সেবার আসানসোল থেকে বাড়ি ফিরছি। কিছুক্ষণ কলার খোসা বাঁচিয়ে প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করার পরে ভাবলাম ওয়েটিং রুমে বসে অপেক্ষা করা যাক। কোনো অজ্ঞাত কারণে আমার ট্রেনটা আপাতত ঘন্টাতিনেক লেটে আসবে।

Banglalive

ওদিকের লম্বা সোফাটা জুড়ে একজন বিশাল শক্তিশালী মহিলা ঘুমোচ্ছেন। কোনো সাধারণ মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে তার মুখে প্রশান্তি, তৃপ্তি এই সব ভাব ফুটে ওঠে। কিন্তু সুপ্ত অবস্থাতেও এই মহিলার বেশ একটা তীব্র ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পাচ্ছে। আমি যদি চোর হতাম তাহলে কিছুতেই এই ঘুমন্ত মহিলার সামনে চুরি করতে পারতাম না – ভয়ে দাঁতে দাঁত লেগে যেত।

আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ভাবছি – এখানে অপেক্ষা করব না কি কলার খোসা অধ্যুষিত হলেও, অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করতে যাব, এই সময় বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন একজন দাড়ি-ওলা ভদ্রলোক। তিনি মহিলার পায়ের কাছে অপরাধীর মতন বসে পড়লেন, আর ক্ষণে-ক্ষণে তার বোজা চোখের দিকে চোখ পড়লে চমকে চোখ সরিয়ে নিতে লাগলেন। মনে হল, বিনা অনুমতিতে বাথরুমে যাওয়ার জন্য তিনি উদ্বিগ্ন।

যথাসম্ভব দূরত্ব রেখে একটা চেয়ারে বসে আমি খবরের কাগজ মেলে ধরলাম মুখের সামনে। হঠাৎ চমকে দেখি দাড়ি-অলা লোকটি আমার পাশ ঘেঁষে এসে বসেছে – চোখে একটা বন্য দীপ্তি। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – ‘শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ?’

সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালাম। আমাকে কি সংস্কৃতেই উত্তর দিতে হবে? ক্লাস সিক্‌সের অস্পষ্ট জ্ঞানের গভীরে ডুব দিয়ে আমি ‘নরাণাং মাতুলক্রমঃ’ উদ্ধার করে যেই জবাব দিতে যাব, অমনি ওই সংস্কৃত ভাষাভাষী দাড়ি-অলা লোকটি শুদ্ধ বাংলায় বললেন, ‘উঃ কতদিন বাঘ-টাঘ মারি না! তোমার ওই কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরাতে কি ছবি ওঠে?’

এবারে আমার রাগ হয়ে গেল। আমার ক্যামেরার নিন্দে করছে নাকি? অরণ্যদেবের মতন বরফশীতল কন্ঠে বললাম – ‘ কি ছবি তোলাতে চান? ওরকম বিচ্ছিরি দাড়ি থাকলে আমি তো লজ্জায় বোরখা পরে থাকতাম।’

তিনি অন্যমনস্কভাবে মহিলার দিকে তাকিয়ে এবার গলা নামিয়ে বললেন – ‘কি হে, কোনোদিন বাঘ-টাঘ মেরেছ?’

আমি মাথা নাড়লাম।

– ‘একটাও না? সে কি হে! কুমায়ুনে তো প্রচুর মানুষখেকো বাঘ-টাঘ পাওয়া যায়।‘

– ‘কিন্তু শুনেছি জিম করবেট সেসব নাকি মেরে দিয়ে গেছে -’

– ‘ওঃ জিম!’ ভদ্রলোক নিঃশব্দে অট্টহাসি হেসে বললেন – ‘হ্যাঁ, ও দুয়েকটা রোগা বাঘ মেরেছিল বটে। অবশ্য অনেক বাড়িয়ে লিখেছে বইতে….আঃ তোমাদের বয়সে আমি পালে-পালে বাঘ-টাঘ মেরেছি!

তিনি আবার একবার নিঃশব্দে অট্টহাসি হাসলেন।

বললেন – ‘এরকম হাসতে পার? আওয়াজ না করে? দেখো, আবার ওর ঘুম ভেঙে না যায়….’

আমি চেষ্টা করলাম কিন্তু তাঁর মতন পারলাম না।

দাড়ি-অলা ভদ্রলোক স্মৃতিমন্থন করতে করতে বললেন, – ‘আমার যে বয়সের কথা বলছি তখনও বাঘেরা এমন সংখ্যালঘু শ্রেণীভুক্ত ভি-আই-টি হয়ে ওঠেনি। বনদপ্তর থেকে পেশাদার শিকারিদের ডাক পড়ত ওই মানুষখেকো বাঘটা মেরে ফেলার জন্য। এখন তো শোনা যায় বাঘেদের স্বর্ণযুগ চলছে। কোনো মানুষ খেয়ে ফেললে, সরকার থেকে তাদের নাকি ফ্রি হজমের গুলি সাপ্লাই করা হয়।

‘একবার আমার ডাক পড়েছে সুন্দরবনের ঘোর জঙ্গলে একটা খুনি বাঘ শিকার করার জন্য। সেবার আমার সঙ্গ ধরেছে আমার বাল্যবন্ধু চাঁদু। মোটাসোটা বেশ স্ফূর্তিবাজ ছেলে ছিল চাঁদু। ও অবশ্য এখন টেকো হয়ে গেছে, কিন্তু যুবক বয়সে যদিও কেউ এখন বিশ্বাস করতে চায় না – চাঁদু এমন টাকগ্রস্ত ছিল না।

আরও পড়ুন:  কেতজেল পাখি (দ্রোহজ ২) পর্ব ৩

‘সত্যি বলছি, চাঁদুকে সঙ্গে নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার ছিল না। বন্দুকের কোন দিক দিয়ে গুলি বেরোয় তাই ওর ভালো করে জানা নেই।

সুন্দরবনের বাঘেরা জন্ম থেকেই মানুষখেকো। সাধারণত তারা খুব চালাক হয়ে থাকে। তাতে অবশ্য আমি ঘাবড়াই না, আমারও আই-কিউ নিতান্ত কম নয়। চিন্তা কেবল চাঁদুকে নিয়ে – বেচারা বেজায় বোকা। বললে বিশ্বাস করবে না, ওকে আর একটা বাচ্চা বাঘকে যদি পাশাপাশি বসিয়ে সোজা একটা ঐকিক নিয়ম এর অঙ্ক কষতে দেওয়া হয় তো আমি নিশ্চিত চাঁদু বাঘের বাচ্চার শ্লেট দেখে টুকবে।

পরদিন সূর্য ওঠার  আগেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম।

যেখানে কাঠুরেদের বাঘে ধরেছিল, আমরা সেই দ্বীপটায় নামলাম। আমাদের গাইড দক্ষিণরবায়ের থানে পুজো দিয়ে আগে-আগে কুড়ুল হাতে চলল। চাঁদুএ এতক্ষণে ভয় পেয়েছে। পেছন থেকে জামা চেপে ধরছে আর বলছে…. ‘মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে….’

চলতে চলতে একটা ফাঁকা মতন জায়গায় পৌঁছাতেই ওদিকের ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল একজন লম্বা সরু চেহারার লোক। পরনে ধুতি, কালো গলা-বন্ধ কোট, মাথায় শোলার টুপি, পায়ে মোজা বুটজুতো, কাঁধে বন্দুক। চাঁদু তাড়াতাড়ি তাকে গুলি মারতে যাচ্ছিল, কোনোরকমে ওকে থামিয়ে, লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম – ‘আপনি কে? সে বলল – ‘আমি শিকারি।’

চাঁদু সামলে নিয়েছে নিজেকে, এবার রেগে গিয়ে বললে – ‘যাঃ গুল দিচ্ছে, শিকারি কখনও ধুতি পরে থাকে?’

শিকারি ওকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে গম্ভীর গলায় বললেন – ‘বাঘ মারা আমার পেশা। আমি গন্ডায় গন্ডায় বাঘ মেরেছি। দুরাত ধরে মাচা বেঁধে আমি এই বাঘটাকে মারার জন্য অপেক্ষা করেছি। আজ বাঘটা আমার ছাগলটাকে অ্যাটাক করেছিল, আমি গুলি ছুঁড়তে ছাগলটা মরে গেছে। তাই গ্রামে যাচ্ছি অন্য একটা ছাগল আনতে -’

চাঁদু রুদ্ধনিশ্বাসে বললে – ‘আর বাঘটার কী হল? শিকারি একটা বিশাল হাই তুলে বললেন – সকালে যখন মাচা থেকে নেমে চলে আসছি তখন হঠাৎ ঘড়-ঘড় শব্দ শুনে দেখি মৃত ছাগলটার গায়ে এক পা তুলে দাঁড়িয়ে বাঘটা হাই তুলছে। আমি আড়াল থেকে বন্দুক তাক করলাম …’

‘তারপর? তারপর? বাঘটা মরে গেল?’

শিকারিকে কিঞ্চিৎ মূহ্যমান দেখাল। তিনি বললেন, – ‘মরত ঠিক, আমার গুলি কখনও ফস্কায় না। কিন্তু আগেই বলেছি বাঘটা হাই তুলছিল, আর জানেনই তো হাই কী রকম ছোঁয়াচে – আমিও হাই তুলত্-তুলতে গুলি ছুঁড়লাম, অমনি বাঘটা লাফ মেরে গাছের মাচায় উঠে গেল….’

– ‘মাচায় উঠে গেল? গায়ে গুলি লেগেছে?’

শিকারি অবজ্ঞায় দৃষ্টি দিয়ে বললেন – ‘লাগবে না! এই যে তার ল্যাজের টুকরো। আমার মনে হয় বাঘটা এখনও গাছে রয়েছে। সাবধান, একে বাঘটা মানুষখেকো তার ওপরে ল্যাজকাটা। কুকুরদেরই ল্যাজ কেটে দিলে তারা কেমন ভয়ানক তেজস্বী হয়ে ওঠে, আর এ হচ্ছে সুন্দরবনের বাঘ!’

শিকারি কোনো কথা আর না বাড়িয়ে বন্দুক কাঁধে বনের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন। চাঁদু তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে পেছন থেকে চেঁচাতে লাগল – ‘সব গুল! ধুতি-পরা লোক কখনও শিকারি হয়?’

আমাদের দলটা তারপর জঙ্গল কেটে পথ করে সাবধানে এগোতে লাগলাম। গাইড আগে আগে, মাঝখানে আমি, পেছনে চাঁদু।

একসময় চাঁদুই বললে – ‘কেমন চিড়িয়াখানার গন্ধ পাচ্ছি রে!’

আরও পড়ুন:  শাড়ি

তখন আমরা এসে দাঁড়িয়েছি বড়ো একটা সুন্দরীগাছের তলায়। মাটিতে রক্তের দাগ, ভিজে জমিতে ইতস্তত বাঘের পায়ের ছাপ। চাঁদু মেপে দেখছে নিজের পায়ের সঙ্গে, হঠাৎ আমাদের গাইড “আঁক” শব্দে চেঁচিয়ে তড়িৎ গতিতে ঈশান কোণ বরাবর বেগে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমরা দুজনে অবাক হয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। এই সব গাঁয়ের লোকদের ব্যবহার ঠিক বোঝা যায় না, হয়তো কোনো জরুরি কাজ-টাজ মনে পড়েছে!

আমি জলের বোতল খুলছি, চাঁদু আমার কাছে সরে এসে নীচুস্বরে বললে – ‘আমি যা দেখছি তুই তা দেখছিস?’

সুন্দরবনের গহন জঙ্গল কি ছেলেমানুষি খেলার জায়গা? আমি বিরক্ত হয়ে বললাম – ‘তুই কী দেখছিস?’

– ‘এখন তাকাস না, মনে হচ্ছে গাছের ওপরে  একটা বাঘ….’

তাকিয়ে দেখি সত্যিই তাই। হাত দশেক উঁচু একটা মাচার ওপরে একটা বাঘ ঘুমোচ্ছে। শিকারির ছাগলটা খেয়ে বেশ তৃপ্তি পেয়েছে মনে হল।

আমি বললাম – ‘হুঁ একটা বাঘ ঘুমোচ্ছে, সেই ল্যাজকাটাটাই হবে -’

– ‘ওটা কী বাঘ রে?’

ওটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার – মানুষখেকো। মাঝেমাঝে ছাগলও খেয়ে থাকে। বাঘটা ঘুমিয়ে আছে, এই ফাঁকে মেরে দিই -’

– ‘কাপুরুষ! চিড়িয়াখানার বাঘ মারতে চেয়েছিলাম বলে একবার কত না গালমন্দ করেছিলি আমাকে, মনে আছে?’

আমি বললাম – ‘শোন চাঁদু, জঙ্গলের বন্য বাঘ দুর্দান্ত ডেঞ্জারাস। শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ। দুষ্ট বাঘকে নিদ্রিত অবস্থায় মারলে কাপুরুষতা হয় না।’

চাঁদু চুপ করে অনেকক্ষণ কী ভাবল – ‘বেশ। বাঘটাকে আমি মারব কিন্তু -’

– ‘বাঃ ইয়ার্কি নাকি? আমি মারব -’

– ‘কেন তুই মারবি? আগে আমি দেখছি, আমি মারব -’

– ‘তা কখনও হয় রে! আমি হেড শিকারি, তা ছাড়া আমার নিশানা অব্যর্থ -’

– তাতে কী হয়েছে? বাঘটা ঘুমচ্ছে, সোজা ওর পেটে বন্দুক লাগিয়ে ছুঁড়লেই হবে -’

– হ্যাঁ, তাহলেই হয়েছে! বাঘকে মারতে হয় দুচোখের মাঝখানটায়, পেটে গুলি করলে ওদের কাতুকুতু লাগে -’

– ‘আহা! সেরকম মারতে হয় বাঘ যখন দাঁড়িয়ে থাকে, তখন। এখন তো ও ঘুমিয়ে আছে -’

– ‘এই বিদ্যে  নিয়ে বাঘ শিকারে এসেছিস, চাঁদু?’

চাঁদু বলল – ‘আমাকে মারতে না দিলে ওকে জাগিয়ে দেব কিন্তু….’

ভেবে দ্যাখো কী ধরনের অমানুষ এই চাঁদু! এতদিন ওকে জঙ্গলের মধ্যে কেমন আগলে আগলে এনেছি, সব রকম বিপদ থেকে ওকে রক্ষা করেছি, সেসব কিচ্ছু ভেবে দেখল না – এমন অকৃতজ্ঞ!

চাঁদু এবার বলল – ‘আমাকে যদি মারতে না দিস তাহলে বাঘটার কানের কাছে গিয়ে কু-উ-উ চেঁচাব। চেঁচাই?’

– ‘অ্যাই, ভালো হবে না চাঁদু -’    

– ‘বেশ করব চেঁচাব…. কু-উ-উ-উ। বিকট গগনভেদী চিৎকার ছাড়ল চাঁদু।

বাঘটা চমকে জেগে উঠল। তারপর বেড়ালের মতন পিঠ বেঁকিয়ে বিরাট এক হাই তুলল। হাই তোলার ব্যাপারে এই বাঘটার বোধ হয় সহজাত এক দক্ষতা আছে। হাই সংক্রামক। আমরা দুজনে অনিচ্ছাসত্ত্বে হাই তুলতে তুলতে ভীত চোখে বাঘটাকে দেখতে লাগলাম।

ও একবার চাঁদুকে দেখছে, একবার আমাকে। কাকে খাবে যেন মনস্থির করতে পারছে না। তখনকার দিনে চাঁদুর চেহারাটা বেশ নধর গোলগাল মতন ছিল। ওকে মারলে বাঘের পুরো ফ্যামিলির পেট ভরে যাওয়ার পরেও কিছুটা বিলিয়ে দেওয়ার জন্য থাকবে। আর, আমাকে তো দেখছই! তখনও আমাকে খাওয়া কিংবা বন্দুক চিবোনো একইরকম ব্যাপার ছিল! তার ওপরে আমার একটা অ্যাডভানটেজ এই দাড়ি। স্থি্র হয়ে থাকলে বাঘটা আমাকে প্রাকৃতিক দৃশ্যের অঙ্গ ভাবতে পারে। সব দিক ভেবে দেখলে চাঁদুরই ঝুঁকি বেশি। আমি বাঘ হলে ওকেই খেতাম। কিন্তু এই বাঘটা সেই সমাধানে আসবে কি?

আরও পড়ুন:  জামাই ষষ্ঠী পালা

বাঘটা মাচা থেকে লাফিয়ে নেমে এসে আমাদের দুজনকে পর্যবেক্ষণ করছে। এমন কাছ থেকে বন্য জন্তু দেখলে ভয়ে হাত-পা কাঠ  হয়ে যায়। বন্দুক তুলতে ভুলে গেছি। একটু পরে বোঝা গেল বাঘটা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে এবং লম্বা জিভ দিয়ে মুখ চেটে নিয়ে চাঁদুর দিকে এক পা এগোল। চাঁদু বুঝতে পেরেছে, আমার দিকে তাকিয়ে চোখের জল মুছে গাইল – ‘মাকে মনে পড়ে আমার, মাকে….’

প্রচন্ড বন্দুকের আওয়াজে চাঁদু থেমে গেল। চোখের সামনে বাঘটা অবাক হয়ে মরে পড়ে গেল – কপালে জিজ্ঞাসার চিহ্ন।

শেয়ালকাঁটার ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল ধুতিপরা শিকারি, সঙ্গে একটা নতুন ছাগল। আমার হাতে একটা ক্যামেরা গুঁজে দিয়ে, সে বীরদর্পে বাঘটার গায়ে এক পা তুলে দাঁড়াল, কাঁধে বন্দুক। আমি ওদের যুগল ছবি তুলে দিলাম। এই পর্যন্ত একনাগাড়ে বলে ওয়েটিং রুমের দাড়ি-অলা ভদ্রলোকটি থামলেন। কিছুক্ষণ নিদ্রিতা স্ত্রীর দিকে ভীরু চোখে চেয়ে থেকে আমাকে ষরযন্ত্রকারীর মতন বললেন – ‘তোমার ক্যামেরা আছে। ওর আর আমার যুগলে একখানা ছবি তুলে দেবে?’

সোফায় শায়িতা বলশালী ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে আমি শিউরে উঠে বললাম – ‘যদিও তেমন ফটোজেনিক নন, আমার আপত্তি নেই।’ দাড়ি-অলা চিন্তা করতে করতে বললেন – ‘ঘুমন্ত স্ত্রীদের ঠিক কোথায় গুলি করতে হয়, জানো? চোখের মাঝখানে, না কি চাঁদু যেমন বলেছিল – পেটে?’

আমি চমকে বললাম – ‘সে কী! গুলি মারলে উনি মরে যাবেন যে!’       

তিনি কঠিন দৃষ্টিতে আমাকে দেখতে দেখতে বললেন – ‘তুমি নিশ্চয় ভাবছ যে স্ত্রীরাও মানুষ, মারার আগে তাদের অন্তত জাগিয়ে দেওয়া উচিত, তাই না? শঠে শাঠ্যং সমাচরেৎ, বুঝেছ? যাও, মিথ্যে সময় নষ্ট করো না, ক্যামেরা রেডি করো। আমি বন্দুকটা বের করছি। ঘটনার পরে, আমাদের যুগলে ছবি তুলে দেবে সেই শিকারির যেমন তুলেছিলাম, কেমন?’

দাড়ি-ওলা সোফার পেছনে বাক্স খুলে বন্ধুক বের করে তাড়াতাড়ি কার্তুজ ভরলেন। দেয়ালে একটা টিকটিকিকে কিছুক্ষণ তাক করলেন তিনি এক চোখ বুজে। তারপর যেই না  নলটা ঘুরিয়েছেন মহিলার দিকে, আচমকা একটা ট্রেন দুর্দান্ত হুইসল বাজিয়ে দিল। মহিলা ঘুম ভেঙে, উঠে বসে, অগ্নিদৃষ্টিতে চারিদিকে তাকালেন। দাড়ি-অলা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বন্দুকটাকে বাক্সবন্দি করে ফেললেন। স্বামীকে সোফার পেছনে আবিষ্কার করে মহিলা তীব্র দৃষ্টি স্থাপন করে বললেন – ‘যাও তো দেখি, গতর  নাড়িয়ে একটা সাদা পান, খয়ের ছাড়া, জাফরান পাতি, চমনবাহার সেজে নিয়ে এসো গে….’

– আচ্ছা।’ নীরবে নতমস্তকে দাড়ি-ওলা বেরিয়ে যাচ্ছিলেন।

মহিলা আবার গর্জন করলেন – ‘মনে রেখো, যাবে আর আসবে। তুমি আবার আমার দৃষ্টির বাইরে গেলেই দেখছি গঁদের আঠার মতন আটকে যাও! তাড়াতাড়ি এসে এই চাদর, বালিশ বেঁধে ফেলবে, বুঝেছ? যাও…. মড়ার ট্রেন কখন যে আসবে।’ তিনি কাত হলেন।

ধীরে, নিঃশব্দে আমি প্ল্যাটফর্মে বেরিয়ে এলাম। লোকে বলে বাঘ-টাঘ। বাঘ তো জানি, টাঘ কী? বাঘের মতনই।

2 COMMENTS

  1. emon bhalo pet phata hasir galpo…anek din parini…sabai enjoy karbe asha kari.bishesato jara bibahito.lekhak o bangla.comke dhanyabad o kritagyata janai

  2. ঠিক জমলে না, এত বড় গল্প, শেষে হতাশ হতে হলো

এমন আরো নিবন্ধ