ধান্যকুড়িয়ার ‘ইউরোপিয়ান ক্যাসল’

6774
dhanyakuria europian castle
ধান্যকুড়িয়ার গায়েন ক্যাসল বা বাগানবাড়ি

ষ্টেশনের নামটা অদ্ভুত ।  কাঁকড়া মির্জানগর । শিয়ালদা হাসনাবাদ লাইনে  যেতে চোখে পড়ে । ট্রেম থেকে নেমে আমার বন্ধু দীপেন  প্রশ্ন করল “এই বিদঘুটে নামের ইতিহাস টা কি ? এখানে কোনও মির্জা সাহেব  কাঁকড়ার চাষ করতেন ?” আমি মাথা নাড়লাম । এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। অনেক ছোট ষ্টেশনের মতো এরও কোনও বিশেষত্ব নেই। দুধারে দিগন্ত পর্যন্ত ধানক্ষেত, প্ল্যাটফর্মে জনাকয়েক লোক , বাতাসে একটা নাম না জানা গাছের সুগন্ধ ।  “তবে ষ্টেশনটার নাম যাই হোক , এই লোকালয়ের নাম কিন্তু মির্জানগর। সামনে যে দুটো ব্যাঙ্ক পড়বে, সেগুলো কিন্তু মির্জানগর শাখা নামেই পরিচিত।” এই বলে প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে আমি রাস্তায় নামলাম।

ষ্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এসে একটা টোটোকে পাকড়াও করলাম। ষ্টেশন থেকে সোজা রাস্তা দিকে ডানদিকে বাঁক নিয়ে সে একটা অপেক্ষাকৃত চওড়া রাস্তায় উঠল। এদিকে প্রচুর গাছপালা, তাই গরমটা অপেক্ষাকৃত কম লাগছিল। মাঝে মধ্যে রাস্তার দুপাশে পুকুর চোখে পড়ছিল। যদিও সাঁতার জানিনা, কিন্তু ছেলেপুলেদের জলে হুটোপুটি করতে দেখে আমার পুকুরে স্নান করতে ইচ্ছে করছিল ।

দীপেনের দিকে তাকিয়ে বললাম “এইবার তোকে একটা মজার কথা বলি। এই রাস্তার নাম কিন্তু আবার কাঁকড়া কচুয়া রোড। একটু এগোলেই লোকনাথ বাবার আশীর্বাদ ধন্য কচুয়াধাম।”  দীপেন একটা সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান মেরে বলল “হুম , টিনটিনের গল্পের মত একটা কাঁকড়া রহস্য রয়েছে দেখছি। এবার ধান্যকুড়িয়া ঘুরে দেখে নিই।পরের বার শুধু এই কাঁকড়া  রহস্য সমাধান করতে আসব।” তারপর একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বলল “ আচ্ছা, ক্যাসলটার চৌহদ্দির ভিতরে ঢোকা যাবে তো? তুমি তো এর আগে তিনবার ঢুকেছো।” আমি একটু হালকা হাসি দিয়ে বললাম “তিনবারই  কপাল জোরে ঢুকেছি । দেখা যাক এবার কপাল খোলে কিনা।”

গায়েন বাগানবাড়ি চত্বর

যাঁরা ধান্যকুড়িয়ার নাম শোনেননি, তারা এই পর্যন্ত পড়ে ভাবছেন বাংলার একটা গ্রাম্য এলাকায় ক্যাসল বা দূর্গ এলো কোথা থেকে। আসলে যেটাকে লোকে ধান্যকুড়িয়ার ক্যাসল  বলে চেনে, সেটা বিদেশী দূর্গের আদলে তৈরী একটা বাগানবাড়ি। বিদেশী দূর্গের আদলে তৈরী কলকাতায় একটিই বাড়ি ছিল। সেটি হল পাথুরিয়াঘাটা অঞ্চলে অবস্থিত ট্যাগোর ক্যাসল। বর্তমানে তার খোল নলচে পাল্টে দেওয়ার তাকে চেনা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধ্যানকুড়িয়ার বাড়িটি ধুঁকছে, কিন্তু এখনও সে তার আভিজাত্য বজায় রেখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রোমোটারের হাতুড়ির ঘা এখনো তার শরীরে  পড়েনি। ওই ক্যাসেল ছাড়া ধান্যকুড়িয়াতে আরও অনেক সুদূশ্য জমিদার বাড়ি রয়েছে, যেগুলো দেখতে অনেকেই আসেন। বাড়িগুলোর অবস্থা বেশ ভালোই। কয়েকটাতে লোক বসবাস করে, অন্যগুলোতে পুজো পার্বনে বাড়ির মালিকরা বেড়াতে আসেন ।

“ধান্যকুড়িয়া কত পুরোনো জায়গা ?”  জানতে চায় দীপেন। যদিও পেশাগত ভাবে ও একটা বেসরকারি চাকরি করে, দীপেনের  বাংলার ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ আছে । এ নিয়ে কিছু লেখালিখি ও করেছে ।

আমি বললাম ‘’ধান্যকুড়িয়া একসময় সুন্দরবন অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল। ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে  জগন্নাথ দাস তার পরিবারের সাথে এখানে বসবাস করতে আসেন।এরপর একে একে এখানে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এখানে এসে বসবাস শুরু করেন। এঁদের উপাধি ছিল মুখ্যত: মন্ডল, সাউ, গায়েন  এবং বল্লভ। এঁদের আসার পর ধীরে ধীরে ধান্যকুড়িয়া লোকজনের বাস করার মত উপযুক্ত বসতিতে রূপান্তরিত হয় । বর্তমানে ধান্যকুড়িয়া উত্তর চব্বিশ পরগণা  জেলার অন্তর্গত একটি জনবসতি। ”

একটু পরে টোটো মূল বাস রাস্তায় এসে পড়ল|এই রাস্তা দিয়ে বসিরহাট হয়ে টাকি চলে যাওয়া যায়। যারা এই রাস্তা দিয়ে অনেকবার গেছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে হয়ত স্বরূপনগর পেরোবার পর রাস্তার বাঁদিকে একটা সুবিশাল পাথরের গেট খেয়াল করেছেন। গেটের দুপাশে মধ্যযুগের ইউরোপীয় স্থাপত্যকলার অনুপ্রেরণায় তৈরী দুটো সুবিশাল টাওয়ার রয়েছে। গেটের মাথায় সিংহের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত দুটি ইউরোপিয়ন মূর্তি চোখে পড়ে।.

গায়েন বাগানবাড়ি গেট

টোটো থেকে নেমে দীপেন কিছুক্ষন হাঁ করে গেটের দিক তাকিয়ে বলল “ইনক্রেডিবল। এরকম একটা গ্রাম্য এলাকায় এমন একটা স্থাপত্য থাকতে পারে ভাবা যায় না ।” তারপর সে ক্যামেরা বের করে কয়েকটা ছবি তুলল। গেটের বাইরে একটা সাইনবোর্ড আছে, তাতে লেখা আছে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ। দীপেন সেদিকে তাকিয়ে বলল “এর ভিতরে তো একটা মেয়েদের অনাথ আশ্রম আছে,তাই না ? তাই এতো কড়াকড়ি?”

আমি হেসে বললাম “ওটা পুরোনো খবর। গত বছর অক্টোবর  মাসে , রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নেন যে এখান থেকে অনাথ আশ্রমটা সরিয়ে নেওয়া হবে । অনাথ আশ্রমের বাড়িটার ভিতরে অবস্থা নাকি এতটাই খারাপ যে ওটা মেয়েদের বাসযোগ্য নয়। এই নিয়ে অনাথ আশ্রমের বাসিন্দা আর স্থানীয় লোকেরা প্রতিবাদ জানায়। তারপর পুজোর পর নভেম্বর মাসে এই গেটে একটা নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয় যার অর্থ হলো যে এখানকার মেয়েদের অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা হবে। যতদিন না এই অনাথ আশ্রমকে বাসযোগ্য করা সম্ভব হচ্ছে ,ততদিন এটি সাময়িক ভাবে বন্ধ থাকবে।”

দীপেন ভুরু কুঁচকে বলল “এটা তো আমার কাছে নতুন খবর। চিঠিটা কি রাজ্য সরকারের তরফ থেকে লেখা ?”

আমি বললাম “তা তো বটেই। চিঠিটা সই করেছেন Director of mass education extension and E.O. additional secretary, MEE and LS department, Govt of West Bengal. তবে এই চিঠি পাওয়ার পর স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে অনাথ আশ্রমের বাসিন্দারা এই রাস্তা অবরোধ করে। পদস্থ জেলা আধিকারিক এসে  আশ্বাস দেন যে অনাথ আশ্রমটা আবার চালু হবে।কিন্তু এখনো তা হয়নি। এখানকার মেয়েদের বিভিন্ন অস্থায়ী জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে । এই সব খবর আমাকে গায়েন পরিবারের মনজিৎ গায়েন জানিয়েছিলেন। সে সময় কিছু অনলাইন সংবাদপত্রে খবরটা বেরিয়েছিল। স্থানীয় লোকের ধারণা যে কিছু প্রোমোটার চক্রের এটার উপর নজর আছে।এখন গেটের ভিতরে পুলিশ পিকেট বসেছে। বাগানের এক কোণে জেলা পরিষদের তত্বাবধানে একটা বড়সড় ইমারত  তৈরী হচ্ছে। এখন ভিতরে ঢুকতে গেলে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট অথবা স্থানীয় থানা থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে হয়।”

“ তুমি নিশ্চই অনুমতি নিয়েই এসেছো ?” দীপেন প্রশ্ন করল। আমি কিছু না বলে একটা হাসি দিলাম যার মানে হ্যাঁ বা না কোনো একটা হতে পারে ।  দীপেন সেই দেখে একটা বুঝে ফেলেছি গোছের হাসি দিলো।

গায়েন বাগানবাড়িতে চত্বরে ঢুকতে অসুবিধে হল না। যে ভদ্রলোক ডিউটিতে ছিলেন তাঁকে আমি চিনি না। কিন্তু এক পরিচিত ভদ্রলোক তাঁকে আমার কথা বলে রেখেছিলেন। ভিতরে ঢুকে সোজা হাঁটলেই একটা পুকুর চোখে পড়ে। এই পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে জল সমেত বাড়িটার একটা সুন্দর ফোটো তোলা যায়। বাড়িটি দক্ষিণমুখী। এর পিছনেও একটা পুকুর রয়েছে। আমরা ক্যামেরা বার করে বিভিন্ন কম্পোজিশনে ছবি তুললাম। তারপর  পুকরের ডানদিকের পাড় দিয়ে হেঁটে এগিয়ে গেলাম বাড়িটার দিকে । বাগানবাড়ির পুবদিকে একটা দোতলা বাড়ি রয়েছে । এইটাই সেই অনাথ আশ্রম যেটা এখন বন্ধ রয়েছে ।

এটা অনস্বীকার্য যে বাড়িটার ডিজাইন ইউরোপীয় মধ্যযুগের দুর্গ থেকে অনুপ্রাণিত। খাঁজকাটা দেওয়াল ঘেরা ছাদ যার পুবদিকে একটা টারেট বা ক্ষুদ্রাকৃতি গম্বুজ এখনও বর্তমান। ছাদের পশ্চিমদিকে মনে হয় কোনওকালে ঘড়ি ছিল| দেওয়ালে দুটো  ফাঁকা গোলাকার আকৃতি চোখে পড়ে। একটি দক্ষিনমুখী , অন্যটি পশ্চিম দিকে রয়েছে। দুটি আকৃতির নিচে একটি করে গায়েন বংশের পরিচায়ক চিন্হ বা coat of arms দেওয়ালে খোদাই করা আছে। সে সময়ের জমিদারেরা ব্রিটিশদের অনুকরণে নিজেদের পরিচায়ক চিন্হ তৈরী করতেন। বাড়িটির পুব দিকের দিকের দেওয়ালেও  এইরকম coat of arms রয়েছে। পুব দিকের দেওয়ালের চিন্হটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় কারণ তার উপরে একটা মুকুট দেখতে পাওয়া যায়।

গায়েন বংশের পরিচায়ক চিন্হ বা coat of arms

দোতলায়  একটা টানা বারান্দা দেখা যায় । তার বাইরের দিকে সুন্দর পাঁচটি  খিলান রয়েছে। খিলানের মাঝখানের লোহার গ্রিলগুলো বোধকরি পরে বসানো হয়েছে। খিলানের শৈলী ইতালিয়ান স্থাপত্য থেকে প্রভাবিত। খিলানগুলির নিচের দিকে একটি করে মধ্যযুগের ইউরোপিয়ান ভাঁড় বা Jester এর মুখ বসানো রয়েছে । তিনটি মুখ পরিষ্কার দেখা যায়, চতুর্থটি গাছ পালায় ঢাকা পড়ে রয়েছে । একতলায় সামনের দেওয়ালের পশ্চিম দিকে একটি icon রয়েছে। এতে পাতার শিরমাল্য (wreath) এর মাঝে ঈগলের মূর্তি আছে , যা কিনা রোমান iconography থেকে অনুপ্রাণিত।

ইউরোপিয়ান ভাঁড় বা Jester এর মুখ

বাড়িটা আমরা প্রদক্ষিণ করলাম। পিছনে আরো বেশি গাছ পালা গজিয়ে জঙ্গল হয়ে রয়েছে। দীপেন আর আমি সাবধানে পা ফেলে এগোচ্ছিলাম। বাড়ির পিছনে গেলে দেখা যায় যে দুপাশে দুটো কোনাকৃতি গম্বুজ রয়েছে যেটা সামনে থেকে দেখা যায়না।  এগুলো সামনের টারেটের থেকে উচ্চতায় ছোট। বাড়ির পশ্চিম দিকে গেলে আরও দুটো আকর্ষণীয় জিনিস চোখে পড়ে। এক, সেদিকে পোর্টিকো সহ আরো একটা প্রবেশপথ আছে । দুই, সেদিকে আরো একটা টারেট রয়েছে , যদিও সেটা উচ্চতায় অনেক ছোট ।

পোর্টিকো সহ গায়েন বাগানবাড়ির আরো একটা প্রবেশপথ

“এ বাড়িতে মনে হয় বহু যুগ  ধরে কেউ ঢোকেনা।সামনের সিঁড়ির  রেলিঙের একটা মূর্তি ভেঙে পড়ে আছে  দেখলাম। এর কোনো রক্ষণাবেক্ষন হয় বলে তো মনে হয় না। বিদেশ হলে  সংরক্ষণ করে কোনো মিউজিয়াম বানিয়ে ফেলতো।” আফসোসের গলায় বলল দীপেন।


“২০১৩ সালে যখন প্রথম এসেছিলাম, তার থেকে গায়েন বাগানবাড়ির অবনতি ঘটেছে। সিঁড়িটা এত খারাপ অবস্থায় ছিল না , জানলার খড়খড়ি গুলো বিভিন্ন  জায়গায় ভেঙে গেছে। এত হেরিটেজ নিয়ে আজকাল কথা হয়, কিন্তু এ বাড়ির কোনও গতি হলো না।শুনেছিলাম ডিস্ট্রিট ম্যাজিস্ট্রেট নাকি বলেছেন যে এ বাড়ি ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের হাতে দিয়ে দেওয়া হবে। জানিনা তার কি হবে।” একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম আমি। গায়েন বাগান বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পশ্চিম দিকে একটু এগোলেই ডান দিকে একটা রাস্তা আছে । এটাই ধান্যকুড়িয়া যাওয়ার প্রবেশ পথ।  এখানে আর টোটো না নিয়ে আমরা হাঁটতে থাকলাম।

“আমরা প্রথমে কোন রাজবাড়ী যাবো?”  জানতে চাইল দীপেন।

“গায়েনদের বাড়ি। যেতে যেতে রাস্তার পাশে ধান্যকুড়িয়া স্কুল ও মন্ডলবাড়ি পড়বে। স্কুলটা দেখতে বেশ সুন্দর। মণ্ডলরা পুরোনো বাসিন্দা, তবে বাড়িটা তুলনামূলক ভাবে অতটা সুন্দর নয়। এগুলো কোনোটাই রাজবাড়ী নয়, জমিদার বাড়ি বলা চলে।”

কিছুক্ষন বাদেই আমরা গায়েন বাড়ির সামনে উপস্থিত হলাম। ধান্যকুড়িয়ার জমিদার বাড়িদের মধ্য এটি সবচাইতে সুবৃহৎ আকারের বাড়ি। বড়  আয়নিক থাম, লম্বা করিডর , ইউরোপিনিয়ান স্থাপত্য শৈলীর গম্বুজ, সব মিলিয়ে বাড়িটা দেখলে বেশ সম্ভ্রম জাগে। এই বাড়িতে এখন মনজিৎ গায়েন তাঁর পরিবারের সাথে বসবাস করেন।

গায়েন বসতবাড়ি

মনজিৎ পেশায় শিক্ষক ।বাড়ির পাশেই শ্যামসুন্দর জিউর মন্দির। বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে একটি সুদূশ্য তিনতলা মিনার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর নাম নজর মিনার। এটির স্থাপত্য শৈলী মিশ্র প্রকৃতির। প্রথম দুটি তলা দিব্যি কোরিন্থিয়ান থাম সমেত ইউরোপিনিয়ান স্থাপত্য দৃষ্টান্ত, কিন্তু তিন তলাটা ইসলামীয় ধাঁচে নির্মিত । এমনকি গম্বুজটাও পুরোপুরি ইসলামীয় স্থাপত্যের উদাহরণ।  গায়েন বাড়ি এবং বাগানবাড়ি দুয়ের বয়স প্রায় দুশোর কাছাকাছি।

যদিও এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গোপীনাথ গায়েন, এই সুবিশাল প্রাসাদ আর দুর্গের মতো বাগানবাড়ি বানিয়েছিলেন তাঁর সুযোগ্য সন্তান  মহেন্দ্রনাথ গায়েন। একসময় গায়েনদের পাটের ব্যবসা বেশ রমরমিয়ে চলত। ইংরেজদের সাথে ওঠা বসা ছিল।তার জন্যই মনে হয় বাড়ির স্থাপত্যে ইউরোপিয়ান স্টাইলের প্রভাব রয়েছে । এই গায়েনরাই ধান্যকুড়িয়াতে প্ৰথম রাইস মিল শুরু করেন । এবাড়িতে দূর্গাপুজো মহেন্দ্রনাথ গায়েন শুরু করেন, যা এখনো প্রতি বছর সব প্রথা মেনে হয়ে আসছে। আমরা সুবিশাল দূর্গা দালান চত্ত্বরে বেশ কিছু ছবি তুললাম।

গায়েন বসতবাড়ির ঠাকুরদালান

“এ বাড়িতে সাহেব, বিবি , গোলাম এর শুটিং হয়েছিল না ?” জানতে চায় দীপেন

“এটা তো সবাই জানে । কিন্তু তুই কি এটা জানিস যে ঋতুপর্ণ এই বাড়িতে ব্যোমকেশ এর শুটিং করেছিলেন? মনে পড়ে ব্যোমকেশ আর অজিত গাড়ি করে একটা বড় থামওয়ালা বাড়িতে ঢুকছে।  এই সেই বাড়ি। ঋতুপর্ণ কায়দা করে উপরের গম্বুজ গুলো কে বাদ দিয়ে শট টা ফ্রেম করেছিলেন।” বললাম আমি

দীপেন তৎক্ষণাৎ মোবাইলে ইউটিউব খুলে সিনেমার শট টা দেখে মিলিয়ে নিল।

গায়েন  বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা মিনিট দুয়েক হাঁটলেই ডান দিকে আরেকটা বাড়ি চোখে পড়ে। সদর রংয়ের এই বাড়ির বাইরেটা গায়েন বাড়ির মত ঝাঁ চকচকে না হলেও এর জানালার উপর স্টাকোর কাজ গুলো বেশ আকর্ষণীয় । জানালাগুলোও বেশ বাহারি । সবকটাতেই সাবেক আমলের খড়খড়ি আছে, এ বাড়িও প্রায় দুশো বছরের পুরোনো।

সাউ বসতবাড়ির সুদূশ্য জানালা

এটি হলো সাউ বাড়ি। এই বংশের  পতিত পাবন সাউ এ বাড়ি তৈরি করেন। এখন এ বাড়িতে সাউ পরিবারের কেউ থাকেন না । বর্তমান প্রজন্মের অশোক সাউ কলকাতায় থাকেন।

সাউ বসতবাড়ির ঠাকুরদালান

সাউ বাড়ি দেখাশোনা করেন একজন কেয়ারটেকার। কপাল ভালো থাকলে ওনাকে বাড়ির গেটের সামনে পাওয়া যায়। অনুরোধ করলে চাবি খুলে ঠাকুর দালানে  ঢুকতে দেন। আগের বার এসে ওনাকে পাইনি , কিন্তু এবার বাড়ির দরজা খোলা ছিল, তাই সদর্পে ঢুকে গেলাম।

“গায়েন বাড়ির ঠাকুরদালান এর থেকে অনেক বড়, কিন্তু এটাতে দারুণ স্টাকোর কাজ রয়েছে দেখছি। ঠাকুর দালানের থামগুলো অনেক বেশি ডেকোরেটিভ।” মন্তব্য করল দীপেন। এটা নিয়ে আমার কোনও দ্বিমত নেই । এ বাড়ির ঠাকুরদালানটা অনেক বেশি দৃষ্টিনন্দন।

সাউ বসতবাড়ির ঠাকুরদালানে স্টাকো অলঙ্করণ

সাউ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা একই রাস্তা ধরে হেঁটে একটা তেমাথায় পৌঁছালাম। এটা হল  সাউ বাড়ি পিছনের দিক। এদিকে একটা পুকুর আছে। তেমাথায় একটা খর্বাকৃতি নেতাজির মূর্তি রয়েছে। আমরা ডান দিকে ঘুরলাম। ওখান থেকে মিনিট দুয়েক হাঁটলেই বাঁ দিকে পড়বে বল্লভ বাড়ি। বাড়িটা সাদা আর সবুজ রং করা। প্রস্থের চেয়ে দৈর্ঘ্যে সুবৃহৎ। কাস্ট আয়রনের গেট|  

বল্লভদের বসতবাড়ি

দোতলা বাড়ির মাথায় কয়েকটা পুতুল, তার মধ্যে একটাকে দেখে রোমান জেনারেল গোছের মনে হয়। দোতলায় টানা বারান্দা। বড় ছোট মিলিয়ে অনেকগুলো কোরিন্থিয়ান পিলার চোখে পড়ে। বাড়ির সামনে গায়েন বাড়ির মত বাগান রয়েছে। বাগানের শেষ প্রান্তে একটা ভগ্ন দুর্গাদালান রয়েছে। এখানেও একটা মিনার রয়েছে , তবে সেটা বাড়ির বাইরে রাস্তার উপর নির্মিত।

এই বাড়ির বয়সও গায়েন বাড়ির সমসাময়িক। এ বংশের শ্যাম বল্লভ এ বাড়ি তৈরী করেছিলেন। এনাদের বাড়িতেও লক্ষীর সমাগম হয়েছে পাটের ব্যবসা থেকে। কলকাতায় আর. জি. কর হাসপাতালের কাছে আদি গঙ্গার পাড়ে বল্লভদের প্রাসাদোপম বাড়ি রয়েছে।

“সাম্প্রতিক কালে রং করেছে।কিন্তু পুতুল গুলো এরকম দড়কচা ভাবে রং করলো কেন? তোমার তোলা আগের  ছবি যা দেখেছি তাতে পুতুলগুলো অনেক গ্ল্যামারাস লাগছিলো।” বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলল দীপেন।

বল্লভদের বসতবাড়ির ছাদের পুতুল (বাঁদিকে ২০১৩ সালের ছবি, ডান দিকে ২০১৯ এর ছবি )

“হয়ত ওই জাতীয় রং পায়নি। বা মিস্ত্রি অত দড় ছিল না” বললাম আমি। এবাড়ির ভিতরে কখনো ঢুকিনি। দূর্গা পুজোর সময় অবশ্য সব বাড়িতেই ঢোকা যায়। তখন পরিবেশটাই আলাদা।

বল্লভ বাড়ি থেকে আরও মিনিট দুয়েক হাঁটলেই রাস্তার ডানদিকে একটা সাদা রংয়ের সুবিশাল দোতলা নবরত্ন রাসমঞ্চ চোখে পড়বে। রাসমঞ্চের চারিদিকে পাঁচ খিলানের প্রবেশ পথ রয়েছে। শুরুর দিকে এ অঞ্চলে বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাব ছিল। কালের হাতছানি উপেক্ষা করে এটি এখনো দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাসমঞ্চ থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে রয়েছে সাউদের বাগানবাড়ি। এই বাড়ির স্থাপত্যের ধাঁচটাও অনেকটাই সাউদের বসতবাড়ির মতো। তবে এটি আকারে অনেক ছোট।

নবরত্ন রাসমঞ্চ

ধান্যকুড়িয়ার জমিদার বাড়িগুলো দেখে নিতে ঘন্টা দুয়েকের বেশি সময় লাগে না।বড় রাস্তায় এসে যখন টোটোর খোঁজ করছি, দীপেন জানতে চাইলো যে কাছাকাছি  দেখবার মত আর কি আছে ? আমি জানালাম কাছাকাছির মধ্যে বেড়াচাঁপায় একটা পুৰাতাত্বিক সাইট আছে যার নাম খনা বরাহের ঢিপি। তাছাড়া ওখানে নতুন চন্দ্রকেতুগড়মিউজিয়াম খুলেছে , সেটাও দেখবার মতন।

“তোকে বল্লাল ঢিপি নিয়ে গেছিলাম মনে আছে।সেই বুদ্ধ স্তুপের ভগ্নাংশ। খনা বরাহের ঢিপি অনেকটা সেই রকম।” বললাম আমি ।

দীপেন ঘড়ি দেখে বলল “সবে এগারোটা বাজে। আমার আজ কোনো কাজ নেই। তোমার যদি থাকে তো কাটিয়ে দাও। চলো বেড়াচাঁপা দেখে আসি। বার বার কি এখানে আসা হবে।”আমি হেসে বললাম “ তাহলে তাই চল।বেড়াচাঁপায় ছোটখাট  একটা ভালো বিরিয়ানির দোকান আছে ওখানে। লাঞ্চ ওখানেই করা যেতে পারে।”এর পরে আর অপেক্ষা করা চলে না। আমরা একটা টোটো পাকড়াও করে বেড়াচাঁপা চলে গেলাম।

মিউজিয়ামের অভিজ্ঞতা ? সে নাহয় অনেকটা লেখায় বর্ণনা দিয়ে দেব । বিরিয়ানি কেমন খেলাম সেটাও জানাতে ভুলব না ।

পুনশ্চ: কয়েকদিন আগে মঞ্জিত গায়েনকে ফোন করেছিলাম। উনি জানালেন ধান্যকুড়িয়ার বাগানবাড়ির কোনো সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়নি।  অনাথ আশ্রমটিও আর খোলেনি, যে জন্য কন্যাশ্রী পাওয়া ওই আবাসিকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে । জেলা পরিষদের বাড়িটির কাজ  পুরোদমে চলছে। শোনা যাচ্ছে ওখানে নাকি গৃহহীনদের পুনর্বাসন করা হবে। ধান্যকুড়িয়ার বাগানবাড়ি ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্ট দেখবে এমন কথাও শোনা যায়নি।

দিন যাবে। গায়েন বাড়ির একটা একটা করে অংশ ভেঙে পড়বে। তারপর একদিন পুরোটাই ধসে যাবে । শহরে বসে ‘হেরিটেজ বিশেষজ্ঞ’ রা এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলবেন যেটা পরের দিন খবরের কাগজের হেডলাইন হবে।

Advertisements

9 COMMENTS

  1. সুন্দর লেখা। ভালো লাগলো। এই রকম আরও লেখার অপেক্ষা করছি।

  2. Lekha ta porae khub bhalow laglow.

    Bengal er koto gram ae gonjae dekhar moto jaiga thhake.erokom ekta ojana jaigai european stapottow dekhae obak hoyechhae.
    Dukhow laglow oboshthha dekhae.
    Etachona rajbarir moto renovate korae resort banalae khub bhalow hoto.

  3. ekhane amio jete chai, kintu lekhata pore keu jete chaile kivabe jabe . ar jante ichhe kirchhe je okhane sab jaiga golote dhukte dea hobe kina.

  4. এর ন্যারেটিভটা একেবারে নতুন ফর্মাটের এবং বেশ মনোরঞ্জক। ভালো লেগেছে। তবে এজাতীয় লেখায় আরো যেগুলো থাকাটা অবশ্য প্রয়োজনীয় মনে করি তা হলো একটা ম্যাপসহ (যা গুগলের কল্যানে এখন আর খুব একটা অসুবিধের নয়) দিক নির্দেশ, কাছাকাছি থাকার ঠিকানা (যদি কিছু থাকে) আর এই জাতীয় তথ্য যা উতসাহী পর্যটকদের কাজে লাগতে পারে বলে মনে হয়।

  5. অনুমতি নিতে কোথায় যোগ়াযোগ করবো যদি একটু উল্লেখ করেন ভালো হয়…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.