প্রয়োজনে আসব…নারকোলের মালা দিয়ে সমাজের শ্যাওলা তুলব…তারপর কাজ শেষ হলে চলে যাব

রবীন্দ্রনাথ ঘোষদস্তিদার | আক্ষরিক ও ব্যবহারিক দু দিক দিয়েই মধ্যবিত্ত বাঙালির পক্ষে খুব ভারী নাম | সংক্ষেপ করে নিয়েছিলেন | বাদ পড়েছিল ইন্দ্র‚ নাথ ও দস্তিদার | যেটুকু ছিল সেটুকু ছোট‚ উচ্চারণেও সুবিধে | ছোট হলেও সে নামের ওজন ও অভিঘাত দুইই বড় সাঙ্ঘাতিক | কয়েক দশক ধরে বাংলা ছবিতে সে নামের কী দাপট‘ ! 

জন্ম পূর্ববঙ্গে ১৯৩১-এর ২৪ নভেম্বর | পরে আপাদমস্তক দক্ষিণ কলকাতার মহিম হালদার স্ট্রিটের বাসিন্দা | পড়তেন ভবানীপুরের সাউথ সাবার্বান স্কুলে | তারপর আশুতোষ কলেজ | বিজ্ঞান শাখায় পড়ছেন | বাবার আশা‚ ভবিষ্যতে ভদ্রস্থ চকারি বাঁধা | কিন্তু ছেলেও মন বন্ধক দিয়ে দিয়েছেন | থিয়েটারের কাছে | তিনি একলব্য হলে তাঁর দ্রোণাচার্য উৎপল দত্ত | কলেজে পড়তে পড়তে শরীরচর্চা করতেন | পাখির চোখ‚ মঞ্চে অভিনয় | 

বাবার চরম বিরোধিতা করেই অভিনয় | মহড়া সেরে গভীর রাতে বাড়ি ফিরতেন | চুপি চুপি | যাতে বাবা টের না পান | জীবনের কী সমাপতন ! মঞ্চে অভিনয়ের ঠিক পাঁচদিন আগে বাবা চলে গেলেন | মায়ের কাছে বললেন ছেলে‚ তাঁর দলের অনেক দেনা-কর্জ | শো বাতিল হলে মুশকিল | কালাশৌচের মধ্যেই প্রথম মঞ্চাবির্ভাব |

অভিনয়ের প্রতি এই নিখাদ নিবেদন বজায় ছিল জীবনের শেষদিন অবধি | তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত | আচমকা মৃত্যু ছোট বোন তপতীর | তার কয়েক ঘণ্টা পরে মঞ্চে বেদম হাসির নাটক কনে বিভ্রাট দেখে কেউ আঁচও করতে পারবে না সদ্য বোনকে হারানো রবি ঘোষের মনের মধ্যে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে |

মঞ্চে উৎপল দত্তের অঙ্গার নাটকে তাঁর অনবদ্য অভিনয় দেখেছিলেন পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় | বড় পর্দায় প্রথম সুযোগ দেন তিনি | ১৯৫৯ সালে ‘ আহ্বান ‘ ছবি | নায়ক অনিল চট্টোপাধ্যায়‚ নায়িকা সন্ধ্যা রায়‚ সঙ্গে নবাগত রবি ঘোষ |

তারপর তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠান | তাঁর জীবন মঞ্চ-রঙ্গ-ইতিহাসের আলেখ্য | সেখানে এক একটা ড্রপ সিন-এর সঙ্গে এসেছে গল্প হলেও সত্যি‚ গুপী গাইন বাঘা বাইন‚ অভিযান‚ কাপুরুষ মহাপুরুষ‚ আগন্তুক‚ অরণ্যের দিনরাত্রি‚ জন অরণ্য‚ পলাতক‚ ছায়াসূর্য‚ ধন্যি মেয়ে‚ বসন্ত বিলাপ‚ দোলগোবিন্দের কড়চা‚ অন্তর্জলির যাত্রা‚ পদ্মানদীর মাঝি‚ পলাতক‚ ঠগিনী‚ বাঘিনী‚ মর্জিনা আবদল্লা‚ বালিকা বধূ‚ আরোহী‚ নির্জন সৈকতে‚ হাঁসুলিবাঁকের উপকথা‚ মেঘ‚ কিছুক্ষণবাংলা ছবি উদিত রবির আলোয় আলোকিত | 

ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন সাঙ্ঘাতিক সিরিয়াস | প্রথম স্ত্রী অভিনেত্রী অনুভা গুপ্ত প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৭২-এ | তার ১০ বছর পরে বিয়ে বৈশাখী দেবীকে | এক বন্ধুর বাড়িতে প্রথম আলাপ | প্রথম দর্শনে বৈশাখী দেবী নাকি খুব হেসেছিলেন তাঁকে দেখে | পরে নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন বৈশাখী দেবী | আলাপের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে বিয়ে | যখনই মজার সংলাপ শোনার আব্দার করতেন উল্টোদিক থেকে জবাব আসত‚ কেন ! আমি কি জোকার ?

রোম্যান্টিক ছিলেন না বিশেষ | খুব কেয়ারিং ও স্নেহপ্রবণ ছিলেন | নিজে কম কথা বলতেন | পছন্দ করতেন মৃদুভাষীদের | আর ছিলেন সাধারণ জীবনযাপনে আগ্রহী | বাড়িতে তিনি সম্পূর্ণ সংসারী | বলিষ্ঠ অভিনেতার ছায়া অবধি সেখানে নেই | জীবনের উপান্তে এসে ইচ্ছে ছিল অভিনয় করা ছেড়ে অভিনয় শেখাবেন | লিখবেন আত্মজীবনী | সে আর হল না | একদিন সিরিয়ালের অভিনয় করতে করতে বললেন‚ এটাই আমার শেষ শট | এরপর বাড়ি যাব | সত্যি চলে গেলেন তিনি | চিরতরে | ১৯৯৭-এর ৪ ফেব্রুয়ারি‚ ৬৫ বছর বয়সে | 

এ যেন ধনঞ্জয়ের ইচ্ছাশক্তি | যখন প্রয়োজন, আসব | নারকোলের মালা দিয়ে সমাজের শ্যাওলা তুলব | বাঘা বায়েন হয়ে শুন্ডি রাজার প্রাসাদের ফোয়ারায় কলার খোসা ফেলে দেখিয়ে দেব আভিজাত্য বনাম মেঠো সুর | অভিযানে গাড়ি ছোটাবো | মহাপুরুষের কাপুরুষতা দেখাবো | মেমারি গেম-এ অতুল্য ঘোষ-এর নাম বলব | বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে ফুটবল খেলাব | অরণ্যে মিশেও একজন হয়ে উঠব | তারপর কাজ শেষ হয়েছে মনে হলে চলে যাব | 

তারপর‚ হলিউড টালিগঞ্জকে বলবে‚ তুমি চার্লি চ্যাপলিনকে চেনো ? উত্তরে টালিগঞ্জ হলিউডকে বলবে‚ আপনি রবি ঘোষকে চেনেন ?  চ্যাপলিনের ভাবশিষ্য তুলসী চক্রবর্তী‚ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়‚ অনুপ কুমার‚ রবি ঘোষদের হলিউড-বলিউড স্বীকৃতি বা পদ্ম-শ্রী-ভূষণ-বিভূষণ দরকার হয় না | তাঁদের প্রতিভাই শতদলের মতো বিকশিত | 

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements

1 COMMENT

  1. রবি ঘোষ – ৮৭.

    যারা ১৯৭০ সালের পরে জন্মেছেন, সেই প্রজন্মের তারা চলচ্চিত্রাভিনেতা রবি ঘোষকে চিনেছেন সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’ থেকে, নাট্যাভিনেতা রবি ঘোষকে চেনার সুযোগ তাঁদের হয়নি । তিনি কিন্তু আগে নাট্যাভিনেতা, তারপরে চলচ্চিত্র । বস্তুত নাট্যাভিনয়ের সাফল্যই রবি ঘোষকে সিনেমায় টেনে এনেছিল ।

    তখন আমি সতেরো বছরের তরুণ, মিনার্ভা থিয়েটারে উৎপল দত্তর সেই সাড়া জাগানো নাটক ‘অঙ্গার’ (১৯৫৯) দেখছি । আমার এখনও মনে আছে একটা সংলাপ ‘আমিই সেই ভূতপূর্ব লোক’ । কয়লাখনির আগুন নেভাতে খনিগর্ভে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধার না করে জল ঢেলে দিয়েছে খনি মালিক । জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে খনি মালিকের খাতায় ‘মৃত’ কয়েকজন শ্রমিক বেঁচে ফিরেছিল । তাদেরই একজন নিজের পরিচয় দিয়েছিল এই সংলাপটি বলে । সেই শ্রমিকটির নাম ছিল ‘সনাতন’ । মনে আছে শেষ দৃশ্যটির স্মৃতি । খনিগর্ভ জলে ভরে যাচ্ছে তাপস সেনের আলোর জাদুতে, রবিশঙ্করের আবহ নির্মাণ আর খনিগর্ভে শ্রমিকদের জলে ডোবার মুহুর্তে দুটি হাত ওপরে তুলে সনাতনের শেষ সংলাপ ‘পৃথিবীর মানুষ, তোমরা আমাদের ভুলো না’ । সনাতনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রবি ঘোষ । আজ ২৪শে নভেম্বর, থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের অনন্য চরিত্রাভিনেতা প্রয়াত রবি ঘোষের ৮৭তম জন্মদিন ।

    জন্ম কলকাতায় ১৯৩১এর ২৪শে নভেম্বর । পুরো নাম রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার । শিক্ষা – কলকাতার সাউথ সুবার্বন (মেইন) স্কুল ও আশুতোষ কলেজ । ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৯ চাকুরী করেন ব্যাঙ্কশাল কোর্টে । প্রখ্যাত অভিনেত্রী অনুভা গুপ্তাকে বিবাহ করেন । ১৯৭২এ অনুভার অকাল প্রয়াণের পর দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন বৈশাখী দেবীকে ১৯৮২তে ।
    রবি ঘোষ উৎপল দত্তর হাতে গড়া। তাঁর শিক্ষাতেই রবির নাট্যাভিনয় জীবনের শুরু ও বিকাশ । লিটল থিয়েটার গ্রুপ গঠন করে উৎপল দত্ত যখন ইংরাজি ভাষার নাটক ছেড়ে বাংলা নাটক করা শুরু করলেন রবিঘোষ সেদিন থেকেই এলেন উৎপল দত্তর এল টি জি গ্রুপে । এল টি জির প্রথম বাংলা নাটক ‘সাংবাদিক’এ রবি ঘোষের ও প্রথম অভিনয়, ডিসেম্বর ১৯৫২তে । ১৯৫২ থেকে মে ১৯৬১ পর্যন্ত রবি ছিলেন লিটল থিয়েটার গ্রুপে । এখানে উৎপল দত্তর পরিচালনায় অভিনয় করেন ‘সাংবাদিক’ (১৯৫২), ’অচলায়তন’ (১৯৫৩), ‘বিচারের বাণী’ (১৯৫৪), ‘ম্যাকবেথ’ (১৮৫৫), ‘জুলিয়াস সিজার’ (১৯৫৬), ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ (১৯৫৬), ‘নীচের মহল’ (১৯৫৭), ‘তপতী’ (১৯৫৭), ‘ছায়ানট’ (১৯৫৮), ‘দ্বাদশ রজনী’(১৯৫৯) এবং ‘অঙ্গার’ (১৯৫৯) । ৩০০ রাত্রি অভিনয়ের পর ১৯৬১তে উৎপল দত্ত নতুন নতুন নাটক ফেরারী ফৌজ মঞ্চস্থ করেন, আর এই সয়েই লিটল থিয়েটার গ্রুপ – রবি ঘোষ সম্পর্কে ছেদ পড়ে ।

    ফেরারী ফৌজ নাটকে মাত্র তিন রাত্রি অভিনয়ের পর রবি চলে যান এবং ১৯৬৩তে গড়ে তোলেন ‘চলাচল’ নাট্যগোষ্ঠী । ‘চলাচল’এ রবি ঘোষ পরিচালিত নাটকগুলি ছিল ‘ঠগ’, ‘রঙ্গ’, ‘ধনপতি গ্রেপ্তার’, ‘বিধি ও ব্যতিক্রম’, ‘ছায়ানট’, অলীক বাবু’ প্রভৃতি । ১৯৭২এর পর তাঁর’চলাচল’ নাটকের গ্রুপ বন্ধ হয়ে যায় । ১৯৭৫এ রবি ঘোষ যুক্ত হন পেশাদার মঞ্চে । ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত অনেকগুলি নাটক পরিচালনা ও অভিনয় করেন । রবি ঘোষ ১৯৮৭তে নট্ট কোম্পানী যাত্রা দলে অভিনয় করেন । ১৯৯২ _ ৯৩এ দুই মরশুমও যাত্রা দলে ছিলেন । আবার ১৯৯৬তে রবি যোগ দেন ‘নট্ট কোম্পানী’তে । এখানেই ১৯৯৬তে তাঁর অভিনয় ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’ পালায় ।

    প্রায় দু’শটির মত ছায়াছবিতে অভিনয় করা রবি ঘোষের চলচ্চিত্র অভিনয়ের কথা প্রায় কিছুই বলা হল না । কারণ রবি ঘোষের অভিনয় প্রতিভা ও লোকপ্রিয়তা নিয়ে নতুন কিছু বলার অবকাশ নেই । শুধু চলচ্চিত্র ও নাট্য জগতের দুই মহান ব্যক্তিত্ব সৌমিত্রচট্টোপাধ্যায় ও উৎপল দত্তর মন্তব্য উদ্ধার করলাম । সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য –“রবি বড় মাপের অভিনেতা ছিল বলেই বড় মাপের কৌতুকাভিনেতা হতে পেরেছিল …যিনি বিশ্বের সেরা অভিনেতা তিনিই বিশ্বের সেরা কৌতুকাভিনেতা – চার্লস চ্যাপলিন” । আর ১৯৮২তে উৎপল দত্ত লিখেছিলেন “ And he has now become what he wanted to be, perhaps the supreme comedian in our cinema . … he is perhaps the best actor I have ever had the honour to work with……”

    চলচ্চিত্রে রবি ঘোষের প্রথম অভিনয় ১৯৫৮তে। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘কিছুক্ষণ’ ছবিতে । তারপর প্রায় প্রায় চল্লিশ বছর জড়িয়ে চিলেন চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে, অভিনয় করেছেন প্রায় দুশোটি চলচ্চিত্রে । তাঁর স্মরণীয় অভিনয় ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’(১৯৬৮), ‘অভিযান’(১৯৬২),‘নির্জনসৈকতে’ (১৯৬৩), ‘আরোহী’ (১৯৬৫),‘গল্প হলেও সত্যি’ (১৯৬৬), ‘আপনজন’(১৯৬৮),‘অরণ্যের দিন রাত্রি (১৯৭০),‘ধন্যি মেয়ে’ (১৯৭১),পদি পিসির বর্মী বাক্স’ (১৯৭২) ‘মর্জিনা আবদাল্লা’ (১৯৭৩) ‘আগন্তুক’ ‘জন অরণ্য’ (১৯৭৬), ‘হীরক রাজার দেশে’ (১৯৮০), ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’ (১৯৯৩),এমন বহু জনপ্রিয় সিনেমায় ।

    ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭তে – ৬৫ বছর বয়সে মৃত্যু হয় এই অবিস্মরণীয় অভিনেতার । আজ তাঁর ৮৭তম জন্মদিনে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা । .

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.