অতীতে উন্মেষের কেন্দ্র তাঁর প্রাসাদ আজ জরাজীর্ণ…কে ছিলেন রাজা সুবোধ মল্লিক ?

উত্তর কলকাতার পুরোনো হলদে আলোর স্ট্রিটলাইট আর রকের আড্ডার সঙ্গে সঙ্গে মনকে টানে পুরোনো দিনের বাড়িগুলির গঠন | দক্ষিণ কলকাতার বাড়িগুলিতে হাল আমলের ফ্যাশনের ছাপ পড়লেও উত্তর কলকাতার বেশিরভাগ বাড়িই রয়ে গেছে পুরোনো দিনের আমেজ মাখানো | আর কলকাতার অন্যতম পুরোনো ঐতিহ্যশালী বাড়ি হিসেবে আমরা রাজা সুবোধ মল্লিকের বাড়ির কথা অনেকেই জানি | রাজা সুবোধ মল্লিকের বাড়ির সংলগ্ন পার্কটি বর্তমানে ওয়েলিংটন স্কোয়্যার নামে পরিচিত | ১২‚ রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়্যার‚ কলকাতা – ৭০০০১৩ – এর এই ঐতিহ্যশালী বাড়িটিতে আজ ঝুলছে কলকাতা পৌরসংস্থার বিপজ্জনক বাড়ির নোটিশ |

বর্তমানে আইনি জটিলতার ফাঁদে পড়ে বট – অবস্থানের গ্রাসে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে রাজা সুবোধ মল্লিকের বাড়িটি | এখন বাড়িটির কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাড়িটির সংস্কার কার্যে বিশেষ এগোতে পারেনি | ক্রিক রোয়ের পাশে ইট বেরিয়ে যাওয়া‚ পলেস্তারা খসে পড়া‚ গাছের শিকড়ে জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়া এই বিরাট বাড়িটি এক সময় ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁতুড়ঘর |

রাজা সুবোধ মল্লিক ১৮৭৯ সালের ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে পটলডাঙায় জন্মগ্রহণ করেন | ছোটোবেলায় সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে পড়াশোনা করেছেন | তারপরে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে | ১৯০০ সালে স্নাতক হওয়ার পরে সুদূর কেম্ব্রিজের ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা করতে যান | বিদেশে থাকাকালীন কিছু পারিবারিক সমস্যার জন্য পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখেই তাঁকে দেশে ফিরে আসতে হয় |  শ্রী অরবিন্দের অন্যতম সহায়ক ছিলেন | পরবর্তী কালে তিনি কংগ্রেসের চরমপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন | ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ের একজন অতি সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন তিনি | মুজফফরপুরের ডিস্ট্রিক্ট জাজ কিংসফোর্ডকে হত্যার চেষ্টার ষড়যন্ত্রে শ্রী অরবিন্দ‚ চরুচন্দ্র দত্তের সঙ্গে সঙ্গে সুবোধ মল্লিকও জড়িত ছিলেন বলে অনুমান করা হয় | স্বদেশিয়ানার দায়ে কারাদণ্ডও হয় তাঁর | কিন্তু ১৪ মাস পরে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান |

স্বদেশী শিক্ষা প্রসারের জন্য সুবোধ মল্লিক বিখ্যাত শিক্ষাবিদদের নিয়ে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর এডুকেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন | বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ‚ যা পরবর্তীকালের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়‚ সেখানেও শিক্ষা প্রসারে এক লক্ষ টাকা দান করেছিলেন তিনি | লাইফ এশিয়া বীমা কম্পানির জনকও তিনিই | দানধ্যানের জন্যই সুবোধ মল্লিককে ‘ রাজা ‘ উপাধিতে ভূষিত করা হয় |

১৮৮৩ সালে যখন সুবোধচন্দ্র বছর চারেকের শিশু‚ তৈরি হয়েছিল তাঁদের পারিবারিক বসতবাড়িটি | পরবর্তীকালে যা হয়ে ওঠে নবজাগরণ ও স্বদেশিয়ানার অন্যতম ঘাঁটি | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর‚ চিত্তরঞ্জন দাশ‚ বাল গঙ্গাধর তিলকের মত বিখ্যাত মনীষীরাও এই বাড়িটিতে এসেছেন | আতিথ্য গ্রহণ করে এ ভবনে দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন শ্রী অরবিন্দ | তিন তলার এই বিরাট বাড়িটিতে রয়েছে ভারতীয় ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের মিশ্রণ | তবে বর্তমান অবস্থা দেখে বোজার উপায় নেই এককালে কতখানি জৌলুস ছিল এই বাড়িটির | যে বাড়িটির দেওয়ালে এক কালে শোভা পেত গিলবার্ট স্টুয়ার্টের আঁকা জর্জ ওয়াশিংটনের একটি ছবি‚ তারই আজ ভগ্নদশার চূড়ান্ত |

বড়িটির একেবারে নিচের তলায় ছিল কালো মার্বেল পাথরে মোড়া একটি বিরাট খাওয়ার ঘর ও বিলিয়ার্ডস খেলার জন্য একটি ঘর | একতলায় ছিল গ্রন্থাগার | সদর থেকে অন্দরমহলে মহিলাদের যাতায়াতের জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি কাঠের সংযোগসেতুও | মল্লিক বাড়ির প্রথা অনুযায়ী নববিবাহিত বধূরা বাড়ির খিড়কি দরজা দিয়েই বাড়িতে প্রবেশ করতে পারত |বাড়ির বিরাট লোহার ফটক আজ বন্ধ ও জরাজীর্ণ |

এই বাড়িটি পরবর্তীকালে আইনি ও শরিকি জটিলতার জালে পড়েছে | বাড়িটির একতলা ও দোতলা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধিকৃত হলেও তৃতীয় তলাটি অধিগ্রহণ করেছে মিশ্র পরিবার | ১৯৯৮ সালে এই বাড়িটিকে হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণ করা হলেও উন্নতি হয়নি তার ভগ্নদশার | বাড়িটির দুটি অংশ অর্থাৎ U – এর ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ক্রিক রো | ক্রিক রোর বাড়িটির বাঁদিকের অংশটি বর্তমানে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে | আর ডানদিকের ভাঙাচোরা অংশটির নিচের ফুটপাথে এখন কয়েকটি পরিবার বসবাস করে | বেশ কয়েকদিন আগেই এই ঐতিহ্য বাড়ির অংশ ভেঙে পড়ায় ক্রিক রো-এ গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছিল | খুব তাড়াতাড়ি মেরামত করা না হলে হয়ত কালের গ্রাসে হারিয়ে যাবে উত্তর কলকাতার ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন ঐতিহ্যশালী রাজা সুবোধ মল্লিকের বাড়িটি |

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Illustration by Suvamoy Mitra for Editorial বিয়েবাড়ির ভোজ পংক্তিভোজ সম্পাদকীয়

একা কুম্ভ রক্ষা করে…

আগের কালে বিয়েবাড়ির ভাঁড়ার ঘরের এক জন জবরদস্ত ম্যানেজার থাকতেন। সাধারণত, মেসোমশাই, বয়সে অনেক বড় জামাইবাবু, সেজ কাকু, পাড়াতুতো দাদা