শরৎচন্দ্রের ‘মেজদা’ কি ফিরে এলেন প্রধানমন্ত্রীর ছদ্মবেশে!

ঘড়ি দেখে সময় মিলিয়ে একটি খাতায় তিনি সব ‘টিকিট’ গদ দিয়ে আটকে রাখতেন | সপ্তাহ পরে এই সব টিকিটের সময় ধরে কৈফিয়ৎ তলব করা হত | তাঁর ‘অত্যন্ত সতর্কতায় এবং সুশৃঙ্খলায়’ কারও সময় নষ্ট হওয়ার জো ছিল না |

কাজের ভারে ক্লান্ত, ঘুমের অভাবে রক্তচক্ষু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিদের দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক, ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের সেই কঠোর নিয়মানুবর্তী ‘মেজদা’ কি ফিরে এলেন নতুন প্রধানমন্ত্রীর ছদ্মবেশে !

মন্ত্রিসভায় তাঁর সতীর্থদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কঠোর নির্দেশ, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হবে | যেমনটা নাকি তিনি নিজে করছেন | রাজনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, এর ফলে সরকারের প্রশাসনিক তৎপরতা এবং দক্ষতা বাড়লেও ৪৪ জন সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিসভার শরীর স্বাস্থ্য কতদিন সতেজ থাকবে, তা নিয়ে কিন্তু সন্দেহ শুরু হয়েছে | শুধুমাত্র মন্ত্রীরাই নন | শাস্ত্রীভবন থেকে নির্মাণভবন — সরকারি কর্মচারীদেরও নাওয়া খাওয়ার সময়ে টান পড়ছে | দুপুরের দীর্ঘ মধ্যাহ্নভোজের সময়েও কাঁট ছাঁট করতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে |

নতুন চাকরির বয়স হয়েছে হপ্তা তিনেক | এরই মধ্যে মন্ত্রীরা অশোক রোডের বিজেপি পার্টি অফিসের বন্ধুবান্ধবদের কাছে বলতে শুরু করেছেন এমন মাস্টারমশাই তাঁরা আগে কখনও দেখেননি | কাজের চাপে এবং ঘুমের অভাবে, অনেকেরই ত্রাহি মধুসূদন দশা | ‘বডি ক্লক’-এরও দফা রফা |

মুম্বইকার নীতিন গডকড়ির কথাই যদি ধরা যায় | অতীতে ভোরবেলা বা সকালের কোনও অনুষ্ঠান বা সম্মেলনে তাঁকে দেখা গিয়েছে, এমন ঘটনা খুবই বিরল | বিজেপি-র জাতীয় সভাপতি থাকাকালীন গডকড়ি সমস্ত বড় সিদ্ধান্তই নিতেন নৈশভোজের সময় | মধ্যরাত পর্যন্ত চলত তাঁর কাজকর্ম, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বৈঠক | সড়ক পরিবহণ এবং জাহাজ মন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর এতদিনের অভ্যাসে বদল ঘটাতে হয়েছে | তিনি নাকি শুতে যাচ্ছেন খুব জলদি | যাতে ভোরে উঠেই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ফোনটা ধরতে পারেন | তাঁর উপর চাপ আরও বেশি কারণ গোপীনাথ মুণ্ডের মৃত্যুর পর নীতিনকেই গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের বাড়তি দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে | তাঁর মতো অনেকেই নাকি তাকিয়ে রয়েছেন, মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের দিকে |

একই দশা ৬৭ বছর বয়স্ক রামবিলাস পাসোয়ানের | লোক জনশক্তি পার্টির এই নেতাকে কখনও কোনও প্রাতঃকালীন সাংবাদিক বৈঠকে হাজির থাকতে কেউ দেখেনি | সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডায় বসেছিলেন পাসোয়ান | তাঁর চোখ দুটি রক্তজবার মতো লাল দেখে এক সাংবাদিক কারণ জানতে চান | পাসোয়ান বলেন যে দিল্লির এই ভয়ঙ্কর উত্তাপেই নাকি চোখ লাল হয়েছে | পরে অবশ্য রহস্য ফাঁস দেন তাঁরই এক সহকর্মী ! জানান, ”উনি তো দুপুর থেকে তাঁর কাজ শুরু করতেন সবসময় | এখন প্রধানমন্ত্রীর ঘুমের সময়ের সঙ্গে নিজের সময় মেলাতে গিয়ে একটু কষ্ট পেতে হচ্ছে পাসোয়ানজীকে |”

তবে সব মন্ত্রীরই যে এই অবস্থা তা নয় | ঘড়ি এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁরা সকাল সাড়ে নটাতেই পৌঁছে যাচ্ছেন অফিসে | সেক্ষেত্রে দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না অফিসারেরা | নগরোন্নয়ন মন্ত্রী বেঙ্কাইয়া নাইডু যেমন খুব সকালে পৌঁছে যাচ্ছেন অফিসে | একদিন তো পৌঁছেছেন সকাল নটায় | মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিও তাই | রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, ইনিংসের শুরুতেই তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিতর্কের সামনে চলে আসায় নিজেকে প্রমাণ করার একটা বাড়তি দায়ও রয়েছে ইরানির |

সরকারি আমলাদের একটা অংশ মনে করছে নিয়মানুবর্তিতার এই চাপ শেষ দেখা গিয়েছে ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় | বিজেপি-র কিছু নেতা আবার মোদীর মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন ‘বিকাশপুরুষ’ বাজপেয়ীকে | এক নেতা কিছুটা স্মৃতিকাতরভাবে জানাচ্ছেন, ”বাজপেয়ীও খুব সকালেই তাঁর কাজ শুরু করতেন | প্রত্যেককে খুবই উৎসাহ এবং প্রেরণা দিতেন তিনি |”

তবে আপাতত যাঁরা এখনও প্রেরণা পাচ্ছেন না, তাঁরা দিনের বেলায় ঘুমে ঢুলছেন অফিসে বসে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here