বয়সে বড় প্রথম স্ত্রীর নিত্য ঝগড়ায় বীতশ্রদ্ধ এই সাহিত্যিকের দ্বিতীয় বিয়ে বাল্যবিধবাকে

9852

অসংখ্য ছোট গল্প‚ উপন্যাস ছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ হল বিদেশি সাহিত্যের হিন্দি রূপান্তর | তাঁকে ভূষিত করা হয়  উপন্যাস সম্রাটউপাধিতে | তিনি মুন্সি প্রেমচাঁদ | যতদিন হিন্দি সাহিত্য থাকবে‚ ততদিন থাকবে গোদান‚ শতরঞ্জ কি বাজী বা শতরঞ্জ কি খিলাড়ি‚ কায়াকল্প‚ কফন-এর জন্ম দেওয়া তাঁর চির শাশ্বত কলম |

# সম্পন্ন কায়স্থ পরিবারে জন্ম ১৮৮০-র ৩১ জুলাই | বারাণসীর কাছে লামহি গ্রামে | বাবা ছিলেন ডাককর্মী | বাবা-মায়ের চতুর্থ তথা কনিষ্ঠ সন্তান তিনি | 

# নামকরণ হয় ধনপত রাই | পরে তাঁর ধনী কাকা নাম দিয়েছিলেন নবাব | সাহিত্যজীবনে তাঁর প্রথম ছদ্মনামও ছিল নবাব রাই |

# ৭ বছর বয়সে শুরু শিক্ষা | গ্রামের মাদ্রাসায়‚ মৌলবীদের কাছে আরবি আর ফার্সি | ৮ বছর বয়সে হারান মাকে | লালন পালনের ভার তুলে নেন ঠাকুমা |

# পরের বছরেই আরও একাকী হয়ে গেলেন ৮ বছরের বালক | চলে গেলেন ঠাকুমা | বাবা ব্যস্ত নিজের কাজ নিয়ে | ঘরে সৎ মা | পরবর্তী জীবনে তাঁর জন্মদাত্রীর স্মৃতি ফিরে এসেছে  বড়ে ঘর কি বেটি  গল্পে | বিমাতার নির্লিপ্ত ভাবলেশহীন ব্যবহার তো বারবার উপজীব্য হয়েছে তাঁর কলমের |

# নিঃসঙ্গ বালক আশ্রয় খুঁজে পেল বইয়ে | গল্প শুনত গ্রামের আড্ডায় ‚ সুযোগ পেলেই ডুবে থাকত বইয়ে | কাজ নিয়েছিল বই বিক্রির | যাতে আরও বই পড়ার সুযোগ পাওয়া যায় | 

# বাবার কাজের সূত্রেই গোরক্ষপুরে শুরু বসবাস | সেখানেই প্রথম লেখালেখি | পরে সেটি আর পাওয়া যায়নি | নিজেই জানিয়েছিলেন লিখেছিলেন এক ব্যঙ্গ কাহিনি | যেখানে এক তরুণ প্রেমে পড়েছিল নিম্নবর্ণের মহিলার | 

# মনে করা হয় এই চরিত্র আসলে নিজের কাকাকে অনুসরণ করে সৃষ্টি করেছিলেন | দিনরাত বইয়ে মুখ গুঁজে থাকার জন্য তাঁকে খোঁটা দিত সেই কাকা | গল্প ছিল তারই প্রতিশোধ |

# ইতিমধ্যে মিশনারী স্কুলের পাঠ শেষ করে শুরু কলেজ | বেনারসের কুইন্স কলেজ | তার মধ্যে ঘরে নতুন বৌ | বিমাতার বাবার আনা সম্বন্ধে বিয়ে হয়েছিল বয়সে বড় কিশোরীর সঙ্গে | যদিও প্রেমচাঁদের কথায় স্ত্রী ছিলেন কুরূপা এবং কলহপ্রিয়া |

# বাবার মৃত্যুর পরে ম্যাট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ | কিন্তু দ্বিতীয় বিভাগে | আপাতত মুলতুবি উচ্চশিক্ষা | বেনারসে এক আইনজীবীর ছেলের গৃহশিক্ষকতার কাজ নেন |

# আইনজীবীর আস্তাবলে মাটির কুঁড়েঘরে থাকতেন | বেতনের অর্ধেক পাঠাতেন বাড়িতে | বাকিটা খরচ করতেন বই কিনে | সারাজীবন কেটেছে বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা আর গৃহশিক্ষকতা করে | 

# ১৯০৩ সালে প্রকাশিত হয় ধনপত রাইয়ের প্রথম উপন্যাস | নবাব রাই ছদ্মনামে |

# কাজের জায়গা থেকে যেতেন গ্রামের বাড়িতে | কিন্তু পেতেন না মানসিক শান্তি | ভাল লাগত না গ্রাম্য পরিবেশ | মন বসত না লেখাতেও | কারণ বিমাতা আর স্ত্রীর তীব্র কলহ |

# ঝগড়ার চোটে স্ত্রী চেষ্টা করল গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হতে | এতে ধনপত প্রচণ্ড বকাবকি করেন | রাগের চোটে স্ত্রী চলে যান বাপের বাড়ি | ধনপত তাঁকে ফিরিয়ে আনার উৎসাহ বোধ করেননি |

# ১৯০৬ সালে আবার বিয়ে করলেন ধনপত | গ্রামের জমিদারের বাল্যবিধবা কন্যা শিবরানি দেবীকে | এর জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাঁকে |

# ১৯০৯ সালে গ্রহণ করলেন ছদ্মনাম মুন্সি প্রেমচাঁদ | যাতে ব্রিটিশ রোষানল থেকে বাঁচানো যায় সাহিত্যকে | ১৯১৪ সাল থেকে লিখতে থাকেন হিন্দিতে | এর আগে তাঁর সৃষ্টি ছিল উর্দু ভাষায় | 

# ১৯১৯ সালে বি.এ পাশ করেন প্রেমচাঁদ | নিযুক্ত হন স্কুলের ডেপুটি ইন্সপেক্টর পদে | কিন্তু গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে সামিল হয়ে ইস্তফা দেন সরকারি পদ থেকে | ঘরে দুই ছেলে | তৃতীয়বারের জন্য অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী | পরবর্তীকালে অবশ্য সমর্থন করেছিলেন লালা লাজপত রাইয়ের চরম পন্থা | 

# এরপর মন দেন মূলত লেখালেখিতেই | কিন্তু সংসারে খুব অনটন | বাধ্য হয়ে লিখতে শুরু করেন হিন্দি ছবির চিত্রনাট্য | কিন্তু তবুও বাঁচানো যায়নি তাঁর প্রকাশনা সংস্থাকে | দেনায় জর্জরিত হয়ে তা বন্ধ হয়ে যায় |

# সংসারে অর্থ এলেও বম্বেতে হিন্দি ছবির জগতে মন বসাতে পারলেন না | একদিকে আর্থিক অসঙ্গতি‚ অন্যদিকে দুর্বল শরীর | মুন্সি প্রেমচাঁদ চলে গেলেন বেনারস | সেখানেই প্রয়াণ ১৯৩৬-এর ৮ অক্টোবর |

# জীবদ্দশায় প্রকাশিত তাঁর শেষ সম্পূর্ণ রচনা গোদান | তাঁর নিজের তথা হিন্দি সাহিত্যের সেরা সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম | 

# তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে আছে দেবস্থান রহস্য‚ প্রেমা‚ রুঠিরানি‚ রঙ্গভূমি‚ বরদান‚ প্রতিজ্ঞা এবং কায়াকল্প | ছোটগল্পের মধ্যে স্মরণীয় হল মা‚ বলিদান‚ বুড়ি কাকি‚ দুর্গা কা মন্দির‚ কফন‚ সদগতি, শতরঞ্জ কি খিলাড়ি-র মতো কালজয়ী সৃষ্টি |

# পাশাপাশি আছে অসংখ্য নিবন্ধ‚ জীবনী‚ নাটক  এবং শিশু কিশোর কাহিনী |

মুন্সি প্রেমচাঁদ কোনওদিন ভারতের বাইরে পা রাখেননি | দুর্ভাগ্যজনক ভাবে অনুবাদের অভাবে তাঁর রচনা পৌঁছয়নি বিশ্বের দরবারে |

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.