন্যে সেখানে কলকাতা তো বটেই, এমন কি হায়দরাবাদের যে মালটিপ্লেক্সে এটা রিলিজ হয়েছে, সেটারও স্ট্যাটাস আপলোড করা!

বাংলা ছবির ভাল হোক। মৈনাকের ছবি হোক সুপার-ডুপার হিট। লেখার শেষে এটুকুই তো শুধু চাওয়া।

1 COMMENT

  1. বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালকরা নিজেদের কৌলীন্য বজায় রাখার জন্য তামিল তেলেগু ছবিও থেকে না টুকে তপন সিনহার ছবি টোকে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here