নিজের সন্তানের সঙ্গে লেখিকা

তাহলে এখন আপনার ছোট্ট ছানা বা “পাপা কি জিগর কা টুকরা”কে নিয়ে আপনার নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। ভাবছেন,এত ছোট,সবসময় চোখে চোখে রাখতে হবে,একটুও যেন সে কষ্ট না পায়। কিন্তু তার সাথে যোগ হয় দিন রাত জাগা,খুদেটিকে খাওয়ানো,তার পটি-হিসি পরিষ্কার,আবার খাওয়ানো,আবার পটি-হিসি… কি চেনা চেনা লাগছে তো? তাহলে আপনি একজন নতুন মা। চোখের তলায় কালি,মাথার চুলের চালচুলো নেই,জামা কাপড় অবিন্যস্ত,হাফ পাগলের মত অবস্থা,ভাল কথাও যেনো শ্রুতিকটু মনে হচ্ছে,গোটা পৃথিবীটা মনে হচ্ছে আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে-এই সব উপসর্গগুলি থাকলে জানবেন আপনি নতুন মায়ের ক্যাটেগরিতে পড়েন।

Banglalive

প্রথমেই জানাই অনেক শুভেচ্ছা। একটি শিশু আপনার জীবন বদলে দেয়, আক্ষরিক অর্থেই। এই কষ্টগুলো আপনি হাসি মুখেই মেনে নেবেন শিশুটির মুখের এক চিলতে হাসি দেখার জন্য। একই সাথে,আপনার মনে হবে সব কিছু উচ্ছন্নে যাক,শুধু যদি একটু ঘুমতে পারতাম। আপনার স্বর্গের ডেফিনিশন তখন বাচ্চার কান্নাবিহীন খানিকটা ঘুম। ভ্যাকেশন মানে ঘুম। রেস্ট মানে ঘুম। শুধু ঘুম। কিন্তু সেটাই পাওয়া যায় না। স্তন্যপান করানোর জন্য আপনার খিদে এবং তৃষ্ণা দুটোই তুঙ্গে। দ্বিগুণ খাবেন আর জলপান করবেন। এই অবস্থায় পেপার-এ করিনা কপূর বা শাহিদ কপূরের বউকে দেখে আপনার মনে হতেই পারে,ইসস! ওরাও মা হয়েছে,আমিও,কিন্তু ওদের চেহারা,আর আমার! প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই আপনার শরীর তখন সবেমাত্র জন্ম দেওয়ার জন্য শিথিল,সাথে স্ট্রেচ মার্কস,এক গাদা চর্বি,সব মিলিয়ে আপনার আর পাশবালিশের মধ্যে তফাত নেই। কিংবা আছে। আপনি একজন মা হয়েছেন,নতুন প্রাণ এর সৃষ্টি করেছেন এবং এইগুলো তার সাইড এফেক্টস মাত্র। সে ক্ষেত্রে শরীরের কী ভাবে যত্ন নেবেন?

প্রথমেই বলি,নিজের চেহারা ফিলমস্টারদের সাথে তুলনা করে মানসিক অবসাদে ভুগবেন না। বা ফিমস্টার দের বৌদেরও। আপনি শো বিজনেসে নেই,অতএব আপনাকে সাইজ জিরো হতেই হবে বা এক্ষুনি নিজের সব মেদ ঝরিয়ে ফেলতে হবে এরকম কেউ মাথার দিব্বি দেয়নি। যারা আপনাকে ভালবাসে এবং আপনার ব্যাপারে চিন্তা করেন,তারা তো নয়ই। প্রথম ৬-৮ সপ্তাহ শুধু মাত্র নিজের খাওয়া দাওয়া এবং শিশুর দিকে নজর দিন। নানা লোকে নানা মত দেবে,সেফ হল নিজের ডাক্তার এর সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এই সময়ে এমনিতেও হরমোনাল চেঞ্জ এর জন্য মানসিক অবসাদ গ্রাস করে,তাই সুস্থ থাকাটাই লক্ষ্য,রোগা হওয়াটা নয়। যদি সম্ভব হয়, এই সময়ে বিকেলে আধ ঘন্টার জন্য হলেও একটু হাঁটতে বেরোন। যদি আপনার নর্মাল ডেলিভারী হয়ে থাকে তাহলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন, সিজারিয়ান হলে সার্জারিটা সারতে সময় দিন। মনে রাখবেন,সবার স্বাস্থ্য সমান নয়,তাই সেরে ওঠার সময়ও সবার সমান হয় না।এই সময়ে শরীরকে বেশি চাপ দেবেন না। বাচ্চা প্রসব করাটা একটা বিশাল স্ট্রেসফুল ব্যাপার, তাই শরীরের ওপর জোর করবেন না।

আরও পড়ুন:  মেকআপ কিট কি অন্যের সঙ্গে শেয়ার করেন? এখনই অভ্যাস পাল্টান‚ অজান্তেই ডেকে আনছেন অসুখ

দিতীয়ত প্রচুর পরিমাণ জল পান করবেন এই সময়ে,কারণ স্তন্যপান করালে প্রচন্ড পিপাসা পায় আর দুধের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য প্রচুর জল খেতে হবে। এর সাথে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে,হাল্কা সহজ পাচ্য কারণ সেটি আপনার শিশুর শরীরেও যাবে। ফল দুধ সবজি যা যা আপনার খেতে ভাল লাগে সেসব খাবেন। মোটা হয়ে যাবেন তাই খাবেন না এসব ভুলেও মাথায় আনবেন না। শরীর এর ক্ষমতা আগে ফিরিয়ে আনতে হবে। তবেই শরীর ফিট রাখার কথা ভাবতে পারবেন। ৬-৮ সপ্তাহ পর থেকে,বা আপনার সুবিধা মতন,যে সময়ে একটু ফাঁকা পাবেন,দিনে ১০ মিনিট,তাতে কিছু ফ্রি হ্যান্ড ব্যায়াম বা যোগ ব্যায়াম করতে পারেন। আজকাল ইউ টিউব এ প্রচুর টিউটরিয়াল আছে যাতে নতুন মায়েদের জন্য কী কী করা উচিত আর কী কী বাদ দেওয়া উচিত সব আছে। সেরকম হলে বাড়িতে কোনো যোগ ব্যায়ামের শিক্ষক রাখতে পারেন। ফ্রি হ্যান্ড করলে আপনার শরীরের ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়বে,এবং মাসল টোনিং হবে। তবে যাদের সিজারিয়ান হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে কী কী ব্যায়াম করবেন আর কী করবেন না সেগুলো একটু ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিলে ভাল হয়। পেটে চাপ পড়বে এই ধরনের ব্যায়াম না করাই উচিত।

এবারে আসি একটি দরকারী বিষয়ে,যেটা হল স্ট্রেচ মার্কস। স্ট্রেচ মার্কস যে শুধু বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে হয় তাই নয়,হঠাৎ করে কেউ রোগা বা মোটা হয়ে গেলে চামড়াতে লম্বা সাদা সাদা দাগ,বা স্ট্রেচ মার্কস দেখা দেয়। শিশু মায়ের গর্ভে যত বেড়ে ওঠে তত বেশি জায়গা করে দিতে ইউটেরাস বেড়ে যায় এবং পেটের আশেপাশের মাসলগুলি টান টান হয়ে বেড়ে যায়। প্রসবের পরে যখন গর্ভ থেকে শিশুটি বেরিয়ে যায় তখন এত তাড়াতাড়ি সেই মাসলগুলি আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনা। এই টান ও সংকোচনের ফলে পেটে চারিদিকে স্ট্রেচ মার্কস দেখা দেয়। অনেকেই এর ফলে লজ্জায় পড়েন,শাড়ি বা কোমর উন্মুক্ত জামা কাপড় পরতে। স্ট্রেচ মার্কস রোধ করতে বেশ কিছু তেল এবং লোশন বাজারে পাওয়া যায়। লাগাবেন নিয়মিত ৩-৪ মাস থেকেই,তাহলে স্ট্রেচ মার্কস প্রতিরোধ খানিকটা হলেও করা যায়। আবার,এটা অনেকটাই জিনের ওপরে নির্ভর করে। অনেকে এইসব ব্যবহার করেও তাদের দাগ রয়ে গেছে,অনেকে ব্যবহার না করেও দাগ নেই। তবে বাচ্চা জন্ম দেওয়াটা আনন্দের বিষয়,তাই আপনার স্ট্রেচ মার্কস নিয়ে লজ্জার কিছু নেই। এগুলো একটি যুদ্ধ জয়ের সুমধুর স্মৃতি হিসেবে গর্বের সাথে আপন করে নিন।ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি,আমি নিয়মিত তেল মাখতাম, এখনো মাখি,এবং অনেকটা স্ট্রেচ মার্কস হয়েও আস্তে আস্তে সেগুলি সব মিলিয়েও গেছে।

আরও পড়ুন:  মুড়ি ঘন্ট

বাচ্চার যখন ৬ মাস বয়স হবে এবং সে শক্ত খাবার খেতে শুরু করবে,তখন স্তন্যপানের ওপরে আর সে পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। যদিও আপনার ঘুম টানা হতে আপনাকে বছর দুই আড়াই অপেক্ষা করতেই হবে। কিন্তু এইবারে আপনি আস্তে আস্তে আপনার ব্যায়ামের সময় একটু বাড়িয়ে নিতে পারেন, এবং খানিকটা হলেও ডায়েট কন্ট্রোল শুরু করতে পারেন। ডায়েট কন্ট্রোল মানে না খেয়ে থাকা নয়,পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়া এবং ২-৩ ঘন্টা অন্তর অন্তর খাওয়া। কার্বোহাইড্রেট এর পরিমাণ কম করে প্রোটিন ইনটেক বাড়ানো। বাইরের ফাস্ট ফুড এড়ানো,খুব বেশি তেল মশলাযুক্ত খাবার না খাওয়া,এগুলিও ডায়েটের মধ্যেই পড়ে। প্রেগনেন্সিতে মায়ের ওজন কিছু না হলেও ১০-২০ কিলো বা তার ও বেশি বাড়ে। ফলে সেই এক্সট্রা ওজন কমানোটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। জিম জয়েন করতে পারেন,বা বাড়িতেই নিয়মিত ঘন্টা খানেক ব্যায়াম করতে পারেন। তাড়াহুড়ো করবেন না,এক দিনে ২-৩ ঘন্টা ব্যায়াম করে ফেলার চেষ্টা করবেন না,রোজ ব্যায়ামও করবেন না। এক আধ দিন গ্যাপ দেবেন যাতে মাসল রিকভার করার সুযোগ পায়। যেদিন ব্যায়াম করবেন না সেদিনকে হেঁটে নেবেন। এই ভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করলে একঘেয়েমি আসবে না।

আস্তে আস্তে আপনি আগের চেহারাতে ফিরে যাবেন,নিয়মের মধ্যে থাকলে। তবে মনে রাখবেন,সবার শরীর এক নয়,আর আপনার শুভাকাঙ্ক্ষীরা আপনার শরীর দেখে আপনাকে বিচার করবেন না। সবাই চায় নিজের পুরনো সুন্দর চেহারায় ফিরে যেতে,তাতে অন্যায় কিছু নেই,তবে অজথা নিজেকে এবং শরীরকে কষ্ট দেবেন না। মা হওয়ার আনন্দটা যেন আপনার রোগা হওয়ার ইচ্ছের কাছে চাপা না পড়ে যায়। 

NO COMMENTS