গ্রামের মোদকের কাছে অপমানিত বালক বড় হয়ে সত্যি একদিন ইংল্যান্ডের রাজার পাশে বসে নৈশভোজ সারলেন

দলগত খেলায় সঙ্ঘবদ্ধ লড়াই ছয়াছবির বিষয় হয়ে নতুন মাত্রা এনে দেয় | সেই ধারা অনুসরণ করেই এ বছর স্বাধীনতা দিবসে মুক্তি পেয়েছে ‘ গোল্ড ‘ | আমির খান‚ শাহরুখ খানের পর এ বার অক্ষয় কুমারও ক্রীড়াকেন্দ্রিক ছবির নায়ক | এবং চক দে ইন্ডিয়ার মতো এই ছবিও হকি নিয়ে | তবে দুটোর প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা |

তখন মাত্র এক বছর হল স্বাধীন হয়েছে খণ্ডিত ভারতবর্ষ | সেই রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেশ থেকে একটা দল গিয়েছিল অলিম্পিকে | ইংল্যান্ডের মাটিতে ব্রিটিশদের হারিয়ে স্বর্ণপদক জিতেছিল হকিতে | এর আগেও ভারত হকিতে স্বর্ণপদক পেয়েছিল | কিন্তু সে ছিল ব্রিটিশ ভারত | যতবার ভারত জিতেছিল‚ বেজেছিল রানির দেশের জাতীয় সঙ্গীত‚ উঠেছিল ইউনিয়ন জ্যাক | সেই প্রথম নিজেদের জন্য খেলে বিশ্বশ্রেষ্ঠ হল ভারত | সম্মানিত হল ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা |

সেই আখ্যান নিয়েই ‘গোল্ড’ | কেন্দ্রে কাল্পনিক চরিত্র তপন দাস | তবে যার আদলে এই চরিত্রটি তৈরি‚ তাঁকে জানতে ফিরে যেতে হবে দুয়ের দশকে | ব্রিটিশ শাসনের অবিভক্ত ভারতবর্ষের এক গ্রামে | যেখানে মিঠাইওয়ালার সঙ্গে কথা হচ্ছে এক গ্রাম্য বালকের |

***************************

– নিজেকে কী ভাবিস তুই ? নবাবপুত্তুর ? নাকি‚ রাজারাজড়াদের সঙ্গে খেতে বসিস ?

– আমি একদিন ইংল্যান্ডের রাজার সঙ্গে বসে খাবো |

গ্রামের পুঁচকে ছোকড়ার মুখে এই উত্তর শুনে মিঠাইওয়ালা তো থ’ |

১৯২০-র দশকের গোড়ায় এই ঘটনা আদৌ মধ্যপ্রদেশের মোহউ গ্রামে ঘটেছিল‚ নাকি নিছক প্রচলিত গল্প‚ তা নিয়ে তর্ক আছে | তবে সেই ছোকড়া কিন্তু সত্যি গ্রেট ব্রিটেনের রাজা ষষ্ঠ জর্জের আমন্ত্রণে নৈশভোজে যোগ দিয়েছিলেন | ১৯৪৮ সালে | সেদিনের সেই গ্রাম্য বালক তখন স্বাধীন ভারতের প্রথম অলিম্পিকে স্বর্ণপদকজয়ী দলের অধিনায়ক |

পিছনে‚ অনেক পিছনে ফেলে এসেছেন পুরনো খোলস | যে ছেলেটার জন্ম হয়েছিল ১৯১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি | ব্রিটিশ শাসিত মধ্যভারতের মোহউ গ্রামে | দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝে ওই সময়ে গ্রামে গিজগিজ করছে সেনাছাউনি | ব্রিটিশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ক্যান্টনমেন্ট রয়েছে সেখানে | সেনা জওয়ানরা সময় পেলেই পোলো খেলেন | ঘোড়ার পিঠে চেপে‚ হেলমেট পরে তাঁদের স্টিক নিয়ে সেই খেলা দেখতে খুব ভালবাসত ছোট্ট কিষণ |

ইচ্ছে করত একদিন সেও ওরকম খেলবে | ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি হয়ে | হাতে স্টিক নিয়ে | সত্যি হল কিষণের স্বপ্ন | বড় হয়ে তিনি খেললেন | তবে ঘোড়ার বদলে নিজের দু পায়ে সওয়ার হয়ে | হাতে স্টিক‚ তবে পোলোর নয়‚ হকির |

১৯৩৩ সালে‚ ১৬ বছর বয়সী কিষণ খেলে ফেললেন বেশ কিছু ক্লাবদলের হয়ে | ধ্যানচাঁদের সঙ্গে খেললেন ঝাঁসি হিরোজ দলের হয়ে | এ দল‚ সে দল খেলতে খেলতেই একদিন চোখে পড়ে গেলেন মহারাজা বীর সিং-এর | টিকমগড় স্টেটের মহারাজার জহুরির চোখ রত্ন চিনতে ভুল করলেন না | দিনকয়েকের মধ্যেই কিষণকে দেখা গেল টিকমগড়ের নামী ক্লাব ভগওয়ান্ত ক্লাবের হয়ে খেলতে |

১৯৪১ সালে কিষণ সিং যোগ দিলেন Bombay, Baroda and Central India Railway বা BB&CI-তে | এখন এই দল পরিচিত Western Railways নামে | ন্যাশনাল হকি চ্যাম্পিয়নশিপ খেললেন সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার হয়ে | তাঁর সাফল্যের জয়পতাকা উড়তে থাকল আগা খান কাপ‚ বেটন কাপ‚ ওবায়দুল্লাহ খান কাপ‚ সিন্ধিয়া কাপের মতো টুর্নামেন্টে |

১৯৪৭ সালে পেলেন অমূল্য সম্মান | পূর্ব আফ্রিকা সফরে ধ্যানচাঁদের পরেই সেকেন্ড ইন কম্যান্ড হলেন কিষণ সিং | পরের বছর দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব | দেশের স্বাধীনতা লাভের ঠিক পরের বছর অলিম্পিক্সের আসর বসল লন্ডনে | যে দেশের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে দুশো বছর ধরে রক্তাক্ত হয়েছে মাতৃভূমি‚ সেই দেশেই মহার্ঘ্য ক্রীড়ার আসর | বকলমে দেশের হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারের মঞ্চ |

মঞ্চ তো প্রস্তুত | কিন্তু কুশীলবরা তো ভগ্ন সৈনিক | বেশিরভাগ দক্ষ খেলোয়াড়রা দেশভাগের পরে চলে গেছেন পাকিস্তান | যাঁরা রয়েছেন তাঁদের নিয়েই স্বপ্ন দেখলেন কিষণ সিং | দেখালেনও বটে |

এমন একটা দল নিয়ে খেললেন যার একজন সদস্যও এর আগে অলিম্পিক্স খেলেননি | সেই বাহিনীই হেলায় উড়িয়ে দিল | ৮-০ গোলে অস্ট্রিয়াকে‚ ৯-১ গোলে আর্জেন্তিনাকে‚ ২-০-এ স্পেনকে এবং ২-১ গোলে হল্যান্ডকে | এই দুর্গম সিঁড়ি পেরিয়ে অবশেষে ফাইনাল | এবং কী সমাপতন ! প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড | বলে বলে নয় নয় করে ৪-০ গোলে ব্রিটিশদের হারাল ‘ নেটিভ’-দের দল | আরও একবার যেন পাওয়া গেল স্বাধীনতার আস্বাদ | অপমানের প্রতিশোধ | লাঞ্ছনার ক্ষততে উপশমের প্রলেপ |

সেই গ্রামের কিশোর কিষণ লাল রেগে গিয়েছিল মিঠাইওয়ালার মিষ্টিতে মাছি বসতে দেখে | সে কথা জানাতেই শুনতে হয়েছিল‚ সে কি নবাবপুত্তুর ? সত্যি কিন্তু তিনি হলেন | পুত্র নয়‚ খোদ নিজেই নবাব | মাছির মতোই উড়িয়ে দিলেন বাঘা বাঘা প্রতিপক্ষকে |

এর আগে যতবার ভারত জিতেছে‚ পতপত করেছে ইউনিয়ন জ্যাক | এবার উঠল ত্রিবর্ণ | বাজল জনগণমন | স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রথমবার অলিম্পিক্সে স্বর্ণপদক জিতল ভারত | পাঁচ ম্যাচ খেলে জয়ী সবকটাতে | মোট গোল করেছিল ২৫ টি | ভারতের গোলে বল ঢুকেছিল পাঁচবার | এই পরিসংখ্যান লেখা যত সহ্জ‚ ওই অবস্থায় করা ততই কঠিন | দেশকে এই জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পিছনে রাইট উইঙ্গার কিষণ লালের অবদান ছিল আকাশছোঁয়া | যদিও তিনি নিজে সবসময় বলতেন‚ দলগত সাফল্য |

এই একইরকম বিনয় ধরে রেখেছিলেন রাজকীয় নৈশভোজে | যা দিয়েছিলেন গ্রেট ব্রিটেনের তৎকালীন ভারতীয় হাই কমিশনার ভি. কে কৃষ্ণ মেনন | অলিম্পিক্সে স্বর্ণপদক জয়ের সম্মানে | সেখানেই রাজা ষষ্ঠ জর্জের সঙ্গে নৈশভোজ সেরেছিলেন মোহউ গ্রামের কিষণলাল |

লাগাতার ২৮ বছর ধরে খেলার পরে অবসর নিলেন তিনি | কিন্তু সে শুধু পেশাদার হকি থেকে | যুক্ত রইলেন প্রশিক্ষণে | ১৯৭৬ সাল অবধি তিনি ছিলেন Railways Sports Control Board-এর মুখ্য প্রশিক্ষক | বলবীর সিং‚ হরবিন্দ্র সিং‚ পৃথ্বীপল সিং‚ মোহিন্দর সিং‚ একের পর এক পলকাটা হিরের জন্ম দিয়েছেন কিষণ লালের মতো জহুরি | প্রতিভা চিনতে তিনি ছিলেন জুড়িহীন | ১৯৬৪ সালে মালয়েশিয়ায় যান‚ প্রশিক্ষণদানে আমন্ত্রিত হয়ে | তার চার বছর পরেই ডাক আসে পূর্ব জার্মানি থেকে | সম্ভবত তিনি একমাত্র অলিম্পিয়ান যিনি অবসরের পরেও নিয়মিত ছিলেন প্রতিযোগিতামূলক হকির আসরে |

হকির দুনিয়ায় পরিচিত ছিলেন ‘ দাদা’ নামে | ১৯৮০ সালে আমন্ত্রণ আসে সাবেক মাদ্রাজ বা আজকের চেন্নাই থেকে | মুরুগাপ্পা গোল্ড কাপ হকি টুর্নামেন্টে | দূরদর্শনে বিশেষ ধারাভাষ্যকারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি | জীবনে এই একটা কাজই শেষ করে যেতে পারলেন না তিনি | ২২ জুন মৃত্যু এসে থামিয়ে দিল তাঁর পথ চলা |

কিষণলালের চার ছেলে এবং এক মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে দেবকী লাল পা রেখেছিলেন বাবার পথে | প্রশিক্ষকও হয়েছিলেন | ২০০৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দুর্ঘটনায় অকালপ্রয়াত হন তিনি | ছোট ছেলের সঙ্গে কিষণলালের অশীতিপর স্ত্রী এখনও থাকেন তাঁদের মোহউ-এর বসতবাড়িতে | সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে কিষণলালের স্মৃতি | সযত্নে রাখা অজস্র পুরস্কার‚ পদক ও শংসাপত্র | চির ভাস্বর হয়ে আছে পদ্মশ্রী সম্মান | যা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে‚ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ | আর কিষণলাল নিজে যা তুলে দিয়েছেন দেশমাতৃকার পায়ে‚ তা স্বর্ণের থেকেও অনেকগুণ বেশি মূল্যবান এবং উজ্জ্বল |  

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.