জন্মদিনেই বা তার পরের দিন তিনি হয়ে উঠলেন ঘাতক…গর্জে উঠল পিস্তল…উচিত শাস্তি বিশ্বাসঘাতক সহযোদ্ধাকে

– এখন হাসছ‚ হেসে নাও | কাল সকালে সব হাসি মিলিয়ে যাবে মুখ থেকে |

বলেছিলেন এক ব্রিটিশ জেল ওয়ার্ডেন | ফাঁসির আসামিকে | ১৯০৮-এর ৯ নভেম্বর | পরের দিনই ফাঁসি কুড়ি বছরের ছেলেটির | তার আগের দিন অমলিন মুখে হাসি !

পরের দিন ভোরে ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে সেই ওয়ার্ডেনের মুখোমুখি তরুণ | জিজ্ঞাসা করলেন‚

– এখন কীরকম দেখছেন আমাকে ?

মাথা নিচু করলেন ওয়ার্ডেন | মৃত্যু থেকে কয়েক কদম দূরে তখনও সেই নিষ্পাপ হাসিমুখে তরুণ | হাসিমুখেই ফাঁসির মঞ্চে উঠে গিয়েছিলেন |

*******

জন্মাষ্টমীর রাতে জন্ম | আদর করে দত্ত পরিবার ছেলের নাম রেখেছিল কানাইলাল | ১৮৮৮ সালে‚ সাবেক চন্দরনগরে তখনও ফরাসি আধিপত্য | পরিবারের কর্তা চুনীলাল কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী | তাঁরই ছেলে কানাইলাল | 

শৈশবে বম্বে চলে যেতে হয় কানাইলালকে | সেখানে কর্মরত ছিলেন তাঁর বাবা | পরে ষোল বছর বয়সে ফিরে আসেন জন্মস্থানে | ভর্তি হন দুপ্লে কলেজে | বি.এ পরীক্ষা দেন হুগলি মহসিন কলেজ থেকে | তখন এই কলেজ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে |

কলেজে পড়ার সময় প্রখ্যাত বিপ্লবী চারুচন্দ্র রায়ের সান্নিধ্যে আসেন কানাইলাল | পেয়েছিলেন বিপ্লববাদে দীক্ষিত অধ্যাপক জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষকে | স্বাধীনতার যুদ্ধে শরিক হতে কলকাতায় চলে আসেন কানাইলাল | যোগ দেন অনুশীলন সমিতিতে |

১৯০৮ সালে কিংসফোর্ড হত্যার জেরে গ্রেফতার করা হয় বহু বিপ্লবীকে | বন্দিদের মধ্যে ছিলেন কানাইলাল দত্তও | ছিলেন আলিপুর জেলে | তখন সারা দেশ উত্তাল স্বাধীনতা আন্দোলনে | সংবাদ শিরোনামে আলিপুর বোমা মামলা | বন্দি স্বয়ং বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ | এবং আরও অনেকে |

মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিলেন নরেন গোঁসাই বা নরেন্দ্রনাথ গোস্বামী | শ্রীরামপুর জমিদারবাড়ির ছেলে সহ্য করতে পারেনি নির্যাতন | কিন্তু তিনি সাক্ষ্য দিলে তো সমূহ বিপদ |

তাঁকে সরানোর ভার পড়ল কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বোসের উপর | দুজনেই বন্দি আলিপুর জেলে | সম্পর্কে সত্যেন্দ্রনাথ মামা হন অরবিন্দ ঘোষের  | যদিও তিনি ভাগ্নের থেকে বয়সে ছোট |

জেলের মধ্যেই সন্তর্পণে কানাইলাল-সত্যেন্দ্রনাথের হাতে পিস্তল পৌঁছে দিলেন মতিলাল রায় | হাঁপানি রোগী সত্যেন্দ্রনাথ ভর্তি ছিলেন জেল হাসপাতালে | পেটে অসহ্য ব্যথা করছে বলে ভর্তি হয়ে গেলেন কানাইলালও |

হাঁপানির কষ্ট ভুগতে ভুগতে সত্যেন্দ্রনাথের মনে হল তিনিও রাজসাক্ষী হবেন | দেখা করতে চাইলেন নরেন গোসাঁইয়ের সঙ্গে | কিছু গোপন কথা আছে |

কাজ হল | টোপ গিললেন নরেন | বিশ্বাস করল ব্রিটিশ সরকার |

১৯০৮-এর ৩১ অগাস্ট | জেল হাসপাতালের সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন নরেন গোস্বামী | পাহারা ঢিলেঢালা | দুই অসুস্থ বন্দি কী আর করবে !

সিঁড়ির বাঁক ঘুরলেন নরেন গোসাঁই | 

এক‚ দুই‚ তিন 

গর্জে উঠল দুটি পিস্তল | বুলেট ফুঁড়ে দিল বিশ্বাসঘাতক সহযোদ্ধার পিঠ | লুটিয়ে পড়লেন তিনি | গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পালাতে গিয়ে পড়ে গেলেন নর্দমায় | ঘটনার আকস্মিকতায় বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে পড়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ | 

লুকিয়ে পড়েননি কানাইলাল বা সত্যেন্দ্রনাথ | কর্তব্য সমাধা করে স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিলেন দুজনে | ঘটনাচক্রে দিনটা ছিল কানাইলালের জন্মদিনের ঠিক পরের দিন | কোথাও আবার ৩১ অগাস্টই তাঁর জন্মদিন বলে উল্লেখিত | 

নরেন ঘাতক দুই বিপ্লবীকে ফাঁসির শাস্তি শোনাতে ব্রিটিশ সরকার সময় নিয়েছিল আড়াই মাস | কিন্তু এতটাই প্রত্যয়ী ছিলেন কানাইলাল‚ কোনও আইনি সাহায্য নেননি | পরিশীলিত ইংরেজিতে স্পষ্ট নিষেধ করেছিলেন উচ্চতর আবেদনেও | লিখেছিলেন “There shall be no appeal” | Will-এর পরিবর্তে Shall ব্যবহার করেছিলেনImperative Sentence অর্থে | অর্থাৎ আদেশ বা আজ্ঞাবাচক বাক্যে বলছেন‚ কোনও উচ্চ আবেদন না করতে |

শেষ কদিন একমাত্র ভাই ছাড়া কারও সঙ্গে দেখা করেননি | তাঁকেই বলে গিয়েছিলেন শেষকৃত্যে যেন কোনও পুরোহিত আচার অনুষ্ঠান না করে | ১০ নভেম্বর‚ ১৯০৮‚ আলিপুর জেলে ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে গিয়েছিলেন কুড়ি বছর বয়সী তরতাজা তরুণ কানাইলাল দত্ত | তার ১১ দিন পর ২৬ বছরের যুবক সত্যেন্দ্রনাথ বোস | 

লেখার শুরুতে যে ওয়ার্ডেনের কথা বলা হয়েছে‚ তিনি পরে চারুচন্দ্র রায়কে বলেছিলেন‚ “I am the sinner who has executed Kanailal. If you have a hundred men like him, your aim will be fulfilled.”|  কানাইলালের মৃত্যুর প্রায় পনেরো বছর পরে তাঁর শেষযাত্রা নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন মতিলাল রায় | প্রকাশ করেছিলেন ফরাসি শাসনের চন্দরনগর থেকে | লিখেছিলেন‚ কম্বল সরাতেই দেখা গেল শুয়ে আছেন কানাইলাল | তাঁর লম্বা চুল এসে পড়েছে কপালে | দুটি অর্ধনিমীলিত চোখ দেখে মনে হছে তিনি অমৃতসুধা পানের স্বাদ লাভ করেছেন | দৃঢ় বদ্ধ ওষ্ঠ এবং দুই হাত মনে করিয়ে দিচ্ছে জীবনপণ | নিথর দেহে কোথাও একটুও মৃত্যুকষ্ট নেই | ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল সেই বই |

শহিদ কানাইলাল দত্তর মৃতদেহ নিয়ে শোভাযাত্রায় কলকাতার রাজপথে জনজোয়ার দেখে ভীত হয়ে পড়েছিল ব্রিটিশ সরকার | এতটাই‚ যে পরে রাজবন্দি বা প্রাণদণ্ড পাওয়া বন্দির দেহ নিয়ে শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয় | ১৯০৮ সালের ২ মে মোকামাঘাট স্টেশনে নিজেকে দুবার গুলি করে আত্মঘাতী হয়েছিলেন প্রফুল্ল চাকী | ১১ অগাস্ট ফাঁসি হয় ক্ষুদিরাম বোসের | তাঁকেই প্রথম শহিদের মান্যতা দেওয়া হয় | প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসুর পরে তৃতীয় ও চতুর্থ শহিদ হলেন যথাক্রমে কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বোস | পরপর তরুণদের আত্মবলিদান গভীর প্রভাব ফেলেছিল জনমানসে | সূচিত হয়েছিল দেশব্যাপী সঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলনের নান্দীমুখ | 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here