হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত : এক পুরোনো বিবাদ

hemanta mukherjee singer

তিনের দশকের মাঝামাঝি, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আধুনিক গান ও চিত্রগীতির কেরিয়ার শুরু— অথচ রবীন্দ্রনাথের গানের জগতে আসতে তাঁর অনেকটাই বিলম্ব। এক দূরদর্শন-সাক্ষাৎকারে হেমন্ত নিজেই জানিয়েছেন, তাঁকে রবীন্দ্রনাথের গান ‘শেখানো’র কেউ ছিল না, যখন তিনি জানতে পারলেন যে সে-গানেরও স্বরলিপি পাওয়া যায় বিশেষ পত্রপত্রিকায় (তখন স্বরবিতান মিলত না), তিনি উৎসাহিত হয়ে নিজেই নোটেশন দেখে গান ‘তুলে’ নেওয়া শুরু করলেন। সেইভাবেই প্রথম রেকর্ড এল— ‘আমার আর হবে না দেরি’। গানটি নির্বাচনের মধ্যে সচেতন ভাবনা ছিল বলেই মনে হয়।

হেমন্ত গান শেখেননি কোনও নামজাদা গুরুর কাছে, উচ্চাঙ্গের তালিম নিতে গিয়েও ছেড়ে দেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতেও তিনি মূলত স্বশিক্ষিত। অনাদি দস্তিদার, মায়া সেন প্রমুখ সুপ্রসিদ্ধ ট্রেনারের তত্ত্বাবধানে রেকর্ড করেছেন, সুচিত্রা মিত্রের মতো বন্ধুদের কাছ থেকেও শিখে নিয়েছেন অনেক গান— কিন্তু ‘প্রথাসিদ্ধ’ রবীন্দ্রসঙ্গীত-শিক্ষা তাঁর ছিল না। আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গেলে ক্লাসিক্যাল গানের শিক্ষাও নিতে হয়, লোকসঙ্গীতের বিভিন্ন আঙ্গিকও রপ্ত করতে হয়। হেমন্ত না শিখেছেন ক্লাসিক্যাল, না কীর্তন-বাউল। তিনি তবে এতদিন ধরে এত বিপুলসংখ্যক রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে রেকর্ড করে গেলেন কী করে, এত মানুষের মুগ্ধতা অর্জনই বা হল কেমনভাবে?

এর একটা সহজ উত্তর বাতাসে ভাসতে দেখা যায়। একদল প্রাজ্ঞ শ্রোতা পরিষ্কার বলে দেন, ‘ওইজন্যেই তো ওঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশুদ্ধ হয়নি। যেভাবে গাওয়া উচিত, উনি তা পারেননি। সহজ করে ঢেলে গেয়ে গেছেন, ফ্ল্যাট, পপুলারিস্টিক পরিবেশন।’

কঠোর বাস্তব এটাই যে, রেকর্ড বা ক্যাসেট বিক্রিতে প্রায় শীর্ষে থাকলেও, রবীন্দ্রসঙ্গীত-গায়ক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বাঙালি সঙ্গীতবোদ্ধাদের (যাকে বলে ‘ক্রিম অব ইন্টেলেকচুয়ালস,’ সেই মহল) থেকে কখনওই নিরঙ্কুশ স্বীকৃতি পাননি।

বাঙালি এলিট-সমাজের একটা বড় অংশকে বরাবর রবীন্দ্রসঙ্গীতের তথাকথিত ‘বিশুদ্ধতা’র দর্শনের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসতে দেখা যায়, যার সঙ্গে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে থাকে ‘হাই-কালচারে’র ঘ্রাণ। রবীন্দ্রগানের ওই ‘শুদ্ধতাবাদী’ ব্র্যান্ডটির কদরদান হলে তবেই সমাজে ‘রুচিশীল’ তথা ‘শিক্ষিত’ শ্রোতা হিসেবে মান মেলে। প্রচল বাক্‌ভঙ্গি থেকে ভিন্ন একধরনের কৃত্রিম উচ্চারণরীতি, আর এক-চুল-না-এদিক-ওদিক-হয় এমন নোটেশন-অনুগত অর্থোডক্স গায়ন— এই জিনিসের ভক্ত হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চায় একশ্রেণীর বাঙালি ভোক্তা, নিছকই যাতে ট্রাম-বাসের সহযাত্রী কিংবা কফিহাউস-ড্রয়িংরুমের ইয়ারবান্ধবের চেয়ে নিজেকে উঁচুদরের রসিক প্রমাণ করা যায়। বিইং ডিফারেন্ট!

কথাটা তেতো হলেও সত্যি। ‘জাতে উঠতে-চাওয়া’ বাঙালি রবীন্দ্রবোদ্ধা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ড কেনে, শোনেও, কিন্তু প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে অন্য সব বাছা-বাছা নাম উচ্চারণ করে; শুধু তাই নয়, ‘হেমন্তর রবীন্দ্রসঙ্গীত ঠিক পিওর রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়নি, আধুনিক গান হয়ে গেছে’ বলে মৃদু ঠোঁট বাঁকায়। আজ নয়, দীর্ঘদিন ধরেই।

#

কিন্তু ‘পিওর রবীন্দ্রসঙ্গীত’ বস্তুটি কী? শিল্পোত্তীর্ণ আধুনিক/লঘুসঙ্গীতের থেকে তার গায়নরীতির কী এমন অনিবার্য ফারাক?

শ্রাব্য-আনন্দ দানের শিল্পমাধ্যম হিসেবে একটি গানের গায়ন, তার বাণী-সুর-কণ্ঠ-যন্ত্রানুষঙ্গের মিলিত অভিঘাতে, একটি সার্থক ও সামগ্রিক ছবি বা অভিপ্রেত ভাবের বিকাশ ঘটাতে পারল কিনা— এই ‘হোলিস্টিক’ বিচারেই মূল্যায়িত হওয়া উচিত বলে আমাদের বিশ্বাস। সে রবীন্দ্র দ্বিজেন্দ্র অতুলপ্রসাদ নজরুল রামপ্রসাদ নিধুবাবু বা হালের সলিল সুমন যাঁরই কম্পোজিশনই হোক। ধরা যাক, ‘পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি’ আর ‘আমার এই পথ-চাওয়াতেই আনন্দ’— দুটি গানেরই মর্মবস্তু যদি কোনও গায়ক একই রকম আন্তরিক নিবেদনে ও সহজ-স্বাভাবিক গায়নে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন, বেছে-বেছে দ্বিতীয় গানটির ক্ষেত্রেই কেন ‘বিশেষ’ বা ‘বাড়তি’ কোনও ভঙ্গির ‘প্রেস্ক্রাইবড ফরম্যাট’ দাবি করা হবে?

বোঝাই যাচ্ছে, আমরা কোনও বিশেষ প্রপার নাউনের ওপর ঈশ্বরত্ব-আরোপের বিরোধী। হ্যাঁ, জনৈক রবীন্দ্রনাথ সকলের, সক্কলের চেয়ে ভাল সৃষ্টি করেছেন— এ পর্যন্তও যদি মেনে নিই, তবু শুধু ‘শ্রেষ্ঠত্বে’র যুক্তিতেই সেই সৃষ্টির চারদিকে একটা আরোপিত বেড়া টাঙিয়ে, আইন খাটিয়ে আর প্রচার করে জনমানসে ‘শুদ্ধ/অশুদ্ধ’-র একটা ধোঁয়াশা তৈরি করা বেশ হাস্যকর লাগে। জনৈক ব্রাজিলিয়ান পেলে সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় ছিলেন, কিন্তু মাঠে নামার পর তাঁর জন্য আলাদা ফাউল-অফসাইডের নিয়ম খাটত না; বাকি একুশজনের জন্য যা নিয়ম, তাঁরও তাই। শেক্সপীয়র নামের এক ইংরেজ সর্বোৎকৃষ্ট নাটককার ছিলেন, কিন্তু তাঁর নাটক মঞ্চস্থ করার ক্ষেত্রে বিলেতে স্টেজ লাইট কস্ট্যুম ডায়লগ-থ্রোয়িং নিয়ে কোনও নিয়ামক সংস্থার চুলচেরা পাহারাদারি নেই, এমনকী দর্শকদের মধ্যেও কোনও ডগমা গড়ে ওঠেনি; বাকি নাট্যলেখকদের মতোই তাঁর রচনার মঞ্চায়নেও প্রয়োগকর্তার স্বাধীনতা অবাধ, প্রযোজনাটি ভাল হলে লোকে প্রশংসা করে, মন্দ হলে গালাগাল দেয়।

অন্যান্য বাঙালি কম্পোজারদের সৃষ্টির সতীত্বরক্ষার জন্য বাজারে পাহারাদার মোতায়েন নেই, ‘বিশুদ্ধ দ্বিজেন্দ্রগীতি’, বা ‘পিওর সলিলের গান’ বলে কিছু অতিরিক্ত কড়াকড়ি নেই, তবু সেসব গান লোকের মুখে, কানে ও হৃদয়ে দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে। ‘গাওয়াটা শুনতে ভাল হলে কী হবে, স্বরলিপি ফলো হয়নি তিন জায়গায়’— এই গোত্রের অচলায়তনী ছিদ্রান্বেষণ কেন যে, অন্য কারও গানের বেলায় না হয়ে, বরাবরের নিয়ম-ভাঙা পরীক্ষা-প্রিয় মুক্ত-চিন্তক স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের গানকে ঘিরেই ঘটে চলল এত দীর্ঘকাল— এ এক আয়রনিই বটে!

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিরুদ্ধে এই অভিযোগটিই সর্বাধিক শোনা যায়। বলা হয়, তাঁর গানে তিনি প্রামান্য স্বরলিপির সূক্ষ্ম প্যাঁচপয়জার অনেকক্ষেত্রে এড়িয়ে গেছেন।

‘সোজাসাপ্টা গাওয়া’ নিয়ে কথাটা অবিশ্যি টেকনিক্যালি ভুলও নয়। গান ধরে-ধরে দেখানো যায়— কোথায় তাঁর গায়নে একটি কি দুটি নির্ধারিত নোটের কারুকাজ একেবারেই লাগেনি, কোথায় মূল স্বর থেকে সামান্য সরে গেছে, কোথায় এক-আধটি বাড়তি স্বরও এসে পড়েছে। কোথাও তিনি পরিচিত বা প্রত্যাশিত লয়ের বদলে দ্রুততর লয়ে গেয়েছেন, কয়েকটি গান অপ্রয়োজনীয় উঁচু স্কেলে গাইতে গিয়ে একটু চিৎকৃত শুনিয়েছে। বেশ কিছু গান তাঁর কণ্ঠে শুনে মনে হয়, একটু তাড়াহুড়ো হল বোধ হয়, আরেকটু ভাবনার দরকার ছিল কি? শেষ দশ-বারো বছর তাঁর কণ্ঠ তারসপ্তকে অস্বচ্ছন্দ ছিল, দমের ঘাটতির কারণেও অনেক জায়গায় স্খলিত হয়ে পড়েছে, অভিব্যক্তির মগ্নতা নষ্ট হয়েছে। মান্না দে একবার বলেছিলেন, হেমন্তবাবুর রবীন্দ্রসঙ্গীত খুব ভাল লাগে, কিন্তু কিছু গান বড় ‘ম্যাটার অব ফ্যাক্ট’ ঢঙে গেয়েছেন।

১৩৭৪ সালে ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় সত্যজিৎ রায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের হালহকিকত নিয়ে এক প্রবন্ধ লেখেন। ঠিক তার পরে, ওই প্রবন্ধ নিয়েই একটা আলাপচারিতা হয় সত্যজিৎ ও রবীন্দ্রসঙ্গীত-বিশেষজ্ঞ সুভাষ চৌধুরীর মধ্যে। অনেকেই শুনেছেন সেই আলাপনের রেকর্ড। যেখানে সুভাষ প্রসঙ্গ উশকে দিচ্ছেন : অনেক ‘পপুলার’ গাইয়ে আজকাল রবীন্দ্রনাথের গানের সূক্ষ্ম কাজগুলি ঘষেমেজে সরল সাদামাটা করে গান, কারণ তাঁদের গলায় সেই কাজের উপযোগী সক্ষমতা নেই, — এবং সত্যজিৎ বেশ প্রকট কৌতুকের সঙ্গে ‘এই তো ধরো আমাদের হেমন্তই তো… তবু লোক শুনতে চাইছে’ বলে হাসিতে ফেটে পড়ছেন, সুভাষ তাঁকে সমর্থন করছেন : হ্যাঁ, হেমন্তবাবুর তো গলায় নেই এইসব, ইত্যাদি। এর পরেও, অবশ্য সরাসরি নাম না করে, কিন্তু যেন পরোক্ষে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে ঘিরেই আলোচনাটি আরও গড়ায়। দুই ‘দীক্ষিত’ রসজ্ঞই একমত হন যে, শেষে হয়তো এমন করতে হবে যে শিক্ষার্থীকে গানের দুটো রূপ দেখিয়ে বলতে হবে— এইটা আসল রূপ, ‘প্রিস্টিন্‌ ফর্ম বা ভালো ফর্ম’ যা ‘সেরা গাইয়ে’র কাছে মিলবে, আর এইটা হল সোজাসাপ্টা পপুলার ভার্সন, যাকে সত্যজিৎ বলছেন ‘লোয়েস্ট কমন ডিনমিনেটর’! হেমন্ত, স্পষ্টতই, সেরার স্তরে নন এঁদের বিচারে— তিনি দ্বিতীয় গোত্রভুক্ত।

#

কিন্তু, কয়েকটি সুর-সরলীকরণের নিরিখেই, বা আদৌ শুধুই স্বরলিপি-আনুগত্যের নিক্তি-বিচারে কি মূল্যায়ন হওয়া উচিত হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো অসাধারণ গায়কের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের মতো অসাধারণ কম্পোজারের গানের? গান কি স্বরলিপি-অনুগমন মাত্র, না তার চেয়েও বেশি কিছু— বস্তুত অনেকটাই বেশি?

পাশাপাশি পাঁচটা নরকঙ্কালকে রাখলে যেমন প্রায় একই দেখায়, আলাদা করে চিনে রাখা শক্ত হয়— অথচ তাদের পূর্ণাঙ্গ মানবরূপ একেবারে ভিন্ন— গানেও তাই। একই স্বরলিপি পাঁচজন ভিন্ন গাইয়ের পরিবেশনে, অভিব্যক্তি কণ্ঠসম্পদ উচ্চারণ এমনকী যন্ত্রসঙ্গতের ভিন্নতায়, আলাদা আলাদা ইন্টারপ্রিটেশন নিয়ে ফুটে ওঠে। যখন মাংস-চামড়া দিয়ে কঙ্কাল ঢেকে যায়, তখন ভিতরে একটা খুদে হাড় কোথায় কিঞ্চিৎ আলাদা, কোন্‌ গভীরের জোড়মুখে একটু কৌণিক হেরফের হয়ে রইল— সেটা রেডিওলজিস্টের গবেষণার বস্তু হলেও হতে পারে, রসভোক্তা প্রেমিকের তাতে কীই বা আসে যায়। কঙ্কালটি তো শিল্প নয়, পূর্ণ অবয়বটিই আসল, সেটিই শেষ কথা— তাকে ঘিরেই যত ভাবের আন্দোলন।

দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে অজস্র গান রেকর্ড করতে হয় যে গায়ককে— বিশেষত বাণিজ্যিক দিকটির কথা সর্বদা মাথায় রেখে— তাঁর বহু গানের মধ্যে কয়েকটি স্খলন, বিচ্যুতি বা মানের তারতম্য হওয়া স্বাভাবিক, একেবারেই হিউম্যান ফ্ল। সে-বিচার করতে বসলে, যাঁদের গায়নে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ‘শুদ্ধতম’ রূপ ধরা পড়েছে বলে দাবি করা হয় তাঁদেরও বিস্তর গানে বয়সোচিত কণ্ঠদৌর্বল্য, অভিব্যক্তির নীরসতা— এমনকি স্বরলিপি-বিতর্কও— চোখ এড়ায় না। লম্বা কেরিয়ারের শুরু থেকে একদম শেষ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠমানের কণ্ঠসক্ষমতা স্বরক্ষেপণ-উৎকর্ষ শ্বাস-প্রাচুর্য ও কারুকার্য-পারদর্শিতা— কোন্‌ গাইয়েই বা এমন নিটোল অবাস্তব আদর্শ বজায় রেখে যেতে পেরেছেন? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরই বৃদ্ধ বয়সের গায়ন পুরোপুরি নিজের স্বরলিপি-অনুগামী নয়, দেখা গেছে। একই গান তিনজন ‘শুদ্ধ’ গাইয়ের গলায় আলাদা আলাদা স্বরলিপিতে ও লয়ে ধরা দিয়েছে— এমন নমুনাও সহজে মিলবে। সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর স্বরলিপিতে গাওয়া গান লিজেন্ড হয়ে গেছে প্রবাদপ্রতিম গায়িকার কণ্ঠে। কিন্তু তাঁদের ‘ব্র্যান্ড’ অক্ষুণ্ণ, এলিট সমাজে তাঁদের শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলির নিরিখেই তাঁরা আদৃত।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রগানের মূল্যায়ন কেন তাঁর শ্রেষ্ঠ নিবেদনগুলির সাপেক্ষে, এবং তাঁর নিবেদনগুলির মূল্যায়ন কেন তাঁর গায়নের শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্যগুলির ভিত্তিতে হবে না?

#

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “আমার গান যাতে আমার গানই মনে হয় এইটুকু তোমরা দেখো।” পঙ্কজকুমার বা সায়গলের মতো জনপ্রিয় লঘুসঙ্গীত-গায়কের কণ্ঠে নিজের গানকে তিনি স্বাগত জানিয়েছিলেন, খুশিও হয়েছিলেন, সেখানেও কিন্তু এখানে-ওখানে স্বরলিপির চ্যুতি বা সরলীকরণ— বা তথাকথিত ‘রাবীন্দ্রিক’ উচ্চারণভঙ্গির অনুপস্থিতি— আমাদের নজর এড়ায় না।

সেক্ষেত্রে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পরিবেশনায় রবীন্দ্রনাথের গান যে স্বধর্ম হারিয়ে বসে, শুদ্ধতাবাদীদের এমন বক্তব্য আমাদের অসার মনে হয়। দু-পাঁচটি স্বর-অদলবদলের দরুনই রবীন্দ্রসঙ্গীতের চরিত্র নষ্ট হয়, এই মনোভাব একটা শুচিবায়ুগ্রস্ত অন্ধ পৌত্তলিকতা মাত্র। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ‘দস্তুর বুড়ো’ বা ‘কর্তার ভূত’-এর বিরোধী ছিলেন, তাঁর গানের সামগ্রিক কাঠামো ও ইম্প্রেশন অত পলকা বা অগভীর নয় মোটেই।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীতের সমালোচকরাও সাধারণত শুধু ‘আমাদের অমন লাগে’ বলেই খালাস। হয়তো-বা এঁদের বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথের গান এমন লোকজনেরই গাওয়ার হক— যাঁরা শুধুই ওই গান নিয়ে থাকবেন; ‘আধুনিক’ গানের সঙ্গে যে-কোনওরকম সংস্পর্শই এঁদের কাছে স্যাক্রিলেজ। কণিকা-সলিল এপিসোডে শান্তিনিকেতনের প্রভাবশালী মহলের আচরণ স্মর্তব্য। বোলপুরের বাইরে বৃহত্তর রাবীন্দ্রিক সমাজেও এই অচলায়তনী মনোপলি-মানসিকতা সক্রিয় আছে। লঘুসঙ্গীত এবং সেই গানের গাইয়েদের সম্পর্কে ‘ওরা বাইরের লোক, অন্ত্যজ’-মার্কা উন্নাসিক মনোভাব, এই মহলের একটা চরিত্রবৈশিষ্ট্য। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় যেহেতু এই ‘সংরক্ষিত পবিত্র-পীঠে’ তথাকথিত ‘বহিরাগত’দের মধ্যমণি, তাবড়-তাবড় বিশুদ্ধ-ব্র্যান্ডের ধারক-বাহকদের চেয়েও ঢের জনাদৃত, তাঁর বিপুল সাফল্যে এই ‘বিপজ্জনক’ বার্তা যেতে পারে যে নামজাদা শুদ্ধতাবাদী এলিট প্রতিষ্ঠানের ছাঁচঢালা শিক্ষার বাইরেও এমন একটা সজীব সহজ প্রবাহ থাকা সম্ভব— তাই সমবেতভাবে তাঁকে ব্রাত্য মন্ত্রহীন পথভ্রষ্ট ঘোষণার পিছনে একটি নির্দিষ্ট রাজনীতি থাকতেই পারে।

রক্ষণশীল পণ্ডিতবর্গের যাবতীয় বোধি ও প্রজ্ঞাকে নমস্কার জানিয়েই আমাদের বক্তব্য, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রগানে যে-সরলীকরণের অভিযোগ ওঠে— সেটিই তাঁর ইউ এস পি। কী সৌভাগ্য যে তিনি অর্থোডক্স শিক্ষারীতিতে শেখেননি ‘গুরুদেবের গান’, স্বরলিপির যান্ত্রিক নিক্তি-মাপা শুদ্ধতার চেয়ে অভিব্যক্তির প্রাণময়তার ওপরেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন, কী সৌভাগ্য যে তিনি অমন দৈব কণ্ঠের দরদ ও মীড়ের ওপর চালাননি প্রাতিষ্ঠানিক যান্ত্রিকতার স্টিমরোলার! ভাগ্যিস, এলিট বোদ্ধাদের তুষ্ট করার তাগিদে তিনি নিজের স্বাভাবিক কনভার্সেশনাল অথচ মার্জিত উচ্চারণভঙ্গিটিকে কৃত্রিম ছাঁচে ফেলে ‘রোবটায়িত’ করতে যাননি। অন্ধ ব্যাকরণ-কাঠামোর আনুগত্য নয়, তিনি জোর দিয়েছিলেন অভিব্যক্তি-দিয়ে-গড়া বাক্‌-প্রতিমাটির রূপমাধুরীর উপরেই। সহজ স্বচ্ছ ঋজু যেমন তাঁর ব্যক্তিস্বভাবটি ছিল, যেমনভাবে তিনি স্বর্ণকণ্ঠে অনায়াসে সুর লাগিয়ে গেয়ে ফেলতেন যুগাতিশায়ী সব আধুনিক আর চিত্রগীতি— ঠিক একইরকম সপ্রতিভ অকৃত্রিম অ্যাপ্রোচ ছিল তাঁর রবীন্দ্রনাথে গানের প্রতিও। পেশাদারিত্ব আর আন্তরিকতার নিখুঁত মিশেল, আর অতিনাটক-বর্জনের সংযম। যেমন সলিলের গান, গৌরীপ্রসন্নর গান, মুকুলের গান— তেমনই তিনি ‘রবীন্দ্রনাথের গান’ গেয়েছেন, ‘ঠাকুরের গান’ নয়।

এ যদি বিশুদ্ধবাদীদের কাছে তাঁর অপরাধ হয়, আমাদের কাছে এটাই তাঁকে প্রিয়তর করেছে। শুকনো ব্যাকরণের ছকে-ঢালা ‘শুদ্ধ’ গান শুনতে শুনতে যখন আমাদের শ্রবণ হাঁফিয়ে ওঠে, তখন তাঁর ‘আনঅর্থোডক্স’, ‘সরলীকৃত’ গায়ন যেন করুণাধারায় নেমে আসে। কে বলে যে তিনি গানের মর্ম স্পর্শ করতে অপারগ, কে বলে তাঁর গানে রবীন্দ্রনাথের লিরিক ঈপ্সিত ছবি বা ভাব নিয়ে ফুটে ওঠে না? আমরা পরিষ্কার দেখতে পাই, ফুলের মালা দীপের আলো ধূপের ধোঁয়া দিয়ে আড়াল করতে যাননি বলেই তিনি একেবারে অ-প্রথাগত, স্বচ্ছ-সহজ ভঙ্গিতে চরণ ছুঁয়ে ফেলেছেন।

#

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ড-ক্যাসেট-ছবির গান ও ঘরোয়া/লাইভ অনুষ্ঠান মিলিয়ে অন্তত শ’দুয়েক রবীন্দ্রসঙ্গীত সহজেই পাওয়া যায়, আছে বিভিন্ন নৃত্যনাট্যে ও গীতি-আলেখ্যতে প্রযুক্ত গানগুলিও। নিজের কণ্ঠের সীমাবদ্ধতা ও পারঙ্গমতা দুইই নিখুঁত বুঝে তিনি মূলত সহজ চলনের গানই নির্বাচন করেছেন, তাই দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে সে-সব। একটা মহল থেকে প্রচার করা হয়, তিনি চেনা গানই গেয়েছেন বেশি। পরিসংখ্যান কিন্তু বলে, বরং বিপরীতটাই বহুলাংশে সত্য; তিনি প্রথম গেয়েছেন, তবেই জনপ্রিয় হয়েছে বিস্তর রবীন্দ্রগান। অথবা, আগেও এক বা একাধিক শিল্পী গেয়েছেন, কিন্তু সে-গানকে মানুষের কাছে ‘চেনাতে’ পেরেছেন হেমন্তই— এমন উদাহরণ অজস্র, ধরে-ধরে দেখানো যায়।

হ্যাঁ, তাঁর নির্বাচন ছিল মেধাবী। তিনি স্পষ্ট জানতেন কোন্‌ গানের প্রতি তিনি সুবিচার করতে পারবেন, তাঁর পরিবেশনে অমোঘ হয়ে উঠবে কোন্‌ ধরণের গান। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কেরিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর ব্যতিক্রমী কণ্ঠের নানান পরিবর্তন আমাদের চোখ এড়ায় না— চারের দশকের সেই পঙ্কজ মল্লিকের অনুসারী রিনরিনে পাতলা গলাটি, পাঁচের দশকের গোড়ায় নিজস্ব উচ্চারণভঙ্গি খুঁজে-পাওয়া সুমিষ্ট টেনর, ওই দশকেরই একেবারে শেষে জন্মানো ধারালো ব্যারিটোনের আভাস, ছয়ের দশকের মাঝামাঝি সেই স্বর্ণময় মধ্যসপ্তক আর অজস্র স্পর্শস্বর-মীড়ের আবেদন, সাতের দশকের শুরুতে সেই মন্দ্র নিনাদী খাদের দানাগুলি… এমনকি শেষের দিকে ঈষৎ হাঁফ-ধরা, তারসপ্তক-অস্বস্তি সমেত সেই ট্রেমেলো-স্বর। কিন্তু এটাও অত্যন্ত জরুরি পর্যবেক্ষণ যে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় অতি সযত্নে, প্রত্যেক পর্যায়েই, নির্বাচন করেছেন তাঁর কণ্ঠের তৎকালীন ধর্ম ও প্রকাশ-সামর্থ্য অনুযায়ী শ্রেষ্ঠ শ্রুতিসুখ দেবে এমন গান।

তিনি বলেছেনও একাধিকবার— গান তাঁর আকুলিবিকুলি আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, আকাশে মেঘ দেখলেই রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে উঠলেন এমন ধাত নয় তাঁর। গান শোনানোকে তিনি তাঁর ‘কাজ’ মনে করে এসেছেন বরাবর, নিজের জন্যে নয়, অপরকে শুনিয়ে শ্রেষ্ঠ আনন্দটি দিতে পারাই তাঁর গায়নের উদ্দেশ্য। সেই আনন্দ-দানের জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন সহজিয়া পথ, কী সুরের প্রকাশে কী উচ্চারণে কী গান নির্বাচনে। এই সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিমায়, চুলচেরা বিশুদ্ধবাদিতার তোয়াক্কা না রেখেই তিনি যে সম্পদ রেখে গেছেন তার তুলনা নেই।

এক-নিঃশ্বাসে স্মরণ করা যাক বিভিন্ন দশকে তাঁর বিভিন্নতর কণ্ঠবৈভবে, রেকর্ডে ও ছায়াছবিতে ধরে রাখা অবিস্মরণীয় গানগুলি— ‘অয়ি ভুবনমনমোহিনী’, ‘প্রাঙ্গনে মোর শিরিষশাখায়’, ‘মনে রবে কি না রবে আমারে’, ‘আমি জ্বালব না মোর বাতায়নে’, ‘কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না’, ‘চলে যায় মরি হায় বসন্তের দিন’, ‘যৌবনসরসীনীরে মিলনশতদল’, ‘এসো আমার ঘরে’, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’, ‘আমার যাবার বেলায় পিছু ডাকে’, ‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়’, ‘এই কথাটি মনে রেখো’, ‘দিয়ে গেনু বসন্তের এই গানখানি’, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’, ‘যখন তুমি বাঁধছিলে তার’, ‘সংসার যবে মন কেড়ে লয়’, ‘কেন যামিনী না যেতে’, ‘আমি কান পেতে রই’, ‘আজি মর্মরধ্বনি কেন জাগিল রে’, ‘কাছে থেকে দূর রচিল’, ‘অলকে কুসুম না দিও’, ‘এই তো ভাল লেগেছিল’, ‘তার অন্ত নাই গো নাই’, ‘যেদিন সকল মুকুল গেল ঝরে’, ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘অশ্রুনদীর সুদূর পারে’, ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’, ‘আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলায়’, ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’, ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’, ‘অনেক পাওয়ার মাঝে মাঝে’, ‘মনে কী দ্বিধা’, ‘আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে’, ‘আর রেখো না আঁধারে’, ‘পুরানো সেই দিনের কথা’, ‘আমার গোধূলিলগন’, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’… …

তালিকাটি শুরু করলে, বস্তুতই, সাগরের ঢেউ গোনার মতো অনন্ত বলে ভ্রম হয় মাঝে মাঝে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নামক সার্সির-বাঁশির টানে যারা মজেছেন, তাঁরা নির্ভুল জানেন— তাঁর তথাকথিত ‘ফ্ল্যাট’, ‘অ-প্রশিক্ষিত’, ‘অশুদ্ধ’ পরিবেশনাতেই শ্রবণসুখ ও অভিব্যক্তির যে-উচ্চতায় পৌঁছেছে এইসব গান, তেমনটি আর কারও কাছে মিলবে না, ‘বিশুদ্ধ’ গায়নের স্টলওয়ার্টদের কাছেও না। এবং, শেষ বিচারে গান তো আসলে কানের ভিতর দিয়ে প’শে মরমকে সুখ দেওয়ারই আয়োজন মাত্র— সেই সুখ যখন আঠারো আনায় পৌঁছয় তখন সে-প্রপাত-স্রোতে কোথায় ভেসে যায় বৈয়াকরণের ময়নাতদন্ত!

জ্ঞানী যতই বলুক কঠিন তিরস্কারে— ‘পথ দিয়ে যে আসিসনি তুই ফিরে যা রে’— আমরা নিশ্চিত অনুভব করি, স্বয়ং গীতস্রষ্টা এই নিবেদনগুলি শুনলে মরমী গায়কের ফেরার পন্থা বন্ধ করে আপনি বাহুডোরে বেঁধে নিতেন। কাছি টুকরো করে ডুবতেও রাজি ছিলেন যিনি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো খোলা হাওয়াকে নিজের গানের পালে লাগতে দেখে তাঁর আনন্দ হত, এ নিয়ে সন্দেহ নেই।।

সৌরভ মুখোপাধ্যায়
শূন্য-দশকে উঠে-আসা কথাকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম। জন্ম ১৯৭৩, আশৈশব নিবাস হাওড়ার গ্রামে, পেশায় ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। গত দেড় দশক নিয়মিতভাবে সমস্ত অগ্রণী বাংলা পত্রিকায় গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। পাঠক-প্রশংসিত উপন্যাস ‘ধুলোখেলা’, ‘সংক্রান্তি’ ও ‘প্রথম প্রবাহ’ এবং অনেক জনপ্রিয় ছোটগল্প তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। লিখতে ভালবাসেন ছোটদের জন্যেও, ‘মেঘ-ছেঁড়া রোদ’ তাঁর এক স্মরণীয় কিশোর-উপন্যাস। সাহিত্য ছাড়াও সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রে অনুরাগ প্রবল। ঘোর আলস্যবিলাসী ও আড্ডাপ্রিয়।

3 COMMENTS

  1. অসাধারণ প্রবন্ধ। এই বিষয়টা নিয়ে আমিও অনেক ভেবেছি। প্রথাগত রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবধারা থেকে কিন্তু জর্জ বিশ্বাসও সারে এসেছিলেন গানের মধ্যে ভাল লাগার আবেগ দেবার জন্য। তার ভঙ্গী রবীন্দ্র ধারকদের পছন্দ হয়নি। এটা তো তর্কাতীত ভাবে সত্য যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের তুঙ্গ জনপ্রিয়তার পিছনে হেমন্তের অবদান। তার সঙ্গে অবলীলায় সুচিত্রা কণিকা মায়াদের গাইতে দেখেছি। তখন এই উচ্চনাসাদের উচ্চবাচ্য করতে শুনিনি।
    এই মান্না দে দাদার কীর্তি ছবির গান শুনে বলেছিলেন এরকম রবীন্দ্রসঙ্গীত আর কেউ গাইতে পারবে না। ৭০ দশকের মাঝামাঝি রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছিল। তাই বাজারকে গরম করতে নিয়ে আসা হল আশা ভোসলেকে। তখন কিন্তু কেউ গেল গেল রব ওঠে নি। আসলে হেমন্ত এসবকে কোনোদিন তোয়াক্কা করেননি। যে শিল্পী কবিতা পড়লেও মনে হয় গান গাইছেন, তাঁর কণ্ঠে রবি ঠাকুর যে সহজেই ঠাঁই পাবেন তাতে আর সন্দেহ কি?

  2. এত ফালতু,অশিক্ষিত বচনে ভরা লেখা খুব কম পড়েছি।আসল সমস্যাটাকেই ধরতে পারেনি।

  3. সুন্দর বিশ্লেষণ। তবে একটা বিষয় অনবধানতা বশত বাদ পড়ে গেছে। উচ্চারণ। উচ্চারণে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছাকাছি কেউ ছিলেন বা আছেন কি? আর একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল রবীন্দ্র সংগীত কথা ও ভাব প্রধান। সেই দিকটা হেমন্ত বাবু খুব ভালো বুঝতেন। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্র সংগীত এক অন্যত্র মাত্রা পায়। যে গানগুলি উল্লিখিত হয়েছে সেগুলি তো বটেই, তাছাড়াও ‘তাই তোমার আনন্দ আমার ‘পর’, ‘এ মনিহার আমায় নাহি সাজে’, ‘পথের শেষ কোথায়’, ‘নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুল বনে’, ‘মোর বীণা ওঠে কোন্ সুরে বাজি’ এরকম অসংখ্য রবীন্দ্র সংগীতের উল্লেখ করা যায়। হেমন্ত ছাড়া বজ্রসেন ভাবা যায়? ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যের শুরুটা শুনলেই বোঝা যায়। ‘না না না বন্ধু’ যেন কোন সুদূর থেকে ভেসে আসে বলে মনে হয়। অন্যান্য গীতিনাট্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাছাড়া, স্বনামধন্য রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুচিত্রা মিত্র অনায়াসে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নাক উঁচু ভাব তো দেখি নাই। আর এ কথা অনায়াসে বলা যায় যে সাধারণ শিক্ষিত মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী হেমন্ত, সে ব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। হেমন্ত বাবু রবীন্দ্র সংগীতের অন্তরটা বুঝতেন। কালোয়াতি করে শুদ্ধতম ভাবে যাঁরা গেয়েছেন তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছে রবীন্দ্র সংগীতকে পৌঁছে দিতে পেরেছেন কি? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ যদি হেমন্ত বাবুর গান শুনতেন তাহলে অ্যাপ্রুভ তো
    করতেনই, হয়তো সে গান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শুনে স্বরলিপির ও সেই মত পরিবর্তন করে নিতেন। ্্্্্

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here