খাস কলকাতার ক্রিক রো এবং ডিঙি ভাঙা লেনের জন্মবৃত্তান্ত

2364

কলকাতা তখন সবে গড়ে উঠছে । স্থলজ পরিবহণের একমাত্র মাধ্যম হল পাল্কি । তবে পরিবহণের মূল ধারাটিই ছিল জলপথ ধরেই। রেলপথ আসার আগে পর্যন্ত জলপথই ছিল সাধারণ মানুষের প্রধান যাতায়াতের রাস্তা । কলকাতা এবং পাশ্ববর্তী অঞ্চলগুলিকে ঘিরে ছিল একাধিক খাল। সেই খাল দিয়েই যাতায়াত হতো, ব্যবসা-বাণিজ্য হতো, লোকজন বিদেশ বিভুঁইয়ে রওনাও হতেন। এই খালগুলি গিয়ে মিশত শাখা নদীতে । সেখান থেকে কোনওটি মূল স্রোতে। কোনওটি আবার সোজা সমুদ্রে মিশত।

আঠারো শতক এবং উনিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত চাঁদপাল ঘাট, অর্থাৎ মূল গঙ্গা থেকে একটি খাল বেরিয়ে চলে গিয়েছিল ধাপা পর্যন্ত । আজকের গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউ যেখানে, সেখান দিয়েই গিয়েছিল খালটি । পথে পড়ত সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার, শিয়ালদহ, এন্টালি এবং লবণহ্রদ। তবে ডিহি এন্টালির উল্লেখ থাকলেও সে সময় কিন্তু শিয়ালদহ বা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার নাম হয়নি। যাইহোক কহ্বলনের লেখা অনুযায়ী, ‘কালভিন ঘাট বা কাঁচাগুডি ঘাট থেকে আরম্ভ হয়ে হেস্টিংস স্ট্রিটের পুরাতন সমাধিক্ষেত্রের পাশ্ববর্তিনী হয়ে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের ওপর দিয়ে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে এসে পড়েছিল । ওয়েলিংটন স্কোয়ারের এই জায়গাটিতে খালটি একটু কোণাকুণিভাবে চওড়া ছিল এবং এখান থেকে ক্রীক রো’র ভিতর দিয়ে বেলিয়াঘাটা সল্টলেক বা ধাপা পর্যন্ত প্রবাহিত হতো।…’কলিকাতা’ সেটেলমেন্ট প্রস্তাবে এই খালের নক্সা আছে । এই খালের ওপর দিয়ে বড় বড় মালের জাহাজ ও নৌকা যাওয়া আসা করত।’

১৮০০ সালে এই খালটির একটি অংশ বুজে যায় । তখন আবার বাকি অংশ সার্কুলার রোডের সমান্তরাল করে কেটে চিৎপুরে মেশানো হয় গঙ্গার মূল স্রোতের সঙ্গে । তখন এই খালের নাম হয় সার্কুলার ক্যানাল বা সার্কুলার খাল। যাইহোক, খাল নিয়ে নয় আলোচনা পরে হবে। তবে এত পর্যন্ত পড়ে অনেকেই হয়ত প্রমাণ চাইতে পারেন। এই রাস্তা দিয়ে যে খাল গিয়েছিল, তার প্রমাণ কোথায় ?

সে প্রমাণ আজও বহন করে ক্রিক রো । আজও এই পথ বয়ে চলেছে সেই জলপথের ইতিহাস। ইংরেজি CREEK শব্দের অর্থ যে খাঁড়ি, তা  প্রত্যেকেই জানি। খাল বুজিয়ে এই রাস্তা হয়েছিল বলে এই পথের নাম হয় CREEK ROW। এর আশপাশেই রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের পাশেই ছিল ডিঙি ভাঙা লেন। লোকমুখে এই পাড়ার নাম ছিল ডিঙি ভাঙা পল্লি। ডিঙি ভাঙা নামকরণের পিছনে একটা দারুণ গল্প আছে—

১৭৩৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। সকাল থেকেই মেঘলা করেছিল। তীব্র বেগে বইছিল হাওয়া। বর্ষা শেষে আকাশের অবস্থা দেখে ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়েছিলেন ‘শিশু’ কলকাতার বাসিন্দারা। কিন্তু রাত হতেই বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে এল এক ঘূর্ণিঝড় (যাঁরা আয়লা দেখেছেন, তাঁদের জন্য জানাই সে ঝড় ছিল আয়লার থেকেও মারাত্মক)। তার সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। দুর্যোগ যে কত বড়, তা কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পেরে গেলেন সবাই। বৃষ্টি-ঝড়ের দাপট এতটাই যে লোকে ভাবল, হয়ত বুঝি ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। কোনও বাড়ির চাল, জানলা, দরজা উড়ে গেল, আবার কিছু মাটির বাড়ি ভেঙে পড়ল ।

ভোররাতে অবশ্য দুর্যোগ থামল । সকালের আলো ফুটতে বোঝা গেল, সদ্য তৈরি হয়ে ওঠা শহরটা লন্ডভন্ড । চারদিকে শুধু হা হুতাশ আর কান্নার রোল । সব গেল’র যন্ত্রণা নিয়ে বুক চাপড়াচ্ছে মানুষ। হতবাক এ দেশে ব্যবসা করতে আসা বিদেশি বণিকরা। তাঁরা তো বঙ্গোপসাগরের ঝড়ের সঙ্গে পরিচিত নন। তাঁরাও গুনছেন ক্ষতির বহর।

এর মধ্যে এক ভয়ানক ঘটনার খবর পাওয়া গেল । গঙ্গায় হাজার হাজার নৌকা, ছোট জাহাজ উধাও। শুধু বেঁচে আছে ‘ডিউক অফ ডর্সেট’ নামে জাহাজটির কিছু অংশ । তবুও ধ্বংসের চিহ্ন তার মধ্যে স্পষ্ট । কোথায় গেল নৌকা-বজরা-জাহাজগুলি ? মহাপ্রলয়ের সময় সেগুলি সার্কুলার ক্যানেলে ঢুকে পড়ে।ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মুখে এসে প্রচণ্ড বেগে নৌকা-জাহাজ ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। সেখানে শুধুই তখন ধ্বংসের স্তুপ, অগণিত লাশ।

সেই থেকেই এই ক্যানেলের পাশ্ববর্তী অঞ্চলের নাম হয়ে ওঠে ডিঙিভাঙা পল্লি। পরবর্তী সময়ে ডিঙি ভাঙা লেন। যদিও ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, ডিঙি ভাঙা পল্লি গড়ে উঠেছিল খাল বুজিয়ে বসতি গড়ে ওঠার পর। তাহলে প্রশ্ন হল, এই খাল বুজতে সময় লাগে আরও ৬৩টি বছর। এই ৬৩টি বছরে তো ডিঙিভাঙার সেই ইতিহাস হারিয়ে যাওয়ার কথা। লোকমুখে তা আবার ফিরে এল কী করে ? সে প্রশ্নের উত্তর অবশ্য জানা নেই। তবে কালের নিয়মে হারিয়ে গিয়েছে ডিঙি ভাঙার স্মৃতি ।নগরায়ণের আর নামকরণের ঠেলায় ডিঙি ভাঙা লেন আজ হারানো বৃত্তান্ত । ক্রিক রো অবশ্য আজও আছে । আজও আছে ডিঙি ভাঙার সেই স্মৃতি আঁকড়ে ধরে ।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.