ভারতবর্ষ তথা এশিয়া উপমহাদেশের বহু দেশেই তামার পাত্রের প্রচলন বহু যুগ ধরেই হয়ে আসছে। এর কারণ তামার গুণাগুণ। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রেও তামার পাত্রে রান্না বা তামার পাত্রে রাখা জল পান করার কথা বলা হয়েছে। এখনকার বিজ্ঞানও ঠিক সেটাই বলে।আজকাল নানা ধরনের কাঁচের এবং মেটালের বাসন পত্র,ফ্লাস্ক ইত্যাদির প্রচলনের জন্য তামার ব্যবহার দৈনন্দিন জীবনে অনেকটাই কম। তার কারণ কাঁচ বা স্টীল বা পোর্সেলিন ব্যবহার এবং পরিষ্কার রাখা সহজ,এবং নানা ধরনের ডিজাইনে এবং আকৃতিতে পাওয়া যায়। কিন্তু তামার পাত্রের গুণাগুণ তাতে নেই। কী হয় তামার পাত্র থেকে জল পান করলে?

Banglalive

তামার পাত্রে সারারাত বা ৮ ঘন্টা জল ঢেলে রাখলে জলে খুব অল্প পরিমাণ তামার আয়ন জলে গিয়ে মেশে। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় অলিগোডাইন্যামিক এফেক্ট যার নানা ধরনের মাইক্রোবস,মোল্ড বা ফাঙ্গি কে নষ্ট করে দেয় এবং শরীর ঠিক রাখে।

তামা,একটি ট্রেস মিনারেল যা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এটি শরীরের মেটাবলিজম ঠিক রাখতে সাহায্য করে জিঙ্ক,পোটাশিয়াম এবং ক্যালশিয়ামের মতন অন্যান্য ট্রেস মিনেরালের সাথে। তামা শরীরের ভিটামিন এবং আমাইনো অ্যাসিডগুলিকে কার্যকর করতে সাহায্য করে এবং শরীর এর বাকি সব কাজকর্ম ঠিক রাখে।শরীরে তামার অভাব থেকে নানা ধরনের রোগ ব্যাধি দেখা দেয়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলে, তাম্র জল, বা তামার পাত্রে রাখা জল সেবন করলে শরীরের তিনটি দোষ,যথা বাত,পিত্ত ও কফ এই তিনটিকে ব্যালেন্স করা যায়। এছাড়াও :

১) তামার পাত্রে রাখা জল পান করলে নানা ধরনের জলবাহিত রোগ যেমন ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে এবং হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।

২) তামা থাইরয়েড-এর জন্য খুব উপকারী।তামা থাইরয়েড ব্যালান্স ঠিক রাখতে সাহায্য করে এবং হাইপো বা হাইপার থাইরয়েডিসম-এর জন্য খুব কার্যকর।  

৩) শরীরের তামার পরিমাণ কম হলে কিছু এনজাইম যা তামার ওপর নির্ভর এবং শরীরের আয়রনগুলিকে রক্তকণিকায় পৌঁছে দেয় তাতে ঘাটতি হয়। ফলে শরীরের অ্যানিমিয়া দেখা দেয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ তামা তাই অ্যানিমিয়ার হাত থেকে বাঁচায়।

আরও পড়ুন:  অবিশ্বাস্য ! ৪২ পেরিয়েও কৈশোরের সৌন্দর্য ! কী করে‚ জানালেন সুন্দরী

৪) তামা হার্ট এর পক্ষে উপকারী এবং ব্রেনের স্টিমুলেশন এর জন্য ও খুব প্রয়োজনীয় একটি উপাদান।

৫) তামা একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং আমাদের শরীরের ফ্রী র‍্যাডিকলগুলির বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে যার ফলে ত্বকে বয়সের ছাপ অনেক দেরীতে পড়ে।এছাড়াও তামা প্রোটিন ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করে, যেটি ত্বক চুল এবং মাসলের ক্ষতিপূরণে খুব কার্যকর। তামা কপার পেপ্টাইড নামক এক যৌগ তৈরি করে যা এই প্রোটিনগুলি কে পৌঁছে দেয় জায়গা মতন। তামা কোলাজেন তৈরিতেও সাহায্য করে যা ত্বকের যৌবন ধরে রাখে এবং বলিরেখা দূর করে।   

৬) তামা আমাদের ওজন কমাতেও সাহায্য করে।

৭) পর্যাপ্ত পরিমাণ তামা আমাদের চুল,ত্বকের স্বাভাবিক রঙ এবং টেক্সচার ধরে রাখতে সাহায্য করে। তামা মেলানিন নামক পিগমেন্ট তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা আমাদের স্বাভাবিক খয়েরী রঙ ধরে রাখতে সাহায্য করে। মেলানিন আমাদের নানা ধরনের চর্ম রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

কিন্তু তামার পাত্রে জল পান করা যেমন একদিক থেকে ভাল,তেমনি সারাদিন তামার পাত্র থেকে জলপান করা কখনই উচিত নয়। শরীরে তামার আধিক্য হলে নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে। তাহলে কীভাবে তামার পাত্রে জল সেবন করা উচিত?

আয়ুর্বেদ অনুসারে,তামার পাত্রে রাখা জল দিনে দু’বারের বেশি সেবন করা উচিত নয়। একদম সকালে ঘুম থেকে উঠেই একবার এবং সন্ধেবেলায় একবার,এই হওয়া উচিত পরিমাণ। এই ভাবে টানা তিন মাস পান করার পরে এক মাস বিরতি দেওয়া উচিত। আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় যদি শরীরের তামার আধিক্য হয়ে থাকে তবে তা বের করে ফেলতে সক্ষম হয়। অতএব, ওই এক মাসের বিরতি দেওয়াটা প্রয়োজনীয় |

কতক্ষণ ধরে রাখতে হয় তামার পাত্রে জল? একটি তামার পাত্রে জল ঢেলে নুন্যতম ৬ ঘন্টা এবং সর্বাধিক ৮ ঘন্টা রেখে সেই জল সকালে উঠে খালি পেটে পান করা উচিত। এতে অন্ত্রচালনা ভাল থাকে।

আরও পড়ুন:  বাবা রেগে মেয়ের পোশাক আগুনে পুড়িয়ে দিলেন...তারপর?

তবে খেয়াল রাখতে হবে তামার পাত্রটি যেন বিশুদ্ধ তামার হয় এবং তাতে অন্যান্য মেটালের মিশ্রণ না থাকে। তবেই এর গুণাগুণ এর ফল আপনি পাবেন।খেয়াল রাখবেন যেন খুব গরম জল তামার পাত্রে না ঢালা হয়। গরম জলে তামা অনেক দ্রুত গতিতে মেশে যার ফলে শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তামা প্রবেশ করতে পারে।  

তামার পাত্র দীর্ঘ দিন ব্যবহারে কালো হয়ে যায়,যাকে বলা হয় অক্সিডেশান। ফলে তামার পাত্র পরিষ্কার করতে হয় নিয়মিত।

তামার পাত্র পরিষ্কার করার সবচেয়ে সহজ উপায় হল নুন এবং লেবু,দুটি উপাদান যা যে কোনো রান্নাঘরেই পাওয়া যাবে। একটি পাত্রে অল্প নুন নিয়ে একটি লেবু কেটে তাতে ডোবান। এবারে ওই তামার পাত্রটিতে ওই লেবুটি ঘষে ঘষে লাগান, মাঝে মাঝে চাপ দিয়ে একটু করে লেবুর রস বের করতে থাকুন। এভাবে করুন যতক্ষণ না পুরো পাত্রটি নুন এবং লেবু দিয়ে ঘষা হচ্ছে।নুন এখানে স্ক্রাবারের কাজ করে। হয়ে গেলে পুরো পাত্রটি জল দিয়ে ধুয়ে নিয়ে আপনার রেগুলার ডিশ ওয়াশিং সাবান বা লিকুইড দিয়ে ধুয়ে নিন।

তামার বোতল ধুতে গেলে একটু লেবুর রস চিপে দিন বোতলের ভেতরে,অল্প একটু নুন এবং হাফ কাপ জল দিয়ে বোতলটি বন্ধ করে নাড়ুন। খুলে মিশ্রণটি ফেলে দিন এবং জল দিয়ে ধুয়ে নিন। দেখবেন আপনার তামার বোতল আগের মতই ঝকঝকে হয়ে উঠেছে নিমেষে।

লেবু না থাকলে ভিনিগার আর নুন ও ব্যবহার করতে পারেন।এক চামচ নুন ২ চামচ ভিনিগারে গুলে নিয়ে একটি তুলো বা সুতির কাপড় দিয়ে গোটা তামার পাত্রে লাগান যতক্ষণ না দাগগুলো পুরোপুরি চলে যাচ্ছে। এরপরে ধুয়ে ভাল করে সুতির কাপড় দিয়ে শুকনো করে মুছে নিন। তামার পাত্র শুকনো না রাখলে জলের জন্য গায়ে দাগ হয়ে যায়। তাই প্রতিবার ধোয়ার পরে শুকনো কাপড় দিয়ে অবশ্যই মুছে নেবেন।

আরও পড়ুন:  শিক্ষিকার সঙ্গে সমকাম ছাত্রীর! আত্মহত্যার হুমকি মা-বাবাকে! তারপর কী হল?

লেবু বা ভিনিগার এর বদলে বেকিং সোডা দিয়েও তামার পাত্র ভাল পরিষ্কার করা যায়। নুনের বদলে বেকিং সোডা এবং লেবু বা ভিনিগার দিয়ে উপরক্ত প্রক্রিয়া করলে একই ফল পাওয়া যায়।

এছাড়াও আজকাল বাজারে তামা পরিষ্কার করার জন্য নানা ধরনের সলিউশন কিনতে পাওয়া যায়।

আধুনিক খাদ্যাভাসের দরুণ আমাদের শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে তামা না থাকার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আমন্ড,কাজু, সবুজ শাক সবজি ,মাশরুম বিনস ইত্যাদি তামা সমৃদ্ধ। এছাড়াও তামার পাত্রে জল খাওয়া শরীরে তামার প্রয়োজনীয়তা মেটায়।

আজকাল বাজার চলতি নানা ধরনের কসমেটিক্স বা ক্রীমে কপার পেপ্টাইড একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় যা ত্বকের যৌবন এবং কমনীয়তা ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে সঠিক খাদ্যাভাস এবং তামার পাত্রে জলপান করলে শরীরের তামার ঘাটতি সহজেই মেটানো যায় এবং এত ধরনের ক্রীমেরও প্রয়োজন পড়েনা।সঙ্গে অবশ্যই লাগবে ব্যায়াম এবং শারীরিক পরিশ্রম।  

প্রাচীন যুগের মানুষেরা তামার গুণাগুণ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হলেও আমরা নতুন যুগের মানুষ সেগুলি ভুলতে বসেছি।স্বাভাবিক সুস্থ ভাবে বাঁচার জন্য তামার প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব অপরিসীম। তাই নিত্যদিনের অভ্যাসে ঢুকিয়ে নিন একটি তামার পাত্র এবং সুস্থ জীবনের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যান,অনায়াসে।      

NO COMMENTS