Holi Hai

 

বাঙালির মতো ভ্রমণ পিপাসু জাতি খুব কমই আছে। পাহাড় হোক কি সমুদ্র, নদী হোক কি মরুভূমি, কিংবা বরফ শীতল প্রকৃতি, গেলেই একটা না একটা বাঙালি পাবেনই। গ্যারান্টি। সেই চিরাচরিত মাঙ্কি টুপি আর মাফ্লার পরে, বা ঝাঁ চকচকে ডাইনিং হলে সেই নাইটির ওপরে ওড়না চড়িয়ে তাদেরকে দেখতে এবং চিনতে পারবেন। কী বললেন? এগুলো ক্লিশে? সে হতে পারে, তবে তাতেই বা ক্ষতি কী?

বেড়াতে যাওয়া নিয়ে প্ল্যানিং করাটা বেড়াতে যাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ কোথায় থাকবেন, কী খাবেন, কী দেখবেন, জায়গাটাই বা কেমন, সেসবের ব্যাপারে আগের থেকে না জেনে গেলে শুধু অপ্রস্তুতে নয়, বিপদেও পড়তে পারেন। আজকাল ইন্টারনেট হওয়ায় এবং প্রচুর ট্রাভেল সাইট খুলে যাওয়ায় বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যানিং অনেক সহজ হয়ে গেছে। তবে বাঙালিদের বাজেট ট্রিপ করার প্রবণতা বেশি। কারণ অফুরন্ত সময় বা টাকা বেশিরভাগেরই নেই। তবে খুব অল্প পরিসরে কিছু জিনিস আছে যেগুলো মাথায় রেখে প্ল্যান করলে বেড়াতে যাওয়াটা সুখকরও হবে এবং বাজেট-এর মধ্যে হবে। কী সেগুলো? আসুন, দেখে নিই এক এক করে :

১) কত দিনের জন্য বেড়াতে যাচ্ছেন, তার ওপরে নির্ভর করবে আপনাদের পুরো বাজেট ফিক্সিং। ছোট উইকেন্ড ট্রিপ হলে হাজার ৭ থেকে ১০ এর মধ্যে হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেটাই বেড়ে ১০ দিন হলে সেটা হাজার ৫০ বা লাখ খানেক অবধি পৌঁছে যেতে পারে। বেশি বই কম নয়। প্রতি দিন হিসেবেই বাড়বে থাকার, খাওয়ার আর ঘোরার খরচা, তাই কত দিনের জন্য সেটা আগে ঠিক করতে হবে।আপনার বাজেট যদি ১০ হাজার হয়, তাহলে ২-৩ দিনের বেশি ঘোরা সম্ভব না।

২) কোথায় যাবেন, সে নিয়ে অনেকেরই নানা ধরনের মত আছে। কেউ ভালবাসে পাহাড়, তো কেউ সমুদ্র, কেউ ঐতিহাসিক জায়গা, তো কেউ জঙ্গল। এখানে এক এক জায়গায় এক এক ধরনের খরচা। সাথে যদি বাচ্চা থাকে তাহলে পাহাড়ে যাবেন কিনা সেটা নির্ভর করবে ডাক্তারের মতামতের ওপরে। বেশি উচ্চতায় শ্বাস কষ্ট হয়, তাই ছোট এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে সেটা বিবেচনা করে এগোনোই ভাল।

৩) ফ্লাইট-এ যাবেন না ট্রেন-এ, নাকি বাস-এ? নির্ভর করবে আপনার ছুটির ওপরে, বাজেট এর ওপরে এবং রাস্তার ওপরে। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার দুপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য এত মনোরম হয় যে গাড়ি করে যাওয়াটাই একটা বড়সড় অভিজ্ঞতা। যদি হাতে সময় কম থাকে বা রাস্তা হয় অনেকটাই, যেমন ধরুন পূর্ব ভারত থেকে দক্ষিণ ভারতের কোথাও বেড়াতে যাচ্ছেন, সেখানে ১৭-২০ ঘন্টার কমে ট্রেন-এ পৌঁছাতে পারবেন না, সেখানে ফ্লাইট-এ যাওয়াটা সময়ের সাশ্রয়। ২-৩ মাস আগের থেকে টিকিট কেটে রাখলে ট্রেনের-এ টিকিট এর সাথে ফ্লাইট এর টিকিট-এর খুব বেশি দামের তফাত হয়না। তাই সেদিকে একটু খেয়াল রাখতে হবে। অনেক সময় কিছু জার্নি, যেমন ধরুন বম্বে থেকে গোয়া, বাস-এ করে গেলে ডেক্কান উপত্যকার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারবেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা ট্রেন জার্নি চেষ্টা করি, যদি ওভার নাইট জার্নি হয় সেক্ষেত্রে ট্রেন সবচেয়ে ভাল। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ট্রেন জার্নি সবচেয়ে সস্তাও।তাই কীসে ট্রাভেল করবে সেটা ঠিক করুন কোথায় যাচ্ছেন সেটার ওপরে নির্ভর করে, এবং আপনার বাজেট এর ওপরে নির্ভর করে।

৪) ভ্রমণ করতে গেলে সাথে লাগেজ কী নেবেন এবং কতটা নেবেন সেটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জামা কাপড় জুতো নিয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অথচ, একটু ভেবে চিন্তে আপনার ব্যাগ গুছোলে ভার লাঘব হবে অনেকটাই। কোথায় যাচ্ছেন এবং ক’দিনের জন্য, তার ওপরে ভিত্তি করে ব্যাগ গোছান। যদি পাহাড়-এ যাচ্ছেন তাহলে সেই সময়ে সেখানকার টেম্পারেচার এবং আবহওয়া কীরকম সেটা অনায়াসেই জানতে পারবেন সংশ্লিষ্ট হোটেল থেকে বা ইন্টারনেট থেকে।গরম জায়গা হলে সোয়েটার টুপির প্রয়োজন থাকে না। যদি ২-৩ দিনের ট্রিপ হয় তাহলে যাতায়াতের জন্য একটা সেট জামা প্যান্ট (সালোয়ার কামিজ বা শাড়ি- যেটা পরে রওনা দেবেন সেটা পরেই ফিরতে পারলে সবচেয়ে ভাল) আর বাকি দুটো দিনের জন্য দুটো টপ/ব্লাউজ আর একটা প্যান্ট/সালোয়ার। মিক্স আন্ড ম্যাচ করলে সিঙ্গল প্যান্ট বা সালোয়ারের সাথে আলাদা টপ পরতে পারেন, তাহলে একটা জামা কম হয়। জুতোর ক্ষেত্রে কিটো টাইপের জুতো পরে যাতায়াত করতে পারেন,খুলতে সুবিধা, হোটেল এও স্নান করার সময় ছাড়া বাকি সময়ে পরে ঘুরতে পারবেন, আর এক জোড়া হাওয়াই চটি হলেই চলে যায়। এটা যখন সমুদ্রে যাবেন তখন স্বাভাবিক ভাবেই সমুদ্র স্নান করার জন্য এক সেট জামা প্যান্ট এক্সট্রা নিতে হবে। পাহাড় হলে একটা ভাল শু ( ওয়াকিং বা রানিং) এবং কিটোস হলেই চলে যায়। ঠান্ডার জায়গা হলে যদি ২-৩ দিনের ট্রিপ হয় তবে একটা সোয়েটার এবং একটি চাদর আর টুপি মোজা, যদি সেটাই বেড়ে হয় ৬-৭ দিন বা ১০ দিন তাহলে একটা জিনস নিলে এবং একটি লেগিংস নিলে আর দু তিন টে টপ/কামিজ নিলেই আপনার গোটা টূর কাভার হয়ে যাবে।সোয়েটার এবং একটি মোটা জ্যাকেট কাফি। খেয়াল রাখবেন টপ বা কামিজ যদি সুতির হয় তাহলে ইস্ত্রি করার ঝামেলা থাকে, তাই চেষ্টা করবেন ভয়েল/শিফন/জর্জেট বা সিন্থেটিক এর টপ নিতে,যাতে ইস্ত্রি করার ঝামেলা টা না থাকে। আজকাল অবশ্য ট্রাভেল আইরন পাওয়া যায়, তাই অনায়াসেই আপনার প্রিয় নীল রঙের টপ বা কামিজ টি ঢুকিয়ে নিতেই পারেন। যদি কোনো স্পেশাল অকেশান সেলেব্রেট করার ব্যাপার থাকে তাহলে অবশ্যই সেই আশমানি রঙা তসরটি নিতে ভুলবেন না। ছেলেদের ক্ষেত্রে কোট প্যান্ট একটু বাল্কি হয়ে যায়, তাই সাদা জামা নীল জিন্স এ সেই ক্লাসিক লুক টা চেষ্টা করে দেখুন, আবার হৃদয় জিতে নেবেন, নতুন করে, সেই পুরনো মানুষ টির। তবে শীতের জায়গা হোক কি গ্রীষ্ম, সাথে একটা পাতলা চাদর/স্টোল সব সময় সাথে রাখবেন। ফ্লাইট এ হোক কি ট্রেন এ, বেশি শীত করলে, বা ছোট বাচ্চাদের বেশি ঠান্ডা লাগলে অথবা স্রেফ ধুলো বালি থেকে নিজেকে বাঁচাতে এই স্টোলের জুড়ি নেই। লাগেজ এমন ভাবে নেবেন যেটা ফ্লাইট এ নিজে কেবিন-এ তুলতে পারবেন সাহায্য ছাড়াই, বা ট্রেন থেকে নামাতে সবসময় কুলির প্রয়োজন যাতে না হয়। কিছু জিনিস আছে যেগুলো ফ্লাইট এ নিয়ে যাওয়া মানা, যেমন ছুরি কাঁচি, ব্লেড,সেফটি পিন ইত্যাদি। সেগুলো চেক ইন এ ঢোকাতে ভুলবেন না। ট্রেন হলে সেসব সমস্যা নেই। সঙ্গে রাখবেন একটা হ্যান্ড স্যানিটাইজার স্প্রে, একটা মশার স্প্রে,সব রকম পরিস্থিতির জন্য। ক্রীম বা লোশন,সাবান বা শ্যাম্পু ছোট ট্রাভেলারস শিশি তে নিতে পারেন। এভাবেই, নিজের লাগেজ প্যাক করুন। হাল্কা ট্রাভেল করাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। বাচ্চাদের ডায়পার ওয়াইপ্স এইসব ১-২ দিনের স্টক রাখুন, বাকিটা জায়গাতে পৌঁছে কিনে নিতে পারবেন।

৫) হোটেল – বহু কষ্ট করে লম্বা ট্রেন জার্নি করে শেষমেশ হোটেল এ পৌঁছে দেখলেন গিসারটা কাজ করছেনা, বা রুমটা সি ফেসিং বা মাউন্টেন ভিউ হলেও এতটাই দূরে সমুদ্র বা পাহাড় যে প্রায় কিছুই দেখা যায়না। অথচ এক গাদা টাকা নিচ্ছে রুমের জন্য। আপনার পছন্দ যদি হয় ফাইভ স্টার হোটেল, তাহলে এইসব সমস্যাগুলো হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাজেট হোটেল অনেক আগেই বুকিং হয়ে যায়। সবচেয়ে ভালগুলো এবং সবচেয়ে ভাল রুমগুলো আগেই বেরিয়ে যায় লিস্ট থেকে। ফলে যদি আপনার প্ল্যান করা হয়ে গিয়ে থাকে,তাহলে অবশ্যই বাজেট হোটেল বাছুন এবং সত্তর বুক করুন। এর জন্য ইন্টারনেট এর সাহায্য নিতে পারেন। লোনলি প্ল্যানেট এর মতন ওয়েবসাইট এ বা এমনিও সেই জায়গার হোটেল এর লিস্ট এ পূর্বে থেকেছেন এরকম বহু মানুষ পাবেন, যারা সেই হোটেল বা জায়গাটির রেটিং করেন। পরিচ্ছন্নতা, রুমের সাইজ, আম্বিয়েন্স, ভিউ, পৌঁছানোর সুবিধা, সেখান থেকে দর্শনীয় স্থানগুলির দুরত্ব, খাওয়া দাওয়া,এইসব নিয়েই তারা লেখেন। সুতরাং হোটেল পছন্দ করার সময় তাদের রিভিউগুলো অবশ্যই পড়বেন। লোকেশানটা ঠিক কোথায় সেটার জন্য গুগল ম্যাপ এর সাহায্য নিন। হোটেলটি পাহাড়ের ঠিক কত কাছে এবং নিকটবর্তী রেলয়ে স্টেশান বা এয়ারপোর্ট কত কাছে সেসবের দুরত্বও দেখতে পেয়ে যাবেন। যদি খুব ভোরে ফ্লাইট ধরতে হয় ফেরার বা খুব রাতের ট্রেন হয় এবং হোটেল অনেকটাই দূরে,এবং আপনার সাথে বাচ্চা বা বয়স্ক লোক আছেন তখন অন্য কোনো হোটেল এ থাকার কথা ভাবতে হতে পারে। বা, হোটেল থেকে দর্শনীয় স্থানগুলি যদি খুব দূরে হয় তাহলে গাড়ি ভাড়া এতটাই পড়বে যে আপনার বাজেট ক্রস করে যাবে। অনেক সময় শীতকালে কোথাও গেলে এ সি রুমের প্রয়োজন পড়ে না। তাতে কিন্তু আপনার বাজেট অনেকটাই কমবে এবং আরো একদিন বেশি থাকার কথাও ভাবতে পারেন। অনেক হোটেল এ ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি থাকে, সেটার সাথে আলাদা করে ব্রেকফাস্ট আর রুম নিলে কত পড়বে, কম্পেয়ার করে দেখে যেটা কম হবে সেটাই বাছবেন। পাহাড়ের দিকে হোমস্টেগুলি অনেক সস্তা এবং লোকাল খাওয়ার এবং পরিবেশে থাকার সুযোগ মেলে। চেষ্টা করবেন সেগুলিতে বুকিং করার।

৬) লোকাল পরিবহন- হোটেল থেকে অনেক সময় বাসএ করে টূর এর এরেঞ্জমেন্ট থাকে, যেটার খরচা আলাদা গাড়ি নেওয়ার চেয়ে কম পড়ে। যদি হোটেল খুব দূরে হয় স্টেশান বা এয়ারপোর্ট থেকে, অনেক সময় হোটেলের পিক আপ ড্রপ থাকে। আলাদা গাড়ি ভাড়া করলে খরচা বেশি পড়ছে কিনা সেটা হিসেব করে নিয়ে গাড়ি বুক করবেন। যদি খুব রাতে বা খুব ভোরে পৌঁছান তখন হোটেলের পিক আপ ড্রপ নেওয়াটা সেফ, যাতে ট্রেন বা ফ্লাইট মিস না করেন। যেকদিন থাকবেন, গাড়ি ভাড়া করেই রোজ ঘুরবেন নাকি লোকাল অটো বা বাস রুট এক্সপ্লোর করবেন সেটা ভেবে দেখতে পারেন। খরচা অনেকটাই বাঁচবে। সাথে থাকবে গুগল ম্যাপ।

৭) খাওয়া দাওয়া- হোয়াইল ইন রোম, ডু আস দা রোমানস। সুতরাং, যেখানে যাচ্ছেন তার লোকাল খাবার খেলে আপনার খরচা কম পড়বে,আবার নতুন ধরনের খাওয়ার ও খাওয়া হবে। বাইরে বেরলে নিরামিষ খাওয়া ভাল,শরীর ভাল থাকে, পেটের গন্ডগোল কম হয়। এক আধ দিন জমিয়ে খেতেই পারেন। সব জায়গাতেই ভাত ডাল রুটি সবজি পাওয়াই যায়। অতএব লোকাল খাওয়ার খেতে না পারলেও চিন্তা নেই। রোজ যদি কন্টিনেন্টাল বা মোগলাই খান, পকেটে টান কিন্তু বেশিই পড়বে।

 

আরও পড়ুন:  প্রজাতন্ত্র, পাবলিক ও পরিণত জনমানস

মোটামুটি বেড়াতে বেরনোর আগে এইগুলো হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেগুলো আগের থেকে ভেবে রাখলে পরবর্তীকালে বেড়াতে গিয়ে অসুবিধার সম্মুখীন হতে কম হবে। তাহলে আর দেরী কীসের? বেরিয়ে পড়ুন, অজানার উদ্দেশ্যে।

NO COMMENTS