স্ত্রী পুত্রকে বিক্রি করে নিজেও ক্রীতদাস হয়ে শ্মশানে মৃতদেহ সৎকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন এই পৌরাণিক রাজা

1026

হিন্দু পুরাণে অভিশাপের পরম্পরা নিয়ে লিখলে কর্ণের পরেই আসবে রাজা হরিশচন্দ্রের নাম | তাঁর পিতা সত্যব্রত ত্রিশঙ্কু হয়ে যা কষ্ট ভোগ করেছিলেন‚ পুত্র হরিশ্চন্দ্র তার তুলনায় কণামাত্র কম দুর্ভোগ পোহাননি | ঐতেরেয় ব্রাহ্মণ‚ মার্কণ্ডেয় পুরাণ‚ দেবী ভগবৎ পুরাণ‚ মহাভারতে আছে তাঁর কথা | উৎসবিশেষে ঈষৎ পরিবর্তন হয়েছে হয়তো | কিন্তু সর্বত্রই তিনি নিপীড়িত |

ঐতেরেয় ব্রাহ্মণে আছে রাজা হরিশচন্দ্রের শত মহিষী ছিলেন | কিন্তু কোনও পুত্র ছিলেন না | বরুণদেবের আশীর্বাদে পুত্রলাভ করলেন রাজা | পরিবর্তে হরিশ্চন্দ্রের কাছ থেকে বচন গ্রহণ করলেন বরুণদেব | ভবিষ্যতে একদিন তাঁকে কিছু দান করবেন রাজা হরিশ্চন্দ্র | প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন নৃপতি |

কালক্রমে বড় হতে লাগলেন রাজা হরিশ্চন্দ্রের পুত্র | তাঁর নাম রোহিত বা রোহিতাশ্ব | একদিন বরুণদেব এসে প্রতিশ্রুতিমতো দান যাচনা করলেন | হরিশ্চন্দ্র ভেবেছিলেন হয়তো ধন সম্পদ চাইবেন তিনি | কিন্তু বরুণদেব চাইলেন পুত্র রোহিতকে ! তাঁকে তিনি বলি দেবেন | শ্রবণমাত্র কম্পিত হল পিতৃহৃদয় |

দেবরাজ ইন্দ্রের পরামর্শে রোহিত পলায়ন করলেন অরণ্যে | তাঁকে না পেয়ে দেবরোষে পড়লেন হরিশ্চন্দ্র | বরুণদেবের অভিশাপে রোগগ্রস্ত হয়ে পড়লেন রাজা | সেই সংবাদ পেয়ে অরণ্যচারী রোহিত বিচলিত হয়ে পড়লেন | এমতাবস্থায় তাঁর সাক্ষাৎ হল এক কপর্দকহীন বিপ্রর সঙ্গে | তাঁর নাম অজিগর্তা | তাঁকে বহু স্বর্ণমুদ্রা ও গাভী দিলেন রোহিত | পরিবর্তে তিনি পেলেন বিপ্রর মধ্যম পুত্রকে | রোহিতের পরিবর্তে তিনি রাজি হলেন বলিপ্রদত্ত হতে |

যাই হোক‚ শেষ অবধি বলিদান করেননি বরুণদেব | অজিগর্তার মধ্যম পুত্রকে দত্তক নিলেন বিশ্বামিত্র | বরুণদেবের অভিশাপ অস্তমিত হওয়ায় আরোগ্য লাভ করলেন রাজা হরিশ্চন্দ্র | ফিরে পেলেন ছেলে রোহিতাশ্বকে | এই একই আখ্যান আছে রামায়ণেও | সেখানে রাজার নাম অম্বরীশ |

মার্কণ্ডেয় পুরাণে যে কাহিনী আছে তা বহুল প্রচলিত | সেখানে কথিত নৃপতি হরিশ্চন্দ্র ছিলেন ত্রেতা যুগে | অত্যন্ত সৎ ও মহান এই নৃপতির মহিষী ছিলেন শৈব্যা বা তারামতী | পুত্র রোহিতাশ্ব |

একদিন মৃগয়ারত হরিশ্চন্দ্র নারীকণ্ঠের ক্রন্দন শুনলেন | ভাবলেন কোনও নারী হয়তো বিপদের সম্মুখীন | তিনি শরনিক্ষেপ করলেন | কিন্তু সেই ক্রন্দন ছিল মায়া | বিঘ্নরাজের সৃষ্টি | বিপদ আরও ঘোরতর করতে তিনি প্রবেশ করলেন রাজা হরিশ্চন্দ্রের দেহে | ওই অরণ্যেই তপস্যা করছিলেন ঋষি বিশ্বামিত্র | তাঁর সামনে গিয়ে কটুবাক্য নিক্ষেপ করেন রাজা | তাঁকে দিয়ে ওই দুষ্কর্ম করান বিঘ্নরাজ |

তপস্যা ভঙ্গ হওয়ায় কুপিত বিশ্বামিত্র রাজাকে বললেন‚ রাজসূয় যজ্ঞের যাবতীয় ব্যয় পূরণ করতে হবে তাঁকে | ইতিমধ্যে বিঘ্নরাজের প্রকোপ দূর হয়েছে | সম্বিৎ ফিরে পেয়েছেন হরিশ্চন্দ্র | তিনি বুঝলেন সমূহ বিপদ উপস্থিত |

যজ্ঞের নিমিত্ত সর্বস্ব হরণ করলেন বিশ্বামিত্র | রাজার ধন সম্পদ দাস দাসী লোকলস্কর থেকে শুরু করে পরনের বস্ত্র অবধি | সব ত্যাগ করে শুধু কৌপীন পরে রাজ্য ত্যাগ করলেন রাজা হরিশ্চন্দ্র | সঙ্গে স্ত্রী ও পুত্র | ঐটুকুই মাত্র নিজের কাছে রাখার অনুমতি পেয়েছিলেন রাজা | কিন্তু তখনও জানতেন না সামনে কী অপেক্ষা করে আছে | তাঁরা যাতে দ্রুত রাজ্য ছাড়েন‚ রানি শৈব্যাকে লাঠিপেটা করতে লাগলেন বিশ্বামিত্র |

ভাগ্য বিড়ম্বিত রাজা হরিশ্চন্দ্র পৌঁছলেন কাশী | দেখলেন আগেই উপস্থিত বিশ্বামিত্র | তিনি বললেন তাঁর যজ্ঞের ব্যয় এখনও বাকি | আরও অর্থ প্রয়োজন | হরিশ্চন্দ্র বাধ্য হলেন স্ত্রীকে বিক্রি করতে | শিশুপুত্র মাকে ছেড়ে কী করে থাকবে ? তাই সেও সঙ্গ নিল মায়ের | মহিষীকে বিক্রয় করে যা পেলেন ঋষির হস্তে সমর্পণ করলেন রাজা |

তথাপি ঋষির ক্ষুধা নিবৃত্ত হল না | এ বার হরিশ্চন্দ্র বললেন তিনি ঋষির ক্রীতদাস হতে পারবেন | এই ভিন্ন আর কিছু দেওয়ার নেই | তখন প্রভু বিশ্বামিত্র ক্রীতদাস হরিশ্চন্দ্রকে এক চণ্ডালের কাছে বিক্রয় করে বেশ কিছু স্বর্ণমুদ্রা লাভ করলেন | 

রাজা থেকে ক্রীতদাস হওয়া হরিশ্চন্দ্র চণ্ডালের নির্দেশে নিযুক্ত হলেন শ্মশানে | নিকৃষ্ট কদর্য উপায়ে সম্পন্ন হতো তাঁর ক্ষুন্নিবৃত্তি | একদিন রাতে ঘুম ভেঙে গেল তাঁর | দেখলেন পায়ের কাছে বসে কাঁদছেন স্ত্রী শৈব্যা | তাঁর কোলে মৃত পুত্র | সর্পাঘাতে মারা গিয়েছে সে | দেখে শোকে উন্মদ হয়ে গেলেন রাজা | ভাবলেন আত্মহত্যা করবেন | কিন্তু ঋণ শোধ না করলে তো পরজন্মেও সেই বোঝা বহন করতে হবে |

তাই নিবৃত্ত হলেন সে চিন্তা থেকে | এমনকী স্ত্রীকে বললেন যতক্ষণ না তিনি ঋণমুক্ত হচ্ছেন ততক্ষণ পুত্রের অন্ত্যেষ্টি করবেন না | কারণ তাকেও পরজন্মে পাপের ভাগীদার হতে হবে |

সেই মুহূর্তে স্বর্গ থেকে আবির্ভূত হলেন দেবতারা | উপস্থিত হলেন ঋষি বিশ্বামিত্র | রাজা হরিশ্চন্দ্র জ্ঞাত হলেন এ সবই ছিল তাঁর উপর পরীক্ষা | তাতে তিনি সসম্মানে উত্তীর্ণ | অতএব স্বর্গবাসে আর বাধা নেই | সেই চণ্ডাল যাঁর নিকট ক্রীতদাস হয়ে ছিলেন রাজা‚ তিনি প্রকাশ করলেন নিজ পরিচয় | তিনি ছিলেন ধর্মরাজ | যাই হোক‚ সস্ত্রীক স্বর্গারোহণ করলেন রাজা হরিশ্চন্দ্র | জীবন ফিরে পেল তাঁর পুত্র রোহিতাশ্ব |

রাজা হরিশ্চন্দ্রের কুলগুরু ঋষি বশিষ্ঠ দীর্ঘ দ্বাদশ বৎসর তপস্যারত ছিলেন | তিনি সব জানতে পেরে রুষ্ট হলেন বিশ্বামিত্রর উপরে | দুজনে আরও একবার দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছিলেন | বিরত করলেন ব্রহ্মা | প্রজাপতি ব্রহ্মা বললেন এই অগ্নিপরীক্ষায় রাজা হরিশ্চন্দ্রের কোনও ক্ষতি হয়নি | বরং তিনি স্বর্গারোহণ করতে পেরেছেন | 

স্বর্গের মাহাত্ম্য মহিমান্বিত করতে এভাবেই ইহজীবনকে তুচ্ছ করে দেখানো হতো হিন্দু পুরাণে | এই উদাহরণ আছে অন্যত্রও | তবে সেই ধারায় সর্বোৎকৃষ্ট যে রাজা হরিশ্চন্দ্রের জীবনকাহিনী তাতে সন্দেহ নেই |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.