টিটিকাকা হ্রদে লুকোনো রহস্যময় শহরই নাকি এল ডোরাডো

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৮০০ মিটার উপরে পেরু আর বলিভিয়ার মাঝে আন্দিজ পর্বতমালায় বিস্তৃত টিটিকাকা হ্রদ। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু নৌ চলাচলযোগ্য হ্রদ। অর্থাৎ উচ্চ অক্ষাংশেও এই হ্রদ নৌ চলাচলের যোগ্য। প্রাচীন কাল থেকেই টিটিকাকা মানে অসীম রহস্যের হাতছানি। ঐতিহাসিকদের মতে, এর গভীরেই ঘুমিয়ে আছে এক প্রাচীন এক সভ্যতা। ইনকাদের আগে জন্ম হয়েছিল এই জনপদের। এই লুকোনো শহরই নাকি এল ডোরাডো। যেখানে রাখা আছে ইনকাদের গুপ্তধন।


ইনকা সভ্যতার ইতিহাস অনুযায়ী, টিটিকাকা হ্রদ থেকেই তাদের সভ্যতার জন্ম। তাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এর জল। ইনকাদের আগে টিটিকাকার তীরে বসতি ছিল পুরাকা, তিহুয়ানাকো জনজাতির। পরবর্তীকালে এরা ইনকাদের সঙ্গে মিশে যায়। পুরবিদদের মতে, টিটিকাকার গভীরে ওই শহর ইনকা-পূর্ববর্তী কোনও জনগোষ্ঠীর তৈরি। কোনও এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে গোটা শহরকে গ্রাস করে নেয় এই হ্রদ।


গভীরতার জন্য টিটিকাকা হ্রদে ডাইভ করা দুরূহ। তবে বছর পনেরো আগে প্রায় দুশোজন আন্তর্জাতিক ডাইভার অভিযান চালান এই হ্রদের গভীরে। অভিযানের নাম ছিল ‘আটাহুয়ালপা ২০০০’। এই অভিযানের ফলেই হ্রদের অতলে আবিষ্কৃত হয় বিশাল মন্দির, রাজপথ, সোনার গয়না, সেরামিকের বাসন এবং মূর্তি। পাওয়া যায় মানুষ এবং পশুদের হাড়, পুজোর উপচার এবং ধূপদানি। ঐতিহাসিকদের মতে, এই স্থাপত্য প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো।


ইনকা সভ্যতারও অনেক আগে থেকে দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এই হ্রদটি পবিত্র হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, এই হ্রদ থেকে দেবতা ভিরাকোচা উঠে আসেন ও তিয়াহুয়ানাচো নামের একটি জায়গায় আসেন প্রথম ‘এন্ডিয়ান’ (আন্দিজ পর্বতমালার অধিবাসী) মানুষ তৈরির করার জন্য। অনেক দিন ধরেই এই ধারণা প্রচলিত হয়ে আসছিল যে, এই হ্রদের নিচে রয়েছে প্রাচীন এক মন্দির। কিন্তু কেউ জানত না, হ্রদের এত গভীরে এই মন্দির কিভাবে এল ? আর কারাই বা তৈরি করেছে এই মন্দির?


১৯৬৭ সালে বলিভিয়ান সরকার ও ১৯৮৮ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক টিটিকাকা হ্রদের নিচে বৈজ্ঞানিক তথ্যের জন্য অভিযান চালায়। বিভিন্ন দেশের প্রত্নতত্ত্ববিদরা হ্রদের নিচের অনেক প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পান। এমনকি হ্রদের তীর থেকে বেশ কিছু পথ নেমে গিয়েছে একদম হ্রদের নিচে। আর সেগুলো হ্রদের অতলে এক জায়গায় একটি অর্ধ-চন্দ্রাকার স্থানে গিয়ে মিলিত হয়েছে। যেন পাথরগুলো খুব সুন্দরভাবে কেটে এই পথগুলো বানানো হয়েছে, পথের সংখ্যা সর্বমোট ত্রিশ।


এরপর ২০০০সালে হ্রদের নিচে পথ অনুসরণ করে পাওয়া গেল দুশো মিটার দৈর্ঘ্য ও পঞ্চাশ মিটার প্রস্থের একটি মন্দিরের সন্ধান। এখন পর্যন্ত এটাই অজানা কারা এই মন্দির তৈরি করেছিল? আর এটি কীভাবে জলে ডুবে গেল? নাকি তৈরি করা হয়েছিল জলের নীচেই? এই মন্দিরের সঙ্গে মিলেছিল শস্য মজুতের জন্য ব্যবহৃত ছাদ, একটি লম্বা রাস্তা ও আটশো মিটার দৈর্ঘ্যের লম্বা দেয়াল। আর জায়গাটি আন্দিজ পর্বতমালার সংলগ্ন জলের নিচে অবস্থিত। গবেষকদের মতে এগুলো প্রায় ১০০০ থেকে ১৫০০ বছরের পুরনো যা প্রাচীন এক সভ্যতার ইঙ্গিত। স্পেনীয় সাম্রাজ্য বিস্তারের আগের সময়ে দক্ষিণ আন্দিজের কাছাকাছি এলাকায় ছিল এই সাম্রাজ্য। পাঁচশো থেকে ন’শো খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল এটি। বিশেষ এক ধরনের ধর্ম ছিল এই তিওয়ানাকু সংস্কৃতিতে, ইতিহাসবিদদের ধারণা এমনটাই।


আট হাজার অষ্টআশি বর্গকিলোমিটার আয়তনের হ্রদটি দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম হ্রদ। বড় বড় জাহাজ নিয়মিত চলাচল করে হ্রদটিতে। গভীরতা প্রায় দুশো চুরাশি মিটার। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পঁচিশটি নদী মিশেছে টিটিকাকার সঙ্গে। তবে হ্রদ থেকে মাত্র একটি নদী বলিভিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। টিটিকাকা হ্রদের পাশে প্রাচীন ইনকা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। একচল্লিশটি ছোট-বড় দ্বীপ রয়েছে টিটিকাকায়, অধিকাংশই ঘনবসতিপূর্ণ। হ্রদটিতে প্রায় পাঁচশো ত্রিশ প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল এবং অনেক প্রজাতি শুধু ওই অঞ্চলেই দেখা যায়। প্রাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম হল টিটিকাকা ব্যাঙ, টিটিকাকা গ্রেব নামক এক প্রজাতির পাখি, পেনসিল ক্যাটফিশ ইত্যাদি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here