চৈত্রের চরিত্র সেল

1658

ওরা রাসবিহারীর থেকে গড়িয়াহাট মোড়ের দিকে হাঁটছে বাঁ দিকের ফুটপাথ ধরে।

অর্ক বলল, ‘ভাই, ভরা চৈত্রে চড়কসন্ন্যাসীদের থেকেও বুরা হাল হাজব্যান্ডদের।’

বিল্টু গলাখাকরি দিয়ে বলল, ‘নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো, আছোলা বাঁশেএফোঁড় ওফোঁড়।গোটা বিষয়টা এক!’

বিল্টু গম্ভীর কায়দায় বলল, ‘তাছাড়া দেখেছি গড়িয়াহাটে, হাতিবাগানে, শিয়ালদায়, সোদপুরে এই সেলের বাজারে সুন্দরীবৌদিদের পেছন পেছন এক ধরনের নিরীহ প্রাণী ঘুরে বেড়ায়!’

কার্তিক কতকটা বিমর্ষ, তবু বলল, ‘বল বল। তুই বরাবর ক্রিয়েটিভ।’

বিল্টু বলল, ‘অধিকাংশ সময়ে ওই প্রাণীদের মুখ দেখা যায় না। হঠাৎ দেখলে মনে হয় পলিথিন-মানুষ। দুই হাতে ছোট বড় পলিথিন প্যাকের পাহাড়। দুই কাঁধে বিগ শপার। এক পিস ব্যাগ হয়তো গলা হয়ে বুকের উপরবাচ্চাদের ওয়াটার বোতল স্টাইলে ঝুলছে। এমনকী ফুটপাথ থেকে কেনা মালটা, যা পাতি খবরের কাগজে মোড়া। তেমন দু’পিস বগলদাবা।মালটার হিসু পাওয়ার পারমিশন পর্যন্ত নেই!’

বুককা বলল, যাই বলিস, কার্তিকের দুঃখ দূর করতেই হবে। সবাই মিলে একটা জম্পেস বৌদি বাছ দেখি।’

খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল সবাই।

##

এই ফিচেলদের কথায় পাত্তা দেবার প্রশ্ন নেই। এরা এরকমই, টোটাল স্বার্থপর! এরা নিজের এলাকাতেই হোক কিংবা গড়িয়াহাটা হাতিবাগানের স্বনামধন্য সেল মার্কেটে। ফালতু টহল দেবে আর দাদা বৌদিদের পেছনে লাগবে।আসলে ইয়ে করেছে কিন্তু বিয়ে করেনি কিনা! করলে বুঝত, কত ধানে কত চাল! কেন গড়িয়াহাট থেকে কুর্তিটা কেনা যাবে কিন্তু ওর সঙ্গে রংমেলান্তি লেগিনসটা কিনতে হলে যেতে হবে হাতিবাগানে। তাছাড়া ধরুন, জুতোর ভালো অফার চলছে নিউ মার্কেটে। তবে মোজার জন্য এলাকার স্টেশন বাজারই যাকে বলে দ্য বেস্ট। দাদা যতোই একবারে ‘ঝঞ্ঝাট’ মিটিয়ে ফেলতে চান। বৌদির যুক্তি অকাট্য—স্থানীয় যুবক দোকানি চেনা। বৌদিকে বেশ ইয়ে করে সে ছেলে। আড়াই কি পৌনে তিনবার হেসে বৌদি যেই বলবেন–অমন করে না ভাই! দাও না! প্লি-ই-জ! দোকানি অমনি জলে গল।ছড়ছড়িয়ে ছাড় দেবে।মাগনা কোল্ডড্রিংকও খাওয়াতে পারে!

সত্যি এসব বৌদিরাই বোঝে, দাদারা মানিব্যাগ কাম কুলি বই অন্য কিছু তো না! সবই মায়া! মায়া থেকেই প্রেম, ভালোবেসে এবং চৈত্র সেলের নিঃশর্ত স্পনসর হয়ে ওঠা। ফলে হাতিবাগানে গিয়ে হয়তো দেখলেন, এক দাদা দু’হাতে দুটো কেনাকাটা বোঝাই ব্যাগ ঝুলিয়ে হুড়মুড়িয়ে হাঁটছেন। পাবলিকের পাইকারি কনুই খেয়েও নিরস্ত হচ্ছেন না। কারণ আগে আগে হাঁটা বৌদির ভঙ্গি বলছে, ‘ফলো মি’। বৌদি ডজন খানেক পা মাড়িয়ে এবং নিজেও দু’ একপিস চাপ খেয়ে খুঁজছে সেই দোকান, গতবার যেখান থেকে একজোড়া ব্রা-র মতো ব্রা কিনেছিলেন।কিন্তু ওই দোকানই কেন? কারণ চৈত্র সেলের বাজারেও জিনিস ছিল এ ওয়ান।দামে ‘ফুটপাথ’,কোয়ালিটিতে ‘ব্র্যান্ডেড’। দাদা পিছন পিছন ছুটতে ছুটতে চেঁচাচ্ছেন, ওই ছেলে কি এবার বসেছে! নয়না, সেলের দোকান। টেম্পোরারি। কিন্তু বৌদি ছুটছে টগবগিয়ে। দাদা যখন রণেভঙ্গ দিয়ে নিজের ইষৎ স্থূলাঙ্গী বউ-এর উসেইন বোল্ট হওয়া নিয়ে গর্বিত হবেন না লজ্জিত হবেন ভাবছেন, তখনই বৌদি ক্যা-অ্যা-চ করে ব্রেক কষলেন। ততক্ষণে শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ-ভিজে একসা।কিন্তু দাদা অবলোকন করলেন বৌদির মুখে যুদ্ধজয়ের হাসি। স্বাভাবিক। ওই তো সেই ব্রা-ওলা ছোকরা…!

তবে সেলের মার্কেট আগের মতো নেই। নয়ের দশকের আর ২০১৮-র সালের সেলের বাজারের মধ্যে গান্ধী-হিটলার তফাৎ। আগে ছিল ঘুরেফিরে সেই গড়িয়াহাট, সেই হাতিবাগান, সেই নিউ মার্কেট। সঙ্গে যে যার এলাকার স্থানীয় মার্কেটটাও টার্গেট করত। মাসখানেকের জন্য বড় দোকানগুলোর সামনের ফুটপাথ ভরে যেত খুচরো দোকানে। শাড়ি-ব্লাউজ-সালোয়ার-ব্রা-প্যান্টি, ছোটদের জামা-প্যান্ট-ফ্রক, ছেলেদের গেঞ্জি-জামা-প্যান্ট-পাজামা-পাঞ্জাবি-জাঙিয়া এবং রুমাল-বালিশের ওয়ার-বিছানার চাদর ইত্যাদি। সংসারের হাজারটা প্রয়োজনের জিনিস। সত্যি কম দামে মিলত। হাফ দামে তো বটেই। অনেক ক্ষেত্রে হাফেরও হাফ। কিন্তু এত কম দামে দিব্য জিনিস বেচত কী করে ওইসব সিজন ব্যবসায়ীরা? অনেকে বলত, ডকের চোরাই মাল। কারও কারও মতে, বচ্ছরভর বিক্রি না হওয়া বড় বস্ত্রালয়ের বাতিল জিনিস। ‘মরা সাহেব’ও হতে পারে।তাই বড়রা পই পই করে শেখাত, উলটেপালটে কিনিস। না হলেই ঠকবি। হতও তাই। দুটো কিনলে একটাতে সিগারেটের ছ্যাকার থেকে খানিক ছোট সাইজের ফুটো পাওয়া যেতই। যাকে বলে সস্তার তিন অবস্থা। কিন্তু সেদিন এদিন না।

তখন মানুষের হাতে হাতে আট দশ হাজারি টাচস্ক্রিন সেলফোন নেই। ছেলে হোক কি মেয়ে সাজগোজ নিয়ে বাড়াবাড়ি করত না। গরিব বাপের পয়সা বিউটিপার্লারে বিলিয়ে চুল কার্ল করে, স্ট্রেট করে দিনে একশো আশিটা সেলফি তোলার বায়না করত না বিবেক। সোশাল সাইটও ছিল না।ফলে বিকট, বিদঘুটে ভঙ্গিতে তোলা সেইসব ছবি আপলোড করার দায়ও ছিল না কারও। আসল কথা হল গড়পরতা বাঙালি ছিল দামোদর শেঠের বিপরীত, অল্পতেই খুশ। ফলে নতুন বছরের প্রথম দিন, মানে ১লা বৈশাখে একটা নতুন জামা পেলেই আনন্দ ধারা বহিছে ভূবনে!কিন্তু যুগ বদলেছে।

বুড়ো মানুষেও ফতুয়া রিজেক্ট করে গায়ে গলিয়েছে টি-শার্ট। তাছাড়া বিশ্বায়নের যুগ, ওপেন মার্কেট। বাড়ির বাইরে পা দিলেই শপিং মল। শহর ও শহরতলির দখল নিয়ে নিয়েছে দেশবিদেশের বহুজাতিক সংস্থার বাহারি শো-রুম। যেখানে শরীর সেঁধালেই চিড়বিড়ানো গরম থেকে মুক্তি। ফাউ মেলে সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল অ্যাহেসাস! গরিবেরও দুম করে নিজেকে বড় লোক মনে হয়! ঢোকার সময় সিকিউরিটি গার্ড বলে, গুড ইভনিং স্যার। স্টোর বয়, গার্লরা স্যার ম্যাডাম ছাড়া কথাই বলে না। কার না ভালো লাগে পাত্তা পেতে! যতোই ট্যাগ লাগানো ফিক্সড রেট হোক। হয়তো ঘুরিয়ে ঠকছি। কিন্তু অত সব মাথায়ই আসে না! ফলে চৈত্র সেলের অর্ধেক বাজার এখন এইসব মাস্তান কোম্পানিদের দখলে।

সবচেয়ে বড় কথা, সেলের বিষয়টাই আমূল বদলে দিয়েছে এরা। সারা বছর চলছে অফারের পর অফার। প্রায় প্রতি মাসে দৈনিক সংবাদপত্রে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন জানান দেয়—কোন জিনিসটা ৩০% অফ,কোনটা ৪৫%। এক সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী যুগলে দুটি সেলফোন কিনলে অন দ্য স্পট ৫০% অফ। কিন্তু পুনশ্চ—শর্ত প্রযোজ্য!

মানতেই হবে ক্রেতা-বিক্রেতার এই নব আর্থসমাজতত্ত্বে সাবেকি সেলকে হারিয়ে দিয়েছে শপিংমলওলারা।এই চৈত্রমাসেও শহরের কমবয়সি দাদাবৌদিদের নিওশপিং চাক্ষুষ করতে হলে তাই আপনাকে উপস্থিত হতে হবে অভিজাত বিপণীতে।বৌদিরা ঘুরে ঘুরে দেখছে বাহারি টপ বা আপার, স্কার্ট, পালাজো, জাম্পশুট, পাতিয়ালা, ধোতিপ্যান্ট ইত্যাদি।দেখছে কোনটায় কতখানি অফ, বাই ওয়ান গেট ওয়ান না বাই টু গেট ২০০লেস।আর ঠ্যালা ঠেলছে দাদা।ঠেলা মানে শপিংট্রলি।দাদাদেরই দায়িত্বে বাচ্চা।বেশি ছোট হলে গলায় ঝুলছে, একটু বড় হলে বাবার একহাত ধরে আছে সে।ছোট বাচ্চা।চুপ মেরে নেই।হয় হাজার হাজার প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে বাপকে, নতুবা কেঁদে ভাসাচ্ছে সে।সেই অবিরত অশ্রুজলে বাবাটির ভেসে যাওয়ার জোগাড়!এখানেই পাবেন সদ্য প্রেমে পড়া পুরুষটিকে।সঙ্গে প্রেমিকা।প্রেমিকটি কাঠবেকার হলেও তেল খরচা করে বাইক চড়িয়ে প্রেমিকাকে নিয়ে এসেছে শপিং স্টোরে।পকেটের যা অবস্থা তাতে একটির বেশি দুটি গারমেন্ট কিনে দেওয়ার ক্ষমতা নেই।ফলে সে সতর্ক, চুপ মেরে আছে।সুন্দরী মেয়ে যখন হরেক কিসমের জামার সামনে একেকবার দাঁড়িয়ে পড়ে কোনও এক পোশাককে ইঙ্গিত করে বলছে,সুইট কালার না? ছেলে লাজুক হেসে বলছে, নে না, ইউ ক্যান…।কিন্তু মেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।একবার হয়তো গয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।নির্দিষ্ট গয়নাটিকে দেখিয়ে বলল, অ্যাই, জানিস নেক্সট মান্থে আমার কাজিনের বিয়ে।নদী, পিসির মেয়ে।ওর বিয়েতে ভাবছি শাড়ি পড়ব।সঙ্গে ট্রাডিশনাল গয়না লাইক দিস।শুনে প্রেমিকটি নিঃশব্দ হাসছে।প্রেমিকের মুখের দিকে তাকিয়ে কী বুঝে সদ্য তরুণী খিলখিল করে হেসে উঠল!অস্বস্তি বোধ করল ছেলে।সে ডানহাতের কবজির সদ্য করানো ট্যাটুর দিকে একবার তাকিয়ে মুখ তুলে বলল, হোয়াট হ্যাপেন্ড ইয়ার!মেয়ে উত্তর দিল না।হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল সেই সেখানে, যেখানে থরেথরে সাজানো হটপ্যান্ট।সঙ্গে ঝোলানো ট্যাগ—বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি।দু’জনের পছন্দে নিয়ে নিল একজোড়া।মলের বাইরে বেরিয়ে প্রেমিকা হাগ করল প্রেমিককে।জড়িয়ে ধরা অবস্থায় কানে কানে বলল, আজ রাতে যখন আই উইল কলই উ,রেড ওয়ানটা পরব।বুঝেছিস গাধা।কাঁধে মাথা রেখে বলল, লাভ ইউ ঋষভ।

কিন্তু ঋষভ আর ওর প্রেমিকার মতো শপিং মলে এতটা সময় ব্যয় করতে পারেনা যারা? স্বামীস্ত্রীদু’জনেই হয়তো চাকরি করে!এমনকী আজকের যা চাকরির বাজার তাতে করে অফডে-টাও সব সময় কমন হয়না।একজনের রবিবার ছুটি, আরেকজনের হয়তো বৃহস্পতিবার।বছর পনেরো আগে হলে এদের পক্ষে চৈত্রসেল অ্যাটেন্ড করা সম্ভব হত না।তাতে দাদাটি হয়তো ‘বেঁচে’ যেত।কিন্তু সেটি হচ্ছে না।কারণ অনলাইন শপিং আছে।

সেলের বাজারে অনলাইনের মতো সস্তা কোথাও পাওয়া যায় না।অতএব রান্না করতে করতে, বাড়ি-অফিস যাতায়াতের পথে, অফিসের টিফিন আওয়ারে কিংবা যখন কাজ তুলনায় হালকা এবং রাতে ডিনারের পর বৌদি খুলে বসছে এক সে একঅনলাইন শপিং সাইট।প্রথমে নিজে অ্যাড টু কার্ট করছে।তারপর ‘অসহায়’ দাদাটিকে সঙ্গে নিয়ে চলছে অর্ডার ফাইনাল করা।ক্যাশ অন ডেলিভারি, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অথবা নেটব্যাঙ্কিং।দাদা হয়তো বলছে এই রঙের পাতিয়ালা তো তোমার আছে!দু’মাস আগেই কিনেছ!বৌদিরবক্তব্য, ইএনটি দেখাও।ওটা ছিল ডার্ক ব্ল্যাক, এটা গ্রেইশ ব্ল্যাক।দাদা বলল, এটা কোনও তফাৎ হল? বৌদি এবার গর্জে উঠল, হল।তুমি বোঝ না।তোমরা বুঝবে না এসব।

ঘটনা ভুল না।মূলত মহিলাদের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে যাবতীয় সাজসজ্জার ব্যবসা।তারা বুঝুক আর না বুঝুক।ভেবে দেখুন, ছেলেদের তো সেই জামা-প্যান্ট, পাঞ্জাবি-পাজামা,স্যুট ব্লেজার।তার আর পর নেই।সেখানে মেয়েদের এক সালোয়ারেরই একশো রকমের কাটিং আছে, আছে তাদের আলাদা আলাদা নাম।ফুটপাথ থেকে শপিং মল, শপিং মল টু অনলাইন—ব্যবসা চলছে ওমেন গার্মেন্টসের ওপর।শহরের রাস্তায় সদ্য তরুণী থেকে মাঝবয়সি যে মহিলারা প্রতিদিন হেঁটেচলে বেড়ায় প্রত্যেকের পোশাকের ধরণ তাই আলাদা।এর উপর গয়না, তার উপর চুল বাঁধার নতুন নতুন নকশা, এবং নেলপলিশ-ক্রিম-আইলাইনার ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।অর্থাৎ এর মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই যে বৌদিরাই ক্রেতা।দাদারা মোড়ের মাথার এটিএম মেশিন, বৌদিরা এটিএম কার্ড উইথ পাশওয়ার্ড।এক্ষেত্রে কিন্তু গত শতাব্দীর নয়ের দশক আর আজকের মধ্যে তিলমাত্র ফারাক নেই।অতএব অবিবাহিত ফিচেলরা দাদা-বৌদিদের নিয়ে ফাজলামি করবে না কেন?

##

ওড়া এখনও হাঁটছে আর ভুলভাল বকেই চলেছে।

বিড়ি টানতে টানতে বুককা বলল, ‘কার্তিকের জন্য আজকে একটা শাঁসালো বৌদি খুঁজতেই হবে কিন্তু।’

বিল্টু বলল, ‘নোংরা কথা বলছিস ভাই। কী রে কার্তিক তোর তো পায়েল আছে। তারপরও বৌদি কেন? তুই শালা এতখানি চরিত্রহীন ছিলিস না তো!’

বিল্টুর কথা শুনে কার্তিক ছাপার অযোগ্য একটা খিস্তি দিল।

বুককা বোঝালো, ‘পায়েলই তো। লাস্ট খবর অনুয়ায়ী বিয়ে করে বৌদি হয়ে গেছে।কার্তিককে একবার শেষ দেখা দেখাতে নিয়ে এসেছি।রবিবার, যদি নতুন হাজব্যান্ড সঙ্গে শপিং-এ আসে!’

বিল্টু বলল, ‘এই জন্য বলি, প্রেম করবি নিজের পাড়ায়। থাকিস বরানগর ইয়ে করলি যাদবপুরের মেয়ের সঙ্গে। চোখে চোখে থাকলে বিয়েটা আটকাতে পারতিস।’

বিল্টু উত্তেজিত গলায় বলল, ‘ভাই কার্তিক, ওই দেখ পায়েল!’

কার্তিক তাকাল না। মাথা নিচু অবস্থায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘আর চাটিস না ভাই। এবার কি তোদের পা ধরে মাফ চাইব।’

বিল্টু কার্তিকের ঘেটি ধরে নাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ওরে ছাগল, শালা তাকিয়ে দেখ।’

কার্তিক এবার তাকাল। দেখল জিন্স-টপ পরা পায়েল। ফুচকা খাচ্ছে।

কার্তিক নিমেষে চৈত্র সেলের ভিড়, গাড়িঘোড়ার খিচুড়ি জ্যাম টপকে চলে গেল রাস্তার ওপারে।

পায়েলের আশপাশে কোনও পুরুষ পাহারাদার নেই দেখে বলল, ‘তুমি কি বৌদি হয়ে গেছ?’

পায়েল ঘুরে তাকাল। মুখে ফুচকা, চোখ বড় বড়। বলল, ‘মানে?’

‘বিয়েটা কি হয়ে গেছে?’

পায়েল মুখের ফুচকা গিলে, শালপাতা মাটিতে ছুড়ে ফেলে এটো হাতেই পেটাতে শুরু করল কার্তিককে। চড়ের পর চড়। মুখে বলতে লাগল, ‘ভিতু একটা। আমি যেই বললাম বিয়ে পাকা হয়ে গেছে আর যোগাযোগ করবে না। অমনি সত্যি সত্যি ফোন করা বন্ধ করে দিল! উল্লুক, গাধা! আমি ফোন করলে ফোন কেটে দেয় আবার! এত বড় সাহস!’ লাথি ঘুষি চড় চালিয়ে যাচ্ছে পায়েল। পায়েল আর কার্তিককে ঘিরে গোল করে একদল দর্শক দাঁড়িয়ে গেছে।সেই ভিড়ে বিল্টু আর বুককাও আছে।সক্কলে অপূর্ব প্রেমের দৃশ্য উপভোগ করছে।

কার্তিক ভালোবাসার মার খেতে খেতে বলছে, ‘আমি বিরক্ত করতে চাইনি। ভেবেছি তোমার ক্ষতি করব না। তাতে যদি আমি তোমাকে হারাই তাও ভালো। আমি একটা গুড ফর নাথিং। কবিতা লিখি আর টিউশন পড়াই…’

Advertisements
Previous articleপ্রেমের ফাঁদ পাতা অফিসে
Next articleগলিতে অন্ধকার
কিশোর ঘোষ
জন্ম ১ জুন, ১৯৭৮। প্রথম পরিচয় কবিতায়। ২০০৯ সালে প্রকাশিত কিশোরের কাব্যগ্রন্থ 'উটপালকের ডায়েরি'। পাঠকের পছন্দ হওয়ায় এই বইয়ের তিনটি এডিশন হয়। বইটি পুরস্কৃত হয়, এই বইয়ের কবিতা অনুবাদ হয়। আরও নানা কাণ্ড। অন্য কবিতার বইয়ের নাম 'সাবমেরিন'। এইসঙ্গে গল্প এবং নানা স্বাদের গদ্য লেখক হিসেবেও হালে পাঠকমহলে কতকটা পরিচিত। বাংলা সিনেমার জন্য গানও লিখে থাকেন মাঝেমধ্যে। কর্মসূত্রে একটি দৈনিক সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত।

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.