মা হওয়া নিয়ে কিছু কথা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

নিজের সন্তানের সঙ্গে লেখিকা

মা হওয়া জীবনের একটি অন্যতম দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। এবং সেটি চলে সারা জীবন। তবে, আমাদের সমাজে কিছু কিছু ধ্যান ধারণা আছে মা কে নিয়ে, যার থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, আজকের এই যুগে। আমার মনে আছে, ২০১৬তে লেবার রুম এ যখন শুয়ে আছি, আমার বাচ্চা ( তখনো ছেলে না মেয়ে জানি না) তার পেড এর কাছে, তখন একটাই চিন্তা মাথায় ছিল, নিশ্চিন্ত হওয়ার চিন্তা। সফল ভাবে একটি শিশু প্রসব করার রিলিফ। সিজারিয়ান না করতে হওয়ার রিলিফ। সিনেমায় যেরকম দেখায়, আনন্দে আত্মহারা হওয়ার ছবি, সেরকম কিছু ছিল না তখন মনের মধ্যে। মনে হলো, একটা কাজ সম্পূর্ণ হলো। ছুরি কাঁচি থেকে চিরকালই দূরে থেকেছি। তাই নর্মাল ডেলিভারিই চেয়েছিলাম। সৌভাগ্যবশতঃ ৩৫ বছর বয়সী হওয়া সত্ত্বেও সুগার-প্রেশার-থাইরয়েড-ওবেসিটি জাতীয় কোনো সমস্যা ছিল না, নিয়মিত হাঁটা চলা সিঁড়ি ভাঙ্গা ফ্রী হ্যান্ড এইসব করেছি, এবং প্রেগ্নান্সির সময়েও কোনো দিন সমস্যা হয়নি। বমি, মাথা ঘোরা, অরুচি এই জাতীয় সমস্যাও কোনোদিন ছিল না। ৪০ সপ্তাহ হওয়ার আগেই ,৩৮ সপ্তাহতে লিভার এঞ্জাইম বেড়ে যাওয়াতে ( যেটা স্বাভাবিক এই সময়ে, অনেকেরই হয়), ভর্তি হই এবং লেবার ইন্ডিউস করে প্রথমে চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিই। তাতে খুব স্মুদলি লেবার প্রগ্রেস হয়,এবং মাত্র সাড়ে পাঁচ ঘন্টার লেবারের শেষে আমার ছেলের জন্ম হয়। তবে তার সাথে সাথে যে যে চিন্তা ভাবনা মাথায় খেলা করেছিল এবং পরবর্তী কালেও করে চলেছে,সেই ধ্যান ধারণাগুলোতে এবারে আসি।

লোকের মনে একটা ধারণা আছে, নবজাতক শিশুকে দেখেই মায়েরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়, আনন্দে কান্নাকাটি করেন। আমার পাশের বেড-এ যিনি ভর্তি চিলেন, তাঁকে প্রসবের জন্য বহু যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। ফলে তাঁর ছেলে যখন জন্ম নেয়, সে আনন্দে আত্মহারা হবে, এটাই স্বাভাবিক ছিল।তাই হয়েওছে।কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সে জায়গায় একটা রিলিফ কাজ করেছিল।মনে হয়েছিল, ৯ মাস ধরে যাকে পেটে ধরে এত ঘুরলাম ফিরলাম, অবশেষে সফল ভাবে তাকে বের করতে সক্ষম হয়েছি। সব ভাল যার শেষ ভাল। আর সেই সময়ে ভীষণ খিদে পেয়েছিল। তার আগের দিন রাতে, খেতে যখন দিয়েছিল, তখন ডেসার্ট-এ বোধহয় কাস্টার্ড ছিল। ভুল বশতঃ, নার্সরা কার্ডিওগ্রাফি করার আগেই আমাকে খেতে দিয়ে দিয়েছিলেন। যখন প্রায় খাওয়া শেষ, তখন শুনলাম ডাক্তারবাবু বলেছেন তখন না খেতে। ফলে ডেসার্টটা আর খেতে দেওয়া হয়নি। সেই দুঃখটি লেবার রুমেও ছিল। প্রসবের পরমুহূর্তেই মনে পড়ল, কতদিন কিছু ভালমন্দ খাইনি ( যদিও তার আগের রাতেই খেয়েছি এবং সকালেই আমার ছেলের জন্ম হয়),বিশেষ করে না খেতে পাওয়া কাস্টার্ড-এর কথা মনে করে। ডাক্তারবাবুকে প্রথমেই ছেলে না মেয়ে জিজ্ঞেস করার আগেই জিজ্ঞেস করলাম, বেরিয়ে কিছু খেতে পাব তো? উনি বললেন হ্যাঁ, চা আর বিস্কিট। তবে এক ঘন্টা পরে।সুতরাং, মা হলেই যে খিদে তেষ্টা সব ভুলে গিয়ে শুধু মাত্র বাচ্চার চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে থাকবে, সেটা সবার ক্ষেত্রে সত্যি নাও হতে পারে। কারণ জানতাম বাচ্চা সুরক্ষিত আছে,সুস্থ আছে।অতএব চিন্তার কারণ কিছু ছিল না। সেই মুহূর্তে আদিম প্রবৃত্তি মানে খিদে তেষ্টা সব কিছুকে ছাপিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে হেসেছিল। আমিও আত্মসমর্পণ করেছিলাম তার কাছে।

দ্বিতীয়ত, বাচ্চা প্রসবের পরে পরেই যেসব ছবি আমরা দেখে থাকি, মায়ের বুকে দেওয়া ইত্যাদি, সেসব সবক্ষেত্রে সম্ভব হয়না। আমার ক্ষেত্রেই বাচ্চা প্রসবের পর মুহূর্তেই তাকে পরিষ্কার করে তার পেডিয়াট্রিশিয়ান জন্মের পরেই যে ভ্যাক্সিনগুলি দেয়, সেগুলি দেওয়ার জন্য নিয়ে গেলেন। জন্মের পরেই, ছেলে না মেয়ে, সেই হিসেব মাথায় কাজ করে না। অনেক পরে আমার মাথায় এসেছিল, ছেলে না মেয়ে সেটা জানা হলো না, যদিও কোনোটাতেই আমার আপত্তি ছিলনা। যখন শুনলাম ছেলে, তখন মাথায় শুধু এটাই এল, যাহ! কত ভাল ভাল জামা কাপড় পরা থেকে বঞ্চিত হবি রে। মেয়েদের কত ভ্যারাইটি।এর বেশি কিছু নয়। কারণ,মা হয়ে ওঠাটা একদিনের ব্যাপার নয়। বাচ্চার বড় হওয়ার সাথে সাথেই সেই বোধটা বাড়ে।

তৃতীয়তঃ প্রথমবার যখন আমার ছেলেকে আমার কোলে দিল, তখন আমার মনে কোনো রকমের অনাবিল আনন্দ বা আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং আশেপাশে আমার মা, বন্ধুরা এরাই খুব বেশি আনন্দিত ছিলেন। আমার ছেলেকে কোলে নিয়েই মনে হল, এই বাচ্চাটি আমার? এত ছোট বাচ্চা নিয়ে কী করবো? এর বড় হতে তো অনেকদিন লাগবে।বাচ্চাগুলো একটু বড় হয়ে জন্মালে সবার কত সুবিধা হতো। এত ছোট বাচ্চা তো কিছুই পারবে না। সব আমাকেই করাতে হবে? শুনতে হাস্যকর মনে হলেও, এটাই ছিল আমার প্রথম অনুভূতি।

চতুর্থতঃ স্তন্যপান করানোর সময়ে মনে হয়েছিল, বাচ্চাটা এটাই খেতে চায় কিনা আদৌ, সেটা বুঝতে পারছি না। সবাই তো বলছে খাওয়াতে, কিন্তু আমার ছেলে একটু টেনেই হাঁপিয়ে যেত, আবার ঘুমিয়ে পড়ত, আবার খেত। যাকে বলে ক্লাস্টার ফিডিং। যারা ক্লাস্টার ফিডিং করিয়েছেন তারাই জানেন ব্যাপারটা কতটা পরিশ্রমের। এবং তখন ক্রমাগত মনে হতো, অন্য কারোর শিশুকে বুঝি মানুষ করছি। নিজের ছেলে, এই অনুভূতিটা আসতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছে।  

পঞ্চমতঃ যতদিন শুধু মাত্র স্তন্যপানেই শিশুর পুষ্টি হয়, ততদিন তাকে নিজের কাছছাড়া করাটা একজন মায়ের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু ৬ মাস বা অন্নপ্রাশন হয়ে গেলে, ১-২ দিনের জন্য নিজের কাজের জন্যই হোক, বা যেটা ভালবাসেন, সেটা করতে শিশুকে কোনো বিশ্বস্ত মানুষ, যেমন নিজের বাবা মা বা শিশুর দেখাশোনা করার জন্য আয়া, তার বাবা, এদের কাছে রাখার চেষ্টা করুন।যিনি পুরোদস্তুর দায়িত্ব নিতে সক্ষম, এমন কোনো মানুষ ছাড়া আর কারোর কাছে বাচ্চা দেবেন না। কারণ ৫-৬ বছরের আগে পর্যন্ত একটা বাচ্চা মানুষ করতে কিছু না হলেও ২ জন লোক পুরোদস্তুর লাগে। কেউ আদর করে আধ ঘন্টা ঘুরিয়ে আনলো, তাতে কিন্তু মোটেও সাহায্য হয় না। বরং ঘন্টা ৩-৪ রাখতে পারবে, এরকম কেউ দায়িত্ব নিতে পারলে তবেই তার কাছে রাখার কথা ভাববেন। ৫-৬ বছর হলে শিশুকে মাঝে মাঝে তার বাবার সাথে ২-৩ দিনের জন্য রাখার অভ্যেস করুন। মা হয়েছেন মানেই সবকিছু শিশু কেন্দ্রিক হবে এবং আপনার নিজস্ব কোনো জীবন থাকবে না, সেটা হতে পারে না। হওয়া উচিতও নয়। তাতে আপনার শিশুও বাকি পাঁচ জনের কাছে এবং তাদের সাথে থাকতে অভ্যস্ত হবে। নিজের জন্য একটু সময় এবং জায়গা বের করে নেওয়া সব মায়েদেরই উচিত। এতে করে আঁকড়ে ধরার প্রবণতা কমলে আপনার এবং আপনার শিশুর দুজনেরই লাভ হবে।

আমার মনে আছে, আমার ছেলের এক বছর হওয়ার দু’মাস আগে আমি তাকে দু’দিনের জন্য তার বাবা এবং আয়ার কাছে রেখে বিজয়ওয়াড়া গেছিলাম, একটি আন্তর্জাতিক কবি সম্মেলনে কবিতার বই থেকে কবিতা পাঠ করতে। প্রায় ১৬ টি দেশ এবং ভারতের সকল রাজ্য থেকে বিখ্যাত কবিদের উপস্থিতি ছিল সেখানে, রাজ্যের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার তথা বহু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের উপস্থিতিতে কবিতা পাঠ সততই, সম্মানের। তার আগের বছর আমার ছেলেকে নিয়ে আমার ৯ মাস চলছিল, তাই ইচ্ছে থাকলেও সে বছর গিয়ে উঠতে পারিনি। তাই এবারে যাব ঠিক করেই রেখেছিলাম। এত ছোট বাচ্চা নিয়ে যাওয়াটা সম্ভব ছিল না, তাই রেখে যাওয়াই মনস্থির করেছিলাম। ছেলে তার বাবার কাছে এবং আয়ার কাছে ভীষণ আনন্দে ছিল এবং তিনদিন  দু’রাত কাটাতে তার সমস্যা হয়নি। আমাদের একটা বড় ভুল ধারণা যে শিশু তার মায়ের কাছেই সবচেয়ে ভাল থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে যা যা করতে পারে, একজন ছেলেও সুযোগ পেলে সেগুলো করতে পারে। ডায়পার চেঞ্জ করা, খাওয়ানো বা ঘুম পাড়ানোটা রকেট সায়েন্স নয়, কারোর ইচ্ছে থাকলে সে নিজেই শিখে নিতে পারে। আমার ছেলের বাবা এই সবই করতে সক্ষম এবং সেই জন্যই তাকে তার কাছে রেখে যেতে আমি দু’বার ভাবিনি। সাথে অবশ্যই তার ২৪ ঘন্টার আয়া ছিলেন। ভুল ত্রুটি মায়েদেরও হয়। তাই বাবার কাছে থাকলে খারাপ থাকবে আর মায়ের কাছে থাকলে ভাল থাকবে সেটা পুরোপুরি সত্যি নয়, যদিও এটা সত্যি যে একজন মায়ের দেওয়া সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাবার থেকে অনেকটাই বেশি হয়। মায়ের সাবস্টিটিউট বাবা কখনোই নয়, কিন্তু একজন বাবার যা যা শেখানো সম্ভব একজন বাচ্চাকে সেটা একজন মায়ের পক্ষে শেখানো সম্ভব নয়। একজন শিশুর দুজনেরই প্রয়োজন আছে। আজকালকার অণু পরিবারে বাবা মার দায়িত্বভাগ প্রায় মিশে গেছে, তাই বাবাদের কিছু জিনিস বাদে প্রায় সবই করতে হয়, যেগুলি একজন মা করেন।

মা হওয়া জীবনের একটি অন্যতম সুন্দর ঘটনা, কিন্তু সময় এসেছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেগুলিতে পরিবর্তন আনা। নতুন প্রজন্মের মায়েদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে, কিছু প্রচলিত ধ্যান ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন ভাবে পথ চলার জন্য।

Advertisements

4 COMMENTS

  1. আমিও তোমার মতোই একজন ছেলের মা। এখন আমার ছেলের বয়স আড়াই বছর। আজ অবধি আমি একাই ওকে বড় করেছি । ওর বাবা কাজের জন্য বেশির ভাগ সময়ই বাইরে কাটাতে হয়। তাই আমাকেই শুধু মানুষ করতে হচ্ছে। সংসার সামলে বাচ্চা সামলানো টা খুব কষ্টের আজকের দিনের মেয়ে দের পক্ষে। বাড়িতে পাঁচ জন থাকলেও বাচ্চার দায়িত্ব কেউই নিতে চায়না। আর আমার ছেলেও তেমনি। সবার সাথে থাকলেও খেলা শেষ হলে মায়ের কাছে আসা চাই। মা ছাড়া ও থাকে না এক মিনিটও। তাই তো এত কষ্টের এত খাটা খাটুনির পরেও যখন ছেলে মা বলে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে মনে হয় এটাই আমার জীবনে বোধ হয় সব চাইতে বড় পাওয়া। আমি যে মা। একজন মায়ের এর বেশি আর কি চাই….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.