ব্রিটিশ পুলিশের গোপন খাতায় ছিল নাম‚ রাজশক্তির কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘সন্দেহভাজন’

রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ্যে কোনোদিনই কী সন্ত্রাসবাদের পক্ষে কথা বলেছিলেন ? তবে বিপ্লবী কর্মী ও নেতারা তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কবি ব্যক্তি হত্যা, ডাকাতি সমর্থন করেননি কিন্তু দেশের মুক্তির জন্য নিবেদিত ব্যক্তিদের দেশপ্রেম, বীরত্ব, ত্যাগকে তিনি প্রশংসা করেছেন। অনেক বিপ্লবী তাঁর আশ্রমে ঠাঁইও পেয়েছেন। ১৯১৮ সালে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পর ভিন দেশি ছাত্র-শিক্ষকদের আগমন ও অবস্থান দেখে পুলিশ মনে করেছিল বিপ্লবীরা এখানে অনুপ্রবিষ্ট ও আশ্রিত। হীরালাল সেনের মতো বেশ কয়েকজন বিপ্লবী শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের কাজে নিযুক্ত হন।

ডঃ ভূপেন দত্তের মতো খ্যাতনামা কয়েকজনের কাছে অধ্যাপনার জন্য প্রস্তাবও পাঠানো হয়। ফলে রবীন্দ্রনাথ ও বিশ্বভারতী সম্পর্কে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স বিভাগের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা খুবই বেড়ে যায়। কবি ও বিশ্বভারতীর ওপর গোপন পুলিশের নজর খুবই কড়া হয়ে ওঠে। কবির দেশি বিদেশি সমস্ত ডাকের চিঠিপত্র সেন্সর হতে থাকে। কিন্তু এর বহু আগে পুলিশের গোপন খাতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম ছিল। ভারতের ব্রিটিশ রাজশক্তির কাছে তিনি ছিলেন—‘Robi Tagore, I. B. Suspect Number 11’। ব্রিটিশ সরকারের চোখে কবি একজন ‘দাগী’ ছিলেন। কলকাতায় থাকার সময় তিনি যখন ঘোড়ার গাড়ি চেপে রাস্তা দিয়ে যেতেন, সে সময় জোড়াসাঁকোর থানা থেকে পুলিশ হেঁকে জানিয়ে দিত, অমুক নম্বর আসামি যাচ্ছে।

স্বদেশী যুগ থেকেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার বিপ্লবীদের সমর্থন করত। তবে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ইংরেজ সরকারের ভয় ছিল বেশি। ইংরেজের গোপন পুলিশ বিভাগ এরকম আভাস পেয়েছিল যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় প্রবাসী বিপ্লবীরা বিদেশ থেকে অস্ত্রশস্ত্র আমদানী করে মুক্তিসংগ্রামের ষড়যন্ত্র করেছিলেন; তাতে কবি পরোক্ষভাবে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও সাহায্য করেছেন । ১৯১৬ সালে জাপান ভ্রমণের সময় প্রবাসী বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর সঙ্গে কবি সাক্ষাৎ করেছেন বলেও পুলিশের ধারণা ছিল। ইংরেজ পুলিশের উচ্চস্তরের বিশ্বাস ছিল রাসবিহারী ছাড়াও অন্যান্য বিপ্লবীরা সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে কবিকে ব্যবহার করছেন।

বিদেশ থেকে অস্ত্র ও টাকা এনে বিপ্লবী তৎপরতা পরিচালনায় কবির ইন্ধনের বাস্তবতা ছিল সানফ্রান্সিসকো ষড়যন্ত্র মামলা। ১৯১৮ সালে কবি আমেরিকা যাওয়ার আগে ৯ মে ১৯১৬ সালে আমেরিকায় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কবি অভিযুক্ত। অভিযোগ; কবি জাপান হয়ে আমেরিকা গিয়েছিলেন জার্মানদের অর্থানুকূল্যে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা দফতর কবিকে সন্দেহ করে এই কারণে যে ভারতবর্ষে সেইসময়ে তিনিই একমাত্র বিশিষ্টজন যিনি প্রথম থেকে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী কথা বলতেন ও লিখতেন।

যুদ্ধের সময় উগ্র জাতীয়তাবাদ বিরোধী বক্তৃতার কারণে ব্রিটিশ সরকার কবির ওপর মোটেও সদয় ছিল না। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর ইউরোপ-আমেরিকায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেও কবি সরকারের বিরাগভাজন হন। ইতিহাসের কী বিচিত্র গতি, এই সন্দেহভাজনকেই জগৎ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে আর তাঁকেই নাইট উপাধি দিয়ে গৌরবান্বিত হয় স্বয়ং ব্রিটিশ রাজশক্তি।

শান্তিনিকেতনে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার বিষয়টাও ইংরেজের দৃষ্টিতে ছিল বিপজ্জনক। ১৯১২ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশরাজ কার্লাইল ও রিজলি সার্কুলার নামে একটি গোপন সার্কুলার জারি করে। সরকারি চাকরিজীবীর ছেলেমেয়েরা যেন সেখানে পড়তে না যায় সে সম্পর্কে সার্কুলারে নির্দেশ দেওয়া হয়। এমনকী এই সার্কুলারের দু’বছর আগে ‘হুংকার’ (রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গীকৃত কাব্য) কাব্যগ্রন্থের লেখক ও রাজদ্রোহের কারণে জেল খাটা হীরালাল সেনকে শান্তিনিকেতনে চাকরি দেওয়ার জন্য কবিকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছিল। কেবল রবীন্দ্রনাথ নন, কালীমোহন ঘোষ, ক্ষিতিমোহন সেন, নন্দলাল বসুকেও ব্রিটিশ পুলিশের উৎপাত সহ্য করতে হয়েছিল।

১৯০৭ সালে ১৬ আগস্ট ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকায় রাজদ্রোহমূলক প্রবন্ধ লিখে অরবিন্দ ঘোষ গ্রেফতার হলে কবি তাকে নিয়ে ‘নমস্কার’ কবিতা লেখেন। সে যুগের সন্ত্রাসবাদীদের প্রেরণার অন্যতম প্রধান উৎস ছিল অরবিন্দের গীতা ও বৈদান্তিক মায়াবাদ। এই ঘটনা গোয়েন্দা সংস্থার চোখ এড়িয়ে যাওয়ার নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ব্রিটিশদের ‘ভারতরক্ষা আইন’(১৯১৫) এবং পুলিশী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ যে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিপ্লবী যুবকদের মুক্তির জন্য সভাসমাবেশে বক্তৃতা, বিবৃতি এবং নানা লেখা লিখতেন সেসব নিশ্চয় ব্রিটিশ পুলিশের নজর এড়াত না।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও নাইট উপাধি ত্যাগের পর কবি ইংরেজ সরকারের খুবই বিরাগভাজন হন।১৯২০ সালের ৫ জুন ইংলন্ডে পৌঁছে তিনি কোথাও আন্তরিক সংবর্ধনা পাননি। ১৯২০-২১ সালে যে সব ছাত্র-যুবক, বিশিষ্ট ব্যক্তি কলেজ ও সরকারি চাকরি ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন তাদের সুরুলের কুঠিবাড়িতে আশ্রয় দেন রবীন্দ্রনাথ। ব্রিটিশ পুলিশ কি এসব ঘটনা খুব সুনজরে দেখত ? শান্তিনিকেতনে প্রথম সারির বিপ্লবী নেতাদের আসা যাওয়া এবং কবির সঙ্গে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ; পুলিশের খাতায় নথিভুক্ত ছিল।রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের আশ্রয় দিচ্ছেন এ ধরনের রিপোর্ট রয়েছে ১৯২৫ সালের ৭ মে’র গোপন নথিতেও। ১৯২৫ সালের ৪ জুন ডিআইবি বড়কর্তা মি. হজের গোপন রিপোর্টে প্রথম সারির কয়েকজন বিপ্লবীর সঙ্গে কবির যোগাযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

কেদারেশ্বর গুহ ও ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত-র মতো বিপ্লবীদের আশ্রয় দেয়া নিয়ে সেই সময় প্রশ্ন ওঠে ব্রিটিশ পুলিশের উচ্চ দফতরে। ২৪ জুন বাংলা সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের বড়কর্তা মি. মিলেজও ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের সেক্রেটারি মি. টনকিনসনকে এক চিঠিতে ঢাকার অনুশীলন দলের অন্যতম প্রধান নেতা নরেন সেনের মে মাসে শান্তিনিকেতনে আসা ও কবির সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেন। মি. মিলেজ শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা ও নানা কাজের ফাঁকে বিপ্লবীদের ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক কার্যকলাপ চলছে বলে বিবরণ দিয়েছেন। তবে কবির শেষ জীবন পর্যন্ত শান্তিনিকেতন সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে বিপ্লবীদের অবস্থান, যাতায়াত, যোগাযোগ নিশ্চিত হয়েও সেইসব ব্যক্তির রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও কার্যকলাপের সঙ্গে কবির সংস্রব বা সমর্থন আবিষ্কার করতে পারেনি পুলিশ। বরং রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে বিপ্লবীরা কবিকে ব্যবহার করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের উদার মানবতাবাদ ও নিজস্ব শিক্ষাচিন্তা ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। তাঁর প্রতিবাদের ভাষা কোনওদিনই প্রচলিত স্লোগান অথবা আন্দোলনের পথে স্ফুরিত হয়নি। ‘নাইটহুড’ প্রত্যাখানের দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত কিংবা সাহিত্যের রূপকের মধ্য দিয়ে তাঁর আবেগ তীব্রভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। কখনো দেশবাসীর প্রতি অভিমানে তাঁর কণ্ঠ থেকে ঝরেছে ক্ষোভ।

ব্রিটিশ পুলিশের পক্ষে তাঁর কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বুঝে ওঠা কোনওদিনই সম্ভব হয়নি, ফলে তাদের চোখে রবীন্দ্রনাথ ক্রমশই সন্দেহজনক হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার প্রকাশ স্পষ্ট ছিল না। শান্তিনিকেতনে তাঁর ব্রাহ্মচর্যাশ্রমকে সরকারবিরোধী প্রতিষ্ঠান বলে সন্দেহ করেও সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নিতে পারেনি। কিন্তু গোয়েন্দারা সূক্ষ্মভাবে গুজব ছড়িয়েছিলেন, শান্তিনিকেতন আসলে একটি ‘রিফরমেটরি’।

তপন মল্লিক চৌধুরী
টেলিভিশন মিডিয়ায় বেশ কিছুকাল সাংবাদিকতা করেছেন । নানা ধরনের কাজও করেছেন টেলিভিশনের জন্য । সম্পাদনা করেছেন পর্যটন, উত্তরবঙ্গ বিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা। নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় । চর্চার প্রিয় বিষয় আন্তর্জাতিক সিনেমা, বাংলা ও বাঙালি।

2 COMMENTS

  1. চমৎকার একটি সুখপাঠ্য লেখা।

  2. জানা তথ্য তবু পড়ে ভাল লাগল উপস্থাপনার কারণে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here