কপি-পেস্ট আর ‘রিমেকওয়ালা’

আজকালকার বাংলা সিনেমার বেশিটাই তামিল তেলুগু সিনেমা থেকে কপি-পেস্ট ভেবে যাঁরা নাক-মুখ সিঁটকে রাখেন, তাঁদের সবিনয়ে বলি, এই কপি-পেস্টের খেলাটা সিনেমা কিন্তু খেলতে শুরু করেছিলো বাংলা ছবির ঢের আগে | অন্য ভাষার মার্কেটের সুপারহিট মশলাকে কেন নিজের ভাষার মার্কেটে আরেকপ্রস্থ তড়কা মেরে চালানো যাবে না, ইয়ার্কি নাকি? সেইজন্যেই ১৯৮১ সালে তৈরি তেলুগু সিনেমা ‘উরিকি মোনাগাডু’ হিন্দিতে রিমেক করতে গিয়ে দুবার ভাবতে হয়নি হিন্দি সিনেমাওয়ালাদের | চুপি চুপি কপি নয়, রীতিমতো অফিসিয়াল রিমেক করা হয়েছিলো সেই ছবি | পরিচালনা করেছিলেন মূল তেলুগু ছবির পরিচালক কে. রাঘবেন্দ্র রাও নিজেই | ১৭৯ মিনিট দৈর্ঘ্যের সেই হিন্দি রিমেক ছবি ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩ মুক্তি পেয়েছিলো ‘হিম্মতওয়ালা’ নামে আর সমালোচকদের মুখে যথেষ্ট ছাই দিয়ে সেই প্রায় বি-গ্রেড মার্কা সিনেমাই ২ কোটি টাকার ব্যবসা করে হয়ে গেছিলো বছরের সবথেকে বড় মেগাহিট |

জিতেন্দ্র-শ্রীদেবী-আমজাদ খান-শক্তি কাপুর-ওয়াহিদা রহমান-অরুণ গোভিল-কাদের খান-সোমা আনন্দ্-আসরানি অভিনীত সেই ‘হিম্মতওয়ালা’র আরেকপ্রস্থ অফিসিয়াল রিমেক হলো পাক্কা ৩০ বছর পরে, এই ২০১৩তে | এবারে রিমেকটা বানালেন যিনি, সেই সাজিদ খানকে হিন্দি সিনেমার রিমেক-মাস্টার (অথবা ‘রিমেকওয়ালা’) বললে একফোঁটাও বাড়িয়ে বলা হয় না | রামগোপাল ভার্মার ‘ডরনা জরুরি হ্যায়’ ছবিতে একটা ১০ মিনিটের ছোট ছবির ডিরেকশন দিয়ে পরিচালনার দুনিয়ায় হাতেখড়ি, তারপর থেকে সাজিদ যেটাই বানিয়েছেন, সেটাই অন্য ছবির কপি-পেস্ট | যাঁরা যাঁরা ভেবে রেখেছেন এই মহান কাজের গুরুমশাইরা হলেন এই বঙ্গের রাজ চক্রবর্তী — রাজীব বিশ্বাস — রাজা চন্দ আর রভি কিনাগিরাই শুধু, তাঁদের মাথা ঘুরে যাবে সাজিদের ফিল্মোগ্রাফি শুনলে | ২০০৭-এ সাজিদ বানালেন ‘হে বেবি’, যেটা ১৯৯০-এর মালয়ালাম হিট ফিল্ম ‘থুভালস্পর্শাম’-এর কপি (মালয়ালাম ছবিটা আবার ইংরেজি ছবি ‘থ্রি মেনস অয়্ান্ড আ বেবি’ থেকে তৈরি আর ইংরেজি ছবিটা আবার ফরাসি ছবি Trois hommes et un couffin থেকে তৈরি – তবে সে কথা থাক) | ২০১০-এ সাজিদের পরের ছবি ‘হাউসফুল; কপি করা হয়েছিলো কমল হাসানের ১৯৯৮ সালের তামিল সিনেমা ‘কাথালা কাথালা’ থেকে | না-বলে চুরির এই কেস এতদূর গড়ায় যে মূল ছবির প্রযোজক পি. এল. থেনাপ্পন সাজিদের ছবির প্রযোজক আরেক সাজিদ-এর (সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা) বিরুদ্ধে মামলা অব্দি করে দেন | ২০১২-এ আসে সাজিদ খানের পরের ছবি ‘হাউসফুল — টু’ আর এই ছবি কপি করা হয় ১৯৯৮-এর হিট মালয়ালাম ছবি ‘মাট্টুপেট্টি মাচান’ থেকে | তারপর আর না-বলে-কয়ে ঝাঁপা কেস নয়, সাজিদ রীতিমতো অফিসিয়ালি রিমেক করলেন এই ‘হিম্মতওয়ালা’র | সব্বাই ছবি দেখে বলছে, বাপরে বাপ, কী লম্বা ছবি | কিন্তু আমি অন্তত সাজিদকে ছবির দৈর্ঘ্যের জন্য ধন্যবাদ না দিয়ে পারছি না, আগের ছবিটা ছিলো আরো লম্বা, পাক্কা ১৭৯ মিনিটের ছবি, সাজিদ সেটা থেকে কেটে-ছেঁটে এবারেরটা যে ১৫০ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে বেঁধে রাখতে পেরেছেন, এই না ঢের |

২০১৩-র বলিউড — যেখানে প্রায় প্রতি মুহূর্তে কনসেপ্ট আর মুভি মেকিংয়ে সশব্দ বিপ্লব ঘটে চলেছে, সেই সময় ত্রিশ বছর আগের একটা ছবিকে প্রায় একটুও নবীকরণ না করে মোটামুটি আগাপাস্তলা টুকে দিতে পরিচালকের কতটা দম লাগে জানি না, তবে প্রযোজকের (ভাসু ভাগনানি আর রণি স্ক্রুওয়ালা) সাহস তো লাগে যথেষ্ট | হবে না? মাঝের এই ৩০টা বছরে যে হিন্দি ছবির দর্শকরাই বদলে গেলেন আনখশির | সেই সময়ের মানুষেরা যা দেখে মজা পেতেন, এখনকার মানুষেরা সেই দৃশ্যগুলোর কপি-পেস্ট দেখেও ঠিক একই রকম মজা পাবেন, আর ছবিটাকে মহা-হিট বানিয়ে দেবেন, যে মার্কেট রিসার্চ থেকে এই সম্ভাব্য মহা-তথ্য উঠে এসেছে, তাকে মহা-সেলাম না জানিয়ে উপায় নেই | মহা-সেলাম জানাচ্ছি, কারণ, এই সময়ের অন্যতম দুই সুপারস্টার — অজয় দেবগণ (এর আগে ঝাঁকে ঝাঁকে হিট দিয়েছেন) আর অয়্ানিমেশনের
বাঘমামা (তাঁর এর আগের হিট ছবি ‘লাইফ অফ পাই’), এই দুইয়ে কম্বো প্যাকেজও যে শেষ-মেশ এই মুম্বই রিসার্চ-প্রসূত ‘হিম্মতওয়ালা’কে বক্স অফিসে দাঁড় করাতে গিয়ে ফেল মেরে গেলো | ছবি রিলিজের দুদিন পরে, রবিবার উত্তর কলকাতায় অভিজাত হলে আমার সঙ্গে এই ছবি বসে দেখলেন মোটে জনা কুড়ি দর্শক — ভাবতে পারছেন?

ছবিটা ফ্লপ, সেটা এখনই লিখে দিচ্ছি না অবশ্য | কারণ বক্স অফিস বিজনেসের মধ্যে হরেক কিসিমের প্যাঁচ-পয়জার লুকনো থাকে | ভারতের নানান কোণে দর্শকের মতিগতিও হরেক টাইপের | সেইজন্য এরকম আগেও হয়েছে, যে ছবি দক্ষিণে সুপারফ্লপ, সেটাই আবার উত্তরে গো-বলয়ে মার-মার-কাট-কাট হিট | কিম্বা যে ছবি সারা ভারত জুড়েই ফ্লপ, সেটাই আবার ওভারসিজে টাকা তুলে আর স্যাটেলাইট রাইটস বেচে সটান ১০০ কোটির ক্লাবে | সেইজন্যে এই ছবির ভাগ্যে শেষ অব্দি কী হবে, সেই ভারডিক্ট না হয় ভবিষ্যতের জন্যে তোলাই তাকুক | আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি, কোনো একটি ওয়েবসাইটে সাজিদ যে জানিয়েছেন, এটাই নাকি তাঁর শ্রেষ্ঠ ছবি, সেটা পড়ে আপনার কিছুক্ষণের জন্য একটা ব্ল্যাক আউটের মতো হয়ে গেলেও হয়ে যেতে পারে | কারণ খুব নরম করে বললেও বলতে হয়, এটাই সাজিদের সর্বনিকৃষ্ট ছবি | মূল ছবির থেকে ডিউরেশন ৩০ মিনিট কমিয়েছেন, তারপরেও বিলকুল ফাঁকা হল-এ পাঁচ মিনিট পরপর ঘড়ি দেখে ভেবে চলেছি, হে ভগবান, আর কতক্ষণ এই যন্ত্রণাটা চলবে — অবস্থাটা বুঝতে পারছেন?

ফাইট মাস্টার বীরু দেবগণের ছেলে অজয় দেবগণ তাঁর নায়ক-সাজার কেরিয়ার যখন ১৯৯১-তে শুরু করেছিলেন ‘ফুল আউর কাঁটে’ ছবিতে, সেই থেকে মিডিয়া আমাদের গিলিয়ে এসেছে একটা তথ্য ঃ: নিজের সব স্টান্ট নাকি নিজেই করেন এই স্টান্টম্যান-পুত্র, অন্য কারুর হেল্প নেন না | এই ছবিতে এসে তাঁর সেই গৌরব-পালকও হাওয়ায় উড়ে নিরুদ্দেশ, কারণ ছবিতে তিনি মারপিট করছেন বাঘের সঙ্গে আর সেই সব দৃশ্যের তলায় পরিচালক স্বয়ং ফুটনোট দিতে দিতে যাচ্ছেন যে, এই সব দৃশ্য কম্পিউটার গ্রাফিক্সের কারিকুরিতে তৈরি | এতদিন ধরে ছবিতে ছবিতে সিগারেট টানার সতর্কবাণী দেখে দেখে চোখ পচে গেছিলো, সেদিক থেকে এটা একটু স্বাদবদল তো বটেই, সেটা বলা মুশকিল |

দক্ষিণী ছবির আগের রিমেকটার নায়িকা ছিলেন দক্ষিণী সুন্দরী শ্রীদেবী, এবারে তাঁর জায়গায় রয়েছেন দক্ষিণী-ছবির আরেক হট নায়িকা : তামান্না | মূল ছবির ২টো গান ‘তাথৈয়া তাথৈয়া’ আর ‘তাকি ও তাকি’ এই ছবিতেও রেখেছেন পরিচালক | পরেশ রাওয়াল, মহেশ মঞ্জরেকর আর আসরানি, তিনজনেই সু-অভিনেতা, কিন্তু তিনজনকেই এই ছবিতে দেখে আপনার মাথা ধরে যাবার প্রবল চান্স | বরং ফাউ হিসেবে রীতেশ দেশমুখের আবির্ভাব আর সোনাক্ষি সিনহার আইটেম ডান্স আপনাকে খুশি করলেও করতে পারে |

এ ছবি দেখতে গেলে অবশ্যই সঙ্গে রাখুন আপনার প্রিয়জনকে | এই গরমে একদম ফাঁকা হলের মায়াবী অন্ধকারে ফাটাফাটি এসি-তে তাঁর সঙ্গে এমন ধুম শরীরী মস্তির সুযোগ চট করে আর পাবেন না |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here