চাকরিতে যোগ দিয়ে শোধ করেছিলেন বৃত্তির টাকাও‚ ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কচুরিপানা সাফ করতেন এই মেধাবী বঙ্গসন্তান

গুরু নিশ্চয়ই সদয় ছিলেন | অল্প বয়সে অনাথ হওয়ার পরেও যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের জীবনকে‚ বলতেই হয় তাঁর পৈতৃক নামকে সার্থক করেছিলেন এই কর্মযোগী | জীবনভর ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র | কিন্তু শুধু বইয়ের পাতা নয় | উপলব্ধি করেছিলেন আদর্শ নাগরিক হতে প্রয়োজন ধুলোমাটি মেখে বড় হওয়া | বাঙালির ঘরকুনে অলস বদনাম ঘোচাতে লিখলেন নতুন মন্ত্র | ব্রতচারীর মন্ত্র | তিনি গুরুসদয় দত্ত চৌধুরী | 

সিলেট জেলার করিমগঞ্জ বীরশ্রী গ্রামের জমিদার পরিবারে রামকৃষ্ণ দত্ত ও আনন্দময়ী দেবীর কোলে এসেছিলেন ১৮৮২-র ১০ মে | ৯ বছর বয়সে বাবা এবং ১৪ বছর বয়সে মাকে হারিয়ে অভিভাবক হিসেবে পেলেন জ্যাঠামশাইকে | অবস্থাপন্ন পরিবারে আর্থিক অসঙ্গতি ছিল না | কিন্তু জমিদার জ্যাঠামশাইয়ের দিক থেকে ভালবাসা আর স্নেহের ঘাটতি ছিল | 

স্নেহের খামতি জীবনদেবতা পুষিয়ে দিয়েছিলেন মেধায় | ১৮৯৮ সালে এন্ট্রান্সে প্রথম | ১৯০১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ পরীক্ষায় দ্বিতীয় | পেলেন সিন্ধিয়া স্বর্ণপদক | কিন্তু সেই পদকের জৌলুসে মন গলল না জ্যাঠমশাইয়ের | বিধান দিলেন‚ অনেক হয়েছে | আর পড়ে কাজ নেই |

কিছুতেই শুনবেন না জমিদারের ভাইপো | মজবুত খুঁটি হিসেবে পেলেন সিলেট ইউনিয়নকে | তাদের দেওয়া বৃত্তিতে সওয়ারি হলেন ইংল্যান্ডগামী জাহাজের | গন্তব্য কেম্ব্রিজের এমানুয়েল কলেজ | ১৯০৫ সালে সসম্মানে‚ প্রথম স্থানে উত্তীর্ণ হলেন ICS পরীক্ষায় | তিনি প্রথম ভারতীয় যিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করলেন | বার এক্সামিনেশনেও পেয়েছিলেন প্রথম শ্রেণী |

কেম্ব্রিজে বসে নামের পাশে এতগুলো ডিগ্রি ইত্যাদি জুড়ল | কিন্তু খসেও গেল একটি জিনিস | পদবী থেকে ঝেড়ে ফেললেন চৌধুরী | এ বার থেকে হলেন গুরুসদয় দত্ত | হয়তো জমিদারির পরিচয় বয়ে বেড়াতে চাননি | 

১৯০৫ সালে দেশে ফিরলেন ICS অফিসার গুরুসদয় দত্ত | চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রথমেই যা করলেন‚ তা হল সিলেট ইউনিয়নের বৃত্তির টাকা ফেরত দিয়ে দিলেন | যাতে ওই অর্থ পেতে পারে আর একজন মেধাবী ছাত্র |

বেঙ্গল ক্যাডারের অফিসার হয়ে দক্ষতার সঙ্গে সামলেছিলেন আমলার দায়িত্ব | আরা‚ হুগলি‚ পাবনা‚ বগুড়া‚ যশোর‚ ফরিদপুর‚ কুমিল্লা‚ ঢাকা‚ বরিশাল‚ বীরভূম‚ বাঁকুড়া‚ হাওড়া‚ ময়মনসিংহ অবিভক্ত বাংলা এবং বিহার ও ওড়িশার বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ অলঙ্কৃত করেছেন তিনি | এরপর আসেন কলকাতয় | ১৯৩০-১০৩৩ ছিলেন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের চিফ হুইপ | মনোনীত সদস্য ছিলেন কাউন্সিল অফ স্টেট এবং সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি‚ যা নাকি ছিল কার্যত ব্রিটিশ ভারতের পার্লামেন্ট | 

নিজেকে শুধু আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতেয় বেঁধে রাখার মানুষ ছিলেন না | যেখানে যেখানে কর্মরত ছিলেন‚ কাজ করে গেছেন সমাজের তৃণমূল স্তরে | ব্রিটিশ সরকারের কর্মী হিসেবে নয় | একজন ভারতবাসী হয়ে | সমাজসেবার সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী সরোজনলিনী | আমলা ব্রজেন্দ্রনাথ দে-এর কন্যা সরোজনলিনী ছিলেন স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী | সরোজনলিনী নিজেও মহিলাদের জন্য বহু কল্যাণমূলক কাজ করে গেছেন | দুজনে এতই বুঁদ থাকতেন শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে‚ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতেন ক্লাবে গিয়ে আনন্দফূর্তি করতে |

কিন্তু কর্তাগিন্নির সেসবে মন ছিল না | গিন্নি মহিলা সমিতিতে পড়ে | কর্তা নেমে পড়েছেন কচুরিপানা সাফ করতে | কখনও নিজের হাতে যাচাই করছেন সেচের নালা | তখন কেন‚ এখনও কেউ ভাবতে পারবে শ্রমিক-কুলি-কামিনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন একজন ম্যাজিস্ট্রেট !

১৯২৫ সালে আচমকা ছন্দোপতন | কদিনের জ্বরে চলে গেলেন সরোজনলিনী | শোকের ক্ষতে প্রলেপ দিতে গুরুসদয় বেছে নিলেন সমাজসেবাকেই | স্ত্রীর স্মৃতিতে শুরু করলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান | যেখানে মহিলাদের জন্য কল্যাণমূলক কাজ হয় | শেখানো হয় লেখাপড়া ও হাতের কাজ | কলকাতায় বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে আজও আছে সরোজনলিনীর মেমোরিয়াল ট্রাস্ট | নানা রকমের কাজ হয় সেখানে |

পাশাপাশি গুরুসদয় বের করেছিলেন মহিলাদের পত্রিকা বঙ্গলক্ষ্মী ও কৃষি পত্রিকা গ্রামের ডাক | পল্লীবাংলার সম্পদের নিশ্ছিদ্র রক্ষক ছিলেন তিনি | সংরক্ষণের সঙ্গে সেসব তুলে ধরতেন বিশ্ব দরবারে | তাঁর নিরন্তর গবেষণায় নতুন জীবন পায় রায়বেশে‚ কাঠি‚ ধামাইল‚ বাউল‚ ঝুমুর‚ ব্রত‚ ঢালির মতো লোকজ নাচ |

১৯৩২ সালে শুরু করলেন ব্রতচারী আন্দোলন | আগেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বঙ্গীয় পল্লী সম্পদ রক্ষা সমিতি | তার নতুন নাম হয় দ্য বেঙ্গল ব্রতচারী সোসাইটি | ১৯৪১ সালে জোকায় পথ চলা শুরু করে ব্রতচারী গ্রাম | সে বছরই কর্কট রোগে মাত্র ৫৯ বছর বয়সে মৃত্যু হয় এর প্রতিষ্ঠাতার |

গুরুসদয়ের মানসসন্তান ব্রতচারী গ্রামে আজ অতীতের ঐতিহ্য আছে | কিন্তু জৌলুস অনেক স্তিমিত | খুব কম দর্শনার্থীর পা পড়ে | কেউ প্রায় জানেনই না ভিতরের সংগ্রহশালা দুর্লভ | গ্রামের কাঁথা‚ টেরাকোটা‚ পাথর আর কাঠের মূর্তি‚ মিষ্টির ছাঁচ‚ খেলনা পরতে পরতে রাখা আছে পরম যত্নে | যা হয়তো এখন গ্রামে গেলেও আর চোখে পড়বে না | একসময় নিজে খুঁজে এসব সংগ্রহ করতেন গুরুসদয় | গুরুসদয় মিউজিয়ম বলতে সবাই বোঝে গুরুসদয় দত্ত রোডে বিড়লাদের সংগ্রহশালা | ব্রাত্য হয়ে পড়ে আছে ব্রতচারী গ্রাম ও তার অমোঘ সংগ্রহ | পাশাপাশি আরও অনেক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন তিনি | লিখেছিলেন বহু বই | যার মধ্যে একটি স্ত্রীর জীবনী | যার ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | 

কিন্তু এমন একজন দৃঢ়চেতা বঙ্গজ ব্যক্তিত্ব কী করে ব্রিটিশদের গোলামি করে গেলেন ? করেননি | চাকরি করতেন‚ কিন্তু আপস নয় | তার মাশুলও দিতে হয়েছে | তিনি ছিলেন সরকারের অবাধ্য আমলা | হাওড়ার বামনগাছিতে প্রতিবাদী জনতার উপর গুলি চালায় ব্রিটিশ পুলিশ | প্রতিবাদ করায় গুরুসদয়কে রাতারাতি বদলি করে দেওয়া হয় ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত অংশে | সেখানেও কাঁটা | গান্ধীজির লবণ আন্দোলনের প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন অসংখ্য মানুষ | তাঁদের দমনপীড়ন করতে ব্যর্থ আমলা গুরুসদয় | আবার বদলি | এ বার বীরভূম | সেই ট্র্যাডিশন আজও তো সমানে চলছে |

ট্র্যাডিশন চলছে গুরুসদয় দত্তের পরিবারেও | তাঁর পুত্র বীরেন্দ্রসদয়‚ পৌত্র দেবসদয় এবং দুই প্রপৌত্র রাজসদয় ও শিবসদয় প্রত্যেকেই মেধা ও মননে গুরুসদয়ের যোগ্য উত্তরসূরী | একই কথা প্রযোজ্য ঘরনিদের দিকেও | গুরুসদয়ের পুত্রবধূ আরতি দত্তও একজন সমাজসেবী ছিলেন | অকালপ্রয়াত শাশুড়িমায়ের রেখে যাওয়া ব্যাটন তুলে নিয়েছিলেন যোগ্য হাতে |

Advertisements

1 COMMENT

  1. অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম । এরকম কত কিছুই আমরা জানিনা । ধন্যবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.