প্রায় ২৫০ বছর আগে বিলেতে ফেনিল জলে অভিজাতদের মালিশস্নান দিতেন এই ভারতীয়

বাথটাবের ফেনিল সাগরে ডুবে যেতে যেতে ইউরোপিয়ান সুন্দরীরা কী করে জানবেন শেখ দিন মহম্মদের কথা ! বিস্মৃত এই নামটি আবার বুব্দুদের মতো ভেসে উঠেছে গুগলের দৌলতে | সম্প্রতি তাঁকে স্মরণ করেছিল গুগল ডুডল | ডিজিটাল মরসুমে শুকনো ঝরা পাতার মতোই উড়ে এলেন ২৬০ বছর আগে জন্মানো এই কপালে-পুরুষ |

১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম আজকের পাটনা শহরে | তখন যা ছিল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত | বক্সারের ছোট্ট গ্রাম থেকে পাটনায় এসে থাকতে শুরু করেছিলেন দিন মহম্মদের বাবা | যিনি ছিলেন নাঈ সম্প্রদায়ের | রীতি অনুযায়ী তাঁর পেশা ছিল ক্ষৌরকর্ম | তখন নাঈ সম্প্রদায় ছিল বংশগত ভাবে ক্ষৌরকার | ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে নিযুক্ত ছিলেন তিনি | সেই কোম্পানিই দায়িত্ব নেয় শেখ দিন মহম্মদের | যখন মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি পিতৃহীন হন | 

কোম্পানির এক সেনা আধিকারিক ছিলেন ক্যাপ্টেন গডফ্রে ইভান বেকার | অ্যাংলো আইরিশ এই অফিসার ছিলেন প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান | তাঁর তত্ত্বাবধানেই শিক্ষানবিশ ছিলেন মহম্মদ | মরাঠাদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ যুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন তিনি | দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র শানাবার মাঝে আর একটা কাজের কাজ সেরে রাখলেন ক্ষৌরকার পুত্র | ঘাঁটাঘাঁটি করলেন ক্ষার নিয়ে | ক্ষার ও ক্ষারীয় বস্তু নিয়ে গভীর চর্চা পরে তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল |

ব্রিটিশদের প্রতি প্রভুভক্ত হয়েও মহম্মদের চোখ এড়ায়নি বাংলা তথা সারা দেশে মুসলিম অভিজাতদের ক্ষয়িষ্ণু জায়মান অবস্থা | বাংলায় তখন ব্রিটিশদের হাতের পুতুল মীর কাশেম মসনদে | পলাশীর যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে | মীর জাফরের জামাই মীর কাশেমের অসহায় অবস্থা মহম্মদকেও আর্দ্র করেছে | কিন্তু একইসঙ্গে রোহিল্লাদের বিরুদ্ধে সুজাউদ্দৌল্লার অভিযান তাঁর ভাল লাগেনি | পছন্দ হয়নি পোল্লিলুর যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে হায়দর আলির জয়লাভ |

বেশিদিন জন্মভূমিতে বসে জয় পরাজয়ের খতিয়ান নিতে হয়নি মহম্মদকে | তাঁর কপাল খুলল ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে | সে বছর বেকার সাহেব অবসর নিলেন | সে বছরই ব্রিটিশ সেনার সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচিয়ে দিলেন মহম্মাদও | বেকার সাহেবের সঙ্গে পাড়ি দিলেন বিদেশে | আর ফিরে আসেননি গ্রেট ব্রিটেন থেকে | বিলেত যাওয়ার বারো বছরের মধ্যে লিখে ফেললেন বই | ভ্রমণকাহিনির নাম হল ‘ The Travels of Dean Mahomed ‘ | চেঙ্গিস খান তৈমুর আর বাবরের প্রশংসায় সে বই উচ্ছ্বসিত | 

বিদেশে গিয়ে কিন্তু বেকার সাহেবের উপর নির্ভর করে বসে থাকেননি মহম্মদ | কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ শুরু করলেন নাবোব বেসিল কখ্রানের অধীনে | এই নাবোব শব্দ সেই ইউরোপে খুব চলত | উর্দু শব্দ ‘নবাব’ থেকেই জন্মানো এই শব্দ বোঝাত ধনী সম্ভ্রান্ত ইউরোপীয় ব্যক্তিকেই | এই বেসিল করেছিলেন কী‚ পোর্টম্যান স্কোয়্যারের বড়িতে একটি স্নানঘর শুরু করেছিলেন | যেখানে উষ্ণ বাষ্পীয় ভাপে নিজেদের আদরের পরশ দিতে পারতেন সাধারণ মানুষও | 

বুদ্ধিমান মহম্মদ ঝোপ বুঝে কোপ দিলেন | স্নানঘরকে বদলে দিলেন ওষুধঘরে | শুরু করলেন শ্যাম্পুয়িং | ‘Champooi’ বা ‘Shampooing’ বলতে তখন ইউরোপে বোঝাত ভারতীয় মালিশ | যার স্রষ্টা এই মহম্মদ | ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে খাস লন্ডনে নিজের মালিশখানা শুরু করলেন মহম্মদ | এখন যেখানে কুইন্স হোটেল‚ সেখানেই ছিল এই দলাই মলাই ঠেক | কবোষ্ণ জলে এই ভারতীয় স্নান ছিল টার্কিশ বাথ-এর থেকেও বেশি জনপ্রিয় | কারণ‚ মহম্মদের প্রখর ব্যবসায়িক বুদ্ধি এতে যোগ করেছিল ওষধি গুণ | প্রচার করা হয়েছিল এই মলিশ স্নানে পালায় হাজারো অসুখ | গেঁটে বাত-সহ আরও নানা ব্যথা এই স্নানেই নাকি পালায় | কোথা থেকে কী হল কে জানে‚ অল্পদিনে রমরমিয়ে উঠল মালিশ কারবার | লন্ডন সমাজে মহম্মদ তখন ডক্টর ব্রাইটন | তাঁর কাছে রোগী পাঠাত হাসপাতালগুলোও | এমনকী‚ স্বয়ং রাজা ষষ্ঠ জর্জ ও ষষ্ঠ উইলিয়ামের মালিশওয়ালা ছিলেন মহম্মদ | পোশাকি কেতার নাম ছিল অবশ্য শ্যাম্পুয়িং সার্জেন ‘Shampooing Surgeon’ |  

সাহেবদের মাথা ঘুরলে‚ হৃদয় ডুবে গেলে আসতেন এই মালিশওয়ালার কাছেই | তবে তাঁকে জনি ওয়াকারের মতো পথে পথে ঘুরতে হতো না | পেয়ারেরা দলে দলে পা দিতেন মহম্মদের সালোঁ-তে | জনি ওয়াকারের  চম্পি তেলের মতো তাঁর সর্বগুণসম্পন্ন শ্যাম্পুও ছিল মুশকিল আসান |

ব্যবসায় লাভের অংশ থেকে শুরু হল মহম্মদের নতুন ব্যবসা | লন্ডনের ভুঁয়ে ভারতীয় খানাপিনার জন্য রেস্তোরাঁ | মধ্য লন্ডনের জর্জ স্ট্রিটে হিন্দোস্তান কফি হাউজ | অন্য খাবারের সঙ্গে ছিল হুকাহ | খাঁটি‚ চিকন ভারতীয় তামাকে মজত সাহেবি মন | পরে অবশ্য আর্থিক সমস্যায় বন্ধ হয়ে যায় এই রেস্তোরাঁ | 

দলাই মলাইয়ের কারবারে মহম্মদের পার্টনার ছিল স্ত্রী | তাঁদের বিয়ের গল্পও এক অভিযান | ভারত ছাড়ার পরে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ পৌঁছন আয়ারল্যান্ডের কর্কে | সঙ্গে সেই বেকার সাহেবের পরিবার | নিজের ইংরেজি আরও ঘষা মাজার জন্য ভর্তি হলেন স্কুলে | আলাপ হল জেন ড্যালির সঙ্গে | জেনের সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত আইরিশ পরিবার কিছুতেই এই সম্পর্ক মানল না | মহম্মদ ও জেন পালিয়ে গেলেন অন্য শহরে | কিন্তু আরও সমস্যা | তখনকার নিয়মে একজন প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান কেবলমাত্র আর এক প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানকেই বিয়ে করতে পারবেন | তাই মহম্মদ পাল্টালেন ধর্ম | ১৭৮৬ সালে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত মহম্মদ বিয়ে করলেন সুন্দরী জেনকে | উনিশ শতকের শুরুতে দুজনে ফিরলেন ইংল্যান্ডে |

ধীরে ধীরে মালিশ ঠেক আর তাঁদের সংসার‚ জমে উঠল দুইই | সাত সন্তান‚ রোজান্না‚ হেনরি‚ হোরেশিয়ো‚ ফ্রেডেরিক‚ আর্থার‚ দিন মহম্মদ এবং অ্যামেলিয়াকে নিয়ে ভরপুর জেনের ঘরকন্না | দিন মহম্মদকেও পরে ব্যাপ্টাইজ করা হয়েছিল | তাঁদের সন্তান সন্ততিদের মধ্যে ফ্রেডেরিক লন্ডনে টার্কিশ বাথ-এর ব্যবসা চালাতেন | এছারাও ছিলেন দক্ষ জিমন্যাস্ট | পরবর্তী প্রজন্মে নাতিদের মধ্যে বিখ্যাততম ছিলেন ফ্রেডেরিক হেবরি হোরেশিয়ো আকবর মহম্মদ | তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত চিকিৎসক | রক্তচাপ নিয়ে তাঁর গবেষণা সর্বজনবিদিত | আর এক নাতি জেমস কেরিমান মহম্মদ পরে সাসেক্সের হোভ-এর ভিকার পদে আসীন হয়েছিলেন উনিশ শতকের শেষ দিকে | 

উত্তরসূরীদের এই কৃতিত্ব সব না হলেও অনেকটাই দেখে যেতে পেরেছিলেন দীর্ঘায়ু মহম্মদ | তিনি প্রয়াত হন ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে‚ ৯২ বছর বয়সে | সেই থেকে ঘুমিয়ে আছেন তিনি‚ লন্ডনের সেন্ট নিকোলাস গির্জায় | তিনি‚ যিনি তথাকথিত শিক্ষিত না হয়েও ব্রিটেনে নেটিভ পর্দা উড়িয়েছিলেন‚ প্রথম ভারতীয় হিসেবে প্রকাশ করেছিলেন ইংরেজি বই , কার্যত সবার অগোচরে‚ সিপাহি বিদ্রোহেরও আট দশক আগে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.