জীবনকে বাজি ধরতে দ্বিধা হয়নি দুই কিশোরীর…তাঁদের অবদান ভুলে যেতে আমরাও দ্বিধাহীন

এখন মেয়েদের চোদ্দ বছর বয়স মানে সেলফি-জাঙ্ক ফুড-কেরিয়ারের ইঁদুরদৌড় | তখন চোদ্দ বছর বয়্স ছিল অন্য বাড়িতে গিয়ে নিজের সংসার শুরু করে মা হয়ে যাওয়া | বা‚ খোলা হাওয়ার পরিবার হলে বড়জোর‚ বিনুনি দুলিয়ে যথাসম্ভব অবগুণ্ঠন বজায় রেখে স্কুলে পড়তে যাওয়া | কিন্তু তাদের দুজনের কাছে ওই বয়সটা ছিল অত্যাচারী ব্রিটিশ সাহেবকে হত্যা করে কারাদণ্ড সহ্য করা |

একজনের জন্ম শতবর্ষ চলে গেছে দু বছর আগেই | অন্যজনের ছিল গত বছর | কেউ মনে রাখিনি | অগ্নিযুগের দুই স্ফুলিঙ্গের কথা বিস্মরণেই গর্ববোধ করে আধুনিক সমাজ | তাঁরা গর্ববোধ করতেন দেশের সেবায় নিবেদিত হতে পেরে | দুই বান্ধবী‚ শান্তি আর সুনীতি | কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা স্কুল তো শুধু স্কুল ছিল না | দুই কিশোরীর কাছে ছিল উন্মেষের আঁতুড়ঘর | 

সুনীতির জন্ম ১৯১৭-র ২৩ মে‚ অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লায় | শান্তির জন্ম কলকাতায়‚ ১৯১৬-র ২২ নভেম্বর | বাবার কর্মসূত্রে থাকতেন কুমিল্লায় | অঙ্কে চৌখস সুনীতি | জটিল সূত্র দিয়ে আঁক কষার মাঝেই স্বপ্ন দেখা এই কিশোরীর | একদিন তার জন্মভূমির পরাধীনতার শৃঙ্খল ঘুচবে | সেই যুদ্ধে যদি বিন্দুমাত্র অবদান থাকত তার … এই ভাবনায় বুঁদ অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার ( আজ বাংলাদেশের মধ্যে)ইব্রাহিম পুরের মেয়েটি |

একই স্বপ্ন দেখতেন শান্তি ঘোষও | অবশেষে এক মাহেন্দ্রক্ষণে দুজনের সাক্ষাৎ | একই ক্লাসে সহপাঠিনী | স্কুলে আর এক বান্ধবী প্রফুল্লনলিনী ব্রহ্মর কাছে শান্তি-সুনীতি শুনলেন এমন এক জগতের কথা‚ যেখানে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছে দুজনেরই ছিল | কিন্তু এতদিন যাওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না | প্রফুল্ল তাঁদের বললেন চাইলে তাঁরাও শরিক হতেই পারেন স্বাধীনতা সংগ্রামে | বিপ্লবীদের গুপ্ত জগতের দরজা চিনিয়ে দিলেন প্রফুল্ল | যুগান্তর গোষ্ঠীর সদস্য হলেন শান্তি‚ সুনীতি দুজনেই | তাঁদের দীক্ষিত করলেন বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত |

লাঠি-ছোরা-তরোয়াল‚ তিন রকমের প্রতিরোধ দ্রুত দক্ষতার সঙ্গে আয়ত্ত করলেন দুই বান্ধবী | ত্রিপুরা জেলা ছাত্রী সঙ্ঘের প্রধান হলেন সুনীতি | প্রশিক্ষণ দিতেন নবাগতাদের | আড়ালে আর একটা জিনিদের প্রশিক্ষণ চলত শান্তি-সুনীতির | সেটা অত্যন্ত গোপনে | দুজনে চাঁদমারি বিদ্ধ করতেন আগ্নেয়াস্ত্রর বুলেটে |

অবশেষে এল বহু প্রতীক্ষিত দিন | ১৯৩১-এর ১৪ ডিসেম্বর | 

শেষ অগ্রহায়ণের ঠান্ডায় জমে গেছে কুমিল্লা | ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস জিওফ্রে বাকল্যান্ড স্টিভেন্স ছিলেন নিজের অফিসে | আর্দালি এসে খবর দিল দুটি কিশোরী দেখা করতে এসেছে | সাহেবের কাছে আর্জি স্কুলে একটি সুইমিং পুল আর সাঁতার প্রতিযোগিতার |  সাক্ষাতের সম্মতি দিলেন সাহেব |

শাড়ির উপর শাল জড়ানো দুই কিশোরী সামনে এল | এগিয়ে দিল আবেদনের কাগজপত্র | মন দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আবেদন পড়ছেন স্টিভেন্স সাহেব | দুই কিশোরীর একবার চোখাচোখি | শালের ভিতর একবার ঢুকেই বেরিয়ে এল রোগা সোগা দুটি হাত | ধরা আছে সেই জিনিস যা দিয়ে গোপনে কতবার চাঁদমারি ধরাশায়ী করেছে দুজনে | এ বার সামনে আসল চাঁদমারি | 

এক বুলেটেই লুটিয়ে পড়লেন দোর্দন্ডপ্রতাপ সাহেব | দুই বান্ধবী উল্লাস তখন দেখে কে !

ধরা পড়ার পরে দুজনকে বেধড়ক মারা হয় | ফাঁসিই বরাদ্দ ছিল | কিন্তু বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপে‚ তাদের বয়স বিবেচনা করে এবং মহিলা বলে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয় | জেলে দুজনকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল | শত অত্যাচারও তাঁদের গলার গান‚ মুখের হাসি কেড়ে নিতে পারেনি | এমনকী‚ ফাঁসি না হওয়ায় মুষড়েও পড়েছিলেন দুজনে |

১৯৩৭ সালে মুক্তি পান শান্তি-সুনীতি | মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই | ততদিনে তছনছ হয়ে গেছে দুজনের ব্যক্তিগত জীবন | বন্ধ হয়ে গেছে সুনীতির বাবার পেনশন | দুই ভাইকে বিনা বিচারে আটক | পরে এক ভাই মারা যান অপুষ্টিতে | নিদারুণ অভাবে ধুঁকছে তাঁর পরিবার | এই অবস্থায় সাত বছর জেল থেকে মুক্তি পান সুনীতি | জেল থেকে বেরিয়ে ফের পড়াশোনা শুরু করেন তিনি | পরবর্তী জীবনে ডাক্তার হয়েছিলেন | ১৯৪৭‚ যে বছর দেশ স্বাধীনতা লাভ করে‚ সুনীতি বিয়ে করেছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা প্রদ্যোৎ কুমার ঘোষকে | 

আর শান্তি ঘোষ ? তাঁর কী হয়েছিল ? জেলমুক্তির পরেও তিনি বজায় রেখেছিলেন রাজনৈতিক-জীবন | Bengal Legislative Council  এবং Legislative Assembly-র সদস্য ছিলেন ১৯৫২ থেকে ১৯৬৮ অবধি | ততদিনে শান্তি ঘরনি | বিয়ে করেছিলেন চট্টগ্রামের প্রাক্তন বিপ্লবী চিত্তরঞ্জন দাসকে | তাঁর আত্মজীবনী ‘অরুণবহ্নি’ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা | 

দেশের জন্য মাত্র ১৪ বছর বয়সে জীবনকে বাজি ধরতে দ্বিধা হয়নি দুই কিশোরীর | আমরাও দ্বিধাহীন | তাঁদের অবদান বিস্মৃত হতে | 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here